সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : অন্নপূর্ণা দিবসের মঞ্চ থেকে রাজ্যের আগের সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ তুললেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। তবে নিজের বক্তব্যে তিনি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) নাম সরাসরি উচ্চারণ করেননি। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল নারী নিরাপত্তা, আর্থিক সহায়তা, বাল্যবিবাহ রোধ, মাদকমুক্ত সমাজ এবং সরকারি আবাসনের মালিকানায় মহিলাদের অগ্রাধিকার। পাশাপাশি তিনি জানালেন, তাঁর সরকার শুধু বিভিন্ন ভাতা দেওয়ার মধ্যে নিজেদের কাজ সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না; সামাজিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছে। প্রসঙ্গত, ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) জন্মদিন উপলক্ষ্যে রাজ্যজুড়ে অন্নপূর্ণা দিবস পালনের আয়োজন করা হয়। কলকাতার সল্টলেকের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে মুখ্যমন্ত্রী নারী-কেন্দ্রিক একাধিক সরকারি উদ্যোগের কথা জানান। এই অনুষ্ঠানেই তিনি ঘোষণা করেন, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার (PM Awas Yojana) আওতায় পশ্চিমবঙ্গে ৫০ লক্ষের বেশি বাড়ির জন্য উপভোক্তার তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। সেই বাড়িগুলির মালিকানা মহিলাদের নামে দেওয়ার পরিকল্পনার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকথাও জানান।

এদিন শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল সামাজিক সংস্কারের প্রসঙ্গ। তাঁর কথায়, ‘এই সরকার শুধু ভাতা দিতে আসেনি, সংস্কার করতে এসেছে।’ একই সঙ্গে তিনি বাল্যবিবাহ বন্ধ করার কথা বলেন। ১৮ বছরের আগে কোনও মেয়ের বিয়ে হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাল্যবিবাহের পাশাপাশি অল্প বয়সে সন্তান প্রসবের প্রবণতা বন্ধ করাও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। মাদকমুক্ত পশ্চিমবঙ্গ গড়ার কথাও এদিন জোর দিয়ে বলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, নেশার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ তৈরি করতে হবে ও এই কাজে মহিলাদেরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। মাদক ব্যবসা ও মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নেশামুক্ত পশ্চিমবঙ্গ গড়ব। সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’
নারী নিরাপত্তার বিষয়টিও এ দিনের বক্তৃতায় গুরুত্ব পেয়েছে। শুভেন্দু জানিয়েছেন, মহিলাদের উপর অত্যাচারের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গত চার মাসে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সম্পতি চট্টোপাধ্যায়ের (Justice Samapti Chatterjee) নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করা হয়েছে। কোনও মহিলার উপর অত্যাচারের ঘটনা ঘটলে সরকার কঠোর অবস্থান নেবে বলে জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, ‘একজন মা-বোনের উপর অত্যাচার হলে আমরা ছাড়ব না।’ অন্নপূর্ণা যোজনার (Annapurna Yojana) চতুর্থ কিস্তির অর্থ নিয়েও এদিন বক্তব্য রাখেন মুখ্যমন্ত্রী। যোগ্য মহিলাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে মাসে ৩ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রকল্পটির কথা তুলে ধরে তিনি জানান, বিপুল সংখ্যক মহিলা ইতিমধ্যেই এই সুবিধা পেয়েছেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অন্নপূর্ণা যোজনার আওতায় যোগ্য মহিলাদের মাসিক ৩ হাজার টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
অন্নপূর্ণা দিবসের সঙ্গে প্রকল্পটির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বও জুড়ে দিয়েছেন রাজ্য সরকার। শুভেন্দুর ঘোষণা অনুযায়ী, প্রতি বছর ১৭ সেপ্টেম্বর রাজ্যে অন্নপূর্ণা দিবস পালন করা হবে। দিনটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জন্মদিন হওয়ায় এ বার থেকেই এই কর্মসূচির সূচনা হয়েছে। অন্নপূর্ণা যোজনাকে সরকারের নারী-কেন্দ্রিক আর্থিক সহায়তা কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে। মহিলাদের বাড়ির মালিকানা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অবশ্য এদিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় যে নতুন বাড়িগুলি তৈরি হবে, সেগুলির মালিকানা পরিবারের মহিলাদের হাতে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। অর্থাৎ বাড়ির কাগজপত্র ও চুক্তির ক্ষেত্রে মহিলাদের নামকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। শুভেন্দুর কথায়, ‘বাড়ির মালিক মহিলারাই হবেন। তাঁদের নামে চুক্তি করা হবে।’
সরকারের নারী-কেন্দ্রিক অন্য উদ্যোগগুলির কথাও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের পারিশ্রমিক বৃদ্ধির প্রসঙ্গ তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। পাশাপাশি কন্যাদের আর্থিক সহায়তার জন্য ‘কন্যা রত্ন দিবস’-এর কর্মসূচীর কথাও জানান তিনি। ১৪ আগস্ট মেয়েদের অ্যাকাউন্টে ১ হাজার টাকা করে পাঠানোর কথা উল্লেখ করে আগামী বছর এই সহায়তার পরিমাণ ২ হাজার টাকা করার পরিকল্পনার কথাও জানান। উচ্চমাধ্যমিকের পরে মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করেছেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্নাতকস্তরে পড়াশোনা করা মেয়েদের তিন বছরে মোট ৫০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এই অর্থ তিনটি কিস্তিতে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দুই বছরে ১৭ হাজার টাকা করে এবং তৃতীয় বছরে ১৬ হাজার টাকা দেওয়ার কাঠামোর কথা প্রকাশ্যে এসেছে।
নারী উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক সমস্যাগুলির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থানও তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে শুধু পরিবার নয়, বিয়েতে সহযোগিতা করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। ১৮ বছরের কম বয়সি মেয়েদের বিয়ে আটকাতে প্রশাসনকে আরও সক্রিয় করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অল্প বয়সে সন্তান প্রসবের ঘটনাও সরকারের নজরে রয়েছে বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে। শুভেন্দুর বক্তৃতায় অবশ্য রাজনৈতিক আক্রমণের সুরও ছিল। তিনি সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম না নিলেও আগের সরকারের কাজকর্ম নিয়ে সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল, নতুন সরকারকে শুধু আর্থিক সুবিধা দেওয়া প্রশাসন হিসেবে না দেখে সামাজিক সংস্কারের দিকে এগিয়ে যাওয়া সরকার হিসেবে তুলে ধরা। ‘ভাতা’ ও ‘সংস্কার’ এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য টেনে তিনি নিজের সরকারের অগ্রাধিকারের কথা জানান।
এদিন অন্নপূর্ণা দিবসের অনুষ্ঠান তাই শুধু একটি সরকারি প্রকল্পের আর্থিক সহায়তা ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। নারী নিরাপত্তা থেকে আবাসনের মালিকানা, মেয়েদের উচ্চশিক্ষা থেকে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের পারিশ্রমিক থেকে মাদকমুক্ত সমাজ ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় একই মঞ্চে উঠে এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকে নারীকে পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে রাখার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার ৫০ লক্ষের বেশি বাড়ির তালিকা তৈরির ঘোষণাও এদিনের কর্মসূচীকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভার্চুয়াল মাধ্যমে অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং নারী উন্নয়নের সঙ্গে আবাসন ও আর্থিক সহায়তার বিষয়টি তুলে ধরেন। রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, নতুন বাড়িগুলির মালিকানা মহিলাদের নামে দেওয়ার দিকে জোর দেওয়া হবে।
অন্নপূর্ণা যোজনায় মাসিক ৩ হাজার টাকা, আবাসন প্রকল্পে মহিলাদের নামে মালিকানা এবং মেয়েদের পড়াশোনায় আর্থিক সহায়তা এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে নারী-কেন্দ্রিক সরকারি কর্মসূচির একটি কাঠামো তুলে ধরেছেন শুভেন্দু অধিকারী। পাশাপাশি সামাজিক সমস্যার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপের কথাও জানিয়েছেন তিনি। তবে এই প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন, উপভোক্তার তালিকা এবং ঘোষিত সহায়তা কত দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছয়, তার উপরই পরবর্তী সময়ে সরকারি উদ্যোগের বাস্তব ফল নির্ভর করবে। অন্নপূর্ণা দিবসের মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে তাই একদিকে ছিল সরকারি প্রকল্পের হিসাব, অন্য দিকে ছিল সামাজিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম না নিয়েও তাঁর পূর্ববর্তী সরকারের সঙ্গে বর্তমান সরকারের কাজের পার্থক্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন শুভেন্দু। আগামী দিনে অন্নপূর্ণা যোজনা, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, নারী নিরাপত্তা এবং মেয়েদের শিক্ষা সংক্রান্ত ঘোষণাগুলি কী ভাবে বাস্তবে কার্যকর হয়, সেটিই এখন নজরে রাখার বিষয়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : CM Suvendu Adhikari on POCSO case for minor marriage | ১৮-র আগে মা হলে স্বামীর বিরুদ্ধে POCSO মামলা! বাল্যবিবাহ রুখতে বড় অভিযানের হুঁশিয়ারি শুভেন্দুর




