সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : নন্দীগ্রাম বিধানসভা উপনির্বাচনের আগে তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) জোড়াফুল প্রতীক নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতা এখনও কাটেনি। একই দলের নাম ও প্রতীক দাবি করে দুই শিবিরের প্রার্থী মনোনয়ন জমা দেওয়ার পর নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছে রাজনৈতিক মহল। কে ‘আসল’ তৃণমূল, সেই প্রশ্নের নিষ্পত্তি না হওয়ায় নন্দীগ্রামের নির্বাচনী প্রক্রিয়াতেও তৈরি হয়েছে বাড়তি অনিশ্চয়তা। এর মধ্যেই দুই প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের দাবি তুলেছে কংগ্রেস (Indian National Congress)। যদিও মনোনয়ন বৈধ হবে কি না, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রিটার্নিং অফিসার এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের বিষয়। নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচনের জন্য মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল ১৬ সেপ্টেম্বর। একই সময়ে তৃণমূলের নাম ও ঐতিহ্যবাহী জোড়াফুল প্রতীক নিয়ে দুই শিবিরের দাবি নির্বাচন কমিশনের বিবেচনায় রয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) ঘনিষ্ঠ শিবির নন্দীগ্রামে সঞ্চিতা প্রধান দে-কে (Sanchita Pradhan Dey) প্রার্থী করেছে। অন্য দিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (Ritabrata Banerjee)-ঘনিষ্ঠ শিবিরের প্রার্থী মহম্মদ এতেসামূল হক (Mohammad Etesamul Haque)। দু’পক্ষই নিজেদের তৃণমূল কংগ্রেসের বৈধ প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে দাবি করছে।

আরও পড়ুন : West Bengal Assembly dissolved, Mamata Banerjee resignation issue | বিধানসভা ভেঙে দিলেন রাজ্যপাল! শপথের আগেই নাটকীয় মোড়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক টানাপোড়েন
জোড়াফুল প্রতীক নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত আরও আগে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর তৃণমূলের ভিতরে নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই শিবিরের মধ্যে মতবিরোধ প্রকাশ্যে আসে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী, দু’পক্ষই দলের নাম, সংগঠন এবং নির্বাচনী প্রতীকের উপর নিজেদের অধিকার দাবি করে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছে। কমিশনও দুই পক্ষের বক্তব্য, নথি ও সাংগঠনিক দাবির ভিত্তি খতিয়ে দেখছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই উপনির্বাচনের মনোনয়ন পর্ব এসে পড়ায় সমস্যা আরও জটিল হয়েছে। আগে থেকেই কমিশন জানিয়েছিল, দলের নাম ও প্রতীক নিয়ে সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত দুই শিবিরের প্রার্থীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অনিশ্চিত থাকতে পারে। ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুই পক্ষকে অতিরিক্ত নথি ও বক্তব্য জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এরপর ১৭ সেপ্টেম্বর দুই শিবিরকে নিয়ে ফের শুনানির সূচী রাখা হয়।
নন্দীগ্রামে দুই তৃণমূল প্রার্থীর মনোনয়নকে ঘিরে কংগ্রেসের আপত্তির মূল জায়গা অবশ্য অন্য। কংগ্রেসের বক্তব্য, জোড়াফুল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না থাকলে ও দুই প্রার্থী একই দলের প্রতীক দাবি করলে তাঁদের মনোনয়ন গ্রহণের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কংগ্রেস মুখপাত্র অজিতেশ পাণ্ডে (Ajitesh Pandey) দাবি করেছেন, দুই প্রার্থীর ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় প্রস্তাবকের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর বক্তব্য, বিষয়টি রিটার্নিং অফিসারের খতিয়ে দেখা উচিত এবং নিয়ম অনুযায়ী মনোনয়ন বাতিল হওয়ার মতো পরিস্থিতি থাকলে তা কার্যকর করা দরকার। কংগ্রেসের তরফে আরও বলা হয়েছে, নির্দল প্রার্থীর মনোনয়নের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রস্তাবকের প্রয়োজন হয়। তাদের দাবি, দুই তৃণমূল প্রার্থীর নথিতে সেই প্রয়োজনীয়তা পূরণ হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা দরকার। অজিতেশ পাণ্ডে বলেছেন, তাঁদের আপত্তি গ্রহণ না হলে দল আইনি পথে যেতে পারে। তবে এই অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি এবং মনোনয়নপত্রের বৈধতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের।
নির্বাচন কমিশনের সামনে এখন মূলত দু’টি বিষয় পাশাপাশি রয়েছে। প্রথমত, তৃণমূলের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ ও নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে দুই শিবিরের বিরোধ। দ্বিতীয়ত, ৬ অক্টোবরের উপনির্বাচনে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে কোন প্রার্থী কোন দলীয় পরিচয় ও প্রতীক নিয়ে লড়বেন। কমিশনের সিদ্ধান্তের উপরই নির্ভর করছে জোড়াফুল প্রতীক ব্যবহারের বিষয়টি। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, কমিশন দুই শিবিরের কাছ থেকে অতিরিক্ত নথি নিয়েছে এবং ১৭ সেপ্টেম্বর ফের শুনানি করছে। নন্দীগ্রামের ক্ষেত্রে বিষয়টির রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন ও তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। পরবর্তী সময়ে শুভেন্দু অধিকারী বিজেপিতে যোগ দেন এবং রাজ্যের বিরোধী রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন। ২০২৬ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর নন্দীগ্রাম ফের উপনির্বাচনের কেন্দ্রে এসেছে। ফলে প্রতীক নিয়ে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ বিরোধের সঙ্গে এই কেন্দ্রের রাজনৈতিক গুরুত্বও জড়িয়ে যাচ্ছে।
মমতা-ঘনিষ্ঠ শিবিরের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে -এর নাম ঘোষণার পর থেকেই তাঁর প্রার্থিতা নিয়ে দলের প্রচার শুরু হয়। অন্য দিকে ঋতব্রত শিবিরও মহম্মদ এতেসামূল হককে সামনে রেখে নির্বাচনী প্রস্তুতি চালাচ্ছে। দুই প্রার্থীর মনোনয়ন জমা পড়ার পরে একই প্রতীক নিয়ে তাঁদের দাবি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রচারের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় ও প্রতীক ব্যবহারের বিষয়টি তাই রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। এরই মধ্যে নন্দীগ্রামে বিজেপিও প্রার্থী দিয়েছে। হাসিরানি রথকে (Hasirani Rath) প্রার্থী করেছে বিজেপি (Bharatiya Janata Party)। তিনি প্রয়াত চন্দ্রনাথ রথের মা। চন্দ্রনাথ রথ দীর্ঘদিন শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ সহকারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিজেপির প্রার্থী হিসেবে হাসিরানি রথের নাম সামনে আসার ফলে নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনে লড়াই আরও বহুমুখী হয়েছে। কংগ্রেসও নিজেদের প্রার্থী দিয়েছে। বামেদের তরফে সিপিআই (Communist Party of India) প্রার্থী করেছে এবং আইএসএফ (Indian Secular Front)-ও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
উল্লেখ্য যে, ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে ভোটগ্রহণ হওয়ার কথা। গণনা হবে ৯ অক্টোবর। ফলে হাতে সময় খুব বেশি নেই। প্রার্থীদের প্রচার, দলীয় প্রতীক, ভোটারদের কাছে প্রচারের পরিচয় এবং নির্বাচনী প্রচারের সামগ্রিক কাঠামো এসব কিছুর ওপরই কমিশনের সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে নন্দীগ্রামে দুই শিবিরের প্রার্থিতা একই সঙ্গে বহাল থাকে কি না, অথবা তাঁদের মধ্যে কোনও একজন দলীয় প্রতীক পান কি না, তা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, তৃণমূলের প্রতীক নিয়ে কমিশনের শুনানি ইতিমধ্যেই একাধিক পর্যায়ে হয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর দুই শিবিরের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কমিশনের বৈঠক হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আরও নথি জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। মমতা শিবিরের তরফে কমিশনের কাছে নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান এবং অনুমোদিত নেতৃত্বের বিষয়ে নথি পেশ করা হয়েছে। ঋতব্রত শিবিরও পাল্টা নথি জমা দিয়েছে।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের দাবি, দলের সাংগঠনিক কাঠামো ও সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্বাচিত বিধায়কের সমর্থন তাঁদের অবস্থানকে শক্তিশালী করে। অন্য দিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির তৃণমূলের প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব ও সংগঠনের ধারাবাহিকতার উপর নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। দু’পক্ষের এই সাংগঠনিক দাবি এবং নথি কমিশন কী ভাবে মূল্যায়ন করবে, তার উপরই জোড়াফুল প্রতীকের ভবিষ্যৎ ব্যবহার নির্ভর করছে। নন্দীগ্রামের মনোনয়ন নিয়ে কংগ্রেসের আপত্তি সেই বৃহত্তর প্রতীক-বিতর্কের মধ্যেই নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কংগ্রেস চাইছে, দুই তৃণমূল প্রার্থীর মনোনয়নপত্রের প্রস্তাবক-সহ সব তথ্য নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী যাচাই করা হোক। দলের তরফে আইনি পদক্ষেপের কথাও বলা হয়েছে। তবে এই দাবির ভিত্তিতে এখনই কোনও প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত হয়নি।
অন্য দিকে, নির্বাচন কমিশনের সামনে এখন সময়ের চাপও রয়েছে। ৬ অক্টোবর ভোট হওয়ার আগে প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ, প্রতীক নির্ধারণ ও প্রচারের সুযোগ তৈরি করতে হবে। তাই তৃণমূলের নাম ও জোড়াফুল প্রতীক নিয়ে কমিশনের সিদ্ধান্ত নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের পরবর্তী পর্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নন্দীগ্রামে তাই আপাতত ভোটের লড়াইয়ের পাশাপাশি চলছে প্রতীকের লড়াইও। এক দিকে দুই তৃণমূল শিবিরের দাবি, অন্য দিকে কংগ্রেসের মনোনয়ন নিয়ে আপত্তি এবং তার মাঝখানে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত। এই তিনটি বিষয়ই আগামী কয়েক দিনের রাজনৈতিক সমীকরণ নির্ধারণ করবে। শেষ পর্যন্ত জোড়াফুল প্রতীক কোন শিবির ব্যবহার করতে পারবে, দুই প্রার্থীর মনোনয়ন কোন অবস্থায় থাকবে এবং ৬ অক্টোবরের ভোটে নন্দীগ্রামের ব্যালটে দলীয় পরিচয় কী ভাবে দেখা যাবে, এখন সেই সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari Ayushman Bharat, Ayushman Bharat West Bengal latest | পশ্চিমবঙ্গে আয়ুষ্মান ভারতের এক মাস! কত পরিবার পেল চিকিৎসার সুবিধা, বড় দাবি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর




