সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নিতুন দিল্লি : টাটা শিল্পগোষ্ঠীর অন্দরমহলের টানাপড়েন এবার প্রকাশ্যে চলে এল। যে এন চন্দ্রশেখরন (N Chandrasekaran) আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ -এ বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে টাটা সন্সের চেয়ারম্যান পদে আর থাকতে চান না বলে জানিয়েছিলেন, তাঁকেই আরও পাঁচ বছরের জন্য ওই পদে রাখার সিদ্ধান্ত নিল টাটা সন্সের পরিচালন পর্ষদ। আর এই সিদ্ধান্তে আপত্তি জানাল টাটা ট্রাস্টস (Tata Trusts), যার চেয়ারম্যান নোয়েল টাটা (Noel Tata)। ফলে দেশের অন্যতম ঐতিহ্যশালী শিল্পগোষ্ঠীর শীর্ষস্তরে নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে বলে উল্লেখ। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর বৈঠকে টাটা সন্সের বোর্ড এন চন্দ্রশেখরনের আরও পাঁচ বছরের মেয়াদ অনুমোদন করেছে। সংবাদ সংস্থা Reuters-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগে নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকা চন্দ্রশেখরন শেষ পর্যন্ত বোর্ডের অনুরোধে নতুন মেয়াদ গ্রহণে সম্মতি দেন। একই সঙ্গে টাটা সন্সকে ভবিষ্যতে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত করার বিষয়টিও বোর্ডের সিদ্ধান্তে জায়গা পেয়েছে। এই দুই সিদ্ধান্তকে ঘিরেই এখন টাটা সন্স এবং টাটা ট্রাস্টসের মধ্যে মতপার্থক্য নতুন মাত্রা পেয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত অবশ্য কয়েক সপ্তাহ আগেই। ১২ আগস্ট চন্দ্রশেখরন জানিয়েছিলেন, বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে তিনি আর টাটা সন্সের চেয়ারম্যান পদে পুনর্নিয়োগের জন্য নিজের নাম প্রস্তাব করবেন না। ১৩ অগস্ট প্রকাশিত টাটা ট্রাস্টসের বিবৃতিতেও তাঁর সেই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছিল। তখন ট্রাস্টের পক্ষ থেকে তাঁর দীর্ঘ সময়ের কাজের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয় ও নতুন চেয়ারম্যান বাছাইয়ের জন্য নির্বাচন কমিটি গঠনের উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি বদলে গেল। নতুন চেয়ারম্যান খোঁজার প্রক্রিয়ার বদলে পুরনো চেয়ারম্যানকেই আরও পাঁচ বছরের জন্য রাখার সিদ্ধান্ত নিল টাটা সন্সের বোর্ড। এখানেই তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন। কেন নিজের সিদ্ধান্ত বদলে চন্দ্রশেখরন আবার দায়িত্ব নিতে রাজি হলেন আর কেনই বা টাটা সন্সের বোর্ড তাঁর মেয়াদ বাড়ানোর দিকে গেল? তা নিয়ে টাটা গোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ পরিচালন কাঠামো নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তে নোয়েল টাটার আপত্তিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে উল্লেখ। টাটা ট্রাস্টসের বক্তব্য অনুযায়ী, চন্দ্রশেখরনকে পুনর্নিয়োগের প্রস্তাব টাটা সন্সের সংস্থার নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। টাটা ট্রাস্টসের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, টাটা সন্সের বোর্ডে চন্দ্রশেখরনের পুনর্নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে নোয়েল টাটা আপত্তি জানিয়েছেন আর ট্রাস্টের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তকে বেআইনি বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন চেয়ারম্যান বাছাইয়ের জন্য আগে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, সেটিও অনুসরণ করা উচিত বলে ট্রাস্টের অবস্থান। অন্য দিকে, টাটা সন্সের বোর্ডের সিদ্ধান্তের অর্থ হল বর্তমান নেতৃত্বেই সংস্থা এগোতে চাইছে। Reuters-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বোর্ডের ভোটাভুটিতে নোয়েল টাটা ছাড়া অন্য সদস্যরা চন্দ্রশেখরনের পুনর্নিয়োগের পক্ষে ছিলেন। ফলে প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। এরপরই টাটা ট্রাস্টসের আপত্তি আরও প্রকাশ্য রূপ নেয়।
এখানে টাটা ট্রাস্টসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টাটা সন্সের প্রায় ৬৬ শতাংশ অংশীদারি রয়েছে টাটা ট্রাস্টসের হাতে। টাটা সন্সই টাটা গোষ্ঠীর মূল হোল্ডিং সংস্থা, যার অধীনে টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস বা TCS, টাটা মোটরস, টাটা স্টিল, এয়ার ইন্ডিয়া -সহ একাধিক বড় সংস্থা রয়েছে। ফলে চেয়ারম্যান কে হবেন, সংস্থার ভবিষ্যৎ পরিচালন কাঠামো কী হবে এবং টাটা সন্সের শেয়ার বাজারে প্রবেশের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে? এই প্রতিটি বিষয়ই গোষ্ঠীর লম্বা সময়ের কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। চন্দ্রশেখরনের মেয়াদ বৃদ্ধির সঙ্গে আরও একটি বড় বিষয় জড়িয়ে রয়েছে। তা হল, টাটা সন্সের সম্ভাব্য আইপিও। বেশ কিছু দিন ধরেই টাটা সন্সের শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। সম্প্রতি রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া বা আরবিআই (RBI) টাটা সন্সের নন-ব্যাঙ্কিং ফিন্যান্সিয়াল কোম্পানি বা NBFC হিসেবে নথিভুক্তি বাতিলের আবেদন গ্রহণ করেনি। এর ফলে সংস্থাটির তালিকাভুক্তির বাধ্যবাধকতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। Reuters -এর প্রতিবেদনে উল্লেখ, আরবিআইয়ের সিদ্ধান্তের পরে টাটা সন্সের সম্ভাব্য আইপিও নিয়ে বাজারে প্রত্যাশা বেড়েছে।
টাটা সন্স দীর্ঘদিন ধরে শেয়ার বাজারের বাইরে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ হোল্ডিং সংস্থা। আরবিআইয়ের নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শ্রেণির বড় NBFC -এর ক্ষেত্রে তালিকাভুক্তির প্রয়োজন হতে পারে। Reuters -এর তথ্য অনুযায়ী, টাটা সন্সের মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত একক সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১.৭৫ লক্ষ কোটি টাকা। আরবিআইয়ের সিদ্ধান্তের পরে সংস্থাটির তালিকাভুক্তির সম্ভাবনা ফের আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে চন্দ্রশেখরনের পুনর্নিয়োগের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ তিনি এমন একটি সময়ে ফের নেতৃত্বে থাকছেন, যখন টাটা সন্সের সামনে একই সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ, নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং সম্ভাব্য আইপিওর মতো একাধিক বড় বিষয় রয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর, ব্যাটারি, বিমান পরিষেবা-সহ নতুন ক্ষেত্রে টাটা গোষ্ঠীর বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। টাটা সন্সের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে ট্রাস্ট এবং বোর্ডের মতপার্থক্য সেই সিদ্ধান্তগুলির গতিপথেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
চন্দ্রশেখরনের নেতৃত্বে টাটা গোষ্ঠী গত কয়েক বছরে বড় ধরনের সম্প্রসারণের পথে এগিয়েছে। তথাপি, বর্তমানে এয়ার ইন্ডিয়ার আর্থিক পরিস্থিতি, জাগুয়ার ল্যান্ড রোভারের ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জ ও নতুন প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিপুল বিনিয়োগের মতো বিষয় সামনে রয়েছে। Reuters-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এয়ার ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে মালিকদের কাছে নতুন মূলধনের প্রয়োজনের কথাও উঠে এসেছে। ফলে টাটা সন্সের শীর্ষ নেতৃত্বের স্থায়িত্ব এখন ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু বিরোধের কেন্দ্র শুধুমাত্র একজন চেয়ারম্যানকে ঘিরে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে টাটা সন্সের পরিচালন পর্ষদ এবং টাটা ট্রাস্টসের ক্ষমতার সম্পর্ক। এক দিকে বোর্ড চন্দ্রশেখরনের নেতৃত্ব বজায় রাখতে চাইছে, অন্য দিকে ট্রাস্টস তাদের অংশীদারি এবং সংস্থার নিয়মের ভিত্তিতে চেয়ারম্যান নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি তুলছে। ফলে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আইনি বা সাংগঠনিক স্তরে আরও গড়াতে পারে কি না, সেদিকেও নজর রয়েছে। আগস্টে চন্দ্রশেখরনের পদত্যাগের ঘোষণার পর টাটা ট্রাস্টস তাঁর সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়েছিল ও নতুন চেয়ারম্যান বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু করার কথা বলেছিল। এখন সেই জায়গা থেকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে গিয়েছে। আবারও চন্দ্রশেখরনই টাটা সন্সের চেয়ারম্যান হিসেবে সামনে এসেছেন। ফলে নেতৃত্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনা আপাতত পিছিয়ে গেলেও টাটা ট্রাস্টসের আপত্তি টাটা গোষ্ঠীর অন্দরমহলের ক্ষমতার সমীকরণ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সবচেয়ে বড় বিষয়, এই সংঘাত এমন সময়ে সামনে এল, যখন টাটা সন্সের সম্ভাব্য শেয়ার বাজারে প্রবেশ নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। আইপিও হলে টাটা সন্সের আর্থিক কাঠামো, মূল্যায়ন ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। অন্য দিকে, তালিকাভুক্তির বিষয়টি নিয়ে টাটা পরিবারের মধ্যেও ভিন্ন মত রয়েছে বলে Reuters -এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। টাটা ট্রাস্টসের প্রকাশিত তথ্যেও টাটা সন্সের তালিকাভুক্তি নিয়ে ভিন্ন মতের অস্তিত্বের ইঙ্গিত রয়েছে। ফলে চন্দ্রশেখরনের নতুন পাঁচ বছরের মেয়াদকে শুধু চেয়ারম্যান পদে ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখলে ছবির পুরোটা ধরা পড়বে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে টাটা সন্সের ভবিষ্যৎ কর্পোরেট কাঠামো, সম্ভাব্য আইপিও, টাটা ট্রাস্টসের ভূমিকা আর নোয়েল টাটার নেতৃত্বাধীন ট্রাস্টের সঙ্গে বোর্ডের সম্পর্ক। আপাতত বোর্ডের সিদ্ধান্ত কার্যকর হলেও টাটা ট্রাস্টসের আপত্তি সেই সিদ্ধান্তকে ঘিরে পরবর্তী পদক্ষেপের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। টাটা গোষ্ঠীর মতো বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যে এই টানাপড়েন কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, এখন সেদিকেই নজর শিল্পমহলের।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Singur Tata comeback news, Samik Bhattacharya industry statement | সিঙ্গুরে আবার টাটা? শিল্পে ফেরার ডাক শমীক ভট্টাচার্যের, নতুন বার্তা দিতে চাইছে বিজেপি



