Northern Sea Route India, India Russia Maritime Trade | ২০২৭-এই রাশিয়ামুখী ভারতের নতুন সমুদ্রপথ! নর্দার্ন সি রুটে প্রথম কার্গো জাহাজ পাঠানোর প্রস্তুতি

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: ভারত-রাশিয়া বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে ২০২৭ সালে। উত্তর মেরুর বরফাচ্ছাদিত জলপথ পেরিয়ে রাশিয়ার দিকে প্রথম কার্গো জাহাজ পাঠানোর পরিকল্পনা করছে নতুন দিল্লি। নর্দার্ন সি রুট (Northern Sea Route) ব্যবহার করে এই পরীক্ষামূলক সমুদ্রযাত্রা সফল হলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ভারতের সামনে খুলে যেতে পারে একটি বিকল্প পথ। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আরও পড়ুন : Urea subsidy in India, Urea price for farmers | ৩ হাজার টাকার ইউরিয়া কৃষক পাচ্ছেন মাত্র ৩০০ টাকায়! মোদী সরকারের সার ভর্তুকিতে কতটা সুরাহা কৃষকের, জানুন পুরো হিসাব

রাশিয়ার আর্কটিক উপকূল ধরে বিস্তৃত নর্দার্ন সি রুট বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মানচিত্রে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রচলিত সুয়েজ খালনির্ভর সমুদ্রপথের তুলনায় এই উত্তরাঞ্চলীয় রুট এশিয়া থেকে ইউরোপে যাওয়ার দূরত্ব উল্লেখযোগ্য ভাবে কমাতে পারে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, নির্দিষ্ট গন্তব্যের ক্ষেত্রে সমুদ্রযাত্রার দূরত্ব প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমার সম্ভাবনা রয়েছে। সময়ের ক্ষেত্রেও প্রায় দুই সপ্তাহ পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক পরিকল্পনায় এই জলপথকে গুরুত্ব দিচ্ছে একাধিক দেশ।

ভারতের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। রাশিয়ার আর্খাঙ্গেলস্ক অঞ্চলে আয়োজিত আর্কটিক-রিজিয়নস ফোরামে ভারতের শিপিং মন্ত্রকের যুগ্ম সচিব এস. ভেঙ্কটেসপতি জানান, ২০২৭ সালে নর্দার্ন সি রুট দিয়ে একটি প্রথম পাইলট কার্গো জাহাজ পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ একেবারে পূর্ণমাত্রার বাণিজ্যিক পরিষেবা শুরুর আগে বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করে দেখতে চাইছে ভারত। উত্তর মেরুর কঠিন আবহাওয়া, বরফের পরিস্থিতি, নৌপরিবহন ব্যবস্থা এবং বন্দর পরিষেবার সঙ্গে ভারতীয় জাহাজগুলির সামঞ্জস্য, সব কিছুই এই পরীক্ষামূলক যাত্রার মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হতে পারে। ভারতের এই উদ্যোগের সঙ্গে রাশিয়ার বৃহত্তর আর্কটিক পরিকল্পনারও যোগ রয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (Vladimir Putin) আগেই জানিয়েছিলেন, ভারত নর্দার্ন সি রুটে সহযোগিতার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু ভারত নয়, বিশ্বের একাধিক দেশ উত্তর মেরুর এই জলপথকে ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে। রাশিয়া চাইছে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই রুটের ব্যবহার আরও বাড়াতে। একই সঙ্গে মস্কোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ ধরনের সহযোগিতা আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের কাঠামো মেনেই এগোনোর পরিকল্পনা রয়েছে।

ভারত-রাশিয়া সমুদ্র যোগাযোগের ক্ষেত্রে এর আগে চেন্নাই-ভ্লাদিভোস্টক করিডোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। এই পূর্ব মেরিটাইম করিডোরে কার্গো পরিবহন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলে জানা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই পথে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সরাসরি সমুদ্রপথে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতাকেই এবার আরও উত্তরের জলপথে কাজে লাগাতে চাইছে দুই দেশ। রাশিয়ার আর্খাঙ্গেলস্ক অঞ্চলের গভর্নর আলেকজান্ডার সিবুলস্কি (Alexander Tsybulsky) জানিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে একাধিক ক্ষেত্রে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে রয়েছে জাহাজ নির্মাণ, বন্দর পরিকাঠামো ব্যবহার করে পণ্য পরিবহন এবং বন্দরের আশপাশে উৎপাদন ও শিল্পকেন্দ্র গড়ে তোলার সম্ভাবনা। অর্থাৎ শুধু একটি সমুদ্রপথ ব্যবহার করাই নয়, নর্দার্ন সি রুটকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তোলার চিন্তাভাবনাও রয়েছে।

ভারতের জন্য এই রুটের গুরুত্ব শুধু পণ্য পরিবহনের সময় কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাশিয়া ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী দেশ। ফলে উত্তরাঞ্চলীয় সমুদ্রপথ ব্যবহার করে ভবিষ্যতে জ্বালানি ও অন্যান্য কাঁচামাল পরিবহনের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি ইউরোপের বাজারের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগের ক্ষেত্রেও বিকল্প রুট পাওয়া গেলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কিছুটা ভাগ করে নেওয়া সম্ভব হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্যে বিভিন্ন ধরনের বাধা তৈরি হয়েছে। সুয়েজ খালকেন্দ্রিক পথ দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ভরসা হলেও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, নিরাপত্তাজনিত সমস্যা এবং জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের কারণে বিকল্প পথ নিয়ে আলোচনা বেড়েছে। সেই জায়গায় আর্কটিকের নর্দার্ন সি রুটকে ভবিষ্যতের একটি সম্ভাবনাময় করিডোর হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রাশিয়া ইতিমধ্যেই এই জলপথের পরিকাঠামো উন্নয়নে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করছে। বরফ ভেঙে জাহাজ চলাচলের জন্য আইসব্রেকার বহর গড়ে তোলা, বন্দর পরিকাঠামো উন্নত করা ও উত্তরাঞ্চলের নৌপরিবহন ব্যবস্থা শক্তিশালী করার কাজ চলছে। রুশ পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটম (Rosatom)-এর সঙ্গেও এই ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। নর্দার্ন সি রুট পরিচালনায় রাশিয়ার আইসব্রেকার ও নৌপরিবহন ব্যবস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ভারতও শুধু জাহাজ পাঠানোর মধ্যে নিজেদের পরিকল্পনা সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না। মেরু অঞ্চলে নৌপরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, পোলার নেভিগেশন ও জাহাজ নির্মাণে সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। কারণ সাধারণ সমুদ্রপথে জাহাজ পরিচালনার সঙ্গে আর্কটিক অঞ্চলে নৌযাত্রার যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। বরফের গতিবিধি, তাপমাত্রা, আবহাওয়া ও সীমিত বন্দর সুবিধার মতো বিষয়গুলিকে মাথায় রেখে বিশেষ প্রস্তুতি প্রয়োজন।

কিন্তু, নর্দার্ন সি রুট নিয়ে আশাবাদের পাশাপাশি পরিবেশগত প্রশ্নও রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বরফ গলার ফলে কোনও কোনও সময়ে নতুন জলপথ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হলেও তার দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে উদ্বেগ রয়েছে। তাই বাণিজ্যিক সুবিধার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা ও নিরাপদ নৌপরিবহনকে গুরুত্ব দিয়েই ভারত এগোতে চাইছে। উল্লেখ্য, ২০২৭ সালের প্রস্তাবিত পাইলট জাহাজ তাই শুধু একটি কার্গো পরিবহনের ঘটনা নয়। এটি কার্যত নর্দার্ন সি রুটে ভারতের ভবিষ্যৎ উপস্থিতির একটি পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ হতে পারে। যাত্রাটি সফল হলে পরবর্তী সময়ে আরও নিয়মিত কার্গো পরিষেবা চালুর সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে ভারতের বন্দর, জাহাজ নির্মাণ শিল্প এবং লজিস্টিক পরিষেবার সঙ্গে রাশিয়ার আর্কটিক পরিকাঠামোর যোগাযোগ বাড়তে পারে।

ভারত-রাশিয়া বাণিজ্যের পরিধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই নতুন সমুদ্রপথ কতটা কার্যকর হয়, তার উত্তর মিলবে বাস্তব যাত্রার পরেই। তবে ২০২৭ সালে নর্দার্ন সি রুট দিয়ে ভারতীয় কার্গো জাহাজ পাঠানোর পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্যে নয়াদিল্লির নতুন দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এশিয়া, রাশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে দ্রুততর সমুদ্র যোগাযোগ গড়ে উঠলে আগামী দিনে বিশ্ব বাণিজ্যের রুট মানচিত্রেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : BRICS Summit Delhi, Vladimir Putin India Visit 2026 | দিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন, দু’দিনের সফরে আসছেন ভ্লাদিমির পুতিন! বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন