Nepal tunnel rescue, Trishuli hydropower rescue | ভরসা ৫০০ ইঞ্জিনিয়ারের হোয়াট্‌সঅ্যাপ গ্রুপ! নেপালের সুড়ঙ্গে জীবনের খোঁজে নকশা দেখিয়ে চলছে উদ্ধারকাজ

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কাঠমান্ডু: বাইরে তখন জল আর কাদার তাণ্ডব। পাহাড়ি নদীর জল ফুলে উঠে ভাসিয়ে দিয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা। কোথাও ধস নেমেছে, কোথাও হড়পা বানে ঢেকে গিয়েছে রাস্তা ও নির্মাণস্থল। আর সেই বিপর্যয়ের মধ্যে মাটির গভীরে অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভিতর আটকে রয়েছেন শ্রমিকেরা। বাইরে থেকে তাঁদের কাছে পৌঁছনোর পথও যেন হারিয়ে গিয়েছে ধ্বংসস্তূপের নীচে। ঠিক এমন পরিস্থিতিতে নেপালে (Nepel tunnel rescue) উদ্ধারকাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে একটি হোয়াট্‌সঅ্যাপ গ্রুপ। গ্রুপটিতে রয়েছেন প্রায় ৫০০ জন ইঞ্জিনিয়ার ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত অভিজ্ঞ কর্মী। তাঁদের পাঠানো নকশা, কারিগরি তথ্য এবং সুড়ঙ্গের অবস্থান সংক্রান্ত বিবরণ ব্যবহার করেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আটকে থাকা মানুষদের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা চালাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।

আরও পড়ুন : Nepal Flash Flood | ভূমিকম্প নয়, হিমবাহধস থেকেই নেপালে ভয়াবহ হড়পা বান! মৃত ২৮৯, নিখোঁজ বহু, আতঙ্ক ভারত-তিব্বত সীমান্তেও

ত্রিশূলী (Trishuli) নদীর উপত্যকায় ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণকাজ এবং সংশ্লিষ্ট এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিপর্যস্ত অঞ্চলে মোট ছ’টি সুড়ঙ্গ ছিল। তার মধ্যে তিনটি ছিল নির্মীয়মাণ। হড়পা বান এবং পাহাড়ি ধসের জেরে সেই সুড়ঙ্গগুলির একাধিক অংশ কাদা, পাথর এবং মাটির স্তূপে ঢেকে যায়। বিপুল সংখ্যক শ্রমিক ওই সব এলাকায় কাজ করছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় হাজার জনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। এমন অবস্থায় উদ্ধারকারী দলের সামনে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়, ঠিক কোন জায়গায় সুড়ঙ্গ রয়েছে এবং তার ভিতরে পৌঁছনোর জন্য কোন দিক দিয়ে খনন করা নিরাপদ হবে। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই কার্যত কাজে লাগে ওই হোয়াট্‌সঅ্যাপ গ্রুপ। বিপর্যয়ের আগেই ত্রিশূলী নদীর উপত্যকায় কর্মরত কয়েক জন ইঞ্জিনিয়ার নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখার জন্য গ্রুপটি তৈরি করেছিলেন। বন্যা ও ধসের পর পরিস্থিতি বদলে গেলে সেই যোগাযোগ ব্যবস্থাই নতুন গুরুত্ব পায়। উদ্ধারকারী দল যখন ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্পগুলির অবস্থান এবং সুড়ঙ্গের কাঠামো সম্পর্কে তথ্য খুঁজছিল, তখন গ্রুপের সদস্যরা নিজেদের কাছে থাকা পুরনো নকশা, প্রকল্পের কারিগরি তথ্য এবং নির্মাণ সংক্রান্ত বিবরণ একে একে শেয়ার করতে শুরু করেন।

নেপালের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’ (The Kathmandu Post) -এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই হোয়াট্‌সঅ্যাপ গ্রুপের ভূমিকার কথা। জানা গিয়েছে, চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প (Chilime Hydropower Project) নিয়ে উদ্ধারকারী দলের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রকল্পটি ঠিক কোথায় অবস্থিত, সুড়ঙ্গের গঠন কেমন, কোথায় প্রবেশপথ এবং ভিতরের কাঠামো কী রকম? এই তথ্যগুলি না জানলে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উদ্ধার অভিযান চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এই সময় এক সরকারি কর্তা চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নকশা চেয়ে পাঠান। গ্রুপে থাকা এক ইঞ্জিনিয়ার দ্রুত সেই নকশা সংগ্রহ করে হোয়াট্‌সঅ্যাপে পাঠিয়ে দেন। মুহূর্তের মধ্যে উদ্ধারকারী দলের হাতে চলে আসে এমন একটি কারিগরি নথি, যা মাঠপর্যায়ে অভিযানের পরিকল্পনা তৈরিতে কাজে লাগতে পারে। নকশা দেখে সুড়ঙ্গের সম্ভাব্য অবস্থান নির্ধারণ, কোথায় ধ্বংসস্তূপের নীচে মানুষ আটকে থাকতে পারেন এবং কোন অংশ দিয়ে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করা যেতে পারে, সেই বিষয়ে উদ্ধারকারীরা প্রয়োজনীয় ধারণা পান।

বিপর্যয়ের পর গ্রুপটির পরিধিও বাড়ানো হয়। শুধু আগে থেকে যুক্ত ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যেই যোগাযোগ সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন ব্যক্তিদেরও গ্রুপে যুক্ত করা হয়। ফলে এক জায়গায় এসে জমা হতে থাকে একাধিক প্রকল্পের নকশা, সুড়ঙ্গের কাঠামো, নির্মাণপদ্ধতি ও যন্ত্রপাতি সংক্রান্ত তথ্য। উদ্ধারকারী দলের কাছে মাঠে দাঁড়িয়ে প্রতিটি প্রকল্পের কাঠামো নতুন করে বোঝার পরিবর্তে দ্রুত প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তবে পরিস্থিতি মোটেই সহজ ছিল না। নেপাল সেনাবাহিনীর (Nepal Army) মুখপাত্র রাজারাম বসনেট (Rajaram Basnet) জানিয়েছেন, বন্যার জেরে সুড়ঙ্গগুলির ভিতরের পরিস্থিতি আগের মতো নেই। কাদা, মাটি ও পাথরে সুড়ঙ্গের অনেকটা অংশ ভরে যাওয়ায় ভিতরে পৌঁছনোর কাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। শুধু পুরনো নকশা হাতে থাকলেই যে উদ্ধারকারী দল সরাসরি নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে যেতে পারবে, এমন নয়। বন্যার জল ও ধসের ফলে সুড়ঙ্গের ভিতরের বাস্তব চিত্র বদলে যাওয়ায় প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিতে হয়েছে।

ত্রিশূলী ৩-এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের (Trishuli 3A Hydropower Project) ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছিল উদ্ধারকারীদের। সুড়ঙ্গের কাছে পৌঁছতেই তাঁদের ছ’দিন সময় লেগে যায় বলে জানা গিয়েছে। ভিতরে কোনও শ্রমিক আটকে থাকতে পারেন বলে যে জায়গাগুলিকে সম্ভাব্য বলে মনে হয়েছিল, সেখানে পৌঁছনোর চেষ্টা চলতে থাকে। জীবিত মানুষের উপস্থিতির সম্ভাবনা থাকায় সেই অংশগুলিতে অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়। অবশেষে বিপর্যয়ের নবম দিনে আসে স্বস্তির খবর। দীর্ঘ উদ্ধার অভিযানের পর সুড়ঙ্গের ভিতর থেকে জীবিত অবস্থায় দুই শ্রমিককে উদ্ধার করতে সক্ষম হয় সেনাবাহিনী ও অন্যান্য উদ্ধারকারী দল। উদ্ধার হওয়া দু’জন হলেন সঞ্জয় শাহ (Sanjay Shah) এবং কবীর মহারাজন (Kabir Maharajan)। দু’জনই সংশ্লিষ্ট জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ছিলেন। সঞ্জয় ছিলেন মেকানিক্যাল ফোরম্যান এবং কবীর মেকানিক্যাল সুপারভাইজর। দীর্ঘ সময় সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে থাকার পর তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বর্তমানে সেখানে তাঁদের চিকিৎসা চলছে।

এই উদ্ধার অভিযানের সাফল্য নতুন করে দেখিয়ে দিয়েছে, দুর্যোগের সময়ে শুধু প্রচলিত উদ্ধার সরঞ্জাম নয়, সঠিক তথ্যও কতটা গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়ি অঞ্চলে বন্যা বা ধসের পরে রাস্তা, ভবন কিংবা নির্মাণস্থলের আগের চেহারা দ্রুত বদলে যায়। ফলে উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছনোর পর অনেক সময় কোথায় কী ধরনের কাঠামো রয়েছে, তা বোঝা কঠিন হয়। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো জটিল নির্মাণে সেই সমস্যা আরও বেড়ে যায়। সুড়ঙ্গের অবস্থান, দৈর্ঘ্য, প্রবেশপথ এবং ভিতরের কাঠামো সম্পর্কে নির্ভুল ধারণা ছাড়া উদ্ধার অভিযান চালানো সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠতে পারে। সেখানেই প্রায় ৫০০ ইঞ্জিনিয়ারের হোয়াট্‌সঅ্যাপ গ্রুপটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মাঠে থাকা উদ্ধারকারীদের সঙ্গে দূরে থাকা কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন মানুষদের দ্রুত যোগাযোগের একটি মাধ্যম তৈরি হয়েছে এই ডিজিটাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। প্রয়োজনের মুহূর্তে একটি নকশা পাঠানো, প্রকল্পের কাঠামো বোঝানো কিংবা কোনও নির্দিষ্ট সুড়ঙ্গের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দেওয়া, এ সবকিছুই দ্রুত করা সম্ভব হয়েছে।

নেপালের ত্রিশূলী উপত্যকার বিপর্যয় শুধু ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ছবি সামনে আনেনি, উদ্ধারকাজে প্রযুক্তি ও মানুষের জ্ঞানভাণ্ডার কীভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারে, তারও একটি নজির তৈরি করেছে। একটি সাধারণ হোয়াট্‌সঅ্যাপ গ্রুপে থাকা ইঞ্জিনিয়ারদের তথ্য যখন মাটির নীচে আটকে থাকা শ্রমিকদের কাছে পৌঁছনোর পথ খুঁজতে সাহায্য করছে, তখন উদ্ধার অভিযানে তথ্যের মূল্যও নতুন করে সামনে এসেছে। সঞ্জয় শাহ ও কবীর মহারাজনের জীবিত উদ্ধারের ঘটনা সেই আশাকে আরও জোরালো করেছে। এখন ধ্বংসস্তূপের নিচে আর কেউ আটকে রয়েছেন কি না, তাঁদের কাছে কী ভাবে পৌঁছনো সম্ভব, সেই উত্তর খুঁজতেই নেপালে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Trishuli River flood, Nepal green house survived flood | ত্রিশূলীর হড়পা বানেও দাঁড়িয়ে সবুজ বাড়ি! নেপালের ভাইরাল ‘অলৌকিক’ বাড়ির রহস্য জানালেন মালিক

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন