সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : নদীর জল যখন নিজের গতিপথ ভুলে চারপাশে ধ্বংসের ছবি তৈরি করে, তখন কোনও একটি বাড়ি সেই প্রবল স্রোতের সামনে অটুট দাঁড়িয়ে থাকলে তাকেই ঘিরে মানুষের কৌতূহল তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। নেপালে ত্রিশূলী নদীর ভয়াবহ হড়পা (Trishuli River flood) বানের পর এমনই একটি সবুজ রঙের বাড়িকে ঘিরে সমাজমাধ্যমে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। উত্তাল জলের স্রোতে আশপাশের বাড়িঘর, যানবাহন এবং নানা কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ভেসে গেলেও ওই সবুজ বাড়িটি অনেকটাই অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেই দৃশ্যের ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়তেই বাড়িটিকে ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়োয় দেখা গিয়েছে, প্রবল গতিতে ত্রিশূলী নদীর জল এগিয়ে এসে বাড়িটির চারপাশে আছড়ে পড়ছে। স্রোতের সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে নানা জিনিসপত্র। আশপাশের কয়েকটি কাঠামোও নদীর জলের প্রবল চাপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু সেই পরিস্থিতির মধ্যেও সবুজ বাড়িটি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ভিডিয়োয় বাড়িটির বারান্দায় কয়েক জন মানুষকেও দেখা যায়। ফলে বিপর্যয়ের ভয়াবহতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
বাড়িটি কী ভাবে এমন প্রবল স্রোতের ধাক্কা সামলাল, তা নিয়েই মূলত প্রশ্ন উঠেছে। অনেকে সমাজমাধ্যমে বাড়িটিকে ‘অলৌকিক’ বলেও উল্লেখ করেছেন। কেউ জানতে চেয়েছেন বাড়িটির নির্মাণে কী ধরনের উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছিল। আবার কারও প্রশ্ন, এত পুরনো একটি বাড়ি যদি এমন ভয়ঙ্কর বন্যার চাপ সহ্য করতে পারে, তা হলে তার নির্মাণে নিশ্চয়ই এমন কোনও বিশেষ ব্যবস্থা ছিল, যা তাকে অন্য বাড়ির তুলনায় বেশি শক্তিশালী করে তুলেছিল। বাড়িটির মালিক প্রকাশ জানিয়েছেন, এর পিছনে কোনও রহস্যময় কারণ নেই। কয়েক দশক আগে বাড়িটি তৈরির সময় যে নির্মাণপদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল, সেটিই এই দুর্যোগের মধ্যে বাড়িটির টিকে থাকার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাড়িটি প্রায় ৪০ বছরের পুরনো। সেই সময় বাড়ি তৈরিতে ব্যবহৃত সিমেন্ট ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর গুণমান নিয়ে তাঁর যথেষ্ট আস্থা রয়েছে।
প্রকাশের দাবি, বাড়িটি নদীর কাছাকাছি হওয়ায় নির্মাণের সময় ভিতের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। সাধারণ বাড়ির মতো শুধু উপরের কাঠামো তৈরি না করে জমির নীচের অংশকে শক্ত করার দিকে নজর দেওয়া হয়েছিল। বাড়িটির ভিত্তির নীচে দুই থেকে তিন স্তরে নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, সেই মজবুত ভিতই হয়তো এত বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বাড়িটিকে জায়গায় ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। নেপালের এই বাড়িকে ঘিরে তৈরি হওয়া কৌতূহলের অন্যতম কারণ অবশ্য তার চারপাশের দৃশ্য। নদীর জল যে এলাকায় ব্যাপক ধ্বংস চালিয়েছে, সেখানে একটি বাড়ির বড় অংশ অক্ষত থাকা সহজেই মানুষের নজর কেড়েছে। বিশেষ করে ভিডিয়োয় দেখা যায়, প্রবল স্রোত বাড়িটির গায়ে ধাক্কা দিচ্ছে। জল বাড়ির নীচের অংশে প্রবেশ করলেও গোটা ইমারতটি ভেঙে পড়েনি। ফলে ভিডিয়োটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই নানা ধরনের ব্যাখ্যা সামনে আসতে থাকে।
প্রকাশ আরও জানিয়েছেন, বিপর্যয়ের সময় বাড়ির ভিতরে পরিবারের মোট ছ’জন সদস্য ছিলেন। হড়পা বানের পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ হয়ে ওঠায় তাঁদের বাইরে বেরোনোর সুযোগ ছিল না। বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা পরিবারের তিন সদস্যকে ভিডিয়োয় দেখা যায়। তাঁরা প্রায় এক থেকে দেড় ঘণ্টা ওই বাড়িতেই আটকে ছিলেন। বাইরে তখন নদীর জল ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত। শেষ পর্যন্ত উদ্ধারকারী দল তাঁদের নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যায়। উল্লেখ যে, পরিবারের সদস্যেরা প্রাণে বেঁচে গেলেও বাড়িটি সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছে, এমনটা নয়। প্রকাশের বক্তব্য অনুযায়ী, বাড়ির নিচের অংশে যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে। বন্যার জলের প্রবল চাপ ও স্রোতের সঙ্গে আসা বিভিন্ন বস্তু বাড়ির নিম্নাংশে আঘাত করেছে। ফলে বেশ কিছু জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাড়ির ভিতরে থাকা বহু সামগ্রীও নষ্ট হয়েছে। শুধু ঘরের জিনিসপত্র নয়, পরিবারের যানবাহনও রক্ষা পায়নি। প্রকাশ জানিয়েছেন, বাইক ও স্কুটার-সহ একাধিক গাড়ি বন্যার জলে ভেসে গিয়েছে। অর্থাৎ বাড়িটি দাঁড়িয়ে থাকলেও তার চারপাশের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। একটি কাঠামো টিকে গেলেই যে সম্পূর্ণ ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো যায় না, এই ঘটনাতেও তার ছবি দেখা গিয়েছে।
বাড়িটির বয়স প্রায় চার দশক হওয়ায় আরও একটি প্রশ্ন উঠেছে, পুরনো দিনের নির্মাণপদ্ধতি কী বর্তমান সময়ের তুলনায় বেশি টেকসই? যদিও কোনও একটি ঘটনার ভিত্তিতে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না, তবু প্রকাশের বক্তব্যে বাড়িটির ভিত নির্মাণে যে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, সেটি নজর কেড়েছে। নদীর কাছাকাছি বাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে জমির প্রকৃতি এবং জলস্রোতের সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল বলেই তাঁর দাবি। ত্রিশূলী নদীর হড়পা বান নেপালের বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। প্রবল জলস্রোতের সঙ্গে কাদা, পাথর, গাছের গুঁড়ি ও নানা ধরনের ধ্বংসাবশেষ এগিয়ে আসায় নদীর আশপাশের বসতি ও পরিকাঠামোর উপর চাপ তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে সবুজ বাড়িটির দাঁড়িয়ে থাকার ছবি তাই স্বাভাবিক ভাবেই সমাজমাধ্যমে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে।
তবে ‘অলৌকিক বাড়ি’ হিসাবে যতই তাকে নিয়ে আলোচনা হোক, মালিক প্রকাশের বক্তব্যে উঠে এসেছে সম্পূর্ণ বাস্তব একটি কারণ। তাঁর মতে, বাড়িটির দীর্ঘস্থায়িত্বের পিছনে রয়েছে পুরনো নির্মাণপদ্ধতি, মজবুত ভিত এবং বাড়ি তৈরির সময় নেওয়া বাড়তি সতর্কতা। প্রকৃতির ভয়ঙ্কর শক্তির সামনে বাড়িটির নীচের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও গোটা কাঠামো ভেঙে পড়েনি। এই ঘটনার ভিডিয়ো দেখে নেটমাধ্যমের বহু মানুষ বাড়িটির নির্মাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ বাড়িটির বয়স জানতে চেয়েছেন, কেউ আবার জানতে চেয়েছেন ভিতের নকশা সম্পর্কে। সেই কৌতূহলের উত্তর দিতে গিয়ে প্রকাশ জানিয়েছেন, বাড়িটি প্রায় ৪০ বছর আগে তৈরি। তখনকার নির্মাণসামগ্রী এবং ভিত তৈরির পদ্ধতির উপরই তিনি বাড়িটির টিকে থাকার কারণ হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে নেপালের ত্রিশূলী নদীর হড়পা বানের মধ্যে সবুজ বাড়িটির দাঁড়িয়ে থাকার ঘটনাটি আপাতত সমাজমাধ্যমে এক বিরল দৃশ্য হিসাবেই আলোচনায় রয়েছে। চারপাশের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে একটি বাড়ির কাঠামো টিকে যাওয়ার ছবি যেমন মানুষের নজর কেড়েছে, তেমনই তার মালিকের বক্তব্য পুরনো নির্মাণপদ্ধতি নিয়েও নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে। তবে বাড়িটির নীচের অংশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং পরিবারের যানবাহন ভেসে যাওয়ার ঘটনাও দেখিয়ে দিয়েছে, বাড়িটি দাঁড়িয়ে থাকলেও বিপর্যয়ের অভিঘাত থেকে সেটি পুরোপুরি রক্ষা পায়নি। শেষ পর্যন্ত ছ’জন পরিবারের সদস্য নিরাপদে উদ্ধার হওয়াই এই ভয়াবহ ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi Pezeshkian Meeting | পেজেশকিয়ানের সঙ্গে মোদীর বৈঠক, হরমুজ নিয়ে দিল্লির উদ্বেগ প্রকাশ বিশকেকে




