সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: বিশ্ববাজারে সারের দাম বাড়লেও তার সরাসরি চাপ যাতে দেশের কৃষকদের উপর না পড়ে, সেই লক্ষ্যেই দীর্ঘদিন ধরে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে আসছে কেন্দ্রীয় সরকার। ইউরিয়ার (Urea) ক্ষেত্রে এই ব্যবধানই এখন আলোচনায়। আন্তর্জাতিক বাজারে একটি বস্তা ইউরিয়ার দাম প্রায় ৩ হাজার টাকার কাছাকাছি পৌঁছলেও ভারতের কৃষককে তা কিনতে হচ্ছে প্রায় ৩০০ টাকায়। বাকি বিপুল অর্থের একটি বড় অংশ বহন করছে সরকার। ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কম রাখার পাশাপাশি কৃষিকাজে সারের জোগান সচল রাখার চেষ্টা চলছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) বিশ্ববাজারে সারের দাম ও ভারতের কৃষকদের জন্য নির্ধারিত দামের মধ্যে এই বিপুল ব্যবধানের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং কাঁচামালের দামে ওঠানামা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় সরকার কৃষকদের উপর সেই বাড়তি খরচ চাপায়নি। ইউরিয়ার ক্ষেত্রে বাজারদর এবং কৃষকের দেওয়া দামের মধ্যে যে ফারাক, তা মূলত সরকারি ভর্তুকির মাধ্যমেই সামাল দেওয়া হচ্ছে। ভারতে কৃষকদের জন্য ৪৫ কেজির একটি ইউরিয়ার বস্তার নির্ধারিত মূল্য প্রায় ২৪২ টাকা। এর সঙ্গে নেইম কোটিং এবং প্রযোজ্য কর যুক্ত হওয়ার পরে খুচরো পর্যায়ে কৃষকের খরচ প্রায় ৩০০ টাকার কাছাকাছি দাঁড়ায়। অথচ ইউরিয়া উৎপাদন অথবা আমদানির প্রকৃত ব্যয় এই দামের তুলনায় অনেক বেশি। সেই ঘাটতি পূরণে সরকার সার উৎপাদনকারী ও আমদানিকারক সংস্থাগুলিকে ভর্তুকি দেয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও কৃষকের জন্য ইউরিয়ার দাম দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক ভাবে কম রাখা সম্ভব হচ্ছে।
এই ব্যবস্থার ফলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে থাকে। কৃষিকাজে ইউরিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সার। ধান, গম, ভুট্টা-সহ বহু ফসলের উৎপাদনে নাইট্রোজেনের জোগানের জন্য ইউরিয়া ব্যবহার করা হয়। সারের দাম আচমকা বেড়ে গেলে তার প্রভাব সরাসরি কৃষকের চাষের খরচে পড়তে পারে। সেই জায়গা থেকেই ভর্তুকি ব্যবস্থাকে কৃষি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হয়। শুধু ইউরিয়া নয়, ডিএপি বা ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেটের ক্ষেত্রেও ভর্তুকির মাধ্যমে কৃষকের খরচ কম রাখার চেষ্টা করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে ডিএপির দাম প্রায় ৫ হাজার টাকার কাছাকাছি পৌঁছলেও দেশে কৃষককে তা প্রায় ১ হাজার ৩৫০ টাকায় দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে সারের যে দাম, তার সঙ্গে ভারতের কৃষকের দেওয়া দামের বিশাল পার্থক্য তৈরি হচ্ছে সরকারি সহায়তার কারণেই।
সার ভর্তুকির এই কাঠামো নতুন নয়। বহু বছর ধরেই কেন্দ্র কৃষকদের জন্য সারের দাম নিয়ন্ত্রিত রাখার নীতি অনুসরণ করে আসছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামাল, জ্বালানি এবং পরিবহণের খরচ বাড়লেও তার পুরো প্রভাব কৃষকের উপর পড়তে দেওয়া হয় না। সরকার সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি বড় অংশ বহন করে। এর ফলে একদিকে কৃষক তুলনামূলক কম দামে সার পান, অন্যদিকে কৃষি উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করা যায়। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে ইউরিয়ার জোগান নিশ্চিত করতেও কেন্দ্রীয় স্তরে পদক্ষেপ করা হয়েছে। প্রায় ১৭ লক্ষ টন ইউরিয়া আমদানির জন্য চুক্তি হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। আগের টেন্ডারের তুলনায় নতুন চুক্তিতে তুলনামূলক কম দামে ইউরিয়া সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে খরিফ এবং রবি, দুই মরসুমেই কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সারের জোগান বজায় রাখতে সুবিধা হতে পারে।
কৃষি মরসুমে সারের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। বিশেষ করে বীজ বোনা এবং ফসলের বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ইউরিয়া বা অন্যান্য সারের জোগান ব্যাহত হলে কৃষকের সমস্যা বাড়ে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি প্রতিকূল হলেও দেশে পর্যাপ্ত মজুত রাখার চেষ্টা সেই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আমদানির মাধ্যমে ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদনও সারের সামগ্রিক জোগান ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সার ভর্তুকির পাশাপাশি কৃষিক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের আরও কয়েকটি আর্থিক সহায়তা রয়েছে। কৃষিঋণ, বিদ্যুৎ ব্যবহারে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা, ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বা এমএসপি-র মাধ্যমে সরকারি ক্রয় ও কৃষকদের সরাসরি আর্থিক সহায়তার মতো একাধিক কর্মসূচি চালু রয়েছে। ফলে কৃষি খাতে সরকারের সামগ্রিক ব্যয়ের পরিমাণও বড়।
কৃষকের আয় ও উৎপাদন খরচ নিয়ে দেশে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, ডিজেল, শ্রমিকের মজুরি এবং পরিবহণ চাষের প্রতিটি পর্যায়েই খরচ রয়েছে। এর মধ্যে সারের দাম যদি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ে, তা হলে কৃষকের উপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ পড়ার আশঙ্কা থাকে। ইউরিয়া ও ডিএপির ক্ষেত্রে ভর্তুকি সেই চাপের একটি অংশ কমানোর চেষ্টা করছে।
তবে এই ব্যবস্থার আর্থিক দায়ও কম নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বাড়লে কৃষকের জন্য নির্ধারিত খুচরো মূল্য অপরিবর্তিত রাখার অর্থ হল সরকারের ভর্তুকির পরিমাণও বাড়তে পারে। বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দামের ওঠানামা, আমদানি ব্যয় এবং মুদ্রার বিনিময়মূল্যের পরিবর্তনের সঙ্গে ভর্তুকির হিসাবও বদলে যায়। ফলে সার ভর্তুকি কেন্দ্রীয় বাজেটের একটি বড় ব্যয়ের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। ইউরিয়ার ক্ষেত্রে প্রায় ৩ হাজার টাকার আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য এবং প্রায় ৩০০ টাকার কৃষকদরের তুলনা সেই ব্যবধানের আকারটিই সামনে আনে। অবশ্য আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, দেশীয় উৎপাদন খরচ, আমদানি মূল্য এবং সরকারি ভর্তুকির হিসাব সময় ও বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে। তাই প্রতিটি বস্তায় সরকারের দেওয়া অর্থের অঙ্কও এক জায়গায় স্থির থাকে না।
কেন্দ্রের দাবি, কৃষকদের জন্য সারের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি পর্যাপ্ত জোগান নিশ্চিত করাই বর্তমান নীতির অন্যতম লক্ষ্য। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা থাকলেও চাষের মরসুমে যাতে সারের অভাব না হয়, তার জন্য আমদানি ও দেশীয় সরবরাহ, দুই দিকেই নজর দেওয়া হচ্ছে। ভারতের মতো কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে সারের দাম কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে ইউরিয়া ও ডিএপির মতো গুরুত্বপূর্ণ সারের দাম কম রাখতে সরকারি ভর্তুকির ভূমিকা যথেষ্ট বড়। আগামী দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম কোন দিকে যায় ও কেন্দ্রীয় সরকার কী ভাবে ভর্তুকির কাঠামো পরিচালনা করে, তার উপর কৃষকের খরচ এবং সরকারি ব্যয়ের সমীকরণও অনেকটাই নির্ভর করবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Halisahar custodial death, Suvendu Adhikari visit West Bengal | হালিশহরে উত্তেজনার পরদিনই মাঠে শুভেন্দু: মৃত তৃণমূলকর্মীর পরিবারে গিয়ে রাজনৈতিক তরজায় নতুন মোড়




