Haldia Phenol Plant, 6000 crore Haldia project | বাংলায় শিল্পের বড় বিনিয়োগ! হলদিয়ায় ৬০০০ কোটির ফেনল-অ্যাসিটোন কমপ্লেক্স, বদলাতে পারে পূর্ব ভারতের পেট্রোকেমিক্যাল মানচিত্র

SHARE:

জয়ী বিশ্বাস, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের শিল্প মানচিত্রে বড় সংযোজন হতে চলেছে হলদিয়ার নতুন ফেনল ও অ্যাসিটোন উৎপাদন প্রকল্প। প্রায় ৬,০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগে তৈরি হচ্ছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ফেনল উৎপাদন কেন্দ্র। হলদিয়া (Haldia) পেট্রোকেমিক্যালস লিমিটেডের সহযোগী সংস্থা অ্যাডপ্লাস পলিমার্স অ্যান্ড কেমিক্যালসের অধীনে গড়ে ওঠা এই প্রকল্প ঘিরে ইতিমধ্যেই শিল্পমহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আগামী ১৪ অক্টোবর প্রকল্পটির উদ্বোধনের কথা রয়েছে। শুধু উৎপাদন ক্ষমতার দিক থেকেই নয়, প্রযুক্তিগত কাঠামোর কারণেও হলদিয়ার এই প্রকল্পকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত কমপ্লেক্সে ফেনল ও অ্যাসিটোনের পাশাপাশি ‘অন-পারপাস’ প্রোপিলিন উৎপাদনের ব্যবস্থাও থাকছে। ওলেফিন কনভার্সন টেকনোলজি বা ওসিটি-ভিত্তিক এই উৎপাদন ব্যবস্থা ভারতের পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হতে চলেছে।

আরও পড়ুন : Amul Howrah plant 700 crore, Amit Shah Amul project West Bengal | হাওড়ায় আমূলের ৭০০ কোটির মেগা প্রকল্প! ১৪ জুন শিলান্যাসে অমিত শাহ বাংলার দুগ্ধ শিল্পে বড় বদলের ইঙ্গিত

প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বছরে প্রায় ৩ লক্ষ ৪৫ হাজার টন ফেনল এবং ২ লক্ষ ১৫ হাজার টন অ্যাসিটোন উৎপাদনের ক্ষমতা থাকবে। শিল্পক্ষেত্রে দু’টি রাসায়নিকেরই ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। প্লাস্টিক, রং, আঠা, ওষুধ, বৈদ্যুতিন সামগ্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের শিল্পোৎপাদনে ফেনল ও অ্যাসিটোন গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে দেশে উৎপাদন বাড়লে বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে কাঁচামালের জোগান আরও স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। হলদিয়ার এই প্রকল্পের অন্যতম বড় দিক হল সমন্বিত উৎপাদন ব্যবস্থা। কাঁচামাল থেকে শুরু করে পরবর্তী উৎপাদন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ একই শিল্প পরিকাঠামোর মধ্যে রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যবস্থায় সময় কমানোর পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থাপনাতেও সুবিধা হতে পারে। পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে কাঁচামালের জোগান এবং উৎপাদনের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গায় একটি সমন্বিত কমপ্লেক্স ভবিষ্যতে সংস্থার উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

হলদিয়া অবশ্য নতুন করে পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের কেন্দ্র হয়ে উঠছে না। দীর্ঘদিন ধরেই পূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত এই বন্দরনগরী। হলদিয়া বন্দরের অবস্থান, পরিবহণ পরিকাঠামো এবং আগে থেকে গড়ে ওঠা রাসায়নিক ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের পরিকাঠামো নতুন প্রকল্পের জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করেছে। ফলে নতুন ফেনল-অ্যাসিটোন কমপ্লেক্স চালু হলে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট সংস্থার উৎপাদনে সীমাবদ্ধ থাকবে না, আশপাশের শিল্পাঞ্চলেও পড়তে পারে। ফেনল এবং কিন্তু অ্যাসিটোনের মতো রাসায়নিকের দেশীয় চাহিদা যথেষ্ট। বিভিন্ন শিল্প সংস্থাকে এই কাঁচামাল আমদানি করতে হলে আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, পরিবহণ ব্যয় ও সরবরাহ ব্যবস্থার উপর নির্ভর করতে হয়। দেশের মাটিতে উৎপাদন বাড়লে সেই নির্ভরতা কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে দেশীয় শিল্পের জন্য নিয়মিত কাঁচামাল সরবরাহের ক্ষেত্রেও সুবিধা হতে পারে।

এই প্রকল্পকে ঘিরে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও রয়েছে। একটি বড় রাসায়নিক উৎপাদন কেন্দ্র তৈরি করতে নির্মাণ পর্যায়েই প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, শ্রমিক ও বিভিন্ন পরিষেবা সংস্থার প্রয়োজন হয়। কারখানা উৎপাদনে যাওয়ার পরও দক্ষ কর্মী, রক্ষণাবেক্ষণ কর্মী, নিরাপত্তাকর্মী, পরিবহণ কর্মী এবং বিভিন্ন সহায়ক পরিষেবায় কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরাসরি কর্মসংস্থানের পাশাপাশি স্থানীয় ছোট ও মাঝারি শিল্পগুলির জন্যও নতুন বাজার তৈরি হতে পারে। ফেনল ও অ্যাসিটোনকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে আরও বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি হয়। ফলে হলদিয়ায় উৎপাদন বাড়লে ভবিষ্যতে ডাউনস্ট্রিম শিল্প গড়ে ওঠার সুযোগও বাড়তে পারে। রাসায়নিক উৎপাদন কেন্দ্রের আশপাশে সংশ্লিষ্ট শিল্পের ছোট ও মাঝারি ইউনিট তৈরি হলে একটি বৃহত্তর শিল্পশৃঙ্খল গড়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে। এতে স্থানীয় ব্যবসা, পরিবহণ, গুদামজাতকরণ এবং পরিষেবা ক্ষেত্রেও চাহিদা বাড়তে পারে। প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি খতিয়ে দেখতে সম্প্রতি হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের চেয়ারম্যান পূর্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায় (Purnendu Chatterjee) প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সংস্থার হোল-টাইম ডিরেক্টর এবং সিইও নবনীত নারায়ণ (Navneet Narayan) -সহ অন্যান্য আধিকারিক। নির্মাণের শেষ পর্যায়ের কাজ, উৎপাদন পরিকাঠামো এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প চালুর প্রস্তুতি নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়।

সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, প্রকল্পের কাজ পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে। উদ্বোধনের সময়সীমা সামনে রেখে শেষ পর্যায়ের প্রস্তুতিতে জোর দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৬,০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ হওয়ায় প্রকল্পটির আর্থিক গুরুত্বও যথেষ্ট। রাজ্যে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই ধরনের বড় প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। রাজ্য সরকারের তরফেও হলদিয়ার প্রকল্পকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) ১৪ অক্টোবর প্রকল্পটির উদ্বোধন করবেন বলে জানানো হয়েছে। রাজ্য সরকারের শিল্পনীতি এবং নতুন বিনিয়োগ টানার প্রচেষ্টার মধ্যেই এই প্রকল্পের সূচনা হতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গের শিল্পায়নের ক্ষেত্রে হলদিয়ার অবস্থান বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। বন্দর, রাস্তা, রেল এবং শিল্পাঞ্চলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে এখানে বিভিন্ন ধরনের শিল্প গড়ে উঠেছে। নতুন ফেনল ও অ্যাসিটোন কমপ্লেক্স চালু হলে সেই শিল্পভিত্তির সঙ্গে আরও একটি উচ্চমূল্যের রাসায়নিক উৎপাদন পর্ব যুক্ত হবে।

দেশীয় পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে উচ্চমূল্যের রাসায়নিক উৎপাদনের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। প্লাস্টিক, ওষুধ, রং, আঠা, বৈদ্যুতিন পণ্য এবং অন্যান্য শিল্পে রাসায়নিক কাঁচামালের চাহিদা বাড়ছে। সেই বাজারের একটি অংশ দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে হলদিয়ার প্রকল্পে। তবে প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে উৎপাদন ক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার, বাজারের চাহিদা, কাঁচামালের জোগান ও আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামার উপর। পরিবেশগত নিয়ম মেনে রাসায়নিক শিল্প পরিচালনা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পরিকাঠামোর উপর চাপ সামলানোও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে। শিল্পাঞ্চলের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে পরিবহণ ও অন্যান্য নাগরিক পরিকাঠামো কী ভাবে উন্নত করা হয়, সেদিকেও নজর থাকবে। উল্লেখ্য, প্রায় ৬,০০০ কোটি টাকার এই বিনিয়োগ তাই কেবল একটি নতুন কারখানা তৈরির ঘটনা নয়। ফেনল, অ্যাসিটোন এবং প্রোপিলিন উৎপাদনের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পর্বকে একই শিল্পপরিকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করে হলদিয়াকে আরও বড় পেট্রোকেমিক্যাল কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ১৪ অক্টোবর প্রকল্পটি উৎপাদনের পথে গেলে তার প্রভাব কতটা বিস্তৃত হয়, এখন সেদিকেই লক্ষ্য শিল্পমহল ও রাজ্য সরকারের।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Gujarat dairy sector development, Amul cooperative success | গুজরাটের দুগ্ধ বিপ্লব: প্রতিটি ফোঁটা দুধে বদলাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি, সমৃদ্ধির পথে পশুপালক সমাজ

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন