সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ হাওড়া: পশ্চিমবঙ্গের দুগ্ধ শিল্পে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ দুগ্ধ ব্র্যান্ড আমূল (Amul) এবার বাংলায় তাদের অন্যতম বড় বিনিয়োগের পথে হাঁটছে। আগামী ১৪ জুন হাওড়ার সাংকরাইল (Sankrail) ফুড পার্কে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার একটি অত্যাধুনিক দুগ্ধ প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রের শিলান্যাস করতে চলেছে সংস্থাটি। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) -এর। ফলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুই ক্ষেত্রেই এই প্রকল্প ঘিরে আগ্রহ তুঙ্গে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুধু হাওড়া বা পশ্চিমবঙ্গ নয়, গোটা পূর্ব ভারতের দুগ্ধ শিল্পের মানচিত্রে বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। গুজরাট কো-অপারেটিভ মিল্ক মার্কেটিং ফেডারেশন (Gujarat Cooperative Milk Marketing Federation) -এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর জয়েন মেহতা (Jayen Mehta) জানিয়েছেন, প্রায় ১৫ একর জমির উপর গড়ে উঠবে এই আধুনিক কারখানা। এখানে প্রতিদিন প্রায় ১৫ লক্ষ লিটার দুধ প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতা থাকবে, যা পূর্ব ভারতের মধ্যে অন্যতম বৃহত্তম হবে।
এই কারখানার একটি বিশেষ আকর্ষণ হল দই ও অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যের উৎপাদন। প্রতিদিন প্রায় ১০ লক্ষ কেজি দই, মিষ্টি দই, ইয়োগার্ট, লস্যি এবং ছাছ উৎপাদনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সংস্থার পরিকল্পনা অনুযায়ী, এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দই উৎপাদন ইউনিট হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারে। বাংলার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি দইকে আধুনিক প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার দিকেও জোর দেওয়া হচ্ছে। এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে স্থানীয় কৃষক এবং দুধ উৎপাদকদের উপর। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলার দুধ উৎপাদকরা বাজারের অস্থিরতা, মূল্য নির্ধারণের অসুবিধা এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হচ্ছেন। আমূলের মতো সংগঠিত সংস্থা সরাসরি মাঠে নামলে সেই সমস্যার অনেকটাই সমাধান হতে পারে। একাধিক গ্রামীণ খামারির মতে, ‘ন্যায্য দামে দুধ বিক্রি করার সুযোগ বাড়বে, আর মধ্যস্বত্বভোগীর উপর নির্ভরতা কমবে।’
হাওড়ার স্থানীয় দুধ ব্যবসায়ী রতন দাস (Ratan Das) বলেন, ‘আমরা বহুদিন ধরে এমন একটি বড় প্রকল্পের অপেক্ষায় ছিলাম। দুধের দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা লেগেই থাকে। এই কারখানা চালু হলে বাজারে স্থিতি আসবে, আর আমরা নিশ্চিন্তে উৎপাদন বাড়াতে পারব।’ তাঁর মতো আরও অনেক খামারি এই প্রকল্পকে ঘিরে আশাবাদী। শুধু কৃষি ক্ষেত্রেই নয়, কর্মসংস্থানের দিক থেকেও এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। কারখানাটি চালু হলে সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে কয়েকশো মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হবে বলে অনুমান। ঠান্ডা শৃঙ্খল (cold chain), পরিবহণ, প্যাকেজিং, বিপণন এই সমস্ত ক্ষেত্রে নতুন চাকরির সম্ভাবনা তৈরি হবে। স্থানীয় যুবসমাজের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রযুক্তির দিক থেকেও এই প্রকল্প অত্যাধুনিক হতে চলেছে। আমূল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়া এবং উন্নত মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে গুণগত মান বজায় রাখতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। জল সংরক্ষণ, শক্তি সাশ্রয় এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও নতুন মানদণ্ড স্থাপন করার লক্ষ্য রয়েছে।
রাজনৈতিক দিক থেকেও এই প্রকল্প তাৎপর্যপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা বিতর্ক রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে একটি জাতীয় স্তরের সংস্থার এত বড় বিনিয়োগ রাজ্যের শিল্প পরিবেশের প্রতি আস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অমিত শাহের উপস্থিতিতে শিলান্যাস অনুষ্ঠান এই প্রকল্পকে আরও গুরুত্ব দিচ্ছে। উল্লেখ্য, পূর্ব ভারতের বাজার দীর্ঘদিন ধরেই দুগ্ধ প্রক্রিয়াকরণ ক্ষেত্রে পুরোপুরি সংগঠিত নয়। এই শূন্যস্থান পূরণ করতে আমূলের এই পদক্ষেপ বড় ভূমিকা নিতে পারে। বিশেষ করে শহর ও গ্রাম দুই ক্ষেত্রেই মানসম্পন্ন দুগ্ধজাত পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। সেই চাহিদা পূরণে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলার মিষ্টি দইয়ের ঐতিহ্যকে জাতীয় স্তরে তুলে ধরার পরিকল্পনাও রয়েছে সংস্থার। আধুনিক প্যাকেজিং এবং সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে এই পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া হলে বাংলার খাদ্য সংস্কৃতিও নতুন করে পরিচিতি পাবে। এতে স্থানীয় উৎপাদকদের পাশাপাশি ছোট ব্যবসায়ীরাও লাভবান হতে পারেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বিবেচনা করলে, হাওড়ার এই প্রকল্প শুধুমাত্র একটি শিল্প উদ্যোগ নয়, বরং একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা বলেই ধরা হচ্ছে। কৃষি, শিল্প, কর্মসংস্থান এবং বাজার সমস্ত ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এখন নজর ১৪ জুনের দিকে, যখন আনুষ্ঠানিকভাবে এই মেগা প্রকল্পের সূচনা হবে।
ছবি সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Amit Shah demographic change committee | ‘জনবিন্যাস বদলের প্রভাব খতিয়ে দেখতে বড় পদক্ষেপ’ : অমিত শাহের মন্ত্রকের উচ্চস্তরীয় কমিটি গঠন, অনুপ্রবেশ ইস্যুতে নতুন করে নজর



