সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ হালিশহর, উত্তর ২৪ পরগনা: কাঁচড়াপাড়ায় পুলিশি হেফাজতে এক তৃণমূল কর্মীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত রাজনীতি সোমবার নতুন মাত্রা পেল। রবিবার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় -এর সফর ঘিরে বিক্ষোভের ঘটনার ঠিক পরদিনই হালিশহরে পৌঁছলেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। তিনি সরাসরি মৃত কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন এবং ঘটনার বিস্তারিত জানতে চান। এলাকায় সকাল থেকেই কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নজরে পড়ে। স্থানীয় সূত্রে খবর, কাঁচড়াপাড়ার ওই ঘটনায় রাজনৈতিক চাপানউতোর তুঙ্গে ওঠার মধ্যেই সোমবারের এই সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। শুভেন্দুর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন নৈহাটির বিজেপি বিধায়ক সুমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Sumitra Chattopadhyay), নোয়াপাড়ার বিধায়ক তথা মন্ত্রী অর্জুন সিংহ (Arjun Singh), জগদ্দলের বিধায়ক রাজেশ কুমার (Rajesh Kumar), বীজপুরের বিধায়ক সুদীপ্ত দাস (Sudipta Das) ও স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী সুমনা সরকার (Sumana Sarkar)। তাঁদের উপস্থিতি ঘটনাটিকে রাজনৈতিকভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
ঘটনার সূত্রপাত কয়েক দিন আগে। তোলাবাজি-সহ একাধিক অভিযোগে কাঁচড়াপাড়া পুরসভার প্রাক্তন কাউন্সিলর জেনি শর্মা কেওট (Jenny Sharma Keot)-এর স্বামী বিরজু কেওটকে (Birju Keot) গ্রেফতার করে হালিশহর থানার পুলিশ। আদালতের নির্দেশে তাঁকে পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছিল। কিন্তু শনিবার খবর আসে, হেফাজতেই মৃত্যু হয়েছে তাঁর। এই মৃত্যুকে ঘিরেই শুরু হয় বিতর্ক। মৃতের পরিবারের দাবি, ‘লকআপের ভিতরে মারধরের জেরে আমার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে’, এমন অভিযোগ তুলে সরব হন জেনি। রবিবার মৃতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গেলে বিক্ষোভের মুখে পড়েন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে কাদা ও চটি ছোড়া হয় বলে অভিযোগ। ‘চোর-চোর’ স্লোগানও শোনা যায় এলাকায়। ঘটনাস্থলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময় মমতা রাজ্য প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি অভিযোগ করেন, ‘পুলিশ লুম্পেনদের প্রোটেকশন দিচ্ছে। আমরা এখানে নিরাপদ নই।’ তাঁর মন্তব্যে রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
অন্য দিকে, বিজেপির পক্ষ থেকে পাল্টা দাবি করা হয়, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর সফরই উত্তেজনা বাড়িয়েছে। দলের একাংশের বক্তব্য, সাধারণ মানুষের ক্ষোভ থেকেই প্রতিবাদ হয়েছে। এই আবহেই সোমবার শুভেন্দুর হালিশহর সফরকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। তিনি মৃতের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন বলে জানা গিয়েছে। পাশাপাশি, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের বিষয়েও তিনি প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলতে পারেন বলে সূত্রের খবর।
স্থানীয় প্রশাসন আগাম সতর্কতা হিসেবে সোমবার সকাল থেকেই ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে। মৃতের বাড়ির আশপাশে নজরদারি জোরদার করা হয়। কোনও রকম অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসন সক্রিয় ছিল। শুভেন্দুর সফরের সময় এলাকায় রাজনৈতিক কর্মীদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। অন্যদিকে, এই ঘটনায় শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে তীব্র বাকযুদ্ধ শুরু হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী মমতার বিরুদ্ধে কটাক্ষ করে বলেন, ‘এত অভিযোগ উঠছে, মানুষ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে, সেটাই স্বাভাবিক।’ তাঁর এই মন্তব্যে পরিস্থিতি আরও তপ্ত হয়। তবে বিজেপির অগ্নিমিত্রা পাল (Agnimitra Paul) ভিন্ন সুরে বলেন, ‘রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু এই ধরনের আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়।’ তাঁর এই বক্তব্য রাজনৈতিক পরিসরে আলাদা গুরুত্ব পায়।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার প্রসঙ্গও সামনে এসেছে। পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগে তদন্তের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। প্রশাসনের তরফে এখনও বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়নি, তবে সূত্রের খবর, ময়নাতদন্তের রিপোর্টের উপরই নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপ। হালিশহরের এই ঘটনা এখন রাজ্যের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। একদিকে পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু, অন্য দিকে রাজনৈতিক নেতাদের সফর ও পাল্টা অভিযোগ, এসব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হচ্ছে। এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগও বাড়ছে। তাঁরা চাইছেন ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ঘটনাকে ঘিরে আগামী দিনে রাজ্য রাজনীতিতে আরও তীব্র সংঘাত দেখা যেতে পারে। ইতিমধ্যেই দুই শিবির নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। হালিশহরের ঘটনাপ্রবাহ কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে সবার।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal anti social activities bill 2026, Suvendu Adhikari new law details | ‘গুন্ডাদমনে’ কড়া পথে বাংলা! এক বছর আটক, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত : নতুন আইনে বড় পদক্ষেপ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সরকারের




