সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা ঘিরে বড়সড় পদক্ষেপ নিতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সংগঠিত সমাজবিরোধী কার্যকলাপ দমনে নতুন আইন আনতে উদ্যোগী হয়েছে শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) -এর নেতৃত্বাধীন প্রশাসন। ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটিজ় বিল, ২০২৬’ শীর্ষক প্রস্তাবিত এই আইন ইতিমধ্যেই গেজেট নোটিফিকেশনে প্রকাশিত হয়েছে। আগামী বিধানসভা অধিবেশনেই এটি পেশ করা হতে পারে বলে সূত্রের খবর। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সংগঠিত অপরাধমূলক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণে আনাই এই বিলের মূল লক্ষ্য। গুজরাত (Gujarat) ও উত্তরপ্রদেশ (Uttar Pradesh)-এর আদলে এই আইন তৈরি করা হয়েছে বলেই রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এই নতুন আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল প্রতিরোধমূলক আটক ব্যবস্থা। কোনও ব্যক্তি জননিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত হলে তাঁকে সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত আটক রাখা যেতে পারে। আইন কার্যকর হলে পুলিশ সুপার বা তার ঊর্ধ্বতন আধিকারিকের রিপোর্টের ভিত্তিতে রাজ্য সরকার এই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। জরুরি পরিস্থিতিতে তৎক্ষণাৎ আটক করা হলেও ১৫ দিনের মধ্যে সরকারের অনুমোদন নিতে হবে। আইনের আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার বিধান। সংগঠিত অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (Bharatiya Nyaya Sanhita) -এর প্রাসঙ্গিক ধারা প্রয়োগ করে তাঁদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। যদি কোনও অভিযুক্ত ব্যক্তি আইনের আওতায় চিহ্নিত হওয়ার পর পলাতক হন, তবে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তাঁর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা সম্ভব হবে।
বিলে সমাজবিরোধী কার্যকলাপের সংজ্ঞাও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এমন সব কাজ, যা সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করে, বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যে বাধা দেয় বা জনজীবনে অস্থিরতা সৃষ্টি করে, সবই এই আইনের আওতায় পড়বে। এছাড়াও প্রাকৃতিক সম্পদের অবৈধ ব্যবহার, বনজ সম্পদের লুট, সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করা, এসব কর্মকাণ্ডকেও সমাজবিরোধী বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই আইনে ‘গুন্ডা’ হিসেবে কাদের গণ্য করা হবে, তাও নির্ধারিত হয়েছে। সংগঠিত অপরাধচক্রের সদস্য বা নেতা, যাঁদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ধারায় চার্জশিট রয়েছে, অস্ত্র আইন, মাদক আইন, মানবপাচার বা বিস্ফোরক আইনে অভিযুক্ত ব্যক্তি, সবাই এই তালিকায় পড়বেন। পাশাপাশি সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক বলে পরিচিত ব্যক্তিকেও এই আইনের আওতায় আনা যাবে। উল্লেখ্য, আইন কার্যকর করতে একটি অ্যাডভাইসরি বোর্ড গঠন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই বোর্ডে থাকবেন হাই কোর্টের বর্তমান বা প্রাক্তন বিচারপতি এবং আরও দুই সদস্য, যাঁদের বিচারপতি হওয়ার যোগ্যতা রয়েছে। আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ কতটা যুক্তিযুক্ত, তা খতিয়ে দেখবে এই বোর্ড। আটক ব্যক্তি নিজের পক্ষে প্রতিনিধি নিয়োগ করে বক্তব্য রাখার সুযোগ পাবেন।
এছাড়া এই আইনে পুলিশকে আরও কিছু বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। কোনও ব্যক্তি অশান্তি সৃষ্টি করতে পারেন বলে আশঙ্কা থাকলে তাঁকে নির্দিষ্ট এলাকা থেকে বহিষ্কার করা বা সেখানে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা থাকবে পুলিশের হাতে। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ ও সরকারি কর্মীদের সুরক্ষার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেন্যান্স অফ পাবলিক অর্ডার ১৯৭২’ আইনের সংশোধনী আনা হচ্ছে। এই সংশোধনের মাধ্যমে বিক্ষোভ বা আন্দোলনের নামে সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তি ভাঙচুরের ঘটনায় অভিযুক্তদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা করা হবে। এ জন্য একটি ক্লেমস কমিশন গঠন করা হবে, যার নেতৃত্বে থাকবেন জেলা বিচারক পদমর্যাদার বিচারবিভাগীয় আধিকারিক।
এই কমিশনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা সংস্থা আবেদন করতে পারবে। তদন্তের পর ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে অভিযুক্তদের কাছ থেকেই সেই অর্থ আদায় করবে সরকার। এই পদক্ষেপ উত্তরপ্রদেশের (Uttar Pradesh) মডেলের সঙ্গে মিল রয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন। রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সংগঠিত অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। বিধানসভায় রাজ্যপালের ভাষণের ধন্যবাদসূচক আলোচনায়ও এই আইনের উল্লেখ করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় এবার বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে সরকার। তবে এই ধরনের আইন নিয়ে বিতর্কও কম নয়। অতীতে গুজরাত ও উত্তরপ্রদেশে চালু থাকা অনুরূপ আইন নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, এই ধরনের আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহারের আশঙ্কা থাকে। যদিও সরকারের তরফে দাবি, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ। কিন্তু, বর্তমান পরিস্থিতিতে সংগঠিত অপরাধ, অশান্তি এবং সম্পত্তি নষ্টের ঘটনা রুখতে প্রশাসন যে আরও কঠোর হতে চাইছে, তা এই প্রস্তাবিত আইন থেকেই বোঝা যাচ্ছে। এখন দেখার, বিধানসভায় বিলটি পাস হলে কীভাবে তা বাস্তবায়িত হয় এবং এর প্রভাব রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলার উপর কতটা পড়ে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari budget news, WB economic policy | বাজেট পেশের পর আত্মবিশ্বাসী শুভেন্দু অধিকারী, নতুন পথের ইঙ্গিত রাজ্যের অর্থনীতিতে




