সাশ্রয় নিউজ ★ কলকাতা : কলকাতার তারাতলা (Taratala) অঞ্চলে নির্মীয়মাণ একটি গুদামঘর ধসে পড়ার ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে গোটা রাজ্যে। বুধবার দুপুরে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৯ জন শ্রমিক, আহত হয়েছেন আরও ২০ জন। বৃহস্পতিবার বিধানসভায় দাঁড়িয়ে এই তথ্য জানালেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। ঘটনায় দুঃখ প্রকাশের পাশাপাশি তিনি নিহতদের পরিবার ও আহতদের জন্য আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এই দুর্ঘটনায় যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের পরিবারের পাশে সরকার রয়েছে।’ নিহত প্রত্যেকের পরিবারের জন্য ১০ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের জন্য ১ লক্ষ টাকা করে দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক, চারজন গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন বলেও তিনি জানান।
দুর্ঘটনার পরই পুলিশ ও প্রশাসন তৎপর হয়ে ওঠে। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারের কাজ শুরু হয় দ্রুত গতিতে। কলকাতা পুলিশ (Kolkata Police) সূত্রে জানা গেছে, বুধবার দুপুর নাগাদ ট্রান্সপোর্ট ডিপো রোড (Transport Depot Road) এলাকায় অবস্থিত ওই নির্মীয়মাণ গুদামের ছাদ হঠাৎ ভেঙে পড়ে। সেই সময় সেখানে বহু শ্রমিক কাজ করছিলেন, ফলে হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যায়। এই ঘটনার তদন্তে ইতিমধ্যেই পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘এই ঘটনায় যারা দায়ী, তাদের কাউকেই রেহাই দেওয়া হবে না।’ প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, নির্মাণ সংক্রান্ত একাধিক গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। গুদামটির নকশা এবং নির্মাণ প্রক্রিয়ায় ত্রুটি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) আরও দাবি করেন, প্রাক্তন মেয়র তথা মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের (Firhad Hakim) স্বাক্ষর রয়েছে এই গুদামঘরের বিল্ডিং প্ল্যানে। এই মন্তব্য ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। যদিও এই বিষয়ে ফিরহাদ হাকিমের পক্ষ থেকে এখনও কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এর আগের দিন মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, কলকাতা পুরসভা (Kolkata Municipal Corporation) -এর ইঞ্জিনিয়ারদের প্রাথমিক রিপোর্টে গুদামঘরের অনুমোদিত নকশাতেই ত্রুটির ইঙ্গিত মিলেছে। সেই সূত্র ধরেই প্রশাসন আরও গভীরে তদন্ত শুরু করেছে। এই ঘটনার পর রাজ্যের সমস্ত নির্মীয়মাণ বাণিজ্যিক প্রকল্প নিয়ে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, আগের তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) সরকারের আমলে অনুমোদিত সমস্ত নির্মীয়মাণ বাণিজ্যিক প্রকল্পের কাজ আপাতত ৩১ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত রাখা হবে। পাশাপাশি, এই প্রকল্পগুলির উপর একটি পূর্ণাঙ্গ অডিট করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে এই ধরনের দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, গুদামটির নির্মাণকাজ বেশ কিছুদিন ধরেই চলছিল ও সেখানে নিয়মিত শ্রমিকরা কাজ করতেন। হঠাৎ করে ছাদ ধসে পড়ায় কেউ পালানোর সুযোগ পাননি। প্রত্যক্ষদর্শীদের কথায়, ‘এক মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু ভেঙে পড়ে, চারদিকে ধুলো আর চিৎকারে ভরে যায় এলাকা।’ দুর্ঘটনার ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে উদ্ধারকাজে একাধিক যন্ত্র এবং দমকল বাহিনীকে নামতে হয়।
এই ঘটনার পর নির্মাণ নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শহরের মধ্যে দ্রুত হারে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক ভবনগুলির ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে কাজ হচ্ছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, ভবিষ্যতে নির্মাণ সংক্রান্ত নিয়ম ভঙ্গের ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাপানউতোর শুরু হয়েছে। বিরোধীরা শাসক দলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি এবং গাফিলতির অভিযোগ তুলেছে। অন্যদিকে, শাসক পক্ষের দাবি, আইন অনুযায়ী তদন্ত চলছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তারাতলার এই গুদামধস শহরের নির্মাণ ব্যবস্থার উপর একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে। শ্রমিকদের নিরাপত্তা, নির্মাণের গুণমান এবং প্রশাসনিক নজরদারি এই তিনটি ক্ষেত্রেই আরও সতর্কতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনেকেই। ঘটনার পর এলাকায় এখনও আতঙ্কের পরিবেশ বিরাজ করছে। নিহতদের পরিবারে শোকের ছায়া, আহতদের পরিবার হাসপাতালে দৌড়ঝাঁপ করছেন। সরকারের আর্থিক সহায়তা কিছুটা সান্ত্বনা দিলেও প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণা কোনওভাবেই মেটার নয়।উল্লেখ্য, কলকাতার মতো একটি ব্যস্ত মহানগরে এই ধরনের দুর্ঘটনা ভবিষ্যতে যাতে আর না ঘটে, সেদিকে নজর রাখার জন্য প্রশাসনের উপরই এখন সবথেকে বড় দায়িত্ব। তদন্তের অগ্রগতি এবং দোষীদের শাস্তি এই দুই দিকেই নজর রাখছে সাধারণ মানুষ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Taratala Warehouse Collapse Kolkata, 3 Dead, Many Trapped, Rescue Ongoing | তারাতলায় গুদাম ধসের মর্মান্তিক ছবি! ৩ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১৮, ধ্বংসস্তূপে এখনও ১২-১৫ জন আটকে, রাতভর উদ্ধারকাজে সেনা-এনডিআরএফ



