যোগী আদিত্যনাথের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিচিতি এবং উত্তরপ্রদেশের মতো দেশের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা। অন্যদিকে, অমিত শাহের ক্ষেত্রে সাংগঠনিক দক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তাঁকে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম শক্তিশালী মুখ করে তুলেছে। আজ তৃতীয় কিস্তি।
মোদীর পর কে? ২০৩৪-এর ভারত ও বিজেপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে বড় প্রশ্ন

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) নেতৃত্বে ভারতের রাজনীতিতে দীর্ঘ অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল ২০১৪ সালে। ২০২৬-এ এসে সেই নেতৃত্ব আরও এক দশকের রাজনৈতিক প্রভাবের কেন্দ্রে রয়েছে। কিন্তু রাজনীতিতে কোনও নেতৃত্বই চিরস্থায়ী নয়। তাই ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচন পেরিয়ে ২০৩৪-এর ভারত কেমন হবে, আর নরেন্দ্র মোদীর পর ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) -এর নেতৃত্বে কে উঠে আসবেন, এই প্রশ্ন এখন থেকেই রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে।
২০২৬ সালের জুনে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার একটি প্রস্তাবে নরেন্দ্র মোদীকে টানা নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি হিসাবে, ১০ জুন ২০২৬-এ তাঁর টানা নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের মেয়াদ ৪,৩৯৯ দিনে পৌঁছয়, যা জওহরলাল নেহরুর ৪,৩৯৮ দিনের রেকর্ডকে অতিক্রম করে। কিন্তু, দীর্ঘ রাজনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি উত্তরসূরি তৈরি করাও যে কোনও বড় রাজনৈতিক দলের সামনে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণেও বলা হচ্ছে, ২০২৯ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় মোদীর বয়স হবে ৭৮ বছর। তখন তিনি পরবর্তী নির্বাচনে লড়বেন কি না, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে নেই। একই সঙ্গে বিজেপিতে তাঁর পরবর্তী উত্তরসূরি কে হবেন, সেটিও স্পষ্ট নয়।
এই জায়গাতেই উঠে আসে ‘মোদীর পর কে?’ প্রশ্নটি
বিজেপির সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি যে নামগুলির উল্লেখ হয়, তার মধ্যে রয়েছেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ (Yogi Adityanath), কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah), কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিতিন গড়করি (Nitin Gadkari) এবং দলের অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রজন্মের কয়েকজন নেতা। তবে তাঁদের কাউকেই বিজেপি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘উত্তরসূরি’ ঘোষণা করেনি। ফলে এই আলোচনা আপাতত রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও সম্ভাবনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
যোগী আদিত্যনাথের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিচিতি ও উত্তরপ্রদেশের মতো দেশের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা। অন্যদিকে, অমিত শাহের ক্ষেত্রে সাংগঠনিক দক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তাঁকে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম শক্তিশালী মুখ করে তুলেছে। আবার নিতিন গড়করির ক্ষেত্রে উঠে আসে প্রশাসনিক ও অবকাঠামো উন্নয়নের অভিজ্ঞতা। তবে প্রধানমন্ত্রী পদে কে ভবিষ্যতে সবচেয়ে উপযুক্ত হতে পারেন, সেটি শুধুমাত্র জনপ্রিয়তা দিয়ে নির্ধারিত হবে না। দলীয় সংগঠন, সংসদীয় সমর্থন, রাজ্যগুলির সঙ্গে সমন্বয়, জোট রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির মতো একাধিক বিষয় বিবেচনায় আসবে।
এর পাশাপাশি বিজেপির সংগঠনেও প্রজন্ম পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে নীতিন নবীন (Nitin Nabin) বিজেপির জাতীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। ৪৫ বছর বয়সে তাঁর উত্থানকে দলের অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনার বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, বিজেপির ভবিষ্যৎ শুধু একজন ‘মোদী-পরবর্তী মুখ’ খোঁজার প্রশ্ন নয়; বরং একটি নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরি করার প্রশ্নও। আগামী কয়েক বছরে রাজ্য সভাপতি, মুখ্যমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং সাংগঠনিক পদে তরুণ নেতাদের আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হলে ২০৩৪-এর নেতৃত্বের ছবি অনেকটাই পরিষ্কার হতে পারে।
কিন্তু এখানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নরেন্দ্র মোদীর রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও জাতীয় স্তরে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। ২০২৬ সালের একটি আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, বিজেপির সামনে ভবিষ্যতে প্রশ্ন হতে পারে, মোদীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার বাইরে দল কতটা শক্তিশালী জাতীয় নেতৃত্ব তৈরি করতে পেরেছে। এই জায়গায় ‘যুব নেতৃত্ব বনাম অভিজ্ঞ নেতৃত্ব’ বিতর্কটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একদিকে থাকবে দীর্ঘ প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতারা। অন্যদিকে থাকবে তুলনামূলক তরুণ নেতৃত্ব, যারা আগামী ১৫-২০ বছর জাতীয় রাজনীতিকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো দীর্ঘ রাজনৈতিক সময় হাতে রাখবে।
কিন্তু ২০৩৪-এর নেতৃত্ব নির্ধারণে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, ভারতের পরিবর্তিত ভোটার সমাজ। নতুন প্রজন্মের ভোটারদের কাছে কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্টার্টআপ, জাতীয় নিরাপত্তা, জীবনযাত্রার মান এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রীকে শুধু নির্বাচনী রাজনীতিতে সফল হলেই চলবে না; অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও ভূরাজনীতির পরিবর্তনও সামলাতে হবে। ভারতের বিদেশনীতি নিয়েও উত্তরসূরি প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়ে প্রধানমন্ত্রী-কেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-চিন প্রতিযোগিতা, রাশিয়া, পশ্চিম এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের অবস্থান আগামী দশকে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ফলে নরেন্দ্র মোদীর পর যিনি নেতৃত্বে আসবেন, তাঁকে একই সঙ্গে ‘continuity’ এবং ‘change’-এর মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।
অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলির জন্যও মোদী-পরবর্তী ভারত একটি বড় রাজনৈতিক সুযোগ হতে পারে। কোনও রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব যদি একজন ব্যক্তির জনপ্রিয়তার উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে নেতৃত্ব পরিবর্তনের সময় সাংগঠনিক দুর্বলতা প্রকাশ্যে আসার সম্ভাবনা থাকে। আবার শক্তিশালী সংগঠন ও দ্বিতীয় সারির নেতৃত্ব থাকলে নেতৃত্ব পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে মসৃণ হতে পারে।সুতরাং ২০৩৪-এর ভারতকে বোঝার জন্য শুধু ‘মোদীর পর কে?’ প্রশ্নটি যথেষ্ট নয়। আসল প্রশ্ন হবে, মোদীর রাজনৈতিক মডেলের কতটা থাকবে, আর কতটা বদলাবে?
সম্ভবত আগামী কয়েক বছরে বিজেপির অন্দরমহলে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে এই জায়গাতেই। মোদীর উত্তরসূরি যদি তাঁর জনপ্রিয়তার প্রতিলিপি হওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে হয়তো প্রত্যাশার চাপ বাড়বে। কিন্তু যদি নতুন নেতৃত্ব নিজের রাজনৈতিক পরিচয়, প্রশাসনিক মডেল ও জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পারে, তাহলে বিজেপির পরবর্তী অধ্যায় আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। আর এখানেই ২০৩৪-এর ভারতের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক রহস্য। ২০২৯-এর নির্বাচন হয়ত সেই উত্তরাধিকার-পর্বের প্রথম বড় পরীক্ষা হবে। তার আগে বিজেপির সংগঠন, রাজ্য নেতৃত্ব ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় যে পরিবর্তনগুলি ঘটবে, সেগুলিই সম্ভবত ভবিষ্যতের নেতৃত্বের প্রথম ইঙ্গিত দেবে।
উল্লেখ্য, ‘মোদীর পর কে’? এর উত্তর কোনও একজনের নামেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। ভারতের রাজনীতিতে আগামী দশকের লড়াই হতে পারে একজন নেতার উত্তরসূরি বনাম একটি নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বব্যবস্থা তৈরি করার লড়াই। আর সেই লড়াইয়ের ফলেই নির্ধারিত হতে পারে ২০৩৪ -এর ভারত, রাজনৈতিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে এবং বিশ্বমঞ্চে ভারতের পরবর্তী অবস্থান।
ছবি : সংগৃহীত




