Narendra Modi | আরও ১০ বছর মোদী কেন? বিশ্বরাজনীতিতে ভারতের উত্থান, যুবশক্তি ও বিরোধীদের কৌশল নিয়ে বড় প্রশ্ন

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: ভারতের রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদী -এর (Narendra Modi) নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। কিন্তু প্রশ্নটি যদি হয়, বিশ্বের দ্রুত বদলে যাওয়া ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতের দীর্ঘস্থায়ী স্বার্থে মোদীর মতো অভিজ্ঞ নেতৃত্ব আরও এক দশক প্রয়োজন কি না, তাহলে বিষয়টি শুধু পছন্দ-অপছন্দের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, কূটনীতি, প্রযুক্তি, শক্তি-নিরাপত্তা ও বিশ্বমঞ্চে ভারতের অবস্থান প্রভৃতি একসঙ্গে বিচার করতে হয়।

আরও পড়ুন : India Australia sports ties, PM Narendra Modi | এমসিজিতে মোদী-আলবানিজের ক্রীড়া রোডম্যাপ ঘোষণা, চেন্নাইয়ে প্রথম বিদেশি লিগ ম্যাচে নতুন ইতিহাস

মোদী সরকারের সমর্থকদের সবচেয়ে বড় যুক্তি হল, গত এক দশকে ভারত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আগের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয় ও দৃশ্যমান হয়েছে। আমেরিকা, রাশিয়া, ইউরোপ, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য এবং Global South প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ শক্তির সঙ্গেই একসঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বজায় রেখেও আমেরিকা ও ইউরোপের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে Quad (QUAD), BRICS (BRICS), SCO (SCO) -সহ একাধিক মঞ্চে ভারতের ভূমিকা সক্রিয় রাখা হয়েছে। বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় এই ‘multi-alignment’ বা বহুমুখী কূটনৈতিক কৌশল ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইউক্রেন সংঘাত, আমেরিকা-চিন প্রতিযোগিতা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও  আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন শুল্ক-সংঘাতেত মধ্যে কোনও একটি শিবিরের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে নিজের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করা ভারতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে মোদী সরকার সেই ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। তবে এই কৌশলের সাফল্য নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে, বিশেষ করে বাণিজ্য, শুল্ক এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে। ২০২৫ সালে মার্কিন শুল্ক-চাপ নিয়ে ভারতের বিরোধীরা মোদী সরকারের বিদেশনীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। 

অর্থনীতির ক্ষেত্রেও দীর্ঘস্থায়ী নেতৃত্বের পক্ষে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) -এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতের অর্থনীতি সাম্প্রতিক বছরগুলিতে শক্তিশালী বৃদ্ধি ধরে রেখেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ৬.৬ শতাংশ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে ৬.২ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল IMF -এর ২০২৫ সালের মূল্যায়ন। একই সঙ্গে ভারতের অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা, আর্থিক খাতের শক্তি এবং পরিষেবা রফতানির গুরুত্বের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এখানেই বিরোধীদের যুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু GDP বৃদ্ধি হলেই সাধারণ মানুষের জীবনে সমৃদ্ধি নিশ্চিত হয় না। কর্মসংস্থান, যুবকদের চাকরি, আয়বৈষম্য, কৃষকের আয়, ছোট ব্যবসার স্থায়িত্ব এবং শিক্ষাব্যবস্থার মান ইত্যাদি এসব প্রশ্নের উত্তরও দিতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে যুবসমাজের মধ্যে পরীক্ষাব্যবস্থা ও চাকরি নিয়ে অসন্তোষের খবরও সামনে এসেছে। অর্থাৎ আগামী দশকের নেতৃত্বকে শুধু বিশ্বমঞ্চে শক্তিশালী অবস্থান নয়, দেশের ভিতরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রত্যাশাও পূরণ করতে হবে। 

এই জায়গাতেই কংগ্রেস ও বিরোধী জোটের কৌশল নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। মোদীর বিরোধিতা করা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। সরকারের নীতি, অর্থনীতি, বিদেশনীতি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করাও বিরোধীদের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন রাজনৈতিক বিরোধিতা ব্যক্তিকেন্দ্রিক আক্রমণ অথবা যুবসমাজকে শুধুমাত্র ক্ষোভের রাজনীতিতে ঠেলে দেওয়ার কৌশলে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে, ভারতের যুবসমাজকে যদি শুধু বলা হয় ‘মোদীকে সরাও’, কিন্তু তার সঙ্গে বিকল্প অর্থনৈতিক মডেল কী, কর্মসংস্থান কীভাবে বাড়বে, প্রযুক্তি ও AI-এর যুগে নতুন চাকরি কোথা থেকে আসবে, ভারতের প্রতিরক্ষা ও বিদেশনীতি কোন পথে যাবে? এসবের সুস্পষ্ট উত্তর না দেওয়া হয়, তাহলে সেই রাজনীতি আদৌ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।

বিরোধীদের জন্য আরও কার্যকর পথ হতে পারে ‘Anti-Modi’ রাজনীতির পরিবর্তে ‘Alternative India’ বা বিকল্প ভারতের রূপরেখা সামনে আনা। তবে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে মোদীকে সরানোর দাবি না করে বরং তার নেতৃত্ব ভারতের জন্য ভাল হবে তার পরিসংখ্যান, নীতি ও বাস্তব পরিকল্পনা দেখানো প্রয়োজন। গণতন্ত্রে শক্তিশালী সরকার যেমন দরকার, তেমনই শক্তিশালী বিরোধী দলও প্রয়োজন। আর মোদীর আরও দশ বছর নেতৃত্বের পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হতে পারে ধারাবাহিকতা। পরিকাঠামো, প্রতিরক্ষা, উৎপাদন, ডিজিটাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর, মহাকাশ, শক্তি ও কূটনৈতিক সম্পর্কের মতো দীর্ঘস্থায়ী প্রকল্পে নীতির ধারাবাহিকতা বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ভারত বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি হয়ে ওঠার প্রতিযোগিতায় রয়েছে। IMF -এর ২০২৬ সালের তথ্যেও ভারতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজারের গুরুত্ব স্পষ্ট। 

তবে ‘আরও দশ বছর’ মানেই নিঃশর্ত সমর্থন একথা জড়দিয়ে বলতে পাড়া যায় না । তবে এইটুকু বলতে পারি যে তাঁর লম্বা নেতৃত্বের সঙ্গে আরও বেশি জবাবদিহির প্রয়োজন বিশেষ । যেমন বলতে পারি – স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিরোধীদের অধিকার, বিচারব্যবস্থার মর্যাদা ও নাগরিক স্বাধীনতা , এসব প্রশ্নে যে কোনও সরকারেরই কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়া উচিত। ভারতের সামনে আগামী দশকে সবচেয়ে বড় লড়াই সম্ভবত আমেরিকা বনাম চিন না ।  ভারত কীভাবে নিজেকে একটি উচ্চ-আয়ের, প্রযুক্তিনির্ভর, কর্মসংস্থানমুখী এবং সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করবে, সেটিই আসল প্রশ্ন। বিশ্বব্যাংক, IMF এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও ভারতের উচ্চ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনার পাশাপাশি কাঠামোগত সংস্কার ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার দিকে নজর দিয়েছে। 

সুতরাং নরেন্দ্র মোদীর আরও দশ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকা উচিত কি না, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ভারতীয় ভোটারদের। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট, এই সিদ্ধান্ত যেন শুধু ‘মোদী বনাম মোদী-বিরোধিতা’তে আটকে না থাকে। দেশের সামনে থাকা প্রশ্ন হওয়া উচিত আরও বড়: আগামী দশ বছরে ভারত কী বিশ্বশক্তির তালিকায় আরও উপরে উঠবে? যুবকদের জন্য কত নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে? প্রযুক্তি ও AI বিপ্লবের নেতৃত্ব ভারত কতটা নিতে পারবে? চিনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কতটা এগোবে? এবং বিশ্বরাজনীতিতে ভারত কী নিজের স্বার্থে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে পারবে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর যে দল সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্যভাবে দিতে পারবে, শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সুবিধা তার দিকেই যেতে পারে। মোদী হোন বা অন্য কোনও নেতা, ভারতের প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যার কাছে বিশ্বমঞ্চে শক্তি এবং দেশের ভিতরে উন্নয়ন দু’টিই সমান গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ মোদী বিকল্প এখনও সামনে আসেনি।

ছবি: সংগৃহীত 

আরও পড়ুন : PM Narendra Modi Auckland speech, India New Zealand ties | ‘২৫ বছর আগে বন্ধুর দেওয়া মাফলার এখনও আছে’ : অকল্যান্ডে আবেগঘন মোদী, প্রবাসী ভারতীয়দের সামনে পুরনো স্মৃতি ও নতুন সম্পর্কের বার্তা

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন