সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : বিজেপির (BJP) সর্বভারতীয় সংগঠনে বড়সড় রদবদল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সোমবার নতুন কেন্দ্রীয় পদাধিকারীদের তালিকা প্রকাশ করলেন দলের সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন (Nitin Nabin)। নতুন কমিটিতে একদিকে যেমন অভিজ্ঞ ও পুরনো মুখদের জায়গা ধরে রাখা হয়েছে, তেমনই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রজন্মের নেতাদের। আগামী লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে সংগঠনকে নতুন করে সাজানোর লক্ষ্যেই এই রদবদল বলে মনে করা হচ্ছে। দলের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদে অবশ্য কোনও পরিবর্তন করা হয়নি। সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) হিসেবে বিএল সন্তোষকেই (B. L. Santhosh) রেখে দেওয়া হয়েছে। ফলে বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামোয় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (RSS) প্রভাবও আগের মতোই বজায় থাকল। নিতিন নবীন সর্বভারতীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় সাত মাস পর নিজের কেন্দ্রীয় টিম ঘোষণা করলেন। এই দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রকাশিত তালিকায় বেশ কয়েকটি নাম রাজনৈতিক মহলে নজর কেড়েছে। বিশেষ করে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি (Smriti Irani) –এর প্রত্যাবর্তন ও এক সময় বিজেপির সাধারণ সম্পাদক থাকা রাম মাধবকে (Ram Madhav) ফের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
নতুন কমিটিতে আট জনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন স্মৃতি ইরানি, ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব (Biplab Kumar Deb), সুনীল বনসল (Sunil Bansal), মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা বিনোদ তাওড়ে (Vinod Tawde), সতীশ পুনিয়া (Satish Poonia), গজেন্দ্র পটেল (Gajendra Patel), হরিশ দ্বিবেদী (Harish Dwivedi) এবং সঞ্জয় ভাটিয়া (Sanjay Bhatia)। এই তালিকায় বিভিন্ন রাজ্যের নেতাদের জায়গা দিয়ে বিজেপি কেন্দ্রীয় সংগঠনের ভৌগোলিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে বলেই মনে করা হচ্ছে। সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) পদে বিএল সন্তোষকে বহাল রাখা হয়েছে। বিজেপির সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও রাজ্যস্তরে দলীয় কাঠামোর সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সমন্বয়ে এই পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর অধীনে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন শিবপ্রকাশ (Shiv Prakash) ও সৌদান সিংহ (Saudan Singh)। দু’জনেরই আরএসএসের সঙ্গে দীর্ঘ সাংগঠনিক যোগাযোগ রয়েছে। ফলে নতুন টিমে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি সঙ্ঘের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতাকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাম মাধবকে সহ-সভাপতি করা হয়েছে। একসময় আরএসএস থেকে বিজেপির সক্রিয় রাজনীতিতে এসে দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছিলেন তিনি। পরে সক্রিয় দলীয় রাজনীতি থেকে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়। নতুন কমিটিতে তাঁকে ফের দায়িত্ব দেওয়াকে বিজেপির সাংগঠনিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাবর্তন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সহ-সভাপতি পদেও রয়েছে একাধিক পরিচিত মুখ। রাজস্থানের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজে (Vasundhara Raje), উত্তরাখণ্ডের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তীর্থ সিংহ রাওয়ত (Tirath Singh Rawat), প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভারতী পাওয়ার (Bharati Pawar), ওড়িশার নেতা বৈজয়ন্ত পণ্ডা (Baijayant Panda), পাঞ্জাবের প্রাক্তন কংগ্রেস নেতা মনপ্রীত সিংহ বাদল (Manpreet Singh Badal) ও সংখ্যালঘু নেতা তারিক মনসুরকে (Tariq Mansoor) এই পদে রাখা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকেও জায়গা পেয়েছেন মধুছন্দা কর (Madhuchhanda Kar)। নতুন কেন্দ্রীয় কমিটিতে সম্পাদক পদেও একাধিক তরুণ মুখ উঠে এসেছে। ১৬ জন সর্বভারতীয় সম্পাদকের মধ্যে রয়েছেন সন্দীপ পাঠক (Sandeep Pathak), অনিল অ্যান্টনি (Anil Antony), রোহন গুপ্ত (Rohan Gupta) ও পশ্চিমবঙ্গের নেতা মনোজ টিগ্গা (Manoj Tigga)। কেরলের প্রাক্তন কংগ্রেস নেতা এ কে অ্যান্টনির (A. K. Antony) ছেলে অনিল অ্যান্টনির অন্তর্ভুক্তিও রাজনৈতিক মহলে নজর কেড়েছে। বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর তাঁকে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কাঠামোয় আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
নতুন কমিটির আর একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দলের তথ্যপ্রযুক্তি ও সমাজমাধ্যম সংগঠন ঘিরে। বিজেপির আইটি ও সোশ্যাল মিডিয়া সেলের দায়িত্বে থাকা অমিত মালবীয়কে (Amit Malviya) সেই দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে। একই সঙ্গে যুব মোর্চার সভাপতি পদ থেকেও লোকসভার সাংসদ তেজস্বী সূর্যকে (Tejasvi Surya) সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে সংগঠনের দুই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নতুন নেতৃত্ব আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দল। অন্য দিকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পীযূষ গোয়েলকে (Piyush Goyal) নতুন কোষাধ্যক্ষ করা হয়েছে। দলের ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ নীতি কার্যকর হলে তাঁর কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় থাকা নিয়ে ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত বদলের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে এখনই কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি। উল্লেখ্য, নতুন টিমের গড় বয়সও আগের তুলনায় তরুণ প্রজন্মের দিকে ঝুঁকে রয়েছে। প্রবীণ নেতাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনামূলক কম বয়সী নেতাদের সাংগঠনিক দক্ষতাকে একই কাঠামোয় আনার চেষ্টা হয়েছে। সামনে রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন, সংগঠন সম্প্রসারণ ও ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন, এই দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক প্রস্তুতির কথা মাথায় রেখেই টিম সাজানো হয়েছে বলে বিজেপির অন্দরে আলোচনা রয়েছে।
নিতিন নবীনের নিজের রাজ্য বিহারেও সংগঠন নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে। সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বড় পরীক্ষা ছিল কেন্দ্রীয় স্তরে নিজের দল গঠন। সেই কাজেই প্রায় সাত মাস সময় নেওয়ার পরে যে তালিকা সামনে এল, তাতে রাজ্যভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা এবং নতুন প্রজন্ম—তিনটি দিককে একসঙ্গে রাখার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে আগামী কয়েক বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লোকসভা নির্বাচনের প্রস্তুতির পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্যে দলের সংগঠন শক্তিশালী করা, যুব ভোটারদের কাছে পৌঁছনো, সমাজমাধ্যমে প্রচার কাঠামো পুনর্গঠন এবং আরএসএসের সাংগঠনিক পরিবর্তনের সঙ্গে সমন্বয় সবকিছুর উপরেই নজর থাকবে নতুন টিমের। ফলে নতুন পদাধিকারীদের তালিকা শুধু সাংগঠনিক রদবদল নয়, বিজেপির আগামী দিনের রাজনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Sunil Bansal BJP, সুনীল বনসল বিজেপি, BJP new team 2026 | সুনীল বনসলকে ফের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক করল বিজেপি, নিতিন নবীনের নতুন টিমে বড় দায়িত্ব




