সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : নতুন সরকার গঠনের আগেই সিঙ্গুর (Singur) ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিল কলকাতা হাইকোর্ট (Calcutta High Court)। টাটা মোটরসকে (Tata Motors) ৭৬৫.৭৮ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশে আপাতত স্থগিতাদেশ জারি করেছে আদালত। বিচারপতি অনিরুদ্ধ রায় (Aniruddha Roy)-এর বেঞ্চ এই নির্দেশ দিয়েছে এবং আগামী আট সপ্তাহের জন্য রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজ্যকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যাঙ্ক গ্যারান্টি জমা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। এই রায়ের ফলে বহুদিন ধরে চলতে থাকা সিঙ্গুর শিল্প প্রকল্প সংক্রান্ত আইনি লড়াইয়ে আবারও নতুন অধ্যায় যোগ হল। রাজ্য সরকার ও টাটা গোষ্ঠীর মধ্যে এই বিরোধ বহু বছর ধরেই রাজনৈতিক এবং আইনি আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। হাইকোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশে আপাতত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে রাজ্য প্রশাসন।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে। সেই সময় তিন সদস্যের একটি সালিশি ট্রাইব্যুনাল নির্দেশ দেয়, সিঙ্গুরে কারখানা স্থাপন করতে না পারার কারণে টাটা মোটরসকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৭৬৫.৭৮ কোটি টাকা দিতে হবে। শুধু মূল অর্থই নয়, ২০১১ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে অর্থপ্রাপ্তির দিন পর্যন্ত বছরে ১১ শতাংশ হারে সুদ এবং অতিরিক্ত ১ কোটি টাকা মামলা খরচ হিসেবেও দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এই নির্দেশের বিরুদ্ধে আপিল করে পশ্চিমবঙ্গ শিল্পোন্নয়ন নিগম (West Bengal Industrial Development Corporation বা WBIDC)। রাজ্যের পক্ষ থেকে আদালতে দাবি করা হয়, সালিশি ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে। সেই আবেদনের ভিত্তিতেই হাইকোর্ট এই অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন, তাই চূড়ান্ত রায় ঘোষণার আগে সময় দেওয়া হচ্ছে।
সিঙ্গুর ইস্যু পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক। ২০০৬ সালে টাটা গোষ্ঠীর ন্যানো (Nano) গাড়ির কারখানা গড়ার জন্য সিঙ্গুরে প্রায় ৯৯৭ একর জমি অধিগ্রহণ শুরু হয়। সেই সময় থেকেই জমি অধিগ্রহণ নিয়ে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। কৃষক, স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে এলাকা। ২০০৮ সালে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছালে টাটা গোষ্ঠীর কর্ণধার রতন টাটা (Ratan Tata) ঘোষণা করেন, ‘এই পরিস্থিতিতে এখানে কাজ করা সম্ভব নয়।’ এরপরই সিঙ্গুর থেকে প্রকল্প সরিয়ে গুজরাটের সানন্দ (Sanand)-এ নিয়ে যাওয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত রাজ্যের শিল্প উন্নয়ন নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। উল্লেখ্য, ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসে তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) সরকার সিঙ্গুর জমি পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেয়। ‘সিঙ্গুর ল্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যাক্ট’ (Singur Land Rehabilitation and Development Act) পাশ করে জমি ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ৩১ অগস্ট সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court) ঐ জমি অধিগ্রহণকে ‘অবৈধ’ বলে ঘোষণা করে এবং ১২ সপ্তাহের মধ্যে জমি কৃষকদের ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেয়। আদালতের নির্দেশ মেনে জমি ফেরানোর কাজ শুরু হলেও বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে নানা অভিযোগ সামনে আসে। বহু কৃষকের দাবি ছিল, দীর্ঘদিন পর জমি ফেরত পেলেও তা আগের মতো চাষযোগ্য অবস্থায় নেই। ফলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে তাঁদের।
এই প্রেক্ষাপটে টাটা মোটরস ক্ষতিপূরণের দাবি তোলে। তাদের বক্তব্য ছিল, প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংস্থার বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সেই কারণেই সালিশি ট্রাইব্যুনাল তাদের পক্ষে রায় দেয়। তবে হাইকোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশে আপাতত সেই ক্ষতিপূরণ প্রদানের বাধ্যবাধকতা স্থগিত থাকল। রাজ্যকে এখন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যাঙ্ক গ্যারান্টি জমা দিতে হবে, যা ভবিষ্যতের রায়ের উপর নির্ভর করে কার্যকর হবে। এই রায় রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। নতুন সরকার গঠনের ঠিক আগে এমন একটি সিদ্ধান্ত রাজ্যের প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক পরিবেশে প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করা হচ্ছে। সিঙ্গুর ইস্যু বহুদিন ধরেই রাজ্যের নির্বাচনী রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। বর্তমানে নজর রয়েছে পরবর্তী শুনানির দিকে। আট সপ্তাহ পর এই মামলার ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণ হবে। তখনই জানা যাবে, রাজ্যকে আদৌ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে কি না, বা এই মামলায় নতুন কোনও মোড় আসবে কী না। প্রসঙ্গত, সিঙ্গুর ইস্যু আবারও শিরোনামে উঠে আসায় শিল্প বনাম কৃষি বিতর্ক নতুন করে আলোচনায় এসেছে। রাজ্যের উন্নয়ন, বিনিয়োগ এবং কৃষকদের অধিকার, এই তিনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা কতটা জরুরি, তা এই মামলার মাধ্যমে আরও একবার সামনে এল।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal CM Announcement 2026, BJP Bengal Swearing Ceremony | পশ্চিমবঙ্গে প্রথম বিজেপি সরকারের শপথে আসছেন মোদী-শাহ-যোগী? আর কে কে?




