সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদলের পর শিক্ষাক্ষেত্রে বড় পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিল কেন্দ্রীয় সরকার। বহুদিন ধরে আটকে থাকা ‘পিএম শ্রী’ (PM SHRI বা Prime Minister Schools for Rising India) প্রকল্প এবার পশ্চিমবঙ্গে চালু হতে পারে বলে জোরাল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, খুব শীঘ্রই পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর মুখ্যসচিবদের কাছে এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হবে।
সরকারি সূত্রের দাবি, ‘ক্ষমতার পরিবর্তনের ফলে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে এবার ওই রাজ্যগুলিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ অনেকটাই মসৃণ হতে পারে।’ কেন্দ্রের লক্ষ্য, দ্রুত প্রশাসনিক সম্মতি নিয়ে স্কুলস্তরে এই প্রকল্প চালু করা, যাতে পড়ুয়ারা সরাসরি এর সুবিধা পেতে পারে। পিএম শ্রী প্রকল্পের আওতায় দেশজুড়ে প্রায় ১৪,৫০০ সরকারি স্কুলকে উন্নত পরিকাঠামো ও আধুনিক শিক্ষার মাধ্যমে ‘মডেল স্কুল’-এ পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP)-এর কাঠামো মেনে এই স্কুলগুলিকে গড়ে তোলা হবে। ডিজিটাল শিক্ষা, স্মার্ট ক্লাসরুম, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরিই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। এতদিন পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) সরকারের সময় এই প্রকল্প কার্যকর হয়নি। একই অবস্থান ছিল তামিলনাড়ুর ডিএমকে (DMK) সরকারেরও। অভিযোগ ছিল, কেন্দ্রীয় অনুদানের সঙ্গে জাতীয় শিক্ষানীতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সেই কারণে দুই রাজ্যই কেন্দ্রের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি বা ‘মৌ’ স্বাক্ষর করেনি। কেন্দ্রের নীতি অনুযায়ী, এই চুক্তি না হলে প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ সম্ভব নয়।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বদল এসেছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি (BJP) ক্ষমতায় আসার পর কেন্দ্রীয় মহলে আশাবাদ তৈরি হয়েছে যে, এবার আর কোনও প্রশাসনিক জটিলতা থাকবে না। শিক্ষা মন্ত্রকের এক কর্তার কথায়, ‘আমরা আশা করছি, খুব দ্রুত চুক্তি স্বাক্ষর হবে এবং রাজ্যের ছাত্রছাত্রীরা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবে।’ শুধু পিএম শ্রী নয়, পশ্চিমবঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প চালুর পরিকল্পনা করছে কেন্দ্র ‘উল্লাস’ (ULLAS বা Understanding Lifelong Learning for All in Society)। এই প্রকল্পের লক্ষ্য প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটানো। নিরক্ষরতা দূর করে সমাজের বৃহত্তর অংশকে শিক্ষার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে এর মাধ্যমে। কেন্দ্রীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে এই দু’টি প্রকল্প চালুর ক্ষেত্রে আপাতত কোনও বড় বাধা থাকার সম্ভাবনা নেই। প্রশাসনিক স্তরে দ্রুত পদক্ষেপ নিলেই কার্যক্রম শুরু করা যাবে। তবে তামিলনাড়ুর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। সেখানে বিজয়ের দল টিভিকে (TVK) সর্বাধিক আসন পেলেও পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে সরকার গঠন এবং নীতি নির্ধারণের প্রক্রিয়া এখনও চূড়ান্ত নয়। এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় সরকার তামিলনাড়ুর ক্ষেত্রেও অপেক্ষাকৃত সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। তবুও তারা আশাবাদী যে, শিক্ষার স্বার্থে শেষ পর্যন্ত ওই রাজ্যও এই প্রকল্পে অংশগ্রহণ করবে।
উল্লেখ্য, শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ু নয়, কেরলেও (Kerala) পিএম শ্রী প্রকল্প নতুন করে চালুর বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে কেন্দ্র। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে কেরল সরকার এই প্রকল্পে সম্মতি দিলেও পরে তা স্থগিত রাখা হয়। ফলে কেন্দ্রীয় অনুদান বন্ধ হয়ে যায়। আসলে কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান শুরু থেকেই এক, যে রাজ্য এই প্রকল্পে অংশ নিতে চাইবে, তাদেরকে নির্দিষ্ট শর্ত মেনে চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে। সেই শর্ত পূরণ না হলে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে না। এই নীতির কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, কেরল, পাঞ্জাব ও দিল্লি এই পাঁচ রাজ্য সমগ্র শিক্ষা প্রকল্পের অনুদান থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় পশ্চিমবঙ্গ এখন সেই তালিকা থেকে বেরিয়ে আসতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান এবং দক্ষতা উন্নয়নের দিকে নজর রেখে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে রাজ্যের স্কুলশিক্ষায় নতুন দিশা মিলতে পারে। ছাত্রছাত্রীদের জন্য উন্নত পরিকাঠামো, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, ডিজিটাল সুবিধা সব মিলিয়ে শিক্ষার মানোন্নয়নের একটি বড় সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এখন দেখার, প্রশাসনিক স্তরে কত দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং কবে থেকে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাক্ষেত্রে এই উদ্যোগ কতটা প্রভাব ফেলবে, তা আগামী দিনে পরিষ্কার হবে। তবে আপাতত এটুকু নিশ্চিত, কেন্দ্র ও রাজ্যের নতুন সমন্বয়ের ফলে বহুদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে শিক্ষার পরিকাঠামোয় পরিবর্তনের দরজা খুলতে চলেছে।



