সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে ফের তীব্র রাজনৈতিক বার্তা দিলেন শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। বুধবার সন্ধ্যায় রাজ্য নির্বাচন কমিশনের দফতরে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক বা সিইও (CEO)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বেরিয়ে তিনি জানান, নতুন পরিস্থিতিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্নে বিজেপি (Bharatiya Janata Party) কোনও আপস করবে না। তাঁর কথায়, ‘ধর্ম-সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে উঠে গুন্ডাদমন হবে। আইন ভাঙলে কাউকে রেয়াত করা হবে না।’ একই সঙ্গে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Mamata Banerjee)-কে রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি। শুভেন্দুর ভাষায়, ‘পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে উনি এখন অপ্রাসঙ্গিক। ওঁকে নিয়ে বেশি কথা বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।’
বুধবার সন্ধ্যায় কলকাতার স্ট্র্যান্ড রোডে অবস্থিত রাজ্য নির্বাচন কমিশনের দফতরে পৌঁছন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ এবং গণনার জন্য নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানাতেই এই সফর। দফতরে ঢোকার আগে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘যে ভাবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট এবং গণনা হয়েছে, তার জন্য কমিশন ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।’ সিইও মনোজকুমার অগ্রবাল (Manoj Kumar Agrawal), বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত (Subrata Gupta) এবং বিশেষ পুলিশ পর্যবেক্ষক এনকে মিশ্র (NK Mishra)-র সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন শুভেন্দু। বৈঠক শেষে সাংবাদিক বৈঠকে তিনি নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রশংসা করেন এবং দাবি করেন, ‘২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন কার্যত ইন্সিডেন্ট ফ্রি ছিল।’ নিজের জেতা ভবানীপুর (Bhabanipur) কেন্দ্রের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘আগে যাঁরা ভয় পেতেন, তাঁরাও এবার ভোট দিতে বেরিয়েছেন। বহু মানুষ জানিয়েছেন, জীবনে এই প্রথম তাঁরা নিজেদের ভোট নিজেরা দিতে পেরেছেন।’ শুভেন্দুর বক্তব্য অনুযায়ী, ভবানীপুরের একাধিক বড় হাউজ়িং কমপ্লেক্সে এবার প্রথমবার ইনসাইড পোলিং বুথ তৈরি করা হয়েছিল। এর ফলে ভোটারদের অংশগ্রহণ বেড়েছে বলেও তাঁর দাবি।
কিন্তু, নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হলেও ভোট-পরবর্তী হিংসার অভিযোগ পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি বিজেপি নেতা। তিনি বলেন, ‘কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু ২০২১ সালের তুলনায় তা অত্যন্ত কম।’ তাঁর বক্তব্য, ‘আমি কাউকে ডিফেন্ড করছি না। তবে ২০২১ সালের ভোটের পরে যে পরিস্থিতি হয়েছিল, তার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা হয় না।’ শুভেন্দুর দাবি, ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের পর প্রায় ১২ হাজার এফআইআর দায়ের হয়েছিল এবং ৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এ বার এখনও পর্যন্ত ৫০টি এফআইআরও হয়নি বলে তিনি জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘আজ দুপুরে রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধনাথ গুপ্তর (Siddhanath Gupta) সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’ একই সঙ্গে তিনি অতীতের ঘটনাগুলির তদন্ত ফের খতিয়ে দেখার ইঙ্গিত দিয়েছেন। শুভেন্দু বলেন, ‘ভবানী ভবনে ২০২১-পরবর্তী হিংসার ফাইল পড়ে রয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঞ্জুলা চেল্লুর (Manjula Chellur)-এর নেতৃত্বে যে কমিটি হয়েছিল, সেই ফাইল আবার খোলা হবে।’
এই মন্তব্যের মাধ্যমে বিজেপি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক হিংসার মামলাগুলিকে নতুন করে সামনে আনতে পারে বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা। শুভেন্দুর আরও দাবি, ‘কোন গ্রামে কী ঘটনা ঘটেছে, সব তথ্য পুলিশকে দিতে হবে।’ তিনি দলীয় কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘শান্ত থাকুন। চোর-ডাকাতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে। এখনও কিছু গুন্ডা বাইরে ঘুরছে। সরকার গঠনের পর তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ এই প্রসঙ্গে তিনি আবারও জোর দিয়ে বলেন, ‘ধর্ম, জাতি বা রাজনৈতিক পরিচয় নয়, আইনই শেষ কথা হবে।’ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বক্তব্যের মাধ্যমে শুভেন্দু নতুন সরকারের প্রশাসনিক অবস্থান সম্পর্কে বার্তা দিতে চেয়েছেন।
উল্লেখ্য যে, ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত ভোটের পর নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন শুভেন্দু। সেই সময় তিনি তৎকালীন সিইও রাজীব সিন্হা (Rajiva Sinha) -এর পদত্যাগ দাবি করেছিলেন এবং কমিশনের অফিস ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন। অথচ এবার একই কমিশনের ভূমিকার প্রশংসা করলেন তিনি। রাজনৈতিক মহলে এই পরিবর্তিত অবস্থান নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। এদিকে, বুধবারই বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) ভোট-পরবর্তী হিংসা নিয়ে কড়া অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর দাবি, ‘যাঁরা এখন হিংসা করছে, তারা বিজেপি সেজে রয়েছে।’ পাশাপাশি তিনি জানিয়েছেন, কোনও বিজেপি নেতা বা কর্মী হিংসায় জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শমীকের বক্তব্য, ‘বিজেপির যত বড় নেতাই হোন, কেউ যদি উস্কানি দেন বা হিংসায় যুক্ত থাকেন, তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে।’ তাঁর এই মন্তব্যের পর শুভেন্দুর বক্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তনের পরে বিজেপি নেতৃত্ব এখন আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্নে কঠোর অবস্থান তুলে ধরতে চাইছে। কারণ, অতীতে রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও হিংসা নিয়ে রাজ্যের ভাবমূর্তি নিয়ে একাধিকবার প্রশ্ন উঠেছে। ফলে নতুন সরকার গঠনের আগেই বিজেপি নেতৃত্ব প্রশাসনিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal CM Announcement 2026, BJP Bengal Swearing Ceremony | পশ্চিমবঙ্গে প্রথম বিজেপি সরকারের শপথে আসছেন মোদী-শাহ-যোগী? আর কে কে?



