সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর পরিচয় নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। বাঁহাতি চায়নাম্যান স্পিনার হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেছেন কুলদীপ যাদব (Kuldeep Yadav)। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় দলের দরজা তাঁর জন্য বার বার বন্ধ হয়েছে। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজের স্কোয়াডে থেকেও প্রথম একাদশে খেলার সুযোগ আসেনি। এক দিনের ক্রিকেটেও নিয়মিত জায়গা হচ্ছে না। এশিয়া কাপ কিংবা এশিয়ান গেমসের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতার দলেও দেখা যায়নি তাঁর নাম। আফগানিস্তান সিরিজ় থেকেও বাদ পড়েছেন। জাতীয় দলের বাইরে থাকার সেই সময়েই কাউন্টি ক্রিকেটে নেমে এবার বল হাতে বড়সড় জবাব দিলেন কুলদীপ। ইয়র্কশায়ারের হয়ে এসেক্সের বিরুদ্ধে প্রথম শ্রেণির ম্যাচে একাই ১০ উইকেট তুলে নিয়েছেন ভারতীয় স্পিনার। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এটাই কুলদীপের প্রথম ১০ উইকেট শিকার। ম্যাচে তাঁর বোলিং শুধু পরিসংখ্যানের দিক থেকেই উল্লেখযোগ্য নয়, জাতীয় দলের বাইরে থাকা একজন ক্রিকেটার কী ভাবে নিজেকে প্রস্তুত রাখছেন, তারও একটি ছবি সামনে এনেছে এই পারফরম্যান্স। ভারতীয় দলে সুযোগ না পাওয়ার হতাশাকে পাশে সরিয়ে রেখে ইংল্যান্ডের কঠিন পরিবেশে নিজের বোলিংকে আরও ধারাল করার পথেই তিনি হাঁটছেন।
কুলদীপকে নিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটে বরাবরই একটি আলাদা আলোচনা রয়েছে। চায়নাম্যান বোলার হিসেবে তাঁর বৈচিত্র্য ব্যাটারদের সমস্যায় ফেলতে পারে। কব্জির মোচড়ে বলের গতিপথ ও ঘূর্ণনের পরিবর্তন ঘটানোর ক্ষমতা তাঁকে অন্য ধরনের স্পিনার করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর সাফল্যের তালিকাও ছোট নয়। কিন্তু জাতীয় দলের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় তাঁর জায়গা সব সময় নিশ্চিত থাকেনি। কখনও দলের ভারসাম্য, কখনও উইকেটের চরিত্র, আবার কখনও একাধিক স্পিনারের মধ্যে সমন্বয়ের কারণে তাঁকে বাইরে থাকতে হয়েছে। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজ়ে স্কোয়াডে থাকার পরও দুই ম্যাচে প্রথম একাদশে সুযোগ না পাওয়াটা সেই ছবিই সামনে এনেছিল। দলের সঙ্গে থেকেও মাঠে নামতে না পারার অভিজ্ঞতা যে সহজ নয়, সেটি নিজেই জানিয়েছেন কুলদীপ। তবে সেই হতাশাকে প্রকাশ্যে ক্ষোভে তিনি পরিণত করেননি। কিন্তু, জাতীয় দলের বাইরে থাকার সময়টাকে নিজের খেলা আরও উন্নত করার কাজে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ইংল্যান্ডের প্রাক্তন পেসার স্টিভ হার্মিসনের (Steve Harmison) পডকাস্টে জাতীয় দলে সুযোগ না পাওয়া নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কুলদীপ জানিয়েছেন, প্রথম একাদশে জায়গা না পেলে তাঁরও খারাপ লাগে। তাঁর কথায়, দলের অংশ হয়ে মাঠে নামতে না পারাটা যে কোনও ক্রিকেটারের কাছেই কঠিন। তবে একই সঙ্গে তিনি মেনে নিয়েছেন, ক্রিকেটে সব সময় ব্যক্তিগত ইচ্ছা অনুযায়ী দল তৈরি হয় না। কিন্তু কুলদীপের বক্তব্যের মূল সুর ছিল দলের পরিকল্পনা ও ভারসাম্য। তিনি জানিয়েছেন, অনেক সময় একজন ক্রিকেটারকে বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত তাঁর ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নাও হতে পারে। দলের প্রয়োজন, পরিস্থিতি ও ম্যানেজমেন্টের পরিকল্পনাই তখন বড় হয়ে ওঠে। ফলে জাতীয় দলের বাইরে থাকার অভিজ্ঞতাকে তিনি এখন পেশাদার ক্রিকেটেরই অংশ হিসেবে দেখছেন।
গত বছরও একাধিক ম্যাচে খেলার আশা করেছিলেন বলে জানিয়েছেন কুলদীপ। কিন্তু সেই সুযোগ আসেনি। তাতে হতাশা তৈরি হলেও তিনি সেটিকে নিজের ক্রিকেটজীবনের শেষ কথা হিসেবে দেখছেন না। বরং তাঁর বিশ্বাস, সামনে আবার সুযোগ আসতে পারে। সেই সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুত থাকাই এখন তাঁর লক্ষ্য। কাউন্টিতে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পিছনেও তাই কোনও ব্যক্তিগত ক্ষোভ নেই বলে জানিয়েছেন কুলদীপ। জাতীয় দলের নির্বাচকদের উদ্দেশে জবাব দেওয়ার জন্য তিনি ইয়র্কশায়ারের হয়ে খেলতে নামেননি। তাঁর লক্ষ্য ছিল অন্য রকম, নিজের সীমাবদ্ধতা পরীক্ষা করা ও এমন পরিবেশে বোলিং করা, যেখানে একজন স্পিনারের জন্য কাজটা সহজ নয়। ইংল্যান্ডের পরিবেশে স্পিনারদের জন্য পরিস্থিতি সব সময় অনুকূল থাকে না। পিচ ও আবহাওয়ার চরিত্র অনেক সময় পেসারদের সুবিধা দেয়। সেই পরিস্থিতিতে স্পিনার হিসেবে নিজের কার্যকারিতা ধরে রাখা কুলদীপের কাছে বড় পরীক্ষা। তাঁর মতে, কঠিন পরিবেশে সফল হতে পারলে নিজের উপর বিশ্বাস আরও বাড়ে। সেই কারণেই কাউন্টি ক্রিকেটকে তিনি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন।
এসেক্সের বিরুদ্ধে সেই চ্যালেঞ্জের উত্তরও দিয়েছেন তিনি। ১০ উইকেটের পারফরম্যান্স কুলদীপের প্রথম শ্রেণির কেরিয়ারে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। একই সঙ্গে ইয়র্কশায়ারের হয়ে তাঁর কার্যকর ভূমিকা ভারতীয় ক্রিকেটের নির্বাচকদের নজরেও ফের আসতে পারে। তবে জাতীয় দলে প্রত্যাবর্তন নিয়ে কোনও দাবি না করে কুলদীপ নিজের কাজটুকুই করে যেতে চাইছেন। এই পারফরম্যান্সের আর একটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় দলের বাইরে থাকা অবস্থায় অনেক ক্রিকেটারই ম্যাচ অনুশীলনের ঘাটতিতে পড়েন। কুলদীপ সেই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটের মধ্যে থাকছেন। কাউন্টির দীর্ঘ ফরম্যাটের ক্রিকেট তাঁকে শুধু বোলিংয়ের অনুশীলনই দিচ্ছে না, ধৈর্য, নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘ সময় ধরে একই জায়গায় বল করার পরীক্ষার মধ্যেও ফেলছে। বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটে একজন স্পিনারের জন্য ধৈর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উইকেট পাওয়ার জন্য প্রতিটি বলেই আক্রমণ করার বদলে ব্যাটারের ভুলের অপেক্ষা করতে হয়। কাউন্টিতে সেই অভিজ্ঞতা কুলদীপের বোলিংয়ে আরও পরিণত ভাব আনতে পারে। এসেক্সের বিরুদ্ধে ১০ উইকেট সেই পরিশ্রমের ফল হিসেবেই সামনে এসেছে।
জাতীয় দলের বাইরে থাকার বিষয়ে কুলদীপের বক্তব্যে আরও একটি বিষয় লক্ষ করার মতো। তিনি কোনও নির্দিষ্ট ক্রিকেটার, নির্বাচক বা কোচকে দায়ী করেননি। বরং দলগত সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়ে নিজের প্রস্তুতির দিকে মন দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দলে থাকলে প্রত্যেক ক্রিকেটারই খেলতে চান, কিন্তু প্রত্যেক ম্যাচে প্রত্যেককে খেলানো সম্ভব নয়। তাই সুযোগ না পাওয়া অবস্থাতেও নিজের প্রস্তুতি থামিয়ে দিলে চলবে না। ভারতীয় ক্রিকেটে স্পিন বিভাগে প্রতিযোগিতা কম নয়। একাধিক ধরনের স্পিনার দলে জায়গা পাওয়ার লড়াইয়ে রয়েছেন। পরিস্থিতি অনুযায়ী কখনও আক্রমণাত্মক স্পিন, কখনও ব্যাটিং গভীরতা, কখনও আবার দলের ভারসাম্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে কুলদীপের মতো ক্রিকেটারের ক্ষেত্রেও জাতীয় দলে জায়গা নিশ্চিত করার বিষয়টি ম্যাচের পরিস্থিতি ও দলের পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত। তবে ইয়র্কশায়ারের হয়ে ১০ উইকেট তাঁর সামনে একটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। ভারতীয় দলের জার্সিতে আবার কবে দেখা যাবে কুলদীপকে, সেই উত্তর ভবিষ্যতের নির্বাচনেই মিলবে। আপাতত তাঁর হাতে রয়েছে পারফরম্যান্স। জাতীয় দলের বাইরে থেকেও বল হাতে নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়ার যে পথ তিনি বেছে নিয়েছেন, এসেক্সের বিরুদ্ধে সেই পথেই বড় সাফল্য পেলেন বাঁহাতি স্পিনার।
দলে সুযোগ না পাওয়ার হতাশা রয়েছে, সেটি কুলদীপ নিজেই স্বীকার করেছেন। কিন্তু সেই হতাশাকে কেন্দ্র করে থেমে থাকার বদলে তিনি বেছে নিয়েছেন কঠিন ক্রিকেট। ইংল্যান্ডের কাউন্টি, কঠিন পিচ ও দীর্ঘ ফরম্যাট, সবকিছুর মধ্যেই নিজের বোলিং পরীক্ষা করছেন। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রথম বার ১০ উইকেট তাঁর সেই পরীক্ষার ফলাফলকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। জাতীয় দলের দরজা কখন খুলবে, তা তাঁর হাতে নেই। কিন্তু দরজা খোলার সময় নিজেকে প্রস্তুত রাখার কাজটি তাঁর হাতেই। কুলদীপ যাদব আপাতত সেই কাজটাই করে চলেছেন। ভারতীয় দলে সুযোগ না পাওয়ার জবাব তিনি মুখে নয়, তুলে নিচ্ছেন উইকেট দিয়ে। আর এসেক্সের বিরুদ্ধে ১০ উইকেট সেই জবাবেরই সবচেয়ে বড় পরিসংখ্যান হয়ে রইল।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India Women Asia Cup Final | Shafali Verma fastest fifty, Smriti Mandhana 59 I শেফালি-স্মৃতির ব্যাটের ঝড়, স্পিনে শ্রীলঙ্কা ধ্বংস! অষ্টমবার এশিয়া কাপ চ্যাম্পিয়ন ভারত



