সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ রাচী, ঝাড়খণ্ড : আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছেন বহু দিন। ঘরোয়া ক্রিকেটেও আর নিয়মিত দেখা যায় না তাঁকে। মাঠে তাঁর ব্যাটিং, উইকেটকিপিং কিংবা নেতৃত্বের সেই পরিচিত দৃশ্য এখন অতীত। কিন্তু ক্রিকেট থেকে নিজেকে পুরোপুরি সরিয়ে নেননি মহেন্দ্র সিং ধোনি (Mahendra Singh Dhoni বা MS Dhoni)। সামনে না এসে ঝাড়খণ্ডের ক্রিকেটের পরবর্তী প্রজন্মকে তৈরি করার কাজে নেপথ্যে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক। সম্প্রতি দলীপ ট্রফিতে পূর্বাঞ্চলের সাফল্যের পর ধোনির সেই নীরব ভূমিকার কথাই নতুন করে সামনে এসেছে। পূর্বাঞ্চলের যে দলটি ট্রফি জিতেছে, সেখানে ঝাড়খণ্ডের পাঁচ ক্রিকেটারের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ঈশান কিশান (Ishan Kishan), শিখর মোহন (Shikhar Mohan), কুমার কুশাগ্র (Kumar Kushagra), কৌনাইন কুরেশি (Konaain Qureshi) ও অনুকূল রায় (Anukul Roy)। প্রত্যেকে নিজেদের জায়গায় পারফরম্যান্স করে নজর কেড়েছেন। আর তাঁদের ক্রিকেটজীবনের কোনও না কোনও পর্যায়ে ধোনির পরামর্শ পৌঁছেছে বলেই জানিয়েছেন ঝাড়খণ্ড ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত কর্তারা।
ধোনির (MS Dhoni) ক্রিকেটজীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর নেতৃত্ব। ম্যাচের পরিস্থিতি পড়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া, চাপের মধ্যে ঠাণ্ডা মাথায় থাকা এবং প্রতিপক্ষের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে ভাবার ক্ষমতার জন্য তিনি দীর্ঘ দিন ধরেই আলাদা জায়গা তৈরি করেছেন। অবসরের পরেও সেই অভিজ্ঞতাই তরুণ ক্রিকেটারদের কাজে লাগছে। সরাসরি কোনও কোচের ভূমিকায় না থেকেও তিনি তাঁদের সঙ্গে কথা বলছেন, খেলা নিয়ে আলোচনা করছেন এবং মাঠের পরিস্থিতি কী ভাবে বুঝতে হয়, সেই বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন। ঝাড়খণ্ড ক্রিকেট সংস্থার সচিব তথা প্রাক্তন ক্রিকেটার সৌরভ তিওয়ারি (Saurabh Tiwary) জানিয়েছেন, রাঁচীতে থাকলে ধোনি নিজেই স্টেডিয়ামে চলে আসেন। সেখানে জুনিয়র কিংবা সিনিয়র যে স্তরের শিবিরই চলুক না কেন, ক্রিকেটারদের সঙ্গে কথা বলতে তাঁর আগ্রহ থাকে। সৌরভের কথায়, ‘ধোনি ফাঁকা থাকলে বা রাঁচীতে থাকলে নিয়মিত স্টেডিয়ামে আসে। জুনিয়র থেকে সিনিয়র যে শিবিরই চলুক না কেন, ও নিজে থেকে এসে সকলের সঙ্গে কথা বলে।’
ধোনির এই যোগাযোগ শুধুমাত্র সৌজন্য সাক্ষাৎ পর্যন্ত কিন্তু সীমাবদ্ধ না। কোন তরুণ ক্রিকেটারের মধ্যে সম্ভাবনা রয়েছে, কার পারফরম্যান্সের দিকে নজর দেওয়া উচিত, সেই বিষয়েও তিনি ঝাড়খণ্ড ক্রিকেট সংস্থার কর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন বলে জানিয়েছেন সৌরভ। অর্থাৎ মাঠের বাইরে থেকেও ঝাড়খণ্ডের ক্রিকেটারদের গতিপথের দিকে লক্ষ্য রাখছেন ভারতের অন্যতম সফল অধিনায়ক। গত বছর সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফিতে ঝাড়খণ্ডের সাফল্যের সময়ও ধোনির প্রতিক্রিয়া পেয়েছিল রাজ্য ক্রিকেট সংস্থা। সৌরভ জানিয়েছেন, দল ট্রফি জেতার পর প্রথম দিকের শুভেচ্ছা এসেছিল ধোনির কাছ থেকেই। তাঁর কথায়, ‘গত বছর আমরা মুস্তাক আলি জেতার সময় ধোনিই প্রথম মানুষ যে আমাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছিল।’
তরুণ ক্রিকেটারদের সঙ্গে ধোনির আলোচনার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ম্যাচ পরিস্থিতি বোঝার শিক্ষা। শুধুমাত্র টেকনিক বা ব্যাটিং-বোলিংয়ের দক্ষতা বাড়ানোই যে যথেষ্ট নয়, ম্যাচের কোন মুহূর্তে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার, পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিকল্পনা কী ভাবে বদলাতে হয়, এসব বিষয়েও তিনি ক্রিকেটারদের সঙ্গে কথা বলেন। সৌরভের দাবি, ‘নিয়মিত ক্রিকেটারদের সঙ্গে কথা বলে, ওদের উদ্বুদ্ধ করে এবং কী ভাবে সাফল্য পেতে হবে সেই রাস্তা বাতলে দেয়।’ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সর্বোচ্চ পর্যায়ে দীর্ঘ সময় কাটানোর সুবাদে ধোনির কাছে ম্যাচ পরিস্থিতি পড়ার অভিজ্ঞতা বিপুল। টি-টোয়েন্টি থেকে এক দিনের ক্রিকেট, টেস্ট থেকে আইপিএল ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের ক্রিকেটে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। সেই অভিজ্ঞতার কিছুটা যদি তরুণ ক্রিকেটারদের মধ্যে পৌঁছে দেওয়া যায়, তা হলে তাঁদের মানসিক প্রস্তুতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে। ঝাড়খণ্ডের ক্রিকেট প্রশাসনের বক্তব্যেও সেই দিকটিই উঠে এসেছে।
সৌরভের মতে, শীর্ষ স্তরে ক্রিকেট খেলতে গেলে ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাঁর কথায়, ‘সবচেয়ে ভাল ভাবে যেটা বোঝায় তা হল, কী ভাবে ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝতে হবে। শীর্ষ স্তরে ভাল খেলতে গেলে এই ব্যাপারটা বোঝা খুবই দরকার।’ দলীপ ট্রফিতে পূর্বাঞ্চলের হয়ে ঝাড়খণ্ডের পাঁচ ক্রিকেটারের উপস্থিতি তাই শুধুমাত্র একটি পরিসংখ্যান নয়। রাজ্য থেকে একের পর এক ক্রিকেটার উঠে আসার পিছনে যে পরিকাঠামো, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের পরামর্শ কাজ করে, সেই ছবিটিও এর মধ্যে রয়েছে। আর সেই প্রক্রিয়ায় ধোনি কতটা সক্রিয়, তা তাঁর স্টেডিয়ামে নিয়মিত যাতায়াত এবং ক্রিকেটারদের সঙ্গে যোগাযোগ থেকেই বোঝা যাচ্ছে।
ঝাড়খণ্ড ক্রিকেটের সঙ্গে ধোনির সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। রাঁচীর ছেলে হিসেবে রাজ্যের ক্রিকেটের সঙ্গে তাঁর আবেগের সম্পর্ক বহু দিনের। নিজের আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের শীর্ষ সময়েও তিনি ঝাড়খণ্ডের ক্রিকেটারদের পাশে থেকেছেন। এখন খেলা থেকে দূরে থেকেও সেই সম্পর্ক ধরে রেখেছেন। বরং সময়ের সঙ্গে রাজ্যের ক্রিকেট নিয়ে তাঁর আগ্রহ আরও বাড়ছে বলেই জানিয়েছেন সৌরভ। ধোনির ভূমিকার সবচেয়ে বড় দিক সম্ভবত এখানেই, তিনি কোনও প্রচারের আলোয় এসে নিজের অবদানের কথা তুলে ধরছেন না। মাঠে নেই, নিয়মিত ঘরোয়া ক্রিকেটও খেলছেন না, কিন্তু রাঁচীর স্টেডিয়ামে তরুণদের সঙ্গে কথা বলছেন, সম্ভাবনাময় ক্রিকেটারদের নিয়ে আলোচনা করছেন ও ম্যাচের মানসিকতা নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছেন। ফলে ঝাড়খণ্ডের আগামী দিনের ক্রিকেটারদের বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় ধোনির প্রভাব হয়তো সব সময় চোখে পড়বে না, কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতার ছাপ ধীরে ধীরে মাঠের পারফরম্যান্সে দেখা যেতে পারে। উল্লেখ্য, দলীপ ট্রফিতে পূর্বাঞ্চরের সাফল্যে ঝাড়খণ্ডের পাঁচ ক্রিকেটারের উপস্থিতি সেই ছবিটাই আরও সামনে এনেছে। ক্রিকেটার হিসেবে ধোনির অধ্যায় শেষ হলেও ঝাড়খণ্ড ক্রিকেটের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ শেষ হয়নি। নতুন প্রজন্মকে তৈরি করার ক্ষেত্রে নেপথ্যে থেকে তাঁর অভিজ্ঞতা এখন রাজ্যের ক্রিকেটের অন্যতম বড় সম্পদ হয়ে উঠছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India vs Brazil football, Sourav Ganguly on Indian football | ব্রাজিল-উরুগুয়ের বিরুদ্ধে খেলেই বদলাবে ভারতীয় ফুটবল? ক্রিকেটের ফর্মুলা নিয়ে সৌরভের বড় পরামর্শ




