সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বেঙ্গালুরু: অধিনায়কের হাতে থাকে দলের সরকারি নেতৃত্বের দায়িত্ব। কিন্তু ক্রিকেটে সব সময় পদমর্যাদাই যে নেতৃত্বের একমাত্র মাপকাঠি নয়, তার বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছেন বিরাট কোহলি (Virat Kohli)। রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু (Royal Challengers Bengaluru) বা আরসিবি (RCB) -এর হয়ে দীর্ঘদিন অধিনায়কত্ব করার পরে এখন সেই দায়িত্ব তাঁর হাতে নেই। কিন্তু দলের অন্দরমহলে তাঁর প্রভাব যে এখনও যথেষ্ট, তা জানালেন বর্তমান অধিনায়ক রজত পাটীদার (Rajat Patidar)। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মাঠে নেতৃত্ব না দিলেও কোহলিই দলের অন্যতম প্রধান পথপ্রদর্শক। তাঁর কাছ থেকেই নেতৃত্বের অনেক কিছু শিখেছেন পাটীদার।
আইপিএলের ইতিহাসে আরসিবির পথচলা বরাবরই আলোচনার কেন্দ্রে থেকেছে। তারকা ক্রিকেটারে ভরা দল হয়েও দীর্ঘ সময় ধরে ট্রফি অধরা ছিল বেঙ্গালুরুর ফ্র্যাঞ্চাইজিটির কাছে। বার বার প্লে-অফ কিংবা ফাইনালের কাছাকাছি পৌঁছেও শেষ ধাপ পেরোতে পারেনি দল। সেই দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে আরসিবির সঙ্গে ‘ট্রফি নেই’ তকমাটিও জুড়ে গিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সাফল্যের পরে ছবিটা বদলেছে। পর পর দু’বার আইপিএল জয়ের ফলে শুধু দলের ইতিহাসেই নতুন অধ্যায় তৈরি হয়নি, নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও নতুন নাম উঠে এসেছে, রজত পাটীদার। পাটীদারের মতে, এই সাফল্যের পিছনে তাঁর নিজের নেতৃত্বের পাশাপাশি কোহলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দলের অধিনায়ক না হয়েও কোহলি যেভাবে সতীর্থদের পাশে থেকেছেন, সিদ্ধান্তের সময় পরামর্শ দিয়েছেন এবং দলের পরিবেশে নিজের প্রভাব বজায় রেখেছেন, তা নতুন অধিনায়ককে অনেক কিছু শিখিয়েছে।
ফাফ ডুপ্লেসি (Faf du Plessis) -এর পর আরসিবির নেতৃত্ব নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই প্রশ্ন ছিল। বিরাট কোহলি দীর্ঘ সময় দলটির অধিনায়ক ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই আরসিবি একাধিক বার সাফল্যের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কোহলি নিজে নেতৃত্বের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালে নতুন অধিনায়ক বেছে নেওয়া নিয়ে দলের সামনে বড় সিদ্ধান্ত আসে। সেই সময় কোহলিকে আবার নেতৃত্বে ফেরানোর সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছিল বলে সূত্রের খবর ছিল। শেষ পর্যন্ত কোহলির নাম নয়, সামনে আসে পাটীদারের নাম। আর সেই সিদ্ধান্তের পিছনে কোহলির মতামত গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলেই জানিয়েছেন পাটীদার। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোহলি নিজেই নেতৃত্বের জন্য তাঁর নাম প্রস্তাব করেছিলেন। অর্থাৎ দীর্ঘদিন দলের নেতৃত্ব দেওয়া ক্রিকেটারটি নিজের জায়গায় কাকে দেখতে চান, সেই প্রশ্নে তাঁর পছন্দ ছিল পাটীদার।
পাটীদারের কাছে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে কারণ কোহলি তাঁর কাছে শুধু দলের সতীর্থ নন, আদর্শও। সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, নিজের আদর্শ খেলোয়াড়ের কাছ থেকে নিয়মিত শেখার চেষ্টা করতেন। কোহলি ব্যাট করার সময় তাঁর খেলার প্রতিটি দিক খেয়াল করতেন। মাঠের আচরণ থেকে শুরু করে মাঠের বাইরের ব্যবহার, এসবকিছুই পর্যবেক্ষণ করে নিজের ক্রিকেটজীবনে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন। পাটীদারের কথায়, তাঁর সবচেয়ে বড় পাওয়া ছিল কোহলির সমর্থন। তিনি বলেছেন, কোনও আদর্শ খেলোয়াড় যদি আপনার পাশে দাঁড়ান ও আপনার উপর আস্থা রাখেন, তা হলে আত্মবিশ্বাসের জন্য আর বেশি কিছু প্রয়োজন হয় না। কোহলির কাছ থেকে পাওয়া সেই সমর্থনই নেতৃত্বের কঠিন দায়িত্ব সামলানোর সময়ে তাঁকে মানসিক ভাবে শক্তি দিয়েছে বলে মনে করছেন আরসিবির অধিনায়ক।
আরও পড়ুন : Rohit Sharma | নতুন রূপে রোহিত শর্মা : ফিটনেসে বদলে গেল হিটম্যান, ক্রিকেট দুনিয়া মুগ্ধ
আইপিএলে আরসিবির নেতৃত্ব নেওয়া যে সহজ দায়িত্ব নয়, সেটিও জানিয়েছেন পাটীদার। কারণ এই দলের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিপুল সংখ্যক সমর্থকের আবেগ। প্রত্যেক ম্যাচে দলের উপর প্রত্যাশার চাপ থাকে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ট্রফি না পাওয়ার পরে অধিনায়ক হিসেবে নতুন কাউকে সামনে আসতে হলে চাপ আরও বাড়ে। এমন পরিস্থিতিতে কোহলির মতো দলের সবচেয়ে পরিচিত মুখের সমর্থন পাওয়া পাটীদারের জন্য বড় সুবিধা হয়ে উঠেছিল। আরসিবির হয়ে কোহলির প্রভাব অবশ্য শুধু নেতৃত্বের সময়েই সীমাবদ্ধ ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে দলের সঙ্গে থাকার ফলে তিনি ফ্র্যাঞ্চাইজিটির সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গিয়েছেন। সতীর্থদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, ম্যাচের পরিস্থিতিতে আবেগ নিয়ন্ত্রণ, কঠিন সময়ে দলকে উজ্জীবিত করার ক্ষমতা এবং নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে উদাহরণ তৈরি করা ইত্যাদি সমস্ত কিছু মিলিয়ে তাঁর প্রভাব এখনও দলের মধ্যে রয়েছে। পাটীদারের বক্তব্যে সেই বিষয়টিই উঠে এসেছে। তিনি কোহলিকে অনুসরণ করার কথা বলতে গিয়ে শুধু তাঁর ব্যাটিংয়ের কথা বলেননি। মাঠের ভিতরে ও বাইরে তিনি কী ভাবে আচরণ করেন, কী ভাবে পরিস্থিতি সামলান, সতীর্থদের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ রাখেন, সেই দিকগুলিও তাঁর শেখার জায়গা ছিল। অর্থাৎ পাটীদারের নেতৃত্বের দর্শন তৈরির পিছনে কোহলির ভূমিকা রয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, অধিনায়কত্বের দায়িত্ব কাউকে দিয়ে দেওয়ার পরেও একজন সিনিয়র ক্রিকেটারের প্রভাব কীভাবে বজায় থাকতে পারে। কোহলির ক্ষেত্রে সেটিই ঘটেছে বলে মনে করছেন পাটীদার। সরকারীভাবে নেতৃত্ব তাঁর হাতে না থাকলেও দলের মধ্যে তাঁর অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা তাঁকে স্বাভাবিক ভাবেই পরামর্শদাতার ভূমিকায় নিয়ে এসেছে। আরসিবির সাম্প্রতিক সাফল্য সেই সিদ্ধান্তের মূল্যও বাড়িয়েছে। পাটীদারকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার সময় তাঁর কাঁধে ছিল বিরাট প্রত্যাশা। কিন্তু পর পর দু’বার আইপিএল জয়ের পরে তাঁর অধিনায়ক হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আর আগের মতো প্রশ্ন নেই। বরং আরসিবির নেতৃত্বের নতুন পর্যায়ে তিনি নিজের জায়গা তৈরি করে নিয়েছেন। কোহলির নেতৃত্ব ছাড়ার পরে তাঁর উত্তরসূরি হিসাবে পাটীদারকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত তাই এখন পিছন ফিরে দেখলে আরও গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে। দলের নেতৃত্বের জন্য কোহলির পছন্দ এবং দল পরিচালন সমিতির সেই পছন্দে সম্মতি, দু’টিই শেষ পর্যন্ত ফল দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। যদিও ক্রিকেটে কোনও সাফল্য একজন ব্যক্তির কৃতিত্বে সীমাবদ্ধ থাকে না। ব্যাটার, বোলার, কোচ, সাপোর্ট স্টাফ ও নেতৃত্ব প্রত্যেকের সম্মিলিত কাজেই একটি দল চ্যাম্পিয়ন হয়।
আরসিবির ক্ষেত্রে কোহলির ভূমিকা আলাদা। দীর্ঘদিন ধরে দলটির মুখ তিনি। সমর্থকদের সঙ্গে ফ্র্যাঞ্চাইজিটির সম্পর্ক তৈরিতেও তাঁর অবদান বড়। অধিনায়ক থাকাকালীন ট্রফি জিততে না পারলেও দলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনও ভেঙে যায়নি। বরং নেতৃত্ব ছাড়ার পরেও তিনি দলটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসাবেই থেকে গিয়েছেন। পাটীদারের কথায় আরও একটি দিক উঠে এসেছে। ক্রিকেটে আদর্শের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা তাঁর অভিজ্ঞতা থেকেই বোঝা যায়। একজন তরুণ ক্রিকেটার যখন দীর্ঘ সময় ধরে কোনও বড় তারকার সঙ্গে খেলেন, তখন শুধু টেকনিক নয়, ম্যাচের মানসিক প্রস্তুতি, চাপ সামলানো এবং দলের প্রতি দায়বদ্ধতার মতো বিষয়ও শেখার সুযোগ পান। কোহলির সঙ্গে খেলতে গিয়ে পাটীদার সেই অভিজ্ঞতাই পেয়েছেন। কোহলির নিজের সিদ্ধান্তও এখানে তাৎপর্যপূর্ণ। নেতৃত্ব নিজের হাতে রাখার পরিবর্তে নতুন একজনকে সামনে নিয়ে আসার অর্থ হল, তিনি দলের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবছিলেন। পাটীদারকে দায়িত্ব দেওয়ার পর তাঁর পাশে দাঁড়ানো সেই আস্থাকেই আরও শক্তিশালী করেছে।
পর পর দু’বার আইপিএল জয় আরসিবির ইতিহাসে নতুন অধ্যায় খুলেছে। সেই সাফল্যের সঙ্গে রজত পাটীদারের নাম এখন স্থায়ী ভাবে জড়িয়ে গেলেও তিনি নিজে জানেন, তাঁর নেতৃত্বের শিক্ষার একটা বড় অংশ এসেছে কোহলির কাছ থেকে। আর সেই কারণেই অধিনায়ক না হয়েও কোহলিকে তিনি দলের ‘আসল নেতা’ হিসেবে দেখছেন। ক্রিকেটের মাঠে নেতৃত্বের পরিচয় সাধারণত অধিনায়কের পদ দিয়েই হয়। কিন্তু দলের ভিতরে যে নেতৃত্ব আরও অনেক ভাবে কাজ করতে পারে, আরসিবির সাম্প্রতিক যাত্রা তার একটি দৃষ্টান্ত। পাটীদারের হাতে অধিনায়কত্ব থাকলেও কোহলির অভিজ্ঞতা, উপস্থিতি এবং সমর্থন দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে রয়েছে। আর কোহলির পছন্দের সেই উত্তরসূরি এখন পর পর দু’বার আইপিএল জিতিয়ে নিজের নেতৃত্বের জায়গাটিও আরও শক্ত করেছেন।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Virat Kohli Test Comeback, Kohli Retirement News | ‘ফিরব না’ : টেস্টে প্রত্যাবর্তন নিয়ে জল্পনায় ইতি টানলেন বিরাট কোহলি, সাদা জার্সি নিয়ে পরিষ্কার অবস্থান



