মেধা পাল ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা: শরীর অনেক সময় বড় কোনও সমস্যার কথা জানানোর আগে ছোট ছোট পরিবর্তনের মাধ্যমে সতর্ক করে। কিন্তু দৈনন্দিন ব্যস্ততা, কাজের চাপ কিংবা ‘এটা তো মেয়েদের স্বাভাবিক সমস্যা’ এই ধারণার কারণে অনেক মহিলা ঋতুস্রাব, তলপেটের ব্যথা, প্রস্রাবের সমস্যা কিংবা যোনিপথের অস্বস্তির মতো উপসর্গ দীর্ঘদিন এড়িয়ে যান। অথচ সব ধরনের ঋতুস্রাবজনিত অস্বস্তি বা তলপেটের সমস্যা স্বাভাবিক ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কিছু উপসর্গের পিছনে থাকতে পারে হরমোনজনিত সমস্যা, এন্ডোমেট্রিয়োসিস (Endometriosis), জরায়ুর ফাইব্রয়েড (Fibroid), সংক্রমণ কিংবা অন্য কোনও স্ত্রীরোগ। প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতার ক্ষেত্রে তাই শরীরে নিয়মিত দেখা দেওয়া পরিবর্তনগুলির দিকে নজর রাখা জরুরি। তবে কোনও একটি উপসর্গ দেখেই নির্দিষ্ট রোগের সিদ্ধান্তে পৌঁছনো উচিত নয়। একই লক্ষণ একাধিক সমস্যার কারণে দেখা দিতে পারে। চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে শারীরিক পরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষা, প্রস্রাব পরীক্ষা, আলট্রাসোনোগ্রাফি বা অন্যান্য পরীক্ষার মাধ্যমে কারণ নির্ণয় করতে পারেন।

প্রথমেই নজরে রাখা দরকার ঋতুস্রাবের ধরন বদলে যাচ্ছে কি না। সাধারণত মাসিক চক্র ২১ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে হতে পারে ও ঋতুস্রাব সাধারণত সাত দিনের মধ্যে শেষ হয়। এর থেকে উল্লেখযোগ্য বিচ্যুতি, বারবার অস্বাভাবিক রক্তপাত, মাঝের সময়ে রক্তপাত বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে তা অবহেলা করা ঠিক নয়। আমেরিকান কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস (American College of Obstetricians and Gynecologists) জানিয়েছে, সাত দিনের বেশি রক্তপাত, খুব ঘন ঘন প্যাড ভিজে যাওয়া, স্বাভাবিক সময়ের বাইরে রক্তপাত কিংবা চক্রের ব্যবধান অস্বাভাবিক ভাবে বদলে যাওয়া অস্বাভাবিক জরায়ুর রক্তপাতের লক্ষণ হতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের আগে নিয়মিত ঋতুস্রাব হত, তাঁদের ক্ষেত্রে হঠাৎ চক্রের ধরন বদলে গেলে কারণ খতিয়ে দেখা দরকার। পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS), হরমোনের ভারসাম্যের সমস্যা, থাইরয়েডের সমস্যা, জরায়ুর পলিপ বা অন্য নানা কারণে ঋতুস্রাবের ছন্দ বদলাতে পারে। তাই মাসিকের তারিখ, রক্তপাতের পরিমাণ এবং কত দিন স্থায়ী হচ্ছে, এসব তথ্য লিখে রাখলে চিকিৎসকের কাছে সমস্যাটি বোঝানোও সহজ হয়।
দ্বিতীয় যে লক্ষণটি কোনও ভাবেই হেলাফেলা করা উচিত নয়, তা হল অসহ্য ঋতুস্রাবের ব্যথা। ঋতুস্রাবের সময়ে সামান্য পেটব্যথা বা কোমরের অস্বস্তি অনেকেরই হতে পারে। কিন্তু ব্যথা এতটাই বেড়ে গেলে যে স্বাভাবিক কাজ, পড়াশোনা বা অফিসের কাজ বন্ধ রাখতে হয়, প্রতি মাসে একই ভাবে তীব্র ব্যথা হয়, কিংবা সময়ের সঙ্গে ব্যথা বাড়তে থাকে, তখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। এ ধরনের তীব্র ব্যথার পিছনে এন্ডোমেট্রিয়োসিস, জরায়ুর ফাইব্রয়েড বা অ্যাডেনোমায়োসিসের মতো কারণ থাকতে পারে। এন্ডোমেট্রিয়োসিসে জরায়ুর অভ্যন্তরের আস্তরণের মতো টিস্যু জরায়ুর বাইরে বৃদ্ধি পায়। এর ফলে ঋতুস্রাবের আগে ও সময়ে তীব্র পেলভিক ব্যথা হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে যৌন সম্পর্কের সময় ব্যথা, মলত্যাগ বা প্রস্রাবের সময় ব্যথা কিংবা অতিরিক্ত ঋতুস্রাবও দেখা যেতে পারে।
তৃতীয় সতর্কসংকেত হতে পারে প্রস্রাবের ধরনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন। বারবার প্রস্রাবের বেগ পাওয়া, হঠাৎ তীব্র বেগ আসা, প্রস্রাবের সময় জ্বালা বা প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারার মতো সমস্যা হলে অনেকেই সেটিকে শুধুমাত্র ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা ইউটিআই (UTI) বলে ধরে নেন। প্রস্রাবে জ্বালা এবং ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ সত্যিই ইউটিআইয়ের সাধারণ উপসর্গ। কিন্তু সব ক্ষেত্রে কারণ এক নয়। কখনও পেলভিক অর্গান প্রোল্যাপ্স (Pelvic Organ Prolapse) -এর সঙ্গেও প্রস্রাবের সমস্যা যুক্ত থাকতে পারে। জরায়ু, মূত্রথলি বা অন্ত্রের কোনও অংশ যোনিপথের দিকে নেমে এলে তলপেটে ভারী লাগা, যোনিপথে কিছু নেমে আসার অনুভূতি, বারবার প্রস্রাবের প্রয়োজন কিংবা মূত্রথলি পুরোপুরি খালি না হওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে। যোনিপথে কোনও অস্বাভাবিক মাংসপিণ্ড বা ফোলা অংশ অনুভূত হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া দরকার।
চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হল যোনিপথ বা তার আশপাশে দীর্ঘস্থায়ী চুলকানি, জ্বালা, লালচে ভাব, ফোলা, অস্বাভাবিক শুষ্কতা কিংবা ত্বকে পরিবর্তন। এ ধরনের উপসর্গকে সবসময় একই রোগের লক্ষণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। ক্যানডিডিয়াসিস বা ইস্ট ইনফেকশনে যোনিপথে চুলকানি, ব্যথা বা অস্বস্তি, প্রস্রাবের সময় অস্বস্তি ও অস্বাভাবিক স্রাব হতে পারে। আবার অন্য ধরনের সংক্রমণ বা ত্বকের সমস্যাতেও কাছাকাছি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই নিজের মতো করে বারবার ওষুধ বা অ্যান্টিফাঙ্গাল ব্যবহার না করে সমস্যাটি দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ একই ধরনের উপসর্গের পিছনে ভিন্ন কারণ থাকতে পারে ও সঠিক চিকিৎসার জন্য কারণটি চিহ্নিত করা দরকার। সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (Centers for Disease Control and Prevention) জানিয়েছে, শুধু উপসর্গের ভিত্তিতে যোনিপথের সংক্রমণের সঠিক কারণ নির্ধারণ সবসময় সম্ভব নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করা হতে পারে।
পঞ্চম লক্ষণটি হয়ত সবচেয়ে বেশি অবহেলিত, দীর্ঘদিন ধরে পেট ফাঁপা বা তলপেটে ভারী লাগা। খাওয়ার পর সামান্য পেট ফাঁপা সাধারণ ঘটনা হতে পারে। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ ধরে বারবার পেট ফুলে থাকা, অল্প খাবারেই পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি, তলপেটে চাপ বা ব্যথা, বারবার প্রস্রাবের বেগ কিংবা পেলভিক এলাকায় অস্বস্তি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার। কারণ এই ধরনের উপসর্গ ডিম্বাশয়ের ক্যানসার-সহ বিভিন্ন রোগে দেখা যেতে পারে, যদিও এগুলি ক্যানসারের নির্দিষ্ট লক্ষণ নয়। ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় উপসর্গ খুবই সাধারণ ধরনের হতে পারে। পেট ফাঁপা, পেট বা পেলভিকে চাপ কিংবা ব্যথা, অল্প খেলেই পেট ভরে যাওয়া এবং ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ, এসব লক্ষণ দেখা যেতে পারে। কিন্তু একই উপসর্গ বহু সাধারণ সমস্যাতেও হয়। তাই শুধু কোনও একটি লক্ষণ দেখে ক্যানসারের আশঙ্কা করা যেমন ঠিক নয়, তেমনই দীর্ঘদিন ধরে একই সমস্যা চলতে থাকলে তা উপেক্ষা করাও উচিত নয়।
প্রজনন স্বাস্থ্য ভাল রাখতে নিজের ঋতুচক্রের ধরন সম্পর্কে ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি। শেষ মাসিকের তারিখ, কত দিন রক্তপাত হয়েছে, রক্তপাতের মাত্রা, ব্যথার তীব্রতা, অস্বাভাবিক স্রাব, প্রস্রাবের সমস্যা বা তলপেটের পরিবর্তন, এসব তথ্য নোট করে রাখলে চিকিৎসকের কাছে রোগের ইতিহাস জানানো সহজ হয়। বিশেষ করে কোনও সমস্যা বারবার হলে বা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকলে সেটিকে ‘স্বাভাবিক মেয়েলি সমস্যা’ বলে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে যদি অতিরিক্ত রক্তপাতের সঙ্গে মাথা ঘোরা বা দুর্বল লাগা শুরু হয়, তীব্র ও অস্বাভাবিক পেলভিক ব্যথা দেখা দেয়, জ্বরের সঙ্গে প্রস্রাবের সমস্যা হয়, প্রস্রাবে রক্ত দেখা যায় কিংবা পেটের ফোলা ও ব্যথা দ্রুত বাড়তে থাকে। ইউটিআইয়ের ক্ষেত্রে জ্বর, কাঁপুনি, কোমর বা পিঠের উপরের অংশে ব্যথা এবং প্রস্রাবে রক্তের মতো লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
মহিলাদের প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা মানে শুধু ঋতুস্রাবের দিন গুনে রাখা নয়। শরীরের স্বাভাবিক ছন্দে কোনও পরিবর্তন হচ্ছে কি না, সেটিও খেয়াল রাখা দরকার। অনিয়মিত বা অতিরিক্ত ঋতুস্রাব, অসহ্য মাসিকের ব্যথা, প্রস্রাবের পরিবর্তন, যোনিপথে দীর্ঘস্থায়ী চুলকানি বা অস্বস্তি এবং দীর্ঘদিনের পেট ফাঁপা, এই পাঁচ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে নিজের মতো করে রোগ নির্ণয় না করে স্ত্রীরোগ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ পথ। সময়মতো কারণ জানা গেলে অনেক সমস্যার চিকিৎসাও তুলনামূলক ভাবে সহজে করা যায়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : period pain relief exercises, period time gym workout | ঋতুস্রাব চলাকালীন ভুল শরীরচর্চায় বেড়ে যেতে পারে যন্ত্রণা, কী করলে মিলবে আরাম? বিশেষজ্ঞের পরামর্শে জেনে নিন সঠিক পথ
বি: দ্র: স্বাস্থ্যসংক্রান্ত এই প্রতিবেদনটি সাধারণ তথ্যের জন্য। উপসর্গ থাকলে নিজে রোগ নির্ণয় বা ওষুধ শুরু না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Sreeleela menstruation controversy | ঋতুস্রাব নিয়ে মন্তব্যে বিতর্কের ঝড়: ‘অজুহাত নয়’ বলায় কটাক্ষে বিদ্ধ শ্রীলীলা



