সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : মাসের নির্দিষ্ট কয়েকটি দিন বহু মহিলার কাছেই কঠিন সময় হয়ে ওঠে। ঋতুস্রাবের সময় শারীরিক অস্বস্তি, পেট ও কোমরের ব্যথা, বমিভাব, ক্লান্তি দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব পড়ে। এর পাশাপাশি আচমকাই বদলে যায় খাওয়ার অভ্যাস। অনেকেরই তখন খাবারের প্রতি অনীহা তৈরি হয়, কিন্তু এক অদ্ভুত আকর্ষণ তৈরি হয় বিশেষ কিছু খাবারের প্রতি, বিশেষ করে ডার্ক চকোলেট। প্রশ্ন উঠছে, কেন এই সময়েই চকোলেট খাওয়ার ইচ্ছে এত বেশি হয় (Period Chocolate Craving Reason) এর পিছনে কি শুধুই স্বাদের টান, না কি শরীরের কোনও গভীর কারণ লুকিয়ে রয়েছে?
ঋতুস্রাবের আগে থেকেই শরীরে নানা পরিবর্তন শুরু হয়। অনেকেই লক্ষ্য করেন, মাসিক শুরুর প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকেই মেজাজে ওঠানামা শুরু হয়। অল্পতেই রাগ, অকারণে মন খারাপ, উদ্বেগ এসবই সাধারণ অভিজ্ঞতা। শারীরিক দিকেও বদল দেখা যায়। খিদে কমে যায়, খাবার দেখলেই বমি বমি ভাব তৈরি হয়, আবার কখনও অদ্ভুত খাবারের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শরীরের হরমোনের ওঠানামা। ঋতুস্রাবের আগে শরীরে প্রোজেস্টেরন (Progesterone) এবং ইস্ট্রোজেন (Estrogen) -এর মাত্রা পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তনের ফলে শরীরের স্বাভাবিক ছন্দে কিছুটা প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে কমে যায় সেরোটোনিন (Serotonin) নামক হরমোনের নিঃসরণ, যা মানুষের মেজাজ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। আবার কর্টিসল (Cortisol)-এর মাত্রা বেড়ে গেলে মানসিক চাপও বাড়ে। এই পরিস্থিতিতে শরীর এমন কিছু খুঁজতে থাকে, যা দ্রুত আরাম দিতে পারে।
এই জায়গাতেই আসে ডার্ক চকোলেট। অনেকেই বলেন, ‘চকোলেট খেলেই যেন একটু ভাল লাগে।’ এর পিছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। চকোলেট খেলে সেরোটোনিন ও ডোপামিন (Dopamine)-এর মাত্রা বাড়ে, যা মস্তিষ্কে আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে। ফলে মন কিছুটা হালকা হয়, উদ্বেগ কমে আসে। তাই এই সময়ে চকোলেটের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। শুধু মানসিক দিক নয়, শারীরিক কারণও রয়েছে। ঋতুস্রাবের সময় অনেক মহিলার শরীরে ম্যাগনেশিয়াম (Magnesium)-এর ঘাটতি দেখা দেয়। এই খনিজ পেশিকে শিথিল করতে সাহায্য করে এবং ব্যথা কমাতে ভূমিকা রাখে। ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি হলে পেট, কোমর বা পায়ে খিঁচুনি বাড়তে পারে। ডার্ক চকোলেটে তুলনামূলক ভাবে ম্যাগনেশিয়ামের পরিমাণ বেশি থাকায় এটি শরীরের এই ঘাটতি কিছুটা পূরণ করতে পারে। ফলে অনেকেই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এই খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
ঋতুস্রাবের সময় যে ‘ক্রেভিং’ তৈরি হয়, তা অনেক সময় শরীরের প্রয়োজনেরই ইঙ্গিত দেয়। যেমন, কেউ মিষ্টি খেতে চান, কেউ আবার নোনতা বা ঝাল খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হন। ডার্ক চকোলেটের ক্ষেত্রে বিষয়টি একটু আলাদা, কারণ এতে একসঙ্গে স্বাদ, পুষ্টি এবং মানসিক স্বস্তি—সবই কিছুটা পাওয়া যায়। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, অতিরিক্ত চকোলেট খাওয়া উচিত। পরিমিত পরিমাণে ডার্ক চকোলেট খেলে তা উপকারী হতে পারে, কিন্তু বেশি খেলে উল্টো প্রভাবও পড়তে পারে। বিশেষ করে যাঁদের সুগার বা ওজন নিয়ন্ত্রণে সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এছাড়া চকোলেটের মধ্যে থাকা ক্যাফেইন কিছু ক্ষেত্রে অস্বস্তি বাড়াতেও পারে।
তাই এই সময় শরীরের কথা শোনা জরুরি। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, জল পান, হালকা খাবার এবং প্রয়োজনমতো পুষ্টিকর খাদ্য, এসবই গুরুত্বপূর্ণ। ডার্ক চকোলেট একটি সহায়ক খাবার হিসেবে কাজ করতে পারে, তবে সেটাই একমাত্র সমাধান নয়। অনেকেই এই সময় নিজেকে একা অনুভব করেন বা মানসিক চাপ বাড়ে। সেই অবস্থায় ছোট ছোট আনন্দের মুহূর্ত তৈরি করাও প্রয়োজন। প্রিয় খাবার খাওয়া, নিজের মতো সময় কাটানো, এসবই মন ভাল রাখতে সাহায্য করে। ডার্ক চকোলেট সেই ছোট্ট আনন্দেরই একটি অংশ হয়ে উঠতে পারে।
উল্লেখ্য, ঋতুস্রাবের সময়ে ডার্ক চকোলেটের প্রতি আকর্ষণ কোনও কাকতালীয় বিষয় নয়। শরীরের হরমোনের পরিবর্তন, মানসিক ওঠানামা এবং পুষ্টির চাহিদা, সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয় এই চাহিদা। তাই এই সময় নিজের শরীরের সংকেত বোঝা এবং সেই অনুযায়ী যত্ন নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Sreeleela menstruation controversy | ঋতুস্রাব নিয়ে মন্তব্যে বিতর্কের ঝড়: ‘অজুহাত নয়’ বলায় কটাক্ষে বিদ্ধ শ্রীলীলা



