প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, মুম্বাই : বলিউডের ঝলমলে আলোর আড়ালে যে ব্যক্তিগত লড়াই লুকিয়ে থাকে, তারই এক গভীর ও মানবিক ছবি তুলে ধরলেন ইরা খান (Ira Khan)। বাবা আমির খান (Aamir Khan) ও মা রিনা দত্তের (Reena Dutta) বিচ্ছেদের প্রভাব, শৈশব থেকেই ওজন নিয়ে কটাক্ষ, দীর্ঘদিনের অবসাদ, সব মিলিয়ে তাঁর জীবনের কঠিন অধ্যায়গুলি নিয়ে অকপট আইরা। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানালেন, কী ভাবে তাঁর মানসিক ভাঙন সামাল দিতে তাঁকে নিয়ে জার্মানি (Germany) পর্যন্ত গিয়েছিলেন আমির খান। সেখানে কাটানো ১৭ দিনের ‘নিয়ন্ত্রিত উপবাস’ ও চিকিৎসার অভিজ্ঞতা আজও তাঁর মনে দাগ কেটে আছে।

ইরার কথায়, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ তাঁর জীবনে বড় ধাক্কা দেয়। যদিও তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, শুধু বিচ্ছেদই নয়, ছোটবেলা থেকেই শরীরের গঠন নিয়ে যে কটাক্ষ ও তুলনার মুখে পড়তে হয়েছে, সেটাই ধীরে ধীরে তাঁর আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিয়েছিল। সমাজের চোখে ‘পারফেক্ট’ হওয়ার চাপ তাঁকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল, যেখানে নিজের অস্তিত্বকেই তিনি অযোগ্য বলে মনে করতে শুরু করেন। ইরা বলেন, ‘আমি আয়নার দিকে তাকাতে ভয় পেতাম। মনে হত, আমাকে দেখার মতো কেউ নেই। আমি মোটা, তাই আমি অযোগ্য, এই ভাবনাটা মাথার ভিতরে গেঁথে গিয়েছিল।’ এই হীনমন্যতা থেকেই ধীরে ধীরে তিনি অবসাদের দিকে ঢলে পড়েন। আইরা খোলাখুলি স্বীকার করেছেন, দীর্ঘদিন তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে উঠেছিল যে, বাবা আমির খান মেয়ের চিকিৎসার জন্য বিশেষ সিদ্ধান্ত নেন। ইরার কথায়, ‘আমার মানসিক অবস্থা দেখে বাবা আমাকে নিয়ে জার্মানি যান। সেখানে আমরা ১৭ দিন ছিলাম।’ এই সময় তাঁরা ছিলেন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত চিকিৎসা পরিবেশে।
ইরা জানান, জার্মানিতে চিকিৎসার অংশ হিসাবে তাঁদের উপবাস করতে হয়েছিল। তবে সেটি কোনও সাধারণ উপোস নয়। চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে এই উপবাস চলত। ইরার ভাষায়, ‘আমরা ১৭ দিন উপবাস করেছি। কিন্তু সেটার পাশাপাশি আমাদের কিছু স্বাধীনতাও ছিল। আমাদের ঘোরাতে নিয়ে যাওয়া হত। পুরো প্রক্রিয়াটা তিনটি স্তরে ভাগ করা ছিল।’ এই অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে একেবারেই নতুন ছিল। শারীরিক ভাবে যেমন কঠিন, তেমনই মানসিক দিক থেকেও ছিল চ্যালেঞ্জিং। জার্মানিতে থেকেও যে আইরা সম্পূর্ণ স্বস্তিতে ছিলেন, তা নয়। বরং সেই সময় তিনি আরও বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। প্রায়ই কাঁদতেন। সেই মুহূর্তগুলিতে বাবার ভূমিকার কথাও অকপটে জানিয়েছেন আইরা। তাঁর কথায়, ‘আমি যখন ভেঙে পড়তাম, বাবা আমার হাতটা শক্ত করে ধরে থাকতেন।’ একজন সুপারস্টারের বাবা নয়, বরং এক চিন্তিত অভিভাবকের ছবি ধরা পড়ে আইরার এই স্মৃতিতে।
এই অভিজ্ঞতার পরেও ইরার লড়াই থেমে থাকেনি। তিনি জানান, ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময়টা তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। মানসিক চিকিৎসা চলেছে দীর্ঘদিন। ওজন নিয়েও নানা শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। এক সময় তাঁর ওজন ছিল ৮৪ কেজি। সমাজের নানা মন্তব্য, নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই, সব মিলিয়ে সহজ ছিল না এই পথ। কিন্তু, ধীরে ধীরে পরিবর্তন এসেছে। চিকিৎসা, নিজের কাজের প্রতি মনোযোগ এবং জীবনে সঠিক মানুষের আগমন, সব মিলিয়ে বর্তমানে অনেকটাই সুস্থ আইরা। ইরা জানিয়েছেন, স্বামী নূপুর শিখরে (Nupur Shikhare) -এর সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর তাঁর জীবনে বড় বদল আসে। নূপুরের সমর্থন ও ভালবাসা তাঁকে নতুন করে বাঁচার শক্তি দিয়েছে। বর্তমানে আইরার ওজন ৫৭ কেজি। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এই সংখ্যার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তাঁর মানসিক সুস্থতা।
ইরার এই স্বীকারোক্তি নতুন করে আলোচনায় এনেছে স্টার সন্তানদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি। বাইরে থেকে তাঁদের জীবন যতটা নিখুঁত মনে হয়, বাস্তবে তা যে মোটেই সহজ নয়, আইরার গল্প তার প্রমাণ। মানসিক অবসাদ, শরীরী কটাক্ষ এবং সমাজের প্রত্যাশা, এই তিনের চাপে কত মানুষই না নীরবে ভেঙে পড়েন। আমির খান আগেও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেছেন। মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি যে এক জন দায়িত্বশীল বাবার ভূমিকা পালন করেছেন, তা আইরার কথায় স্পষ্ট। এই অভিজ্ঞতা শুধু এক তারকা পরিবারের গল্প নয়, বরং বহু মানুষের জীবনের সঙ্গে মিলে যায়। ইরার বক্তব্য অনেককেই নিজেদের লড়াই নিয়ে মুখ খুলতে সাহস দেবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অনেকেই মনে করেন, ইরা খানের এই অকপট স্বীকারোক্তি এক দিকে যেমন তাঁর ব্যক্তিগত যন্ত্রণার দলিল, তেমনি অন্য দিকে মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব নিয়ে সমাজকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Aamir Khan controversy, Abhinav Kashyap statement | ‘আমির খান ধূর্ত শেয়াল, সব কিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান’ ফের বিস্ফোরক অভিযোগ ‘দাবং’ পরিচালক অভিনব কাশ্যপের




