সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে নজিরবিহীন আয়োজনের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় সূচিত হল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah)-সহ বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। একই মঞ্চে তাঁর সঙ্গে শপথ গ্রহণ করলেন আরও পাঁচ জন মন্ত্রী, যাঁদের নিয়ে গঠিত হল রাজ্যের প্রথম বিজেপি মন্ত্রিসভা। যদিও কে কোন দফতরের দায়িত্ব সামলাবেন, তা এখনও ঘোষণা করা হয়নি। শনিবার ব্রিগেডের বিশাল সমাবেশে প্রথমে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শুভেন্দু। তার পর পর্যায়ক্রমে শপথ নেন দিলীপ ঘোষ (Dilip Ghosh), অগ্নিমিত্রা পাল (Agnimitra Paul), অশোক কীর্তনিয়া (Ashok Kirtania), ক্ষুদিরাম টুডু (Khudiram Tudu) এবং নিশীথ প্রামাণিক (Nisith Pramanik)। এই মন্ত্রিসভায় উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের প্রতিনিধিত্বের পাশাপাশি সামাজিক ভারসাম্যের দিকেও নজর দেওয়া হয়েছে। মতুয়া, আদিবাসী ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে নতুন সরকারের কাঠামোয়।

নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশিত হয় গত ৪ মে। ২০৭টি আসন জিতে বিজেপি রাজ্যে সরকার গঠনের স্পষ্ট ম্যান্ডেট পায়। নির্বাচনের আগে থেকেই মুখ্যমন্ত্রী পদ নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে ছিল। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বারবার জানিয়ে দিয়েছিল, বাংলার মাটি ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত, বাংলা মাধ্যমে শিক্ষিত কোনও নেতাকেই এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হবে। সেই প্রেক্ষাপটে শুভেন্দু অধিকারীর নামই সবচেয়ে বেশি উঠে আসে রাজনৈতিক মহলে।
অবশেষে বিধায়কদলের বৈঠকে সেই জল্পনার অবসান ঘটে। অমিত শাহ বলেন, ‘পরিষদীয় দলনেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আটটি প্রস্তাব জমা পড়েছিল এবং প্রত্যেকটিতেই একটিই নাম ছিল। দ্বিতীয় কোনও নাম আসেনি। তাই সর্বসম্মতভাবে শুভেন্দু অধিকারীকেই মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে ঘোষণা করা হচ্ছে।’ এই ঘোষণার পর থেকেই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানকে ঘিরে উত্তেজনা চরমে ওঠে।
নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুর ও নন্দীগ্রাম দু’টি কেন্দ্র থেকেই জয়ী হয়েছেন, যা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অন্যদিকে খড়্গপুর সদর কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছেন দিলীপ ঘোষ, যিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজ্য বিজেপির অন্যতম মুখ হিসেবে পরিচিত। আসানসোল দক্ষিণ কেন্দ্র থেকে জয়ী অগ্নিমিত্রা পাল শিল্পাঞ্চলের প্রতিনিধি হিসেবে মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছেন। বনগাঁ উত্তর কেন্দ্রের বিধায়ক অশোক কীর্তনিয়া মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করছেন। বাঁকুড়ার রানিবাঁধ থেকে জয়ী ক্ষুদিরাম টুডু আদিবাসী মুখ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। কোচবিহারের মাথাভাঙা কেন্দ্র থেকে জয়ী নিশীথ প্রামাণিক রাজবংশী অধ্যুষিত এলাকার প্রতিনিধিত্ব করছেন।
এই মন্ত্রিসভার গঠন রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন দিশা দেখাচ্ছে। একদিকে যেমন অভিজ্ঞ নেতাদের জায়গা দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হতে পারে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন একাধিক বিজেপি শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় নেতারা। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বিপুল জনসমাগম এই অনুষ্ঠানের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। রাজনৈতিকভাবে এই মুহূর্তটি রাজ্যের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এই প্রথমবার পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠন করল।
দফতর বণ্টন নিয়ে এখন জোর চর্চা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। কোন মন্ত্রী কোন দায়িত্ব পাবেন, তা নিয়ে নানা জল্পনা থাকলেও সরকারিভাবে এখনও কিছু ঘোষণা করা হয়নি। প্রশাসনিক কাজ দ্রুত গতিতে শুরু করতে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এই ঘোষণা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। নতুন সরকারের সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, অর্থনীতি চাঙা করা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, শিল্পে বিনিয়োগ আনা এবং গ্রামীণ উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা। নির্বাচনী প্রচারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া এখন প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠবে। সেই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও পরিকাঠামো উন্নয়নও সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের এই মুহূর্তে রাজ্যের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। নতুন সরকার কীভাবে সেই প্রত্যাশা পূরণ করে, তা দেখার জন্য এখন অপেক্ষা করছে গোটা বাংলা। ব্রিগেডের মঞ্চ থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা আগামী দিনে কোন দিকে এগোয়, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari CM: বাংলার নব মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিলেন শুভেন্দু অধিকারী | ঐতিহাসিক দিন



