সুজয়নীল দাশগুপ্ত ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : ইডেন গার্ডেন্স -এর আলোর নিচে এক ইনিংসেই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এলেন ২১ বছরের তরুণ উইকেটরক্ষক-ব্যাটার মুকুল চৌধরি (Mukul Chaudhary)। কলকাতা নাইট রাইডার্স (Kolkata Knight Riders)-এর বিরুদ্ধে লখনউ সুপার জায়ান্টস (Lucknow Super Giants)-এর হয়ে প্রায় হারতে বসা ম্যাচ জিতিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, ভারতীয় ক্রিকেটে আরও এক নতুন ‘ফিনিশার’-এর আবির্ভাব হতে পারে খুব শিগগিরই। মাত্র ২৭ বলে অপরাজিত ৫২ রান, ইনিংসটি শুধু সংখ্যার দিক থেকে নয়, পরিস্থিতি সামলানোর দক্ষতার জন্যও আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। শুরুটা ছিল ধীর। প্রথম ৮ বলে মাত্র ২ রান। কিন্তু ক্রিজে থিতু হওয়ার পরই বদলে যায় গিয়ার। শেষ পর্যন্ত স্ট্রাইক রেট পৌঁছে যায় ২০০-র কাছাকাছি। ইনিংসে ছিল ২টি চার এবং ৭টি ছয়। এই রূপান্তরই মুকুলকে আলাদা করে তুলছে, পরিস্থিতি বুঝে খেলা এবং শেষ পর্যন্ত ম্যাচ টেনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা।
ম্যাচের পর মুকুল বলেন, ‘মাথা ঠান্ডা রাখা খুব জরুরি। আগে খুব তাড়াহুড়ো করতাম। এখন চেষ্টা করি যতক্ষণ সম্ভব ক্রিজে থাকতে।’ তাঁর কথায় উঠে এসেছে পরিবর্তনের গল্প— ধৈর্য, নিয়ন্ত্রণ এবং হিসেবি আক্রমণ। আরও যোগ করেন, ‘শেষ পর্যন্ত থাকলে ম্যাচ জেতানো সম্ভব, এই বিশ্বাস নিয়েই ব্যাট করি।’ এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে দলের অধিনায়ক ঋষভ পন্থ (Rishabh Pant)-এর। মুকুল জানান, ‘পন্থ ভাই আমাকে বলেছিল বেশি না ভাবতে, শুধু বল দেখে খেলতে। ওই কথাগুলো মাথায় রেখেই চাপমুক্ত থাকতে পেরেছি।’ এই মানসিকতা তাঁকে ইনিংসের মাঝপথে নতুন করে গতি তুলতে সাহায্য করে।
মুকুলের ক্রিকেটযাত্রা সহজ ছিল না। রাজস্থানের ঝুনঝুনু (Jhunjhunu, Rajasthan)-র মতো এলাকায় ক্রিকেটের পরিকাঠামো খুব সীমিত। তাঁর বাবা দলীপ কুমার চৌধরি (Dalip Kumar Chaudhary), পেশায় শিক্ষক, ছেলের স্বপ্ন পূরণের জন্য নিজের পেশা বদলে ব্যবসায় নামেন। পরে ছেলেকে সিকার (Sikar)-এর একটি ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ভর্তি করান। সেখানেই এক ম্যাচে উইকেটরক্ষক না থাকায় হঠাৎ গ্লাভস তুলে নেন মুকুল। সেই সিদ্ধান্তই তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। আজকের মুকুল একজন পূর্ণাঙ্গ উইকেটরক্ষক-ব্যাটার। আইপিএল (IPL)-এর নিলামে তাঁকে ২ কোটি ৬০ লক্ষ টাকায় দলে নেয় লখনউ। তবে তার আগেই কোচ জাস্টিন ল্যাঙ্গার (Justin Langer)-এর নজরে পড়েছিলেন তিনি। একটি প্রশিক্ষণ শিবিরে তাঁর খেলা দেখে মুগ্ধ হন ল্যাঙ্গার। পরে দলের ডাটা অ্যানালিস্ট শ্রীনিবাস (Srinivas)-এর সুপারিশে তাঁকে দলে নেওয়া হয়। ল্যাঙ্গার বলেন, ‘কয়েক মাস আগে ওকে প্রথম দেখি। তখনই মনে হয়েছিল, এই ছেলেটার মধ্যে আলাদা কিছু আছে।’ তিনি আরও জানান, ‘মুকুল শুধু শক্তিশালী ব্যাটার নয়, দারুণ অ্যাথলিট। উইকেটের মাঝে দৌড় প্রায় কোহলির মতো।’ এখানেই আসে আর এক গুরুত্বপূর্ণ দিক, ফিটনেস। মুকুলের ক্রিকেটীয় আদর্শ মহেন্দ্র সিংহ ধোনি (MS Dhoni)। তাঁর ব্যাটিংয়ে ‘হেলিকপ্টার শট’-এর ছাপও দেখা যায়। ইডেনে প্রথম ছয় মারার সময় সেই শটই ব্যবহার করেছিলেন তিনি। কিন্তু ফিটনেসের ক্ষেত্রে তিনি অনুসরণ করেন বিরাট কোহলিকে (Virat Kohli)। কঠোর অনুশীলন, দৌড় এবং শরীরচর্চার ভেতর দিয়ে নিজেকে সর্বদা প্রস্তুত রাখার চেষ্টা করেন।।ল্যাঙ্গারের কথায়, ‘ম্যাচ পড়ার ক্ষমতা ওর অসাধারণ। কথা বললে মনে হয় অনেক অভিজ্ঞ ক্রিকেটার।’ এই পরিণত মানসিকতাই তাঁকে চাপের মুহূর্তে স্থির থাকতে সাহায্য করে। শেষ ৪ ওভারে যখন দলের দরকার ছিল ৬৪ রান, তখন অনেকেই ম্যাচ হার ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু মুকুল অন্য গল্প লিখলেন।
কার্তিক ত্যাগীর (Kartik Tyagi) ওভারে টানা দু’টি ছয় মেরে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন তিনি। পরে ক্যামেরন গ্রিন (Cameron Green)-এর বিরুদ্ধে এক ওভারেই তিনটি বাউন্ডারি, যার মধ্যে দু’টি ছয়। এই দুই ওভারেই লখনউ ফিরে আসে ম্যাচে। শেষ পর্যন্ত ম্যাচ জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন মুকুল, যা একজন প্রকৃত ফিনিশারের লক্ষণ। ঘরোয়া ক্রিকেটে তাঁর অভিজ্ঞতা সীমিত। রাজস্থানের হয়ে মাত্র চারটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ, পাঁচটি লিস্ট এ এবং ১০টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন। তবে টি-টোয়েন্টিতে তাঁর স্ট্রাইক রেট ১৬৪.৭০, যা তাঁর আক্রমণাত্মক মনোভাবের প্রমাণ। ল্যাঙ্গারের মতে, ‘মুকুলের মধ্যে দীর্ঘ দৌড়ে সাফল্য পাওয়ার ক্ষমতা আছে।’ যদিও তিনি সতর্কও করেছেন, ‘ভারতীয় দলে জায়গা পাওয়া সহজ নয়। প্রতিযোগিতা খুব বেশি।’ তবুও তাঁর বিশ্বাস, সঠিক পরিশ্রম ও ধারাবাহিকতায় মুকুল বড় মঞ্চে জায়গা করে নিতে পারেন। এই মুহূর্তে আইপিএল-ই তাঁর সবচেয়ে বড় মঞ্চ। এখানেই নিজেকে প্রমাণ করতে হবে বারবার। তবে ইডেনের ইনিংস ইতিমধ্যেই তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রে এনে দিয়েছে। প্রতিপক্ষ দলগুলিও এখন তাঁকে নিয়ে পরিকল্পনা করতে বাধ্য হবে। মুকুল নিজেও জানেন, পথটা দীর্ঘ। তাই তিনি বলেই দিয়েছেন, ‘শিখে যেতে চাই, উন্নতি করতে চাই।’ তাঁর এই মানসিকতাই ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে আরও উজ্জ্বল করে তুলছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : IPL ticket fraud, DDCA controversy | আইপিএলে টিকিট জালিয়াতির ছায়া! বৈধ টিকিট নিয়েও ঢুকতে পারলেন না ডিডিসিএ কর্তা, দিল্লি স্টেডিয়ামে চাঞ্চল্য




