মেধা পাল ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, মুম্বাই: পর্দায় তাঁর চরিত্র যতটা তীব্র, বাস্তব জীবনে নানা পাটেকরকে (Nana Patekar) নিয়েও ততটাই নানা গল্প রয়েছে। রাগী স্বভাবের অভিনেতা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত তিনি। শুটিং সেটে মতের অমিল থেকে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার ঘটনাও তাঁর কর্মজীবনে একাধিকবার আলোচনায় এসেছে। কিন্তু এই পরিচিত ছবির আড়ালে থাকা অন্য নানা পটেকরকে এবার সামনে আনলেন চিত্রনাট্যকার রণবীর পুষ্প (Ranveer Pushp)। তাঁর কথায়, কৃষকদের দুর্দশা দেখে দেড় কোটি টাকার গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত পর্যন্ত বদলে দিয়েছিলেন অভিনেতা। গাড়ি কেনার জন্য রাখা টাকা কৃষক আত্মহত্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির হাতে পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। রণবীরের দাবি, একটি পরিবারের হাতে প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা করে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন নানা। উল্লেখ্য, নানা পাটেকরের সঙ্গে রণবীর পুষ্পের পরিচয় শুধু ব্যক্তিগত নয়, কাজের সূত্রেও। পার্থ ঘোষ (Partha Ghosh) পরিচালিত ১৯৯৬ সালের ‘অগ্নিসাক্ষী’ ছবিতে দু’জন একসঙ্গে কাজ করেছিলেন। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা থেকেই নানা পটেকরের ব্যক্তিত্বের একটি আলাদা দিকের কথা তুলে ধরেছেন রণবীর। তাঁর মতে, নানা সম্পর্কে বাইরে থেকে তৈরি হওয়া অনেক ধারণাই অসম্পূর্ণ। অভিনেতার রাগ যেমন রয়েছে, তেমনই মানুষের সমস্যার প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতাও রয়েছে।

আরও পড়ুন : Sonali Kulkarni Aamir Khan | কেন ‘দঙ্গল’-এর আমিরকে আসল হিরো বললেন সোনালী?
রণবীরের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি সময়ে কৃষক আত্মহত্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি পরিবারের দুরবস্থার কথা নানা পটেকরের কাছে পৌঁছয়। সেই সময় অভিনেতা একটি দামি গাড়ি কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। গাড়িটির দাম ছিল প্রায় দেড় কোটি টাকা। কিন্তু কৃষক পরিবারগুলির পরিস্থিতি জানার পর নিজের পরিকল্পনা বদলে ফেলেন তিনি। গাড়ি কেনার পরিবর্তে সেই অর্থ সাহায্য হিসেবে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সরাসরি নিজের পরিচয়ে নয়, বন্ধুর মাধ্যমে পরিবারের কাছে টাকা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন বলে দাবি রণবীরের। রণবীর পুষ্পের বক্তব্যে উঠে এসেছে, ওই অর্থ কয়েকটি পরিবারের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর কথায়, প্রতিটি পরিবার প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা করে পেয়েছিল। অর্থাৎ একটি বিলাসবহুল গাড়ি কেনার সম্ভাব্য খরচকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজে ব্যবহার করেছিলেন নানা। এই ঘটনার কথা বলতে গিয়ে রণবীরের বক্তব্য, কৃষকদের চোখের জল মুছতে যে মানুষ নিজের ব্যক্তিগত কেনাকাটার পরিকল্পনা বদলাতে পারেন, তাঁকে শুধু তাঁর রাগের ঘটনাগুলি দিয়ে বিচার করা যায় না।
কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর সঙ্গে নানা পটেকরের নাম নতুন নয়। কৃষক পরিবারের আর্থিক সমস্যার কথা সামনে রেখে তিনি ‘নাম’ (Naam) নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। মহারাষ্ট্রে কৃষক আত্মহত্যার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে সংগঠনটির কাজ শুরু হয়েছিল। আর্থিক সাহায্যের পাশাপাশি কৃষক পরিবারগুলিকে স্বনির্ভর করার উদ্যোগও সংগঠনটির কাজের অংশ হয়ে ওঠে। নানা নিজেও কৃষি ও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। তবে নানা পটেকরের ব্যক্তিত্বের আরেকটি দিকও রণবীর অস্বীকার করেননি। তিনি মেজাজি, কথা স্বীকার করেও সেই আচরণের পিছনে পরিস্থিতির ভূমিকার কথা বলেছেন চিত্রনাট্যকার। তাঁর বক্তব্যে এমন একটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে, যা নানার রাগের ধরন সম্পর্কে অন্য ছবি তুলে ধরে।
একদিন রাস্তায় চলন্ত একটি গাড়ি থেকে এক ব্যক্তি প্লাস্টিকের বোতল বাইরে ছুড়ে ফেলেছিলেন বলে জানান রণবীর। ঘটনাটি দেখে নানা নিজের গাড়ি থামান। রাস্তায় পড়ে থাকা বোতলটি নিজেই তুলে নেন। এরপর যে গাড়ি থেকে বোতলটি ফেলা হয়েছিল, সেটিকে ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড় করিয়ে চালকের সঙ্গে কথা বলেন অভিনেতা। সেই সময় রাস্তার পাশে মহাত্মা গান্ধী-এর ছবি এবং পরিচ্ছন্নতা নিয়ে প্রচারাভিযানের বিজ্ঞাপন ছিল। সেটির দিকে ইঙ্গিত করে ওই ব্যক্তিকে নানা প্রশ্ন করেন বলে রণবীরের দাবি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অভিনেতার বক্তব্যের মূল কথা ছিল, দেশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব শুধু প্রশাসনের নয়, নাগরিকেরও। গাড়ির জানলা দিয়ে রাস্তার উপর আবর্জনা ফেলে দেওয়া কোনও ভাবেই নাগরিক দায়িত্বের সঙ্গে যায় না।
রণবীরের বর্ণনায় নানার সেই আচরণ রাগের বহিঃপ্রকাশ হলেও তার মধ্যে একটি সামাজিক প্রশ্নও ছিল। তিনি যে ভাষায় ওই ব্যক্তিকে প্রশ্ন করেছিলেন, তা হয়তো কঠিন ছিল, কিন্তু ঘটনাটির কেন্দ্রবিন্দু ছিল রাস্তায় আবর্জনা না ফেলা। অর্থাৎ নানা পটেকরের মেজাজের সঙ্গে তাঁর সামাজিক সচেতনতার একটি যোগ রয়েছে বলেই মনে করেন রণবীর। উল্লেখ্য, বলিউডে নানা পটেকরের রাগ নিয়ে বহু গল্প প্রচলিত। ১৯৮৯ সালের ‘পারিন্দা’ (Parinda) ছবির শুটিং চলাকালীন পরিচালক বিধু বিনোদ চোপড়া (Vidhu Vinod Chopra) -এর সঙ্গে তাঁর মতবিরোধের ঘটনাও দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। নানা নিজেও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তাঁর স্বভাবের তীব্রতা নিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু রণবীরের বক্তব্যে সেই স্বভাবের পাশাপাশি তাঁর মানুষের জন্য কাজ করার দিকটিও সামনে এসেছে। কৃষকদের নিয়ে নানার কাজের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনযাপনের কথাও বহুবার উঠে এসেছে। মহারাষ্ট্রের খামারবাড়িতে সময় কাটান অভিনেতা। অভিনয়ের ব্যস্ততার বাইরে কৃষিকাজ ও গ্রামীণ পরিবেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক রয়েছে। ফলে কৃষকদের জীবনযাত্রা ও তাঁদের সমস্যার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ কেবল সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
নানা পটেকরকে ঘিরে আলোচনায় শুধু সমাজসেবা বা অভিনয় নয়, তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও বহু বছর ধরে কৌতূহল রয়েছে। বিশেষ করে অভিনেত্রী মনীষা কৈরালা (Manisha Koirala) -এর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে নব্বইয়ের দশকে বলিউডে নানা ধরনের গুঞ্জন ছড়িয়েছিল। ‘অগ্নিসাক্ষী’ ছবিতে একসঙ্গে কাজ করার সময় তাঁদের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে আলোচনা হয়। সেই প্রসঙ্গেও এবার মুখ খুলেছেন রণবীর পুষ্প। রণবীরের বক্তব্য অনুযায়ী, নানা ও মনীষার মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ছিল। তবে সেটি বন্ধুত্ব নাকি প্রেম, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত কোনও সিদ্ধান্ত দেননি। তাঁর কথায়, দু’জন একে অপরকে বুঝতেন ও শুটিংয়ের আগে নিজেদের দৃশ্য নিয়েও আলোচনা করতেন। পর্দায় তাঁদের অভিনয়ের সমন্বয় দেখলেই তাঁদের বোঝাপড়ার বিষয়টি কিছুটা ধরা যায় বলে মনে করেন তিনি।
নানা পটেকর ও মনীষা কৈরালার জুটি নব্বইয়ের দশকে একাধিক ছবিতে দেখা গিয়েছিল। ১৯৯৬ সালে সঞ্জয় লীলা ভন্সালী (Sanjay Leela Bhansali)-র ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’ (Khamoshi: The Musical)-এ তাঁরা একসঙ্গে অভিনয় করেন। ছবিতে মনীষা ছিলেন নানার চরিত্রের মেয়ের ভূমিকায়। একই বছরে ‘অগ্নিসাক্ষী’-তেও তাঁদের দেখা যায়। এরপর ১৯৯৮ সালে পার্থ ঘোষের ‘যুগপুরুষ’ (Yugpurush) ছবিতে ফের একসঙ্গে কাজ করেন তাঁরা। ‘অগ্নিসাক্ষী’ -এর সময়কার সম্পর্ক নিয়ে যে গুঞ্জন তৈরি হয়েছিল, সেটিকে রণবীরও পুরোপুরি অস্বীকার করেননি। তবে তাঁর বক্তব্যে কোনও নির্দিষ্ট সম্পর্কের দাবি নেই। তিনি বলেছেন, দু’জনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ছিল এবং তাঁদের পরস্পরের প্রতি বোঝাপড়া ছিল। ফলে নব্বইয়ের দশকের সেই পুরনো গুঞ্জন নতুন করে আলোচনায় এলেও সেটিকে নিশ্চিত সম্পর্কের তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
নানা পাটেকরের ব্যক্তিত্ব নিয়ে রণবীর পুষ্পের এই বক্তব্য তাই একসঙ্গে তাঁর অভিনয়জীবন, ব্যক্তিগত স্বভাব এবং সামাজিক কাজের প্রসঙ্গ সামনে এনেছে। এক দিকে রয়েছে রাগী অভিনেতা হিসেবে তাঁর পরিচিতি, অন্য দিকে কৃষক পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ঘটনা। দেড় কোটি টাকার গাড়ি কেনার বদলে সেই অর্থ বিপন্ন পরিবারগুলির হাতে তুলে দেওয়ার যে দাবি রণবীর করেছেন, সেটিই নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। নানা পটেকর নিজে এখনও এই নির্দিষ্ট ঘটনার বিষয়ে নতুন করে কোনও মন্তব্য করেছেন কি না, তা আলাদা বিষয়। তবে রণবীর পুষ্পের বক্তব্যের সূত্র ধরে অভিনেতার দীর্ঘ কর্মজীবনের একটি ভিন্ন অধ্যায় ফের সামনে এসেছে। পর্দায় তীব্র অভিনয় এবং ব্যক্তিজীবনে কৃষক পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ, নানা পটেকরকে ঘিরে তৈরি এই দুই ছবিই এখন নতুন করে আলোচনায়।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Aamir Khan Lalkara | ৬১-তে ২৫ বছরের যুবক আমির খান! ‘লালকারা’-র জন্য ফের বড় শারীরিক বদল



