শোভনা মাইতি, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মুম্বাই : বলিউডে বয়স নিয়ে তারকাদের যে চেনা ছক, তা ভাঙার সাহস খুব বেশি অভিনেতার মধ্যে দেখা যায় না। বিশেষ করে বড় তারকার ক্ষেত্রে পর্দায় বয়সের ছাপ এড়িয়ে যাওয়া, কমবয়সী নায়িকার সঙ্গে রোম্যান্স ও চিরতরুণ নায়ক হিসেবে নিজেকে ধরে রাখার প্রবণতা বহুদিন ধরেই আলোচনায়। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আমির খানের (Aamir Khan) ‘দঙ্গল’ ছবির রূপান্তরকে আলাদা করে দেখছেন অভিনেত্রী সোনালী কুলকার্নি (Sonali Kulkarni)। তাঁর মতে, এখনও যে তারকার পোস্টার দেখে তরুণীরা মুগ্ধ হন, সেই আমির যখন পর্দায় কয়েকটি মেয়ের বয়স্ক বাবার চরিত্রে নিজেকে হাজির করেছিলেন, তখনই তিনি দেখিয়েছিলেন তারকা হওয়ার আসল সাহস। আমিরকে নিয়ে সোনালীর এই মন্তব্য সামনে আসতেই বলিউডে বয়স, তারকাখ্যাতি ও অভিনয়শিল্পীর চরিত্র বাছাই নিয়ে ফের আলোচনা শুরু হয়েছে। এক সাক্ষাৎকারে নিজের অভিজ্ঞতা ও ইন্ডাস্ট্রির বদলে যাওয়া মানসিকতার প্রসঙ্গ তুলতে গিয়ে তিনি আমিরের পাশাপাশি সইফ আলি খানের (Saif Ali Khan) উদাহরণও টেনেছেন। তাঁর বক্তব্য, অভিনেতাদের এখন আর সবসময় পর্দায় কমবয়সী দেখানোর প্রতিযোগিতায় থাকতে হয় না। বরং বয়সকে মেনে নিয়ে অভিনয়ের নতুন জায়গায় যাওয়ার সাহসই একজন শিল্পীর বড় পরিচয় হতে পারে।
সোনালীর নিজের কেরিয়ারেও বয়স ও পর্দার চরিত্রের এই বৈপরীত্যের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সলমন খানের (Salman Khan) ‘ভারত’ ছবিতে তিনি অভিনয় করেছিলেন তাঁর মায়ের ভূমিকায়। অথচ বাস্তবে সোনালী বয়সে সলমনের চেয়ে ছোট। বলিউডের প্রচলিত বয়সের হিসাব অনুযায়ী এমন চরিত্র বাছাই নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। কিন্তু সোনালী সেই অভিজ্ঞতাকে আক্ষেপ হিসেবে দেখছেন না। তাঁর মতে, সিনেমার জগতে ধীরে ধীরে এমন অনেক পুরনো ধারণা বদলেছে, যা একসময় অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কাজের সুযোগ সীমিত করে দিত। একসময় বলিউডে এমন ধারণা ছিল, কোনও অভিনেত্রী বিয়ে করলে তাঁর নায়িকা হিসেবে কাজের সুযোগ কমে যাবে। সংসার বা সন্তান থাকলে তাঁকে আর আগের মতো পর্দার কেন্দ্রীয় চরিত্রে দেখা যাবে না, এমন মানসিকতাও ইন্ডাস্ট্রিতে ছিল। সোনালীর মতে, সেই জায়গা এখন অনেকটাই বদলেছে। অভিনেতা কিংবা অভিনেত্রী, দু’জনের ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত জীবন এবং পেশাগত জীবনকে আলাদা করে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
অভিনেত্রীর বক্তব্য, ‘এখন আর আগের মতো কথা শোনা যায় না যে বিয়ে করলে অভিনেত্রীর কেরিয়ার শেষ। দর্শকরাই দেখিয়ে দিয়েছেন, একজন অভিনেত্রীও বিয়ে করতে পারেন, সংসার করতে পারেন, সন্তান থাকতে পারে এবং একই সঙ্গে অভিনয়ও চালিয়ে যেতে পারেন।’ তাঁর মতে, শিল্পীরা এখন নিজেদের কাজ ও প্রতিভার মাধ্যমে দর্শকের কাছে জায়গা তৈরি করতে চাইছেন। শুধুমাত্র নায়ক বা নায়িকার প্রচলিত ছাঁচে আটকে থাকার প্রয়োজন ক্রমশ কমছে। এই প্রসঙ্গেই আমির খানের কথা ওঠে। সোনালী এবং আমির একসঙ্গে ‘দিল চাহতা হ্যায়’ (Dil Chahta Hai) ছবিতে কাজ করেছিলেন। সেই সময়ের সহ-অভিনেতার পরবর্তী কেরিয়ারের বেশ কিছু সিদ্ধান্ত তাঁকে মুগ্ধ করেছে বলেই জানিয়েছেন সোনালী। বিশেষ করে ‘দঙ্গল’ ছবিতে আমিরের চরিত্র ও শারীরিক রূপান্তর তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ‘দঙ্গল’-এ মহাবীর সিং ফোগাটের (Mahavir Singh Phogat) চরিত্রে আমিরকে কখনও তরুণ, কখনও মধ্যবয়স্ক ও পরিণত বয়সের চরিত্রে দেখা যায়। ছবির গল্প অনুযায়ী মেয়েদের বাবা হিসেবে তাঁর পর্দার উপস্থিতিই ছিল কাহিনির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চরিত্রের বয়স ও শারীরিক পরিবর্তন ফুটিয়ে তুলতে আমির নিজের চেহারা এবং শরীর নিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন করেছিলেন।
সোনালীর বক্তব্যে সেই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমির এমন একজন সুপারস্টার, যাঁর পোস্টার দেখে আজও মেয়েরা পাগল হয়। তাঁকে বিয়ে করার জন্যও অনেকে পাগল হয়ে যান। সেই মানুষটি যখন ‘দঙ্গল’-এ কয়েকটি মেয়ের বয়স্ক বাবার চরিত্রে কোনও প্রস্থেটিক মেকআপের সাহায্য না নিয়ে হাজির হন, তখন আমার চোখে তিনিই আসল হিরো।’ অভিনেত্রীর মতে, একজন বড় তারকার পক্ষে নিজের জনপ্রিয় চেহারা এবং পর্দার পরিচিত ইমেজ থেকে বেরিয়ে আসা সহজ নয়। দর্শক যে ধরনের আমির খানকে দেখতে অভ্যস্ত, তার বাইরে গিয়ে বয়সের ছাপ গ্রহণ করে একটি চরিত্রে নিজেকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলা অন্য ধরনের আত্মবিশ্বাসের দাবি রাখে। ‘দঙ্গল’-এর ক্ষেত্রে আমির সেই ঝুঁকি নিয়েছিলেন বলেই মনে করেন সোনালী।
এখানেই তিনি বলিউডের চিরতরুণ নায়ক হওয়ার মানসিকতার সঙ্গে পার্থক্য টেনেছেন। তাঁর মতে, একজন অভিনেতার কাজ শুধু নিজের তারকাখ্যাতি ধরে রাখা নয়। চরিত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেকে বদলে নেওয়াও অভিনয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চরিত্রের ধরন বদলাবে, পর্দায় চেহারাতেও তার প্রতিফলন থাকবে, এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে গ্রহণ করাই একজন শিল্পীর পরিণত সিদ্ধান্ত। শুধু আমির খান নন, সোনালীর প্রশংসার তালিকায় রয়েছেন সইফ আলি খানও। তাঁর মতে, সইফ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও আকর্ষণীয় এবং চ্যালেঞ্জিং চরিত্র বেছে নিচ্ছেন। তরুণ দেখানোর কোনও বাধ্যবাধকতার মধ্যে নিজেকে আটকে রাখেননি তিনি। বরং বয়সের সঙ্গে মানানসই চরিত্রে অভিনয় করার পথ বেছে নিয়েছেন। সইফকে নিয়ে সোনালীর বক্তব্যের মূল কথা হল, সময়ের সঙ্গে একজন অভিনেতার পর্দার পরিচয়ও বদলাতে পারে। একটি নির্দিষ্ট বয়সে যে ধরনের চরিত্র পাওয়া যায়, বয়স বাড়লে তার পরিসর আরও অন্য দিকে যেতে পারে। সেই পরিবর্তনকে ভয় না পেয়ে গ্রহণ করতে পারলেই একজন অভিনেতার কাজের পরিধি বাড়ে।
বলিউডে পুরুষ তারকাদের বয়স নিয়ে এই আলোচনা নতুন নয়। পঞ্চাশ বা ষাট পেরিয়েও বহু নায়ককে পর্দায় তরুণ প্রেমিকের চরিত্রে দেখা যায়। একই সময়ে তাঁদের তুলনায় বয়সে ছোট অভিনেত্রীকে কখনও কখনও তাঁদের মায়ের চরিত্রেও অভিনয় করতে হয়। সোনালীর ‘ভারত’ ছবির অভিজ্ঞতা সেই বৈপরীত্যেরই একটি উদাহরণ। তবে তাঁর বক্তব্যে আক্ষেপের বদলে বদলে যাওয়া সিনেমা-সংস্কৃতির দিকটি উঠে এসেছে। বর্তমানে দর্শকের চরিত্রের প্রতি আগ্রহও বাড়ছে বলে মনে করেন তিনি। কোনও অভিনেতা কত বছর বয়সী, তাঁর বৈবাহিক অবস্থা কী কিংবা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে সন্তান রয়েছে কি না, এসবের চেয়ে পর্দায় তিনি কী ধরনের কাজ করছেন, তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ওটিটি, নতুন ধরনের গল্প এবং চরিত্রনির্ভর সিনেমার প্রসারও এই পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে। আমিরের ‘দঙ্গল’ ও সইফের সাম্প্রতিক চরিত্রগুলিকে সামনে রেখে সোনালী আসলে সেই বদলে যাওয়া বলিউডের কথাই বলেছেন।
সোনালীর বক্তব্যে উঠে এসেছে এমন এক সিনেমা জগতের ছবি, যেখানে তারকার বয়স লুকিয়ে রাখার চেয়ে চরিত্রের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জনপ্রিয়তার ঝুঁকি নিয়ে বয়সকে পর্দায় গ্রহণ করাও যে একজন অভিনেতার বড় সিদ্ধান্ত হতে পারে, সেই কথাই তুলে ধরেছেন তিনি। ফলে সোনালীর আমির-প্রশংসা শুধু কোনও একটি ছবির অভিনয় ভিত্তিক মন্তব্য নয়। এর মধ্যে রয়েছে বলিউডের দীর্ঘদিনের তারকা-সংস্কৃতি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ। যে আমিরকে আজও বহু তরুণী বিয়ের স্বপ্নে দেখেন, সেই তারকাই যখন ‘দঙ্গল’-এ নিজের বয়সকে আড়াল না করে মেয়েদের বাবা এবং পরিণত বয়সের মানুষ হিসেবে পর্দায় হাজির হন, তখন সেই সিদ্ধান্তই সোনালীর চোখে তাঁকে ‘আসল হিরো’ করে তোলে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Kiara Advani daughter name, Sidharth Malhotra baby girl | হিব্রু অভিধান থেকে মেয়ের নাম! কিয়ারা আডবাণী সিদ্ধার্থ মালহোত্রা কন্যার নাম রাখলেন ‘সারায়াহ’, জানুন অর্থ ও নাম নির্বাচন নিয়ে তারকা দম্পতির ভাবনা




