সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: নেপালের ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর প্রায় তিন সপ্তাহ কেটে গেলেও উদ্বেগ কাটছে না পশ্চিমবঙ্গের একাধিক পরিবারের। নেপালে বেড়াতে কিংবা কাজের সূত্রে গিয়ে এখনও নিখোঁজ রাজ্যের ৩৭ জন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রায় যাওয়া বহু পর্যটক। বিপর্যয়ের পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় দিনের পর দিন অপেক্ষায় রয়েছেন পরিজনেরা। এই পরিস্থিতিতে বুধবার নবান্ন সভাঘরে নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। পরিবারের আর্থিক সমস্যা, সরকারি পরিষেবা পেতে জটিলতা, নিখোঁজদের সম্ভাব্য সন্ধান ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ, একাধিক বিষয় নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়। নেপালের রাসুয়া জেলার ত্রিশূলী ও ভোতেকোশী নদী অববাহিকায় ভয়াবহ হড়পা বান ও বন্যার পর থেকেই বহু পর্যটক ও তীর্থযাত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গ থেকেও একটি বড় দল সেই সময় নেপাল-চিন সীমান্তের দিকে ছিল। পরবর্তী সময়ে রাজ্য সরকারের তরফে নিখোঁজদের তালিকা তৈরি, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং উদ্ধারকারী সংস্থাগুলির সঙ্গে সমন্বয়ের কাজ শুরু হয়। সেপ্টেম্বরের গোড়ায় নিখোঁজদের নিকটাত্মীয়দের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ প্রোফাইল তৈরির প্রক্রিয়াও শুরু করা হয়েছিল, যাতে উদ্ধার হওয়া মৃতদেহগুলির সঙ্গে প্রয়োজনে তা মিলিয়ে দেখা যায়।
এই দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবারের আর্থিক অনিশ্চয়তা। নিখোঁজদের অনেকেই পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী। কেউ শ্রমিক, কেউ কারিগরি পেশায়, কেউ আবার ব্যবসা বা অন্য কোনও কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের অনুপস্থিতিতে সংসারের আয় বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি সরকারি নথিপত্র ও পরিষেবা নিয়েও সমস্যায় পড়ছেন পরিবারের সদস্যেরা। কারও নামে পেনশন, কারও নামে রান্নার গ্যাসের সংযোগ বা অন্য সরকারি সুবিধা থাকায় মূল ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে সেই পরিষেবা কী ভাবে চালু থাকবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নবান্নের বৈঠকে পরিবারের সদস্যেরা এই সমস্যাগুলি মুখ্যমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন বলে জানা গিয়েছে। প্রশাসনের তরফে অভিযোগ ও সমস্যাগুলি নথিভুক্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকার নেপাল প্রশাসন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নিখোঁজদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে।
নিখোঁজদের পরিবারের কাছে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন হয়ে উঠেছে মৃত্যু শংসাপত্র নিয়ে। দীর্ঘ সময় কোনও সন্ধান না মিললে পরিবারের পক্ষে ব্যাঙ্ক, পেনশন, বিমা, সম্পত্তি বা অন্যান্য সরকারি পরিষেবার ক্ষেত্রে একাধিক আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। সাধারণ আইনি কাঠামোয় নিখোঁজ ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের আগে মৃত হিসেবে ঘোষণা করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে বিপর্যয়ের পর দীর্ঘ সময় ধরে কোনও তথ্য না পাওয়া পরিবারগুলির সামনে ভবিষ্যতে কী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে নেপাল সরকারের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য, কেন্দ্রীয় সরকারের সমন্বয় এবং রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে যোগাযোগ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পরিবারের সদস্যেরা দ্রুত তথ্য পাওয়ার দাবি জানিয়েছেন। কারণ, একদিকে তাঁরা প্রিয়জনের সন্ধানের অপেক্ষায় রয়েছেন, অন্যদিকে দৈনন্দিন জীবন চালানোর বাস্তব সমস্যাও তাঁদের সামলাতে হচ্ছে।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রয়াত নেতা মুকুল রায়ের (Mukul Roy) পুত্র শুভ্রাংশু রায় (Subhranshu Roy)। তাঁর স্ত্রী শর্মিষ্ঠা ভৌমিক রায়ও (Sharmistha Bhowmik Roy) নেপাল বিপর্যয়ের পর থেকে নিখোঁজ। শর্মিষ্ঠা ২১ আগস্ট কলকাতা থেকে একটি তীর্থযাত্রী দলের সঙ্গে নেপালের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন। পরে নেপাল-চিন সীমান্তের কাছে বিপর্যয়ের পর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি ৩০ সদস্যের একটি কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার দলের অংশ ছিলেন। শুভ্রাংশু রায় এর আগে জানিয়েছিলেন, বিপর্যয়ের আগে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে শেষবার যোগাযোগ হয়েছিল। পরে চিন সীমান্তের দিকে কোনও নিরাপদ এলাকায় তাঁদের পৌঁছনোর সম্ভাবনা রয়েছে বলে একটি সূত্রের কথা তিনি উল্লেখ করেছিলেন। তবে এই ধরনের তথ্যের সরকারি নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। ১৫ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনেও তিনি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে নিখোঁজদের সন্ধানে সরকারি স্তরে আরও সমন্বয়ের আবেদন করার কথা জানিয়েছিলেন।
নবান্নের বৈঠকে চিন সীমান্তে কয়েক জন আটকে থাকতে পারেন, এমন সম্ভাব্য তথ্যের প্রসঙ্গও উঠে আসে। তবে রাজ্য সরকারের কাছে সেই মুহূর্তে এমন কোনও নিশ্চিত তথ্য নেই বলে জানানো হয়। আন্তর্জাতিক সীমান্ত সংক্রান্ত বিষয়ে সরাসরি চিনের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে রাজ্যের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া গেলে কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে বিষয়টি তোলা যেতে পারে বলে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, শুধু নিখোঁজদের সন্ধান নয়, তাঁদের পরিবারগুলির ভবিষ্যৎ নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার নিখোঁজ রংমিস্ত্রি মুজিবুর মোল্লার (Mujibur Molla) স্ত্রী সরবানু বিবির জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্ট জেলাশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতিতে দ্রুত কোনও কাজের ব্যবস্থা হলে সংসার চালানোর ক্ষেত্রে কিছুটা সহায়তা হবে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে।
বাঁকুড়ার নিখোঁজ অশোক পালের (Ashok Pal) স্ত্রী জবা পালকেও সহায়তার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী তাঁকে নিজের অস্থায়ী সহকারী হিসেবে নিয়োগ করার কথা জানিয়েছেন বলে সূত্রের খবর। একইভাবে উত্তরবঙ্গের সমর মণ্ডলের (Samar Mondal) স্ত্রী গীতিকা সরকার মণ্ডলের (Gitika Sarkar Mondal) পাশে দাঁড়িয়ে নিজের এক মাসের বেতন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। শিলিগুড়ির আরও একটি পরিবারকেও এক মাসের বেতন দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এই আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি নিখোঁজ পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনা নিয়েও উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যে পরিবারগুলিতে স্কুল বা কলেজপড়ুয়া সন্তান রয়েছে, তাদের শিক্ষার দায়িত্ব রাজ্য সরকার নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। ফলে নিখোঁজ ব্যক্তির আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সন্তানের পড়াশোনা যাতে থেমে না যায়, সেই বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে।
পরিবারগুলির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার জন্য একটি হোয়াট্সঅ্যাপ নম্বর ও ইমেল ব্যবস্থাও চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উদ্ধারকাজ বা নিখোঁজদের সন্ধান সংক্রান্ত কোনও নতুন তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত পরিবারের সদস্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এই যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হবে বলে জানানো হয়েছে। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরকে পরিবারগুলির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
নেপাল বিপর্যয়ের পর রাজ্যের নিখোঁজদের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে কিছুটা তারতম্য দেখা গিয়েছে। শুরুতে ৩২ থেকে ৩৭ জনের কথা সামনে এলেও পরবর্তী পর্যায়ে রাজ্য প্রশাসনের তালিকায় ৩৭ জন নিখোঁজের কথা উঠে এসেছে। বসিরহাটের পোদ্দার পরিবারের দু’জনের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হওয়ায় নিখোঁজের সংখ্যাতেও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে। এদিকে, উদ্ধার হয়ে দেশে ফিরে আসা পরিবারের সদস্যেরাও নবান্নে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন। বসিরহাটের পোদ্দার পরিবারের সদস্যেরা নিরাপদে ফিরে আসার জন্য প্রশাসনের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। তবে যাঁদের এখনও কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি, তাঁদের পরিবারগুলির অপেক্ষা অব্যাহত।
নেপাল বিপর্যয়ের পর থেকে শুধু উদ্ধার অভিযান নয়, নিখোঁজদের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজও চলছে। প্রথম-স্তরের আত্মীয়দের রক্তের নমুনা নিয়ে ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করে নেপাল পুলিশের কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। উদ্ধার হওয়া দেহগুলির নমুনার সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে এখন নিখোঁজদের পরিবারগুলির সামনে দুটি সমান্তরাল অপেক্ষা, একদিকে প্রিয়জনের কোনও সন্ধানের আশায় থাকা, অন্যদিকে সংসার চালানোর মতো জরুরি সমস্যার মোকাবিলা করা। নবান্নের বৈঠকে আর্থিক সহায়তা, চাকরি, সন্তানদের পড়াশোনা ও প্রশাসনিক পরিষেবা নিয়ে যে উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে, তা সেই দ্বিতীয় সমস্যার কিছুটা সমাধানের চেষ্টা। আর নিখোঁজদের সন্ধানের ক্ষেত্রে রাজ্য, কেন্দ্র ও নেপাল প্রশাসনের সমন্বয়ই এখন পরিবারের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে অপেক্ষা করা পরিবারগুলির কাছে প্রতিটি নতুন তথ্যের মূল্য তাই অনেক বেশি। উদ্ধার অভিযান, ডিএনএ মিল, সীমান্ত এলাকার তথ্য এবং প্রশাসনিক যোগাযোগ, এই একাধিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই নিখোঁজদের বিষয়ে পরবর্তী খবরের অপেক্ষা করছেন পরিজনেরা। তাঁদের দাবি, সরকারি স্তরে অনুসন্ধান যতদিন চলবে, ততদিন নিয়মিত তথ্য তাঁদের কাছে পৌঁছনো ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আর্থিক সহায়তা অব্যাহত থাকুক।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi, Independence Day 2026 : তরুণদের হাতেই বিকশিত ভারতের স্বপ্ন, বছরে ১ কোটি যুবক-যুবতীকে এআই প্রশিক্ষণের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর




