সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : চারধাম যাত্রার (Char Dham) ছবিটাই বদলে দিতে চলেছে উত্তরাখণ্ডের নতুন রেল যোগাযোগ। দিল্লি (Delhi) থেকে হৃষীকেশ (Rishikesh) পৌঁছতে সময় কমে যেতে পারে কয়েক ঘণ্টায়, আর সেখান থেকে পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি হওয়া নতুন রেলপথ ধরে কর্ণপ্রয়াগেও পৌঁছনো যাবে অনেক কম সময়ে। হিমালয়ের দুর্গম ভূপ্রকৃতির মধ্যে তৈরি হচ্ছে এমন এক রেলপথ, যার বড় অংশই থাকবে মাটির উপরে নয়, পাহাড়ের ভিতর দিয়ে সুড়ঙ্গের মধ্যে। প্রকল্পের কাজ এগোলে কেদারনাথ, বদ্রীনাথ-সহ চারধামগামী তীর্থযাত্রীদের যাত্রার ধকল অনেকটাই কমতে পারে। পাশাপাশি গঢ়বাল হিমালয়ের প্রত্যন্ত এলাকার সঙ্গে যোগাযোগের নতুন দরজাও খুলতে পারে।
হৃষীকেশ-কর্ণপ্রয়াগ রেল প্রকল্পের সাম্প্রতিক অগ্রগতি ইতিমধ্যেই দৃষ্টি কেড়েছে। ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ ১০.৮৪৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘এসকেপ টানেল-১’-এর দুই প্রান্ত যুক্ত হয়েছে। এই সাফল্যের ফলে প্রকল্পে মোট ৪১টি টানেল ব্রেকথ্রু সম্পন্ন হয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় এমন দীর্ঘ সুড়ঙ্গ নির্মাণ অত্যন্ত কঠিন কাজ। ভঙ্গুর ও জটিল ভূস্তরের মধ্য দিয়ে রেলপথ এগিয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে বলেই প্রকল্পটির বড় অংশ সুড়ঙ্গনির্ভর। প্রস্তাবিত দ্রুতগতির রেল যোগাযোগ ও হৃষীকেশ-কর্ণপ্রয়াগ রেললাইন, এই দুই পরিকাঠামো একসঙ্গে কার্যকর হলে দিল্লি থেকে উত্তরাখণ্ডের চারধাম অঞ্চলে যাতায়াতের সময়ের বড় পরিবর্তন হতে পারে বলে প্রকল্প-ভিত্তিক হিসাব সামনে এসেছে। দিল্লি থেকে হৃষীকেশের যাত্রা প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় নামিয়ে আনার সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে। এরপর হৃষীকেশ থেকে কর্ণপ্রয়াগের জন্য নতুন রেলপথ চালু হলে পাহাড়ি পথে দীর্ঘ সড়কযাত্রার পরিবর্তে ট্রেনেই বড় অংশ অতিক্রম করা সম্ভব হবে। তবে দিল্লি-হৃষীকেশ দ্রুত রেল সংযোগের সময়ের হিসাবটি এখনও ভবিষ্যৎ প্রকল্পের সম্ভাব্য যাত্রাসময়ের হিসাব হিসাবেই দেখা উচিত, বর্তমানে চালু দিল্লি-মেরঠ নমো ভারত করিডোরের দৈর্ঘ্য ৮২.১৫ কিলোমিটার এবং সেটি দিল্লি-মেরঠ যাত্রাকে এক ঘণ্টার কম সময়ে নামিয়ে এনেছে।
হৃষীকেশ-কর্ণপ্রয়াগ রেললাইনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যই হল সুড়ঙ্গ। প্রকল্পটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১২৫ কিলোমিটার বলে সাম্প্রতিক সরকারি ও প্রকল্প-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে মূল রেলপথের প্রায় ১০৪ কিলোমিটার সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়ে যাবে এবং আরও একাধিক এসকেপ টানেল তৈরি করা হচ্ছে। অর্থাৎ পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করে ট্রেন চালানোর বদলে প্রকৃতির কঠিন ভূপ্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাহাড়ের ভিতর দিয়েই রেললাইন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই প্রকল্পের সাম্প্রতিক অগ্রগতির মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলির একটি হল এসকেপ টানেল-১-এর কাজ শেষ হওয়া। ঢালওয়ালা থেকে নীরগাড্ডু পর্যন্ত বিস্তৃত এই সুড়ঙ্গটির দৈর্ঘ্য ১০ কিলোমিটারেরও বেশি। ১১ সেপ্টেম্বর দুই প্রান্ত যুক্ত হওয়ার পর প্রকল্পের কাজ আরও এক ধাপ এগিয়েছে। প্রকল্পে মোট ২৮টি টানেলের পরিকল্পনা রয়েছে এবং সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী ২২টি মূল টানেলের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। হৃষীকেশ থেকে কর্ণপ্রয়াগের বর্তমান সড়কযাত্রা পাহাড়ি বাঁক, যানজট ও আবহাওয়ার কারণে সময়সাপেক্ষ। বহু ক্ষেত্রে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। নতুন রেলপথ চালু হলে এই যাত্রার সময় উল্লেখযোগ্য ভাবে কমতে পারে। প্রকল্প-ভিত্তিক হিসাবে হৃষীকেশ থেকে কর্ণপ্রয়াগের যাত্রা আড়াই ঘণ্টার আশপাশে নামিয়ে আনার সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে। সেই হিসাবে দিল্লি থেকে কর্ণপ্রয়াগ পর্যন্ত মোট যাত্রাসময়ও বর্তমানের তুলনায় অনেকটাই কমতে পারে। তবে এই সময়সূচি পুরো রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হওয়ার পরের সম্ভাব্য হিসাব; বাস্তব যাত্রাসময় ট্রেনের গতি, সংযোগ, স্টপেজ এবং পরিষেবার ধরন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
এই রেলপথের সুবিধা সরাসরি কেদারনাথ বা বদ্রীনাথ মন্দিরের দরজায় পৌঁছে দেবে না। তবু চারধাম যাত্রার একটি বড় অংশ সহজ হবে। বদ্রীনাথগামী যাত্রীদের ট্রেনে কর্ণপ্রয়াগ পর্যন্ত পৌঁছে সেখান থেকে সড়কপথে জোশীমঠ ও বদ্রীনাথের দিকে যেতে হবে। অন্য দিকে কেদারনাথের ক্ষেত্রে রুদ্রপ্রয়াগ বা সংশ্লিষ্ট রেল সংযোগস্থলে নেমে গাড়িতে গৌরীকুণ্ডের দিকে যেতে হবে। তারপরই শুরু হবে পদযাত্রা। অর্থাৎ পুরো তীর্থযাত্রার চরিত্র বদলে না গেলেও দীর্ঘ পাহাড়ি সড়কপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রেলপথের আওতায় চলে আসবে। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে প্রবীণ তীর্থযাত্রী এবং পরিবারের সঙ্গে পাহাড়ে যাওয়া যাত্রীদের ক্ষেত্রে। দীর্ঘ সময় ধরে পাহাড়ি সড়কে গাড়িতে যাতায়াত অনেকের জন্য ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে। ট্রেনের মাধ্যমে তুলনামূলক দ্রুত ও নির্দিষ্ট পথে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হলে চারধাম যাত্রার প্রথম পর্বটি অনেক স্বস্তিদায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে পর্যটনের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
হৃষীকেশ-কর্ণপ্রয়াগ রেলপথটি দেহরাদূন, টিহরি গঢ়বাল, পৌড়ী গঢ়বাল, রুদ্রপ্রয়াগ এবং চমোলী জেলার মধ্য দিয়ে যাবে। হৃষীকেশ, মুনি কি রেতি, শিবপুরী, ব্যাসী, দেবপ্রয়াগ, মলেথা, শ্রীনগর গঢ়বাল, তিলানী, গৌচর ও কর্ণপ্রয়াগের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলি এই রেল যোগাযোগের আওতায় আসবে। ফলে প্রকল্পটি শুধু তীর্থযাত্রীদের জন্য নয়, পাহাড়ি অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। উল্লেখ্য, রেল যোগাযোগ তৈরি হলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষিপণ্য দ্রুত সমতলে পাঠানো, ছোট ব্যবসার পরিধি বাড়ানো, পর্যটকদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির মতো একাধিক ক্ষেত্র এতে উপকৃত হতে পারে। যেসব পাহাড়ি এলাকা বর্তমানে দীর্ঘ সড়কপথের কারণে তুলনামূলক বিচ্ছিন্ন, রেল পরিষেবা চালু হলে সেগুলির সঙ্গে বড় শহরের যোগাযোগ আরও সহজ হতে পারে। প্রকল্পের কাজ যে গতিতে এগোচ্ছে, তাতে এখন মূল নজর রয়েছে কবে পুরো রেলপথ চালু হবে তার দিকে। সাম্প্রতিক রিপোর্টগুলিতে ২০২৯ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ পরিষেবা চালুর লক্ষ্য থাকার কথা উঠে এসেছে। পাশাপাশি প্রকল্পের কিছু অংশ তার আগেই চালু করার সম্ভাবনার কথাও বলা হচ্ছে। তবে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট উদ্বোধনের তারিখ চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
হিমালয়ের পাহাড়ের নিচ দিয়ে প্রায় ১০৫ কিলোমিটার রেলপথ যাওয়ার পরিকল্পনা এই প্রকল্পকে দেশের অন্যতম কঠিন রেল নির্মাণ উদ্যোগে পরিণত করেছে। ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি, পাথরের গঠন, পাহাড়ি জলধারা এবং দুর্গম এলাকায় নির্মাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া, প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই জায়গায় একের পর এক সুড়ঙ্গের কাজ শেষ হওয়া প্রকল্পটির অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। দিল্লি থেকে হৃষীকেশ এবং সেখান থেকে কর্ণপ্রয়াগ, এই রেল সংযোগ বাস্তবায়িত হলে চারধাম যাত্রার সময়ের পাশাপাশি উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ি অর্থনীতির গতিও বদলাতে পারে। এখনকার দীর্ঘ সড়কযাত্রার পরিবর্তে ভবিষ্যতে পাহাড়ের বুকের ভিতর দিয়ে ছুটবে ট্রেন। কেদারনাথ-বদ্রীনাথের শেষ গন্তব্যে পৌঁছতে এখনও গাড়ি ও হাঁটার পথ থাকবেই, কিন্তু যাত্রার সবচেয়ে দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর অংশটি যদি রেলের আওতায় আসে, তা হলে তীর্থযাত্রার অভিজ্ঞতাই বদলে যেতে পারে। তাই ২০২৯-কে সামনে রেখে এই প্রকল্পের প্রতিটি সুড়ঙ্গের অগ্রগতির দিকেই এখন দৃষ্টি উত্তরাখণ্ডের পাশাপাশি গোটা দেশের।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Russia to India rail route, India Russia train corridor | রাশিয়া থেকে সরাসরি ট্রেনে ভারত! নতুন রেলপথে কূটনীতি ও বাণিজ্যে বড় চাল, মস্কোর প্রস্তাবে আন্তর্জাতিক মহলে চাঞ্চল্য




