Narendra Modi BRICS bilateral meetings, Modi seven countries meeting | ব্রিক্‌সের শেষ দিনে মোদীর ম্যারাথন কূটনীতি, সাত দেশের সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্য-প্রতিরক্ষা থেকে মহাকাশে নজর

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : দু’দিনের ব্রিক্‌স সম্মেলনের শেষ দিনেও ব্যস্ত কূটনৈতিক কর্মসূচীতে কাটল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) রবিবার। সম্মেলনে যোগ দিতে আসা বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন তিনি। দক্ষিণ আফ্রিকা, ফিলিপিন্স, মিশর, কাজাখস্তান, বুরুন্ডি, উগান্ডা এবং নাইজেরিয়া, মোট সাতটি দেশের সঙ্গে আলাদা করে আলোচনায় বসেন প্রধানমন্ত্রী। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ থেকে প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, পরিকাঠামো, মহাকাশ ও কৌশলগত সহযোগিতা, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে আলোচনায়। ফলে ব্রিক্‌সের আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পাশাপাশি শেষ দিনের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকগুলিও ভারতের বিদেশনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যথেষ্ট তাৎপর্য বহন করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার (Cyril Ramaphosa) সঙ্গে বৈঠকে ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা সম্পর্কের বিস্তৃত পরিসর নিয়ে আলোচনা করেন মোদী। বিরল খনিজ থেকে পরিকাঠামো, খাদ্য নিরাপত্তা থেকে প্রযুক্তি ইত্যাদি একাধিক ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা কী ভাবে আরও বাড়ানো যায়, তা নিয়ে কথাবার্তা হয়েছে। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে বিরল খনিজের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, আধুনিক প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও নানা শিল্পক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় একাধিক খনিজের জোগান নিশ্চিত করা এখন বিভিন্ন দেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেই প্রেক্ষাপটে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে সহযোগিতার বিষয়টি বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে।

আরও পড়ুন : Narendra Modi BRICS Speech, Rare Earth Minerals | জিনপিংয়ের সামনেই বিরল মৃত্তিকা নিয়ে মোদীর কড়া বার্তা, প্রযুক্তি-খনিজকে হাতিয়ার করার বিরুদ্ধে সরব ভারত

আলোচনায় দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কের বিভিন্ন দিকও উঠে আসে। আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলির সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ আরও বাড়ানোর বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন নরেন্দ্র মোদী। আফ্রিকার উন্নয়নকে সামনে রেখে ভারত একসঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী বলেও তিনি জানিয়েছেন। বাণিজ্যিক সম্পর্কের পাশাপাশি প্রযুক্তি ও উন্নয়নমূলক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ আরও গভীর করার সম্ভাবনা রয়েছে। এর পর ফিলিপিন্সের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়রের (Ferdinand Marcos Jr.) সঙ্গে বৈঠক করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ভারত ও ফিলিপিন্সের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও প্রযুক্তির পাশাপাশি মহাকাশবিজ্ঞান নিয়েও দুই রাষ্ট্রনেতার মধ্যে কথা হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দেশ ফিলিপিন্সের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

বাণিজ্যিক সম্পর্কের পাশাপাশি দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়। ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির ক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই পরিসরে ফিলিপিন্সের সঙ্গে অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও কৌশলগত সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ ভারতের বৃহত্তর পূর্বমুখী নীতির সঙ্গেও যুক্ত। মিশরের প্রেসিডেন্ট আব্দেল ফাতাহ এল-সিসি -এর (Abdel Fattah el-Sisi) সঙ্গেও বৈঠক করেন মোদী। বৈঠকটিকে নিজের সমাজমাধ্যম পোস্টে ‘অসাধারণ’ বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। ভারত-মিশর বন্ধুত্ব এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও দুই রাষ্ট্রনেতার মধ্যে আলোচনা হয়। চলতি পশ্চিম এশিয়া সংঘাতের প্রেক্ষাপটে মিশরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সংঘাতের পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও মধ্যস্থতার ক্ষেত্রেও কায়রোর ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। ফলে মিশরের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মোদীর বৈঠকে আঞ্চলিক পরিস্থিতি উঠে আসা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। মিশরের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কৌশলগত যোগাযোগের ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্কের পরিধি রয়েছে। ব্রিক্‌সের মতো বহুপাক্ষিক মঞ্চে দুই দেশের রাষ্ট্রনেতার বৈঠক সেই সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি করেছে।

আরও পড়ুন : PM Narendra Modi on foreign travel | বিদেশ ভ্রমণ থেকে সোনা কেনা অভ্যাস বদলের ডাক নরেন্দ্র মোদীর, দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে দেশেই খরচের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

রবিবারের সাতটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মধ্যে কাজ়াখস্তান, বুরুন্ডি, উগান্ডা ও নাইজেরিয়ার সঙ্গেও আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। আফ্রিকার দুই দেশ বুরুন্ডি ও উগান্ডার সঙ্গে ভারতের উন্নয়ন সহযোগিতা, বাণিজ্য ও পারস্পরিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নাইজেরিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কৌশলগত সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আফ্রিকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার যে উদ্যোগ নয়াদিল্লি দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে আসছে, ব্রিক্‌স সম্মেলনের মঞ্চে সেই প্রচেষ্টারও প্রতিফলন দেখা গেল। কাজাখস্তানের সঙ্গে আলোচনাতেও দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক গুরুত্ব পেয়েছে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি ও কৌশলগত সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ব্রিক্‌সের মতো আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে কাজ়াখস্তানের নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসা সেই সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি সুযোগ তৈরি করেছে।

রবিবারের বৈঠকের আগে ব্রিক্‌স সম্মেলনের ফাঁকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (Vladimir Putin), ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান (Masoud Pezeshkian) ও চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের (Xi Jinping) সঙ্গেও দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছিলেন মোদী। ফলে দু’দিনের সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দেশের রাষ্ট্রনেতার সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসার সুযোগ পেয়েছেন। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, কৌশলগত সম্পর্ক এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার মতো বিষয়গুলিও সেই আলোচনায় উঠে এসেছে।

ব্রিক্‌স সম্মেলন উপলক্ষ্যে শনিবার রাতে নতুন দিল্লির ভারত মণ্ডপমে বিদেশি অতিথিদের জন্য নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের আমন্ত্রিতরাও উপস্থিত ছিলেন। বিজেপি-শাসিত ছয় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরাও ওই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন বলে দেওয়া তথ্য থেকে জানা গিয়েছে। তাঁদের মধ্যে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ (Yogi Adityanath), মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীস (Devendra Fadnavis), অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা (Himanta Biswa Sarma), উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিংহ ধামী (Pushkar Singh Dhami) ও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা (Rekha Gupta) -এর নাম রয়েছে। উল্লেখ্য, দেশের সব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকেই নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বলে জানানো হয়েছে। তবে বিরোধী-শাসিত রাজ্যগুলির পক্ষ থেকে কোনও প্রতিনিধি ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হননি বলে সূত্র মারফৎ দাবি করা হয়েছে। ফলে ব্রিক্‌স সম্মেলনের আন্তর্জাতিক কূটনীতির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিসরেও নৈশভোজটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

ব্রিক্‌স সম্মেলনের শেষ দিনে মোদীর একের পর এক বৈঠক থেকে ভারতের বিদেশনীতি নিয়ে একটি বৃহত্তর ছবি সামনে এসেছে। শুধু বড় শক্তিধর দেশ নয়, আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়ানোর উপর জোর দেওয়া হয়েছে। কোথাও বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, কোথাও প্রযুক্তি ও মহাকাশ, আবার কোথাও প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সহযোগিতা, দেশভেদে আলোচনার অগ্রাধিকারও আলাদা ছিল। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যখন বাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, তখন ব্রিক্‌সের মঞ্চকে কাজে লাগিয়ে একাধিক দেশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করেছে ভারত। বিশেষ করে আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দুই দিক থেকেই আরও বিস্তৃত করার ইঙ্গিত মিলেছে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকগুলিতে। প্রসঙ্গত, দু’দিনের সম্মেলন শেষ হলেও ব্রিক্‌সের মঞ্চে হওয়া এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনার প্রভাব আগামী দিনে কতটা পড়ে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে। বাণিজ্য থেকে প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা থেকে মহাকাশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে কথাবার্তা হয়েছে, তার ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে নতুন চুক্তি, সহযোগিতা বা যৌথ উদ্যোগের দরজা খুলতে পারে। ফলে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হলেও ভারতের কূটনৈতিক তৎপরতার পরবর্তী পর্ব শুরু হওয়ার অপেক্ষা এখন।

ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : BRICS Summit Delhi, Narendra Modi Vladimir Putin Xi Jinping | ব্রিক্‌সের মঞ্চে মোদী-পুতিন-শি, আমেরিকার নীতির আবহে তাৎপর্যপূর্ণ তিন রাষ্ট্রনেতার ছবি

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন