Ganga Water Sharing Treaty 2026 | Tarique Rahman India Visit : গঙ্গার জলচুক্তি নিয়ে বাড়ছে টানাপড়েন, তারেকের ভারত সফরের দিকে নজর দিল্লির

SHARE:

১২ ডিসেম্বর ২০২৬-এ মেয়াদ শেষ হতে চলেছে ভারত-বাংলাদেশের গঙ্গার জল বণ্টন চুক্তি, নবীকরণ নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা এবং তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর।

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার জল বণ্টন নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ জলচুক্তির মেয়াদ আগামী ১২ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের আগে চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত মেলেনি। ফলে শুষ্ক মরসুমে গঙ্গার জল বণ্টন কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে দুই দেশেই আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ জল পাওয়ার যে ব্যবস্থা এত দিন কার্যকর ছিল, তার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, ভারতের অভ্যন্তরীণ জলচাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় পুরনো চুক্তির শর্তগুলি নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের (Tarique Rahman) সম্ভাব্য ভারত সফরও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁর সফরের সময়সূচি এবং দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনার ফলের উপর জলচুক্তির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করতে পারে বলে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।

১২ ডিসেম্বর ২০২৬-এ মেয়াদ শেষ হতে চলেছে ভারত-বাংলাদেশের গঙ্গার জল বণ্টন চুক্তি, নবীকরণ নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা এবং তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত

আরও পড়ুন : PM Narendra Modi on West Asia Conflict | পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিয়ে বিরোধীদের নিশানা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর, সার ও জ্বালানি সঙ্কট ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত

১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার জল বণ্টন চুক্তি (Ganga Water Sharing Treaty) স্বাক্ষরিত হয়েছিল। দুই দেশের মধ্যে নদীর জল ভাগাভাগি নিয়ে দীর্ঘদিনের টানাপড়েনের পর এই চুক্তি একটি স্থায়ী কাঠামো তৈরি করেছিল। চুক্তির মেয়াদ নির্ধারিত হয়েছিল ৩০ বছর। সেই হিসাবেই ২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বর এর মেয়াদ শেষ হচ্ছে। ফলে হাতে সময় খুব বেশি নেই। নতুন করে চুক্তি স্বাক্ষর হবে, পুরনো চুক্তির শর্ত সংশোধন করে মেয়াদ বাড়ানো হবে, নাকি সম্পূর্ণ নতুন কোনও সমঝোতায় পৌঁছবে দুই দেশ, তা নিয়ে কৌতূহল বাড়ছে। গঙ্গার জল বণ্টনের বিষয়টি মূলত ফারাক্কা ব্যারাজকে (Farakka Barrage) কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে অবস্থিত এই ব্যারাজ থেকে শুষ্ক মরসুমে বাংলাদেশের দিকে প্রবাহিত জলের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় চুক্তির নির্দিষ্ট সূত্র অনুযায়ী। প্রতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত নদীর জলপ্রবাহের পরিমাণ বিবেচনা করে দশ দিন অন্তর জল ভাগের হিসাব করা হয়। নদীতে জলের প্রাপ্যতা অনুযায়ী ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বরাদ্দের অনুপাতও পরিবর্তিত হয়।

চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল, ১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত নির্দিষ্ট তিনটি পর্যায়ক্রমিক দশ দিনের সময়ে ভারত ও বাংলাদেশ প্রত্যেকেই ৩৫ হাজার কিউসেক জল পাওয়ার নিশ্চয়তা পায়। তবে এই নিশ্চয়তা সারা শুষ্ক মরসুমের জন্য একটানা প্রযোজ্য নয়। নদীতে জলের পরিমাণ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে দুই দেশের মধ্যে সমান ভাগে জল বণ্টনের নিয়ম রয়েছে। প্রবাহ ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে থাকলে বাংলাদেশ পায় ৩৫ হাজার কিউসেক ও বাকি জল ভারত পায়। আর প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেক ছাড়ালে ভারত পায় ৪০ হাজার কিউসেক, অবশিষ্ট জল যায় বাংলাদেশের ভাগে। এই জল বণ্টন ব্যবস্থা বাংলাদেশের কৃষি, পানীয় জল এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বিশেষ করে শুষ্ক মরসুমে পদ্মা নদীতে জলের প্রবাহ বজায় রাখা বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ-সহ বিভিন্ন রাজ্যে কৃষিকাজ, পানীয় জল এবং শিল্পের জন্য গঙ্গার জল অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বিহার থেকেও জলসম্পদের উপর বাড়তি চাপের কথা সামনে এসেছে। ফলে নতুন চুক্তি নিয়ে আলোচনায় দুই দেশের নিজস্ব প্রয়োজন ও ভবিষ্যতের জল নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চলেছে।

আরও পড়ুন : Sheikh Hasina return Bangladesh, Sheikh Hasina December return | ডিসেম্বরে দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে পূর্ণ নিরাপত্তা, বিচার হবে আইনের পথেই: তারেক রহমানের উপদেষ্টার দাবি

ভারতের অবস্থানের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ জলচাহিদা একটি বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। কৃষিকাজের সম্প্রসারণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ এবং শিল্পের বিকাশের ফলে গঙ্গা অববাহিকায় জলের প্রয়োজন আগের তুলনায় বেড়েছে। বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যগুলির চাহিদাও নতুন করে বিবেচনায় নেওয়ার দাবি উঠছে। শুধু আন্তর্জাতিক চুক্তির শর্ত বজায় রাখাই নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পানীয় জল, সেচ ও শিল্পের প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাও কেন্দ্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণে পুরনো চুক্তির মেয়াদ ও শর্ত অপরিবর্তিত রেখে এগোনোর বদলে নতুন পরিস্থিতি অনুযায়ী সংশোধনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আলোচনার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল চুক্তির মেয়াদ। বিভিন্ন মহলে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পরিবর্তে তুলনামূলক কম সময়ের জন্য নতুন সমঝোতা করার প্রস্তাবও উঠে এসেছে। নির্দিষ্ট সময় অন্তর জলপ্রবাহ, বর্ষার ধরন এবং দুই দেশের চাহিদা পর্যালোচনা করে শর্ত পরিবর্তনের সুযোগ রাখার পক্ষেও মত রয়েছে। তবে এ বিষয়ে ভারত সরকারের চূড়ান্ত অবস্থান কী হবে, তা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।

বাংলাদেশের তরফে অবশ্য নতুন চুক্তির বিষয়ে আগ্রহ আছে। ঢাকার অন্যতম দাবি, নতুন সমঝোতায় বাংলাদেশের প্রাপ্য জলের নিশ্চয়তা আরও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। শুষ্ক মরসুমে নদীর প্রবাহ কমে গেলে বাংলাদেশের কৃষি ও সাধারণ মানুষের জলপ্রাপ্তি যাতে বড়সড় সমস্যার মুখে না পড়ে, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে শুধু পুরনো চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোই না। একইসঙ্গে জল বণ্টনের নিয়মে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন নিয়ে আসার বিষয়টিও আলোচনার কেন্দ্রে বলে সূত্রের খবর। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের (Tarique Rahman) সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে কূটনৈতিক মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এখনও পর্যন্ত তাঁর সফরের চূড়ান্ত দিনক্ষণ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। তবে নভেম্বরের শেষ ভাগ অথবা ডিসেম্বরের প্রথম দিকে তাঁর নতুন দিল্লি সফরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। দুই দেশের সম্পর্কের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে এই সফর গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে গঙ্গার জল বণ্টন, সীমান্ত সংক্রান্ত বিষয় এবং দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র নিয়ে শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari Matua Announcement | ঠাকুরনগরে বড় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর, মতুয়া উন্নয়নে ৫০ কোটি ও পৃথক পুরসভার প্রতিশ্রুতি

এক্ষেত্রে নতুন দিল্লির অবস্থান নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সূত্রে দাবি করা হয়েছে, তারেক রহমানের ভারত সফর না হলে পুরনো চুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়নের সম্ভাবনা কমতে পারে। একই সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ কমানো ও শর্তে পরিবর্তন আনার বিষয়টিও বিবেচনায় আছে বলে ওই সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও ভারত সরকারের তরফে এমন কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি, তবু সময়সীমা যত এগিয়ে আসছে, ততই বিষয়টি নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতার গুরুত্ব বাড়ছে।

আরও পড়ুন : PM POSHAN West Bengal, cook cum helper salary | পশ্চিমবঙ্গের স্কুলের রান্নাকর্মীদের বেতন, বোনাস ও অবসর সুবিধার দাবি

কিন্তু, জলচুক্তি নিয়ে আলোচনা যে একেবারেই বন্ধ আছে, এমন নয়। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল (Randhir Jaiswal) বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন, দুই দেশের নদী ও জলসম্পর্কিত বিষয়গুলি যৌথ নদী কমিশনের (Joint Rivers Commission) কাঠামোর মধ্যেই আলোচনা করা হয়। কারিগরি স্তরেও বৈঠক ও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক স্তরের আলোচনা ও প্রযুক্তিগত পর্যায়ের সমন্বয় এই দুই ক্ষেত্রেই পরবর্তী পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। ভারতের সংসদেও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ২০২৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি লোকসভায় বিদেশ মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছিল, ১৯৯৬ সালের গঙ্গা জল বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বর ২০২৬-এ শেষ হচ্ছে ও তখন পর্যন্ত নবীকরণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়নি। পাশাপাশি বিভিন্ন অংশীদারের কাছ থেকে পানীয় জল ও শিল্পের প্রয়োজন সংক্রান্ত মতামত নেওয়ার বিষয়টিও সংসদীয় উত্তরে উঠে আসে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতিনিধিও এই বিষয়ে কেন্দ্রের আন্তঃমন্ত্রক আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন।

গঙ্গার জল বণ্টন নিয়ে সিদ্ধান্তের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে সীমান্তের দুই পারের নদীনির্ভর জনজীবনে। পশ্চিমবঙ্গের কৃষক, মৎস্যজীবী, নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দা ও বাংলাদেশের পদ্মা অববাহিকার মানুষের জীবনযাত্রা নদীর জলপ্রবাহের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই নতুন চুক্তি নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় দুই দেশের প্রয়োজন, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ এবং ভবিষ্যতের জলসম্পদের পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি। এখন দেখার যে, তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর আর দুই দেশের পরবর্তী কূটনৈতিক আলোচনার দিকে। ১২ ডিসেম্বরের আগে নতুন সমঝোতা সম্ভব হয় কি না, পুরনো চুক্তির শর্তে কী ধরনের পরিবর্তন আসে ও বাংলাদেশের জলপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা কীভাবে নির্ধারিত হয়, তা আগামী কয়েক সপ্তাহে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। গঙ্গার জল শুধু দুই দেশের মধ্যে একটি সম্পদ বণ্টনের বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা। তাই চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে কূটনৈতিক সমঝোতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জলনিরাপত্তার বিষয়টিও বড় ভূমিকা নিতে চলেছে।

ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : মোবাইল রিচার্জের দাম ঊর্ধ্বমুখী: ভারতে বাড়ছে ডিজিটাল খরচের চাপ, বিপাকে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবার

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন