সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : নতুন দিল্লিতে ফের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi), রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (Vladimir Putin) এবং চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (Xi Jinping)। ব্রিক্স (BRICS) সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনেও তিন রাষ্ট্রনেতার একসঙ্গে ছবি ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে একাধিক রাষ্ট্রনেতার সঙ্গে ছবি তোলা স্বাভাবিক কূটনৈতিক রীতি হলেও, মোদী-পুতিন-শি এই তিন নেতার এক ফ্রেমে উপস্থিতি বরাবরই বাড়তি নজর কেড়েছে। দিল্লিতে এ বারের ব্রিক্স সম্মেলনের আবহে সেই ছবির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্য আরও বেড়েছে। উল্লেখ্য, শনিবারও পুতিন ও শি-কে পাশে নিয়ে ছবি তুলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। রবিবার ফের একই দৃশ্য দেখা গেল। ১১ সদস্যের ব্রিক্স জোটের প্রতিনিধিদের নিয়ে আয়োজিত যৌথ ছবিতেও মোদীর দুই পাশে ছিলেন রাশিয়া ও চিনের রাষ্ট্রপ্রধান। ফলে পর পর দু’দিন বিশ্বের তিন গুরুত্বপূর্ণ শক্তির নেতাকে একই ফ্রেমে দেখা যাওয়ায় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দিল্লির অবস্থান নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
ব্রিক্সকে ঘিরে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) আপত্তি নতুন নয়। বিশেষ করে রাশিয়া এবং চিনকে ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হয়। সেই দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ধারাবাহিক যোগাযোগ তাই কূটনৈতিক দিক থেকে গুরুত্ব বহন করছে। এর আগে চিনের তিয়ানজিনে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন বা এসসিও (SCO) সম্মেলনেও মোদী, পুতিন ও শি-কে একই ফ্রেমে দেখা গিয়েছিল। সেই ছবি নিয়েও ট্রাম্পের মন্তব্য সামনে এসেছিল। দিল্লির সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতার দিকে তাকালে ছবিটিকে শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। ব্রিক্স সম্মেলনের আগে পুতিনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন মোদী। পরের দিন শি জিনপিংয়ের সঙ্গেও বৈঠকে বসেন তিনি। অর্থাৎ একই আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাশিয়া ও চিনের সঙ্গে ভারতের পৃথক দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগও হয়েছে। এক দিকে মস্কোর সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ দিনের সম্পর্ক, অন্য দিকে গলওয়ান সংঘাতের পর ভারত-চিন সম্পর্কের টানাপড়েন কমানোর উদ্যোগ, দুই দিকই দিল্লির বর্তমান কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভারত-চিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে গত কয়েক বছরে সীমান্ত পরিস্থিতি বড় প্রশ্ন হয়ে ছিল। গলওয়ান সংঘাতের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে কমানোর চেষ্টা চালিয়েছে নতুন দিল্লি ও বেজিং। বিভিন্ন পর্যায়ে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ এবং সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে দিল্লির মাটিতে মোদী ও শি-র পাশাপাশি উপস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলের কাছে আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। অন্য দিকে, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বহু দিনের। প্রতিরক্ষা থেকে জ্বালানি, নানা ক্ষেত্রেই মস্কোর সঙ্গে দিল্লির যোগাযোগ রয়েছে। ইউক্রেন সংঘাতের পরও রাশিয়া থেকে ভারতের তেল কেনা নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নয়াদিল্লির মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। রুশ তেল আমদানির প্রশ্নে ভারতের উপরে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েও দুই দেশের মধ্যে চাপানউতোর হয়েছে। ফলে মোদী-পুতিনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং একই সঙ্গে শি-র সঙ্গে ভারতের নতুন করে কূটনৈতিক যোগাযোগ, দুই ঘটনাই আন্তর্জাতিক রাজনীতির বৃহত্তর সমীকরণের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ব্রিক্স সম্মেলনের আলোচনাতেও উঠে এসেছে আমেরিকার বাণিজ্যনীতি। ১১ দেশের জোট ঐকমত্যের ভিত্তিতে যে যৌথ ঘোষণাপত্র প্রকাশ করেছে, সেখানে কোনও দেশের নাম সরাসরি উল্লেখ না করেই একতরফা শুল্কনীতির বিরোধিতা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্ককে রাজনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জোট। গুরুত্ব পেয়েছে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতিও। গাজ়া ও বৃহত্তর পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ব্রিক্স। ইরানকে ঘিরে আমেরিকার সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক উত্তেজনা এবং গাজায় ইজরায়েলের সামরিক অভিযান এই দুই প্রেক্ষাপটে ব্রিক্সের অবস্থান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নজর কেড়েছে। কারণ ব্রিক্সের সদস্যদেশ ইরান এক দিকে যেমন পশ্চিম এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শক্তি, তেমনই ইজ়রায়েলের সঙ্গে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দীর্ঘ দিনের।
ভারতের জন্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে যৌথ ঘোষণাপত্রে। পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার নিন্দা জানিয়েছে ব্রিক্স। ভারত ওই হামলার পিছনে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গিদের যোগের অভিযোগ করে আসছে। অন্য দিকে, চিনের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। এই অবস্থায় ব্রিক্সের যৌথ নথিতে পহেলগাঁও হামলার নিন্দা এবং তাতে শি জিনপিংয়ের সম্মতি ভারতের কূটনৈতিক পরিসরে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ব্রিক্সের মঞ্চে মোদী নিজেও জোটটির অবস্থান নিয়ে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য, ব্রিক্স কোনও নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া জোট নয়। বরং পারস্পরিক সহযোগিতা ও একসঙ্গে এগিয়ে চলাই এর লক্ষ্য। ফলে ব্রিক্সের মঞ্চে রাশিয়া ও চিনের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা যেমন দেখা যাচ্ছে, তেমনই দিল্লি এই জোটকে কোনও নির্দিষ্ট শক্তির বিরোধী মঞ্চ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে না।
বিশ্ব রাজনীতিতে বর্তমানে একদিকে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমী জোট, অন্য দিকে রাশিয়া ও চিনকে ঘিরে শক্তির সমীকরণ এই দুই মেরুর মধ্যে বিভিন্ন দেশ নিজেদের কূটনৈতিক পরিসর তৈরি করছে। ভারতও সেই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে একাধিক শক্তির সঙ্গে একই সময়ে সম্পর্ক বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক যেমন রয়েছে, তেমনই মস্কোর সঙ্গে পুরনো যোগাযোগ এবং বেজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগও চলছে। এই পরিস্থিতিতে দিল্লির ব্রিক্স মঞ্চে মোদী-পুতিন-শি-র পাশাপাশি দাঁড়ানো ছবি তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক মুহূর্তের ছবি হয়ে থাকছে না। তিন দেশের নিজস্ব স্বার্থ, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যের প্রশ্নে ছবিটি একটি প্রতীকী দৃশ্য হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে আমেরিকার শুল্কনীতি, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য, চিনের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্ক এবং পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত—সবকিছুর মধ্যে ব্রিক্সের ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
দিল্লির মঞ্চ থেকে মোদী যে কূটনৈতিক ভারসাম্যের ছবি তুলে ধরতে চাইছেন, পুতিন ও শি-র সঙ্গে পর পর দু’দিনের এই উপস্থিতি তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ব্রিক্সের ভবিষ্যৎ ভূমিকা, ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক এবং ভারত-চিন যোগাযোগ—আগামী দিনে এই তিনটি ক্ষেত্রেই নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের। আপাতত দিল্লির মাটিতে একই ফ্রেমে মোদী, পুতিন ও শি-র উপস্থিতিই হয়ে উঠেছে ব্রিক্স সম্মেলনের অন্যতম আলোচিত দৃশ্য।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Annapurna Yojana 3000 rupees, Annapurna Yojana payment date | প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জন্মদিনেই অন্নপূর্ণা যোজনার ৩০০০ টাকা! ১৭ সেপ্টেম্বর অ্যাকাউন্টে ঢুকবে অর্থ, নভেম্বরে ফের আবেদনের সুযোগ


