সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ব্রিক্স সম্মেলনের (BRICS Summit 2026) নৈশভোজে আমিষ পদ না থাকা নিয়ে বিতর্ক থামার নাম নেই। দিল্লির ভারত মণ্ডপমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) আয়োজিত নৈশভোজের মেনুতে পনির, মিলেট, জিলিপি-সহ একাধিক ভারতীয় পদ থাকলেও মাছ-মাংসের কোনও আয়োজন ছিল না। সেই মেনু ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোরের মধ্যেই এ বার সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi)। সরাসরি ব্রিক্সের নৈশভোজের প্রসঙ্গ না তুললেও তাঁর পোস্টের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। পাল্টা কংগ্রেসকে নিশানা করেছেন কেন্দ্রীয় সংসদ বিষয়কমন্ত্রী কিরেন রিজিজু (Kiren Rijiju)। রবিবার নিজের সমাজমাধ্যম অ্যাকাউন্টে উত্তর ভারতের জনপ্রিয় খাবার ছোলে ভাটুরের ছবি পোস্ট করেন রাহুল। ছবির সঙ্গে তিনি লেখেন, ‘উল্লেখ্য যে, ৮০ শতাংশ ভারতীয়ই আমিষাশী। ভারতের আমিষ পদগুলি সুস্বাদু, যেমন আমার বোনের ছোলে ভাটুরেও।’ রাহুলের এই পোস্টে ব্রিক্সের নৈশভোজের কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক বিতর্কের সময় ও বিষয় বিবেচনা করে রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা, নিরামিষ মেনু নিয়ে কেন্দ্রকে পরোক্ষে আক্রমণ করতেই এই পোস্ট করেছেন তিনি।
রাহুলের পোস্টে আরও একটি রাজনৈতিক ইঙ্গিত খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে। ছোলে ভাটুরে আদতে নিরামিষ পদ হলেও সেটিকে সামনে রেখে ভারতের খাদ্যাভ্যাসের বৈচিত্র্যের কথা তুলে ধরেছেন কংগ্রেস নেতা। তাঁর বক্তব্যে আমিষ খাবারের প্রসঙ্গ থাকলেও ছবিতে রয়েছে তাঁর বোন প্রিয়ঙ্কা গাঁধী বাড্রার (Priyanka Gandhi Vadra) পছন্দের ছোলে ভাটুরে। ফলে খাবার নিয়ে কোনও নির্দিষ্ট পক্ষ নেওয়ার বদলে ভারতীয়দের খাদ্যাভ্যাসের বহুত্বকেই সামনে আনা হয়েছে বলে মনে করছেন কংগ্রেসের সমর্থকেরা। রাহুলের পোস্টের আগেই ব্রিক্স নৈশভোজের মেনু নিয়ে সরাসরি সরব হয়েছিল কংগ্রেস। দলের নেতা পবন খেড়া (Pawan Khera) কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে নিশানা করে অভিযোগ করেন, মানুষের খাদ্যাভ্যাসের উপর নিজেদের পছন্দ চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে বিজেপির। তাঁর বক্তব্য, ভারতের মানুষ কী খাবেন, কী খাবেন না, সেই সিদ্ধান্ত তাঁদের নিজেদের। তাঁর অভিযোগ, এ বার সেই পছন্দের পরিধি দেশের বাইরের অতিথিদের ক্ষেত্রেও পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
পবন খেড়ার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়। কারণ ব্রিক্স সম্মেলনে যোগ দিতে দিল্লিতে এসেছিলেন একাধিক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও শীর্ষ নেতা। তাঁদের সম্মানে আয়োজিত নৈশভোজে শুধুমাত্র নিরামিষ পদ পরিবেশন করা নিয়ে কংগ্রেসের প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের খাদ্যসংস্কৃতির সব দিক তুলে ধরা হল কি না। দলটির বক্তব্য, ভারতের খাদ্যাভ্যাসে যেমন নিরামিষের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে, তেমনই মাছ, মাংস ও ডিম খাওয়ার সংস্কৃতিও দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রচলিত। কংগ্রেসের অভিযোগ অবশ্য মানতে নারাজ কেন্দ্র। রাহুল ও তাঁর দলের বক্তব্যের পাল্টা জবাব দিয়েছেন কিরেন রিজিজু। তাঁর অভিযোগ, ব্রিক্স সম্মেলনে আসা রাষ্ট্রপ্রধানদের খাবারের মেনু নিয়েও রাজনীতি করছে কংগ্রেস। রিজিজুর বক্তব্য, বিদেশি অতিথিদের জন্য যে খাবারের আয়োজন করা হয়েছিল, সেখানে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের খাদ্যসংস্কৃতিকে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে খাবারের স্বাদ এবং পুষ্টির দিকটিও বিবেচনায় রাখা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
রিজিজু বলেন, ‘আমি ভাবতেই পারছি না যে, ব্রিক্স সম্মেলনে আসা নেতাদের খাবারের মেনু নিয়ে কংগ্রেস রাজনীতি করছে।’ তাঁর দাবি, ভারতে আসা রাষ্ট্রপ্রধানেরা নিরামিষ খাবার গ্রহণ করেছেন। মেনুতে দেশের আঞ্চলিক বৈচিত্র্য তুলে ধরার চেষ্টা ছিল বলেও জানান তিনি। অর্থাৎ কেন্দ্রের অবস্থান, নিরামিষ নৈশভোজ কোনও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং অতিথিদের সামনে ভারতের খাদ্যসংস্কৃতির একটি নির্দিষ্ট দিক তুলে ধরার আয়োজন। বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি পরিসংখ্যানও। রাহুল গাঁধীর পোস্টে দাবি করা হয়েছে, দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ আমিষাশী। তবে জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা বা এনএফএইচএসের (NFHS) সর্বশেষ প্রতিবেদনে ভারতীয়দের আমিষ ও নিরামিষ খাদ্যাভ্যাসের সামগ্রিক অনুপাতের কোনও নতুন পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি। ফলে রাহুলের ব্যবহৃত সংখ্যাটি নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
আগের এনএফএইচএসের তথ্য অবশ্য দেশের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়। ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সি পুরুষদের ৮৩.৪ শতাংশ এবং মহিলাদের ৭০.৬ শতাংশ কোনও না কোনও সময়ে মাছ অথবা মাংস খেয়েছেন। ফলে ভারতের খাদ্যসংস্কৃতিতে আমিষ খাবারের উপস্থিতি যে যথেষ্ট বড়, তা ওই তথ্য থেকে বোঝা যায়। তবে ‘আমিষাশী’ বলতে নিয়মিত আমিষ খাবার খান এমন মানুষ, নাকি জীবনের কোনও সময়ে মাছ-মাংস খেয়েছেন এমন মানুষ, এই দুইয়ের মধ্যে পরিসংখ্যানগত পার্থক্য রয়েছে। ব্রিক্সের নৈশভোজের মেনু নিয়ে বিতর্কের আর একটি দিকও রয়েছে। ভারতের মতো বিশাল দেশে খাদ্যাভ্যাস অঞ্চল, সম্প্রদায়, পারিবারিক সংস্কৃতি ও ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী বদলে যায়। বাংলায় মাছের দীর্ঘ ঐতিহ্য যেমন রয়েছে, তেমনই উত্তর ভারতে বিভিন্ন নিরামিষ পদ জনপ্রিয়। দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের খাবারেও রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। ফলে কোনও একটি খাবারের ধরনকে সামনে রেখে গোটা দেশের খাদ্যসংস্কৃতিকে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
ব্রিক্স নৈশভোজে মিলেট-ভিত্তিক পদ, পনির এবং মিষ্টান্ন রাখার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র তাই রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হলেও কেন্দ্রের বক্তব্য, অতিথিদের জন্য ভারতীয় খাদ্যসংস্কৃতির বৈচিত্র্য ও পুষ্টিগুণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্য দিকে কংগ্রেসের প্রশ্ন, সেই বৈচিত্র্যের মধ্যে আমিষ খাবারের কোনও জায়গা কেন থাকল না। রাহুল গান্ধী-এর পোস্ট সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তিনি সরাসরি কেন্দ্র বা ব্রিক্সের নৈশভোজের নাম না নিলেও তাঁর বক্তব্যের সময় ও বিষয়বস্তু নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে ‘৮০ শতাংশ ভারতীয়ই আমিষাশী’ মন্তব্যটি নৈশভোজের নিরামিষ মেনুর সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন কংগ্রেস ও বিজেপির নেতারা। উল্লেখ্য, এক দিকে রাহুল গাঁধীর পোস্টকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসের খাদ্যস্বাধীনতার যুক্তি সামনে এসেছে, অন্য দিকে রিজিজু অভিযোগ তুলেছেন খাবারকেও রাজনৈতিক বিতর্কে টেনে আনার। ফলে ব্রিক্স সম্মেলনের কূটনৈতিক আলোচনা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং রাষ্ট্রপ্রধানদের বৈঠকের পাশাপাশি দিল্লির নৈশভোজের মেনুও এখন রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্রিক্স সম্মেলনের মঞ্চে ভারত যে নিজের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তুলে ধরতে চেয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক নেই। কিন্তু সেই বৈচিত্র্যের কতটা খাবারের মেনুতে প্রতিফলিত হয়েছে, তা নিয়েই মতভেদ। রাহুলের ছোলে ভাটুরে পোস্ট থেকে শুরু করে রিজিজুর পাল্টা অভিযোগ, নৈশভোজের নিরামিষ মেনু আপাতত কূটনৈতিক আয়োজনের গণ্ডি ছাড়িয়ে পৌঁছে গিয়েছে দেশের রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন :BRICS Summit Delhi, Narendra Modi Vladimir Putin Xi Jinping | ব্রিক্সের মঞ্চে মোদী-পুতিন-শি, আমেরিকার নীতির আবহে তাৎপর্যপূর্ণ তিন রাষ্ট্রনেতার ছবি


