শোভনা মাইতি, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: দীপাবলি (Diwali) মানেই আলোর উৎসব, বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো, কালীপুজো, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সময় কাটানো আর উৎসবের আমেজে কয়েকটা দিন কাটিয়ে দেওয়া। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলাচ্ছে উৎসব উদ্যাপনের ধরন। এখন আর বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যে দীপাবলির আনন্দ সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছেন না নতুন প্রজন্মের বহু মানুষ। বরং হাতে কয়েক দিনের ছুটি এলেই ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ার পরিকল্পনা করছেন তাঁরা। কারও পছন্দ সমুদ্রের নীল জল, কারও টান পাহাড়ের নির্জন পথের দিকে। আবার অনেকে চেনা পর্যটনকেন্দ্রের বাইরে গিয়ে নতুন শহর, নতুন সংস্কৃতি এবং অজানা জায়গা আবিষ্কার করতে আগ্রহী। অনলাইন ভ্রমণ সংস্থা ও আবাসন বুকিং প্ল্যাটফর্মগুলির সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেও উঠে এসেছে এই পরিবর্তিত প্রবণতার ছবি। বিশেষ করে কম বয়সিদের মধ্যে উৎসবের ছুটিতে ভ্রমণের আগ্রহ উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়ছে। বেড়ানোর (Travel) এই প্রবণতায় সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে তরুণ প্রজন্মের বিমানযাত্রার চাহিদা। ভ্রমণ সংস্থাগুলির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সিদের মধ্যে বিমানের টিকিট বুকিং গত বছরের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে।
অন্য দিকে, ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সিদের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার প্রায় ৬ শতাংশ। বয়সের দুই গোষ্ঠীর পরিসংখ্যানের এই পার্থক্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, উৎসবের ছুটিকে কাজে লাগিয়ে দূরে কোথাও ঘুরে আসার পরিকল্পনায় এগিয়ে রয়েছেন কিশোর-তরুণ এবং সদ্য প্রাপ্তবয়স্কদের একটি বড় অংশ। পড়াশোনা, চাকরি কিংবা দৈনন্দিন ব্যস্ততার ফাঁকে পাওয়া কয়েক দিনের অবসরকে তাঁরা কাজে লাগাতে চাইছেন নিজের পছন্দের জায়গায় সময় কাটানোর জন্য। এক সময়ে দীপাবলির ছুটিতে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা মূলত পরিবারের সদস্যদের ঘিরেই তৈরি হত। এখন সেই ছবিতে যুক্ত হয়েছে বন্ধুদের সঙ্গে ছোট সফর, একা ঘুরতে যাওয়া কিংবা স্বল্প সময়ের মধ্যে একাধিক জায়গা দেখে আসার পরিকল্পনা। ডিজিটাল মাধ্যমে টিকিট কাটা, হোটেল বুক করা ও গন্তব্য বেছে নেওয়ার সুবিধা থাকায় বেড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়াও আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। ফলে উৎসবের ছুটিকে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্পে নতুন ধরনের চাহিদা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণদের পছন্দের গন্তব্য এবং পরিবারের সঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার জায়গার মধ্যে যে পার্থক্য আছে, তা-ও উঠে আসছে অনলাইন অনুসন্ধানের পরিসংখ্যানে।
দেশের মধ্যে ভ্রমণের ক্ষেত্রেও চাহিদা বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। একটি জনপ্রিয় আবাসন বুকিং প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুসারে, উৎসবের মরসুমে গত বছরের তুলনায় দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে থাকার জায়গা খোঁজার প্রবণতা প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। তরুণদের মধ্যেও আবাসন অনুসন্ধানের হার বেড়েছে প্রায় একই পরিমাণে। অর্থাৎ, শুধু বিমান বা ট্রেনের টিকিট কেটে গন্তব্যে পৌঁছনো নয়, সেখানে কয়েক দিন থাকার ব্যবস্থাও আগে থেকে করে রাখতে চাইছেন বহু পর্যটক। শহরাঞ্চল থেকে শুরু করে দেশের পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে এই চাহিদার প্রভাব পড়ছে। বিমানের টিকিট বুকিংয়ের ক্ষেত্রে লাক্ষাদ্বীপের (Lakshadweep) আগাতী (Agatti) উল্লেখযোগ্য ভাবে এগিয়ে বলে উল্লেখ। অনলাইন ট্রাভেল প্ল্যাটফর্মের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই গন্তব্যে বিমানের টিকিটের চাহিদা বেড়েছে প্রায় ১৩০ শতাংশ। সমুদ্রের নীল জল, প্রবালপ্রাচীর ও দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশ যাঁদের আকর্ষণ করে, তাঁদের কাছে অগাতী যে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, এই পরিসংখ্যান তারই ইঙ্গিত দেয়। শহরের কোলাহল থেকে দূরে কয়েক দিনের অবসর কাটানোর জন্য দ্বীপভ্রমণকে বেছে নিচ্ছেন বহু পর্যটক। লাক্ষাদ্বীপে যাওয়ার পরিকল্পনা করলে যাতায়াতের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অনুমতি, স্থানীয় নিয়ম ও থাকার ব্যবস্থা সম্পর্কে আগেভাগে খোঁজ নেওয়া জরুরি।
আরও পড়ুন : Scam, Safe Travel Tips | বেড়াতে গিয়ে সর্বস্বান্ত! ভ্রমণপ্রেমীরা কীভাবে এড়াবেন স্ক্যামের ফাঁদ?
আগাতীর পরেই বিমানযাত্রার চাহিদা বৃদ্ধির তালিকায় রয়েছে বিহারের গয়া (Gaya), নাগাল্যান্ডের ডিমাপুর (Dimapur), রাজস্থানের উদয়পুর (Udaipur), অসমের ডিব্রুগড় (Dibrugarh), উত্তরপ্রদেশের গোরখপুর (Gorakhpur), মধ্যপ্রদেশের জবলপুর (Jabalpur), মণিপুরের ইম্ফল (Imphal) এবং উত্তরাখণ্ডের দেহরাদূন (Dehradun)। এই তালিকার বৈচিত্র্যও লক্ষ্য করার মতো। এক দিকে আছে ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্বসম্পন্ন শহর, অন্য দিকে রয়েছে পাহাড়, প্রকৃতি ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ। ফলে দীপাবলির ছুটিতে ভ্রমণ মানেই কেবল সমুদ্রসৈকত কিংবা পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্র, এমন ধারণা ক্রমশ বদলাচ্ছে।
আরও পড়ুন : Dhinga Gawar Mela | ঢিঙ্গা গাওর মেলা, রাজস্থানের যোধপুরে নারীর শক্তি আর লোককথার অনন্য উৎসব
হোটেল বুকিংয়ের পরিসংখ্যানেও রাজস্থানের উদয়পুর বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছে। শহরটিতে থাকার জায়গা বুক করার চাহিদা বেড়েছে প্রায় ৩১৬ শতাংশ। রাজপ্রাসাদ, হ্রদ, ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য ও রাজস্থানি সংস্কৃতির আকর্ষণে উদয়পুর বরাবরই পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে। উৎসবের ছুটিতে সেই আগ্রহ আরও বেড়েছে বলে বুকিংয়ের পরিসংখ্যানে ইঙ্গিত মিলছে। উদয়পুরের পাশাপাশি হোটেল বুকিংয়ের চাহিদা বেড়েছে বেঙ্গালুরু (Bengaluru) এবং জয়পুরেও (Jaipur)। সামগ্রিক ভাবে উৎসবের মরসুমে হোটেল বুকিংয়ের পরিমাণ প্রায় ১৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ভ্রমণ প্ল্যাটফর্মের তথ্য। তবে তরুণদের পছন্দের জায়গাগুলি পরিবারের ভ্রমণ পরিকল্পনার সঙ্গে সব সময় মেলে না। আবাসন বুকিংয়ের অনুসন্ধান অনুযায়ী, কম বয়সি পর্যটকদের আগ্রহের তালিকায় রয়েছে বারাণসী (Varanasi), কলকাতা (Kolkata), উত্তর গোয়া (North Goa), দক্ষিণ গোয়া (South Goa) ও বেঙ্গালুরু। এই গন্তব্যগুলির প্রত্যেকটির চরিত্র আলাদা। বারাণসীর ঘাট, প্রাচীন মন্দির ও গলির জীবন যেমন পর্যটকদের টানে, তেমনই কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিবেশ, খাবার এবং শহুরে জীবনযাত্রাও আকর্ষণ তৈরি করে। গোয়ার ক্ষেত্রে সমুদ্রসৈকত, রাত্রিকালীন বিনোদন এবং অবসর কাটানোর সুযোগ তরুণদের পছন্দের অন্যতম কারণ হতে পারে। বেঙ্গালুরু আবার আধুনিক শহুরে জীবন, খাবার এবং আশপাশের পর্যটনস্থলে যাওয়ার সুবিধার জন্য ভ্রমণ পরিকল্পনায় জায়গা করে নিচ্ছে।
আরও পড়ুন : Vaishno Devi Temple | পাহাড়ের দেবী বৈষ্ণোদেবী: ত্রিকূটা পর্বতের রহস্যময় সাধিকার অমরগাথা
অন্য দিকে, পরিবারের সঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার ক্ষেত্রে পছন্দের তালিকায় রয়েছে জম্মু ও কাশ্মীরের শ্রীনগর (Srinagar), হিমাচল প্রদেশের কাংড়া (Kangra), অমৃতসর (Amritsar), গুয়াহাটি (Guwahati), নাসিক (Nashik) এবং মেঘালয় (Meghalaya)। প্রকৃতি, ধর্মীয় স্থান, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য এবং পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ এই ধরনের গন্তব্য বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। শ্রীনগরের উপত্যকা, মেঘালয়ের পাহাড় ও জলপ্রপাত কিংবা অমৃতসরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব— সব কিছুর মধ্যেই রয়েছে ভিন্ন অভিজ্ঞতা। ফলে পরিবারকেন্দ্রিক ভ্রমণ পরিকল্পনায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলিও গুরুত্ব পাচ্ছে। দীপাবলির ছুটিতে দেশের বাইরে যাওয়ার আগ্রহও কম নয়। আন্তর্জাতিক বিমানযাত্রার বুকিংয়ে তাইপেই (Taipei), সেবু (Cebu), ডাবলিন (Dublin), ফু কক (Phu Quoc) ও ওসাকা (Osaka) -এর মতো গন্তব্যগুলির চাহিদা বেড়েছে। তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেই আধুনিক শহুরে জীবন ও স্থানীয় খাবারের জন্য পরিচিত। ফিলিপিন্সের সেবু ও ভিয়েতনামের ফু কক সমুদ্র ও দ্বীপভিত্তিক অবকাশযাপনের সুযোগ দেয়। আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন আবার ইতিহাস, সাহিত্য ও শহুরে সংস্কৃতির জন্য পর্যটকদের আকর্ষণ করে। জাপানের ওসাকায় রয়েছে আধুনিক নগরজীবন, ঐতিহ্যবাহী দর্শনীয় স্থান এবং জনপ্রিয় খাদ্যসংস্কৃতির অভিজ্ঞতা। বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক গন্তব্যের প্রতি এই আগ্রহ থেকে বোঝা যায়, বিদেশ ভ্রমণের পরিকল্পনাতেও পর্যটকদের পছন্দের পরিসর বাড়ছে।
এই পরিবর্তনের পিছনে ছুটির সময়ের যথাযথ ব্যবহার, অনলাইনে সহজে ভ্রমণ পরিকল্পনা তৈরি করার সুবিধা এবং নতুন জায়গা ঘুরে দেখার ইচ্ছা কাজ করছে বলে মনে করা যায়। তবে বুকিংয়ের হার বৃদ্ধি মানেই যে প্রত্যেক পর্যটক শেষ পর্যন্ত সফরে যাচ্ছেন, এমন নয়। টিকিটের চাহিদা ও আবাসন অনুসন্ধানের পরিসংখ্যান মূলত মানুষের আগ্রহ এবং সম্ভাব্য পরিকল্পনার ছবি তুলে ধরে। উৎসবের সময় বিমানভাড়া ও হোটেলের খরচ বাড়তে পারে বলেও আগে থেকে বাজেট তৈরি করা প্রয়োজন। জনপ্রিয় গন্তব্যে ঘর না পাওয়ার সমস্যা এড়াতে আগাম বুকিং, যাতায়াতের বিকল্প ব্যবস্থা ও স্থানীয় আবহাওয়ার খোঁজ নেওয়াও জরুরি।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, দীপাবলির ছুটিকে ঘিরে ভ্রমণের মানচিত্রে নতুন প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। তরুণদের বিমান টিকিট বুকিংয়ে প্রায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি, দেশের অভ্যন্তরীণ গন্তব্যে আবাসন অনুসন্ধানের উত্থান এবং বিদেশের একাধিক শহরের প্রতি বাড়তি আগ্রহ, এই পরিসংখ্যান উৎসবের অবসর কাটানোর বদলে যাওয়া অভ্যাসের পরিচয় দিচ্ছে। কারও কাছে দীপাবলির আনন্দ মানে পরিবারের সঙ্গে বাড়িতে থাকা, আবার কারও কাছে আলোর উৎসবের ছুটি মানে নতুন শহরে পা রাখা কিংবা অচেনা সমুদ্রের সামনে দাঁড়ানো। উৎসবের চেনা রীতির পাশাপাশি ভ্রমণও যে ক্রমশ উদ্যাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে, বুকিংয়ের এই প্রবণতা তারই ইঙ্গিত বহন করছে।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Chicham Bridge : হিমাচলের আকাশছোঁয়া সেতু, চিচাম ব্রীজে দাঁড়িয়ে যেন মেঘ ছুঁয়ে ফেলা যায়

