সুজয়নীল দাশগুপ্ত ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, দুবাই : এশিয়া কাপে ফের ভারতের জয়গান। ব্যাট হাতে শেফালি বর্মা (Shafali Verma) ও স্মৃতি মন্ধানার (Smriti Mandhana) দাপটের পর বল হাতে ভারতীয় স্পিনারদের ঘূর্ণিতে ভেঙে পড়ল শ্রীলঙ্কা। ফাইনালে ৭২ রানের বড় ব্যবধানে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে অষ্টমবার মহিলা এশিয়া কাপের (Women’s Asia Cup 2026) শিরোপা ঘরে তুলল ভারত। শুধু তাই নয়, গোটা প্রতিযোগিতায় অপরাজিত থেকেই এই সাফল্য পেল ভারতীয় দল। ফাইনালের শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় ভারত। টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর ওপেনিং জুটিতেই বড় রানের ভিত তৈরি করে ভারতের মেয়েরা। শেফালি ও স্মৃতির আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে পাওয়ারপ্লের ছয় ওভারেই ভারতের স্কোর পৌঁছে যায় ৫৭ রানে। শেফালির ব্যাট থেকে আসে চারটি চার ও দু’টি ছক্কা। শুরু থেকেই শ্রীলঙ্কার বোলারদের উপর তিনি চাপ তৈরি করে দেন।

শেফালির ইনিংসের গতি আরও বাড়তে থাকে। অষ্টম ওভারের মাঝামাঝি মাত্র ২৪ বলে অর্ধশতরান পূর্ণ করেন তিনি। মহিলা টি-২০ এশিয়া কাপের ইতিহাসে এটাই দ্রুততম অর্ধশতরান। আন্তর্জাতিক টি-২০ ক্রিকেটে এটি শেফালির ২১তম অর্ধশতরান। এবারের এশিয়া কাপে এটি তাঁর তৃতীয় পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস এবং পরপর দ্বিতীয় অর্ধশতরান। শেফালির সঙ্গে তাল মিলিয়ে রান তুলতে থাকেন স্মৃতিও। বাঁহাতি এই ওপেনার ৩৫ বলে অর্ধশতরান পূর্ণ করেন। মাত্র ১০ ওভারেই ভারতের স্কোর দাঁড়ায় ৯৮ রানে। দুই ওপেনারের ব্যাটে একের পর এক বাউন্ডারি আসতে থাকায় বড় রানের ইঙ্গিত তখনই মিলেছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই শেফালি ও স্মৃতি তাঁদের জুটিতে শতরানও পূর্ণ করেন। একসঙ্গে এটি ছিল এই জুটির ষষ্ঠ শতরানের পার্টনারশিপ।
ভারতের ইনিংসের গতি থামাতে অবশেষে সাফল্য আসে শ্রীলঙ্কার। ১৩তম ওভারে ১৭ বছর বয়সী চামুদি প্রাবোধা (Chamudi Praboda) শেফালিকে প্যাভিলিয়নের পথে ফিরিয়ে দেন। ১৩০ রানে ভাঙে ভারতের দুর্দান্ত ওপেনিং জুটি। শেফালির আগ্রাসী ব্যাটিং শেষ হলেও ভারতের রানের গতি তখনও থামেনি। তবে এর পরেই বড় ধাক্কা আসে। রান নিতে গিয়ে রানআউট হন স্মৃতি। ৩৯ বলে ৫৯ রান করে সাজঘরে ফেরেন ভারতীয় ওপেনার। চলতি এশিয়া কাপে এটি ছিল স্মৃতির তৃতীয় রানআউট। স্মৃতি ফিরে যাওয়ার পর রিচা ঘোষ (Richa Ghosh) ও অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর (Harmanpreet Kaur) ভারতীয় ইনিংসকে আরও বড় জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষের দিকে দ্রুত কয়েকটি উইকেট হারায় ভারত। মাত্র সাত রানের মধ্যে তিন উইকেট পড়ে যাওয়ায় ইনিংসের শেষ ভাগে কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছিল। তথাপি, শেষ মুহূর্তে গীতিকা কমলিনী (G Kamalini) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। তাঁর ছক্কায় ভারত ২০ ওভার শেষে ১৮৩ রানের লড়াইয়ের মতো স্কোর দাঁড় করায়।
১৮৪ রানের লক্ষ্য কিন্তু শ্রীলঙ্কার সামনে সহজ ছিল না। তার উপর ভারতীয় বোলিং আক্রমণ শুরু থেকেই তৈরি ছিল চাপ বাড়ানোর জন্য। রান তাড়া করতে নেমে শ্রীলঙ্কা নিয়মিত ব্যবধানে উইকেট হারাতে থাকে। ভারতের স্পিনাররা একের পর এক আঘাত হেনে শ্রীলঙ্কার ব্যাটিং লাইনআপকে প্রায় অচল করে দেন। শ্রীলঙ্কার ইনিংসের মাঝামাঝি সময়ে চারিথা রানার বলেই ম্যাচের মোড় আরও ভারতের দিকে ঘুরে যায়। পরপর তিন বলের মধ্যে তিনি দু’টি উইকেট তুলে নেন। কাভিশা দিলহারি (Kavisha Dilhari) ও সিলভাকে ফিরিয়ে শ্রীলঙ্কার স্কোর নামিয়ে দেন ১০২ রানে ৬ উইকেটে। ফলে বড় রান তাড়া করার চাপ আরও বেড়ে যায়। এর পর শ্রীলঙ্কার ইনিংস দ্রুত ভেঙে পড়তে থাকে। ব্যাট হাতে বিধ্বংসী ইনিংস খেলা শেফালিও বল হাতে নিজের অবদান রাখেন। হাসিনি পেরেরার (Hasini Perera) উইকেট তুলে নেন তিনি। ফলে ব্যাটিংয়ের পর বোলিংয়েও নিজের ছাপ রাখেন ভারতীয় অলরাউন্ডার।

শ্রীলঙ্কার পরের ব্যাটার সুগন্ধিকা কুমারী (Sugandika Kumari) বোলারদের মাথার উপর দিয়ে বল পাঠানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ভারতীয় ফিল্ডার নন্দনী শর্মা (Nandni Sharma) সামনে ঝাঁপিয়ে দুর্দান্ত ক্যাচ ধরে ফেলেন। সেই ক্যাচে চারানি নিজের চতুর্থ উইকেট পান। ভারতীয় ফিল্ডিংয়ের ক্ষিপ্রতাও তখন শ্রীলঙ্কার উপর চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়। এরপর প্রেমা রাওয়াত (Prema Rawat) তুলে নেন মিথালি আযোধ্যার (Mithali Ayodhya) উইকেট। শ্রীলঙ্কার শেষ ব্যাটারদের প্রতিরোধও বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। শেষ পর্যন্ত দীপ্তি শর্মা (Deepti Sharma) নিজের ঘূর্ণিতে কৌশিনী নুথিয়াঙ্গানাকে (Kaushini Nuthyangana) পরাস্ত করেন। ফ্লাইটে বিভ্রান্ত করে বল স্টাম্পে আঘাত করতেই শেষ হয় শ্রীলঙ্কার ইনিংস।
মাত্র ১১১ রানে অলআউট হয়ে যায় শ্রীলঙ্কা। ফলে ৭২ রানের বড় জয় পায় ভারত। ব্যাটিং, বোলিং এবং ফিল্ডিং তিন দিকেই দাপট দেখিয়ে ফাইনালে জয় তুলে নেয় ভারতীয় দল। ১৮৩ রান করার পর ১১১ রানে শ্রীলঙ্কাকে গুটিয়ে দেওয়া ভারতীয় দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্সেই ম্যাচের ফলের ব্যবধান ফুটে ওঠে। এই জয়ের সঙ্গে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দল এশিয়া কাপে নিজেদের অষ্টম শিরোপা নিশ্চিত করল। এর আগে সাতবার ট্রফি জেতা ভারত এবার সংখ্যাটা আটে নিয়ে গেল। শুধু তাই নয়, গোটা প্রতিযোগিতায় একটি ম্যাচও না হেরে চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় সাফল্যের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। অন্যদিকে, রবিবারের ফাইনালটি ছিল আগের সংস্করণেরও পুনরাবৃত্তি। ২০২৪ সালের ফাইনালে শ্রীলঙ্কার কাছেই হেরে গিয়েছিল ভারত। দাম্বুলায় সেই ম্যাচে শ্রীলঙ্কা ট্রফি জিতেছিল। এবার সেই হারের মঞ্চেই যেন পাল্টা জবাব দিল ভারত। ফাইনালে ৭২ রানের জয় নিয়ে শিরোপা পুনরুদ্ধার করল হরমনপ্রীত কৌর-এর দল।
এশিয়া কাপের ফাইনালে ভারতের উপস্থিতিও দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতার সাক্ষ্য বহন করছে। এবার নিয়ে টানা ১০ বার ফাইনালে উঠল ভারতীয় দল। তার মধ্যে অষ্টমবার ট্রফি জেতার রেকর্ড তৈরি হল। অর্থাৎ মহিলা এশিয়া কাপে ভারতের আধিপত্যের ইতিহাস আরও সমৃদ্ধ হল একথা বলার অপেক্ষা রাখে না। উল্লেখ্য যে, ফাইনালে শেফালি ও স্মৃতির ওপেনিং জুটি ভারতকে যে ভিত্তি এনে দিয়েছিল, সেটিই পরে বোলারদের কাজ সহজ করে দেয়। দ্রুত রান তুলে বড় স্কোর তৈরি করার পর ভারতীয় স্পিন আক্রমণ শ্রীলঙ্কার ব্যাটিংকে চাপে ফেলে দেয়। ফলে রান তাড়া করার লড়াই একসময় প্রায় একপেশে হয়ে গিয়েছিল। একইভাবে বলা যায় যে, শেফালির দ্রুততম অর্ধশতরান, স্মৃতির ৫৯ রান আর শেষ দিকে কমলিনীর ছক্কা ভারতের স্কোরকে ১৮৩-তে নিয়ে যায়। বিপরীতে শ্রীলঙ্কার ব্যাটিং ১১১ রানেই থেমে গেল। এশিয়া কাপে ফাইনালের মতন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এই ব্যবধানই ভারতকে এনে দেয় আরও একটি ঐতিহাসিক শিরোপা।
অষ্টম এশিয়া কাপ জয়ের পাশাপাশি টুর্নামেন্টে ভারতের অপরাজিত অভিযানও দলের সামগ্রিক শক্তির পরিচয় দিল। সামনে থেকে ওপেনারদের আক্রমণ, মাঝের ওভারে নিয়ন্ত্রিত বোলিং ও শেষ দিকে স্পিনারদের ধারাবাহিক আঘাত এসব নিয়েই ফাইনালে ভারত যে ক্রিকেট খেলল, তাতে শ্রীলঙ্কার হাতে ম্যাচে ফেরার সুযোগ খুব কমই ছিল। এশিয়া কাপের মুকুট আবারও ভারতের মাথায় উঠল, আর রেকর্ডের খাতায় যোগ হল আরও একটি সোনালি মুহূর্ত।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Asian Games 2026 Cricket, BCCI Asian Games News | বিসিসিআইয়ের হুঁশিয়ারিতেই সুর বদল! এশিয়ান গেমসে শ্রেয়স-হরমনপ্রীতদের থাকার ব্যবস্থা নিয়ে বড় ঘোষণা জাপানের




