সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ব্রিকসের (BRICS) মঞ্চে মুখোমুখি বিশ্বের দুই গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। এক দিকে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (Xi Jinping), অন্য দিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। এমন এক কূটনৈতিক আবহেই গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও বিরল মৃত্তিকা নিয়ে ভারতের অবস্থান তুলে ধরলেন মোদী। প্রযুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালকে কোনও দেশের কৌশলগত হাতিয়ার করে তোলার প্রবণতা যে বিশ্ব অর্থনীতি ও যৌথ উন্নয়নের পথে বাধা তৈরি করতে পারে, ব্রিকস সম্মেলনের মঞ্চ থেকে সেই বার্তাই দিলেন প্রধানমন্ত্রী। ব্রিকস সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে মোদীর বক্তব্য ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কারণ, বিশ্বজুড়ে উন্নত প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, স্মার্টফোন, সৌরবিদ্যুৎ, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও একাধিক আধুনিক শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বিরল মৃত্তিকা ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহে চিনের ভূমিকা অত্যন্ত বড়। সেই পরিস্থিতিতে চিনের প্রেসিডেন্টের উপস্থিতিতেই প্রযুক্তি ও খনিজ সম্পদের ব্যবহার নিয়ে ভারতের অবস্থান তুলে ধরেছেন মোদী।
আরও পড়ুন : Main Shunya Hun: Manantar Art’s Inaugural Exhibition Explores the Philosophy of Shunya
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সকলের অংশগ্রহণ ও গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের প্রয়োজনীয়তা। তাঁর কথায়, ‘প্রযুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজকে হাতিয়ার করা হলে আমাদের সম্মিলিত অগ্রগতির পথে বাধা তৈরি হতে পারে। তাই প্রযুক্তির ব্যবহার ও গ্রহণের ক্ষেত্রে সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উপর আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি।’ মোদীর এই বক্তব্যের নেপথ্যে রয়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে বিরল মৃত্তিকা ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজকে ঘিরে তৈরি হওয়া নতুন সমীকরণ। আধুনিক শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বেশ কিছু খনিজের উত্তোলন, প্রক্রিয়াকরণ এবং সরবরাহে চিন দীর্ঘদিন ধরেই শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ফলে এই খনিজের জোগানকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং ভূরাজনীতিতেও চাপানউতোর বেড়েছে।
গত বছর আমেরিকা ও চিনের মধ্যে বাণিজ্যিক সংঘাত বাড়ার সময়ে বেজিং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং উন্নত প্রযুক্তি উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের রফতানিতে নিয়ন্ত্রণ কঠোর করেছিল। পরবর্তী সময়ে কিছু ক্ষেত্রে সেই বিধিনিষেধে পরিবর্তন আনা হলেও বিষয়টি আন্তর্জাতিক শিল্পমহলে উদ্বেগ তৈরি করে। কারণ, উৎপাদনশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কাঁচামালের সরবরাহে কোনও বড় বাধা তৈরি হলে তার প্রভাব এক দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিরল মৃত্তিকা বা রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট (Rare Earth Elements) নামটি শুনতে সাধারণ মনে হলেও আধুনিক প্রযুক্তির দুনিয়ায় এর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, উইন্ড টারবাইন, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা এবং নানা ধরনের ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ তৈরিতে এই উপাদানগুলির প্রয়োজন হয়। শুধু খনিজ উত্তোলন করলেই হয় না, সেগুলি ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় আনতে প্রয়োজন উন্নত প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তিও। আর এখানেই চিনের প্রভাব আরও বেশি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের বিরল মৃত্তিকার বিপুল অংশ চিনে প্রক্রিয়াজাত হয়। ফলে খনিজের প্রাপ্যতার পাশাপাশি পরিশোধন ও প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রেও বেজিংয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এই সরবরাহ ব্যবস্থার উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন দেশ নিজেদের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করছে।
ব্রিকসের মঞ্চে মোদীর বক্তব্য তাই শুধু বাণিজ্যিক প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি অর্থনীতি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে বৈদ্যুতিক যান, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি থেকে প্রতিরক্ষা উৎপাদন, প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও প্রযুক্তির সরবরাহ এখন কৌশলগত বিষয় হয়ে উঠেছে। কোনও নির্দিষ্ট দেশ যদি এই সম্পদ বা প্রযুক্তির উপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, তা হলে অন্য দেশগুলির শিল্প ও উৎপাদন ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়তে পারে।
ভারতও গত কয়েক বছরে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার দিকে দৃষ্টি দিয়েছে। দেশের শিল্প ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন জোগান নিশ্চিত করার প্রশ্নটিও জড়িত। বৈদ্যুতিক গাড়ি, সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি, সেমিকন্ডাক্টর ও আধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের উৎপাদন বাড়াতে হলে নির্দিষ্ট কিছু খনিজের প্রয়োজন হবে। ফলে এই ক্ষেত্রে আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সরবরাহের সম্পর্ক গড়ে তোলাও ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিকসের দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় তাই মোদীর বক্তব্যকে ভারতের বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অবস্থানের সঙ্গেও দেখা হচ্ছে। ভারতের বক্তব্য হল, উন্নত প্রযুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সুবিধা যেন কেবল কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। উন্নয়নশীল দেশগুলিও যাতে প্রযুক্তির সুবিধা পায় এবং নিজেদের শিল্প কাঠামো গড়ে তুলতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরির পক্ষে নতুন দিল্লি।
এর আগে ব্রিকসের রাষ্ট্রনেতাদের বৈঠকের পর যৌথ ঘোষণাপত্রও প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে আন্তর্জাতিক সংঘাত, সন্ত্রাসবাদ এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক সমস্যার মতো বিষয় নিয়ে অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতার মধ্যেই দ্বিতীয় দিনে প্রযুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়ে মোদীর বক্তব্য আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। চিনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই প্রসঙ্গ তাৎপর্যপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে, আবার বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিযোগিতাও রয়েছে। প্রযুক্তি, উৎপাদন ও কৌশলগত শিল্পের ক্ষেত্রে দুই দেশই নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এমন পরিস্থিতিতে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের উপস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ খনিজকে হাতিয়ার না করার কথা বলা কূটনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন কাঁচামাল আর শুধু শিল্পের প্রয়োজনীয় উপকরণ নয়। কোনও দেশের শিল্প উৎপাদন কতটা স্থিতিশীল থাকবে, নতুন প্রযুক্তি কত দ্রুত বাজারে আসবে এবং সবুজ শক্তির প্রসার কতটা দ্রুত হবে, তার সঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ সরাসরি যুক্ত। ফলে বিরল মৃত্তিকা নিয়ে প্রতিযোগিতা আগামী দিনে আরও বাড়তে পারে। ভারতের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ি, নবীকরণযোগ্য শক্তি, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের পরিসর বাড়ছে। সেই কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের সরবরাহে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব ভারতীয় শিল্পেও পড়তে পারে। তাই ব্রিকসের মতো বহুপাক্ষিক মঞ্চে প্রযুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থার পক্ষে সওয়াল করেছে ভারত।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী -এর বক্তব্যে উঠে আসা ‘প্রযুক্তির গ্রহণে সকলকে অন্তর্ভুক্ত করা’র ধারণাটি আসলে উন্নত প্রযুক্তির সুবিধা আরও বেশি দেশের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রশ্নকে সামনে এনেছে। শুধু প্রযুক্তি তৈরি নয়, সেই প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় খনিজ, কাঁচামাল ও উৎপাদন পরিকাঠামো নিয়েও সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। ব্রিকসের মতো মঞ্চে এই আলোচনা আগামী দিনে আরও গুরুত্ব পেতে পারে। চিনের বিরল মৃত্তিকা-নির্ভর সরবরাহ কাঠামো এবং বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়ে বাড়তে থাকা প্রতিযোগিতার মধ্যেই মোদীর এই বক্তব্য সামনে এল। ফলে ব্রিকস সম্মেলনের মঞ্চে ভারতের বক্তব্য শুধু বর্তমান বাণিজ্য পরিস্থিতি নয়, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ও শিল্প অর্থনীতির দিকও তুলে ধরল। শি জিনপিংয়ের উপস্থিতিতে মোদীর এই অবস্থান আগামী দিনে ভারত-চিন সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক খনিজ সরবরাহনীতি নিয়ে আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : CM Suvendu Adhikari on West Bengal Investment | Rs 5000 Crore Investment : সল্টলেকে মুখ্যমন্ত্রীর বড় ঘোষণা! বাংলায় ৫ হাজার কোটির বিনিয়োগ, ১৪০ নতুন স্টোর থেকে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প




