সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : কলকাতার সল্টলেকে একটি অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকেই রাজ্যের শিল্প ও বিনিয়োগ নিয়ে একাধিক বড় ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (CM Suvendu Adhikari)। শুক্রবার সল্টলেক সিটি সেন্টারে ‘বাজার্স স্টাইল রিটেইল লিমিটেড’ -এর উদ্যোগে বিশ্বের বৃহত্তম ফ্যাশন ওয়ার্ডরোবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে আগামী কয়েক বছরে রাজ্যে বিপুল বিনিয়োগ আসার কথা জানান তিনি। তাঁর দাবি, নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র চার মাসের মধ্যেই শিল্প ও ব্যবসার পরিবেশে গতি এসেছে। আগামী তিন বছরে শুধু একটি সংস্থার হাত ধরেই ৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং ১৪০টি নতুন স্টোর খোলার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। বিশ্বের বৃহত্তম ফ্যাশন ওয়ার্ডরোব হিসেবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম ওঠার ঘটনাকেও এদিনের অনুষ্ঠানে গুরুত্ব দেওয়া হয়। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, এমন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাংলায় ব্যবসা ও বাণিজ্যের সম্ভাবনাকে সামনে আনার পাশাপাশি রাজ্যের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি করছে। সল্টলেকের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় এই ধরনের উদ্যোগ আগামী দিনে আরও বিনিয়োগ টানতে পারে বলেও তিনি জানান।
এদিনের মঞ্চ থেকে রিটেইল শিল্পের সম্প্রসারণের পাশাপাশি পুরুলিয়ায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের কথাও জানান শুভেন্দু। প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ওই প্রকল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের জন্য জমি সংক্রান্ত কাজ চলছে। রাজ্য প্রশাসনের তরফে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। ফলে খুচরো ব্যবসার পাশাপাশি পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি ক্ষেত্রেও বড় বিনিয়োগের সম্ভাবনা সামনে এসেছে। গত চার মাসে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে শিল্প প্রকল্পের যে তালিকা তৈরি হয়েছে, তারও উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ডানকুনিতে শ্রীরাম গ্রুপ এবং লাক্স গ্রুপের প্রায় ৭০০ কোটি টাকার সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। মেজিয়ায় শ্যাম স্টিলের প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার বড় প্রকল্পও এগোচ্ছে। শিল্পাঞ্চলগুলিতে নতুন বিনিয়োগের ফলে উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
খাদ্য ও দুগ্ধশিল্পেও বিনিয়োগের প্রসঙ্গ উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। সাঁকরাইলে আমূলের প্রায় ৬০০ কোটি টাকার ডেয়ারি প্ল্যান্ট তৈরির কাজ এগোচ্ছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। রঘুনাথপুরে অমিত মেটালিক্সের নতুন প্রকল্পের কাজও চলছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের একাধিক শিল্পাঞ্চলে একই সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিনিয়োগ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলছে বলে অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে দাবি করা হয়। তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রেও কলকাতা ও নিউটাউনের গুরুত্ব বাড়ছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। নিউটাউনে এলঅ্যান্ডটি (L&T) -এর ডেটা সেন্টার চালু হওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার নতুন প্রকল্পের উদ্বোধন দুর্গাপুজোর আগেই হতে পারে বলে জানান। হলদিয়া দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকেন্দ্র। সেখানে নতুন বিনিয়োগ হলে পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের পরিধি আরও বাড়তে পারে।
শিল্পের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও বাংলায় নতুন প্রকল্পের কথা তুলে ধরেন শুভেন্দু। গার্ডেন রিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স বা জিআরএসই (GRSE)-কে ঘিরে একাধিক প্রতিরক্ষা প্রকল্পের কাজের কথা জানান তিনি। প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর উপস্থিতিতে এই প্রকল্পগুলির কয়েকটির রূপায়ণ হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী। পূর্ব মেদিনীপুরের জুনপুট নিয়েও এদিন বড় ঘোষণা করেন তিনি। জুনপুটে প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা বা ডিআরডিও (DRDO)-র একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। উপকূলবর্তী এই এলাকায় প্রতিরক্ষা গবেষণা সংক্রান্ত পরিকাঠামো গড়ে উঠলে রাজ্যের শিল্প ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
আগামী দিনে কলকাতায় শিল্পপতি গৌতম আদানি (Gautam Adani) -এর সফরের কথাও জানান শুভেন্দু। নিউটাউনে ২ হাজার শয্যার হাসপাতাল তৈরির জন্য ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পরিকল্পনার কথা উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। পাশাপাশি আম্বানি পরিবারের সঙ্গেও রাজ্য সরকারের ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী। স্বাস্থ্য, পরিকাঠামো ও শিল্প, তিন ক্ষেত্রেই বড় বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন তিনি। বন্দর পরিকাঠামো নিয়েও এদিন বক্তব্য রাখেন মুখ্যমন্ত্রী। তাজপুর গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্পকে দাদন পাত্রবাড়ে স্থানান্তরের সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি। রাজ্যের শিল্প ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে গভীর সমুদ্র বন্দরের গুরুত্ব রয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা জমি হস্তান্তরের বিষয়েও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। পুজোর আগেই ৩৩টি সংস্থাকে জমি হস্তান্তর করা হবে বলে জানান তিনি।
শিল্প বিনিয়োগের পাশাপাশি জাতীয় স্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনেও বাংলার উপস্থিতির কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। দিল্লিতে আয়োজিত ১৮তম ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলনের বিশেষ সান্ধ্যভোজে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। দেশের অন্যান্য মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে এমন আন্তর্জাতিক মঞ্চে উপস্থিত থাকার সুযোগ রাজ্যের জন্য মর্যাদার বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সল্টলেকের অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে একের পর এক বিনিয়োগের হিসাব তুলে ধরে রাজ্যে শিল্প সম্প্রসারণের একটি বড় ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করেন শুভেন্দু। রিটেইল থেকে সৌরবিদ্যুৎ, ইস্পাত থেকে দুগ্ধশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি থেকে প্রতিরক্ষা এবং বন্দর থেকে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো, বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রকল্পের কথা সামনে এসেছে। আগামী তিন বছরে ৫ হাজার কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ এবং ১৪০টি নতুন স্টোর খোলার পরিকল্পনা সেই তালিকায় অন্যতম বড় ঘোষণা। এখন নজর, ঘোষিত প্রকল্পগুলির কতগুলি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাস্তবায়িত হয় এবং তার ফলে রাজ্যে কতটা কর্মসংস্থান তৈরি হয়।




