সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা ২ অক্টোবর ২০২৬ : পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে ফের উত্তেজনা। নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধীদের প্রতিবাদের পরেই পাল্টা পথে নামল বিজেপি। কলকাতার রাজপথে ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ (Save Democracy) কর্মসূচীর ডাক দিয়ে বড় মিছিল করল গেরুয়া শিবির। কলেজ স্ট্রিট থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত আয়োজিত এই মিছিলে নেতৃত্ব দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari), বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) ও দলের সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন (Nitin Nabin)। বিরোধীদের আন্দোলনের পরদিনই বিজেপির এই কর্মসূচি ঘিরে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন করে সরগরম হয়ে উঠেছে। এক দিকে এসআইআর নিয়ে বিরোধীদের আপত্তি, অন্য দিকে সেই প্রক্রিয়ার সমর্থনে বিজেপির পাল্টা প্রচার, দুই শিবিরের রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে ক্রমশ বাড়ছে সংঘাত।
বিজেপির এই মিছিলের সময় ও কর্মসূচীর ধরন যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। কারণ, তার আগের দিনই বিরোধীরা রামলীলা ময়দানে এসআইআর প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সরব হয়েছিল। নির্বাচনী তালিকা সংশোধনের পদ্ধতি, সাধারণ ভোটারদের উপর তার সম্ভাব্য প্রভাব এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিরোধী শিবিরের আপত্তি সামনে আসে। সেই কর্মসূচির পরদিন কলকাতার রাস্তায় নেমে বিজেপি কার্যত পাল্টা রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরল। দলের বক্তব্য, গণতন্ত্র রক্ষার নামে বিরোধীরা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কারকে রাজনৈতিক বিরোধিতার হাতিয়ার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ গেরুয়া শিবিরের। সোমবার কলেজ স্ট্রিট থেকেই শুরু হয় বিজেপির এই মিছিল। নির্ধারিত সময়ে সেখানে দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের জমায়েত বাড়তে থাকে। জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে মিছিলের সামনের সারিতে দেখা যায় শুভেন্দু অধিকারী, নীতিন নবীন এবং শমীক ভট্টাচার্যকে। তাঁদের পিছনে বিজেপির বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা দলীয় পতাকা এবং তেরঙ্গা নিয়ে হাঁটতে থাকেন। মিছিল এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে মধ্য কলকাতার রাস্তাঘাট। ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ এবং ‘অরাজকতা হটাও’ এই ধরনের স্লোগানকে সামনে রেখেই কর্মসূচি চালায় বিজেপি।
কলেজ স্ট্রিট থেকে শুরু হওয়া মিছিলের গন্তব্য ছিল ধর্মতলা। কলকাতার রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন এই দুই এলাকার মধ্যে দিয়ে পদযাত্রা করে বিজেপি নেতৃত্ব সাধারণ মানুষের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে চেয়েছে। মিছিলের সামনের সারিতে দলের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি কর্মসূচির রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে নীতিন নবীনের কলকাতায় এসে এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া বিজেপির সাংগঠনিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। রাজ্যের নেতৃত্বের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের যৌথ উপস্থিতির মাধ্যমে দলের কর্মী-সমর্থকদের কাছে ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক অবস্থানের ছবি তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছে। বিজেপির অভিযোগ, এসআইআর নিয়ে বিরোধীদের প্রচারের পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। দলের দাবি, ভোটার তালিকার নির্ভুলতা বজায় রাখা এবং প্রকৃত ভোটারদের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচন কমিশনের এই সংশোধন প্রক্রিয়া প্রয়োজনীয়। নির্বাচনী তালিকায় ভুল নাম, মৃত ব্যক্তির নাম কিংবা একই ব্যক্তির একাধিক নথিভুক্তির মতো সমস্যা থাকলে তা সংশোধন করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বার্থেই জরুরি। বিজেপির বক্তব্য, এই প্রশাসনিক ও নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে অযথা আতঙ্ক তৈরি করা উচিত নয়। ভোটার তালিকা নির্ভুল করার কাজে সহযোগিতা করা প্রয়োজন।
বিজেপি নেতাদের অভিযোগ, বিরোধীরা এসআইআরকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি করছে। নির্বাচনী তালিকা সংশোধনের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে আড়াল করে রাজনৈতিক প্রচার চালানো হচ্ছে বলেও দাবি বিজেপির। তাঁদের বক্তব্য, গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হল অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। সেই নির্বাচনের জন্য নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রয়োজন। ফলে তালিকা সংশোধনের উদ্যোগকে বিরোধিতার মাধ্যমে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে কাম্য নয়। বিজেপির এই মিছিলের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সেই বক্তব্যই জনসমক্ষে তুলে ধরা। অন্য দিকে, বিরোধী শিবিরের অবস্থান সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের বক্তব্য, এসআইআর প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন রয়েছে। সাধারণ ভোটারদের নথিপত্র, নামের বানান, ঠিকানা ও পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অসুবিধা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিরোধীরা। বিশেষ করে দরিদ্র, প্রান্তিক এবং প্রবীণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করা কঠিন হতে পারে বলে তাদের দাবি। নির্বাচনী তালিকা সংশোধনের নামে কোনও প্রকৃত ভোটারের নাম যাতে বাদ না যায়, তা নিশ্চিত করার দাবি তুলেছে বিরোধী দলগুলি। ফলে এসআইআর নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুধু প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকছে না, তা ক্রমশ বৃহত্তর রাজনৈতিক সংঘাতের চেহারা নিচ্ছে।
কলকাতার এই মিছিলে বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের পাশাপাশি দলের অন্যান্য সিনিয়র নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। নীতিন নবীন কলকাতায় এসে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দেখ করেন দেন। পরে তাঁরা একসঙ্গে কলেজ স্ট্রিটে পৌঁছে পদযাত্রায় অংশ নেন। রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের এই সক্রিয় উপস্থিতি বিজেপির কাছে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এসআইআর ইস্যুকে ঘিরে দলের প্রচারকে শুধু পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতীয় স্তরেও তুলে ধরার চেষ্টা চলছে।
বিজেপির দাবি, কলকাতার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন শহরেও একই ধরনের ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ কর্মসূচী নেওয়া হচ্ছে। দলের প্রচার অনুযায়ী, বিরোধীদের প্রতিবাদের পাল্টা রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরতেই এই দেশব্যাপী উদ্যোগ। বিজেপি নেতৃত্বের বক্তব্য, নির্বাচনী ব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থা বজায় রাখা এবং নির্বাচন কমিশনের কাজের প্রতি সমর্থন জানানো এই কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য। দলের কর্মী-সমর্থকদেরও এই প্রচারে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই মিছিল ঘিরে কলকাতার রাজনৈতিক আবহে যে উত্তাপ তৈরি হয়েছে, তা শুধু দুই দলের কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আগামী দিনে এসআইআর প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে, তার উপরেও এই রাজনৈতিক সংঘাতের প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। নির্বাচনী তালিকা সংশোধন নিয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলির প্রচারও জনমত তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। ফলে বিজেপির এই পদযাত্রাকে নিছক দলীয় কর্মসূচি হিসেবে দেখছে না রাজনৈতিক মহলের একাংশ। বরং বিরোধীদের আন্দোলনের মোকাবিলায় রাজ্যের শাসকদলের রাজনৈতিক অবস্থান আরও জোরালো করার উদ্যোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ধর্মতলায় পৌঁছে মিছিলের নেতৃত্বে থাকা নেতারা বক্তব্য রাখেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে সাধারণ মানুষের সক্রিয় ভূমিকার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তাঁরা। বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিবাদ করার অধিকার থাকলেও তার নামে অশান্তি কিংবা বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। নির্বাচন কমিশনের কাজের উপর আস্থা রাখার পাশাপাশি ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার আবেদনও জানানো হয়। কর্মসূচীতে কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতিকে দলের তরফে সফল বলে উল্লেখ। রাজনৈতিকভাবে এই মিছিলের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল শুভেন্দু অধিকারী ও নীতিন নবীনের একসঙ্গে নেতৃত্ব দেওয়া। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপির সর্বভারতীয় নেতৃত্বের এই যৌথ উপস্থিতি দলের সংগঠনকে নতুন করে সক্রিয় করার প্রচেষ্টা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে শমীক ভট্টাচার্যের উপস্থিতি রাজ্য বিজেপির সাংগঠনিক নেতৃত্বের অংশগ্রহণকেও সামনে এনেছে। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নেতৃত্বের সমন্বয়ে এসআইআর ইস্যুতে দলের অবস্থান আরও জোরালোভাবে প্রচার করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
আগামী দিনেও এই ইস্যুতে ধারাবাহিক কর্মসূচী চালানোর ইঙ্গিত দিয়েছে বিজেপি। ফলে এসআইআর নিয়ে বিরোধীদের প্রতিবাদ আর বিজেপির পাল্টা প্রচার, এই দুইয়ের মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত আরও বাড়তে পারে। এক পক্ষের দাবি, ভোটার তালিকার নির্ভুলতা রক্ষায় সংশোধন জরুরি। অন্য পক্ষের আশঙ্কা, সেই প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গণতন্ত্র রক্ষার দাবি দুই শিবিরের মুখেই থাকলেও পদ্ধতি ও রাজনৈতিক অবস্থানের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে দূরত্ব ক্রমশ বাড়ছে। কলেজ স্ট্রিট থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত বিজেপির এই পদযাত্রা সেই সংঘাতকেই আরও একবার কলকাতার রাজপথে নিয়ে এল।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari Matua Announcement | ঠাকুরনগরে বড় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর, মতুয়া উন্নয়নে ৫০ কোটি ও পৃথক পুরসভার প্রতিশ্রুতি



