সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: এনসিপিআইকে ঘিরে বঙ্গ রাজনীতিতে নতুন দলবদলের জল্পনা তৈরি হতেই তা কার্যত উড়িয়ে দিলেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya)। সিতাইয়ের সাংসদ জগদীশ চন্দ্র বসুনিয়া (Jagdish Chandra Basunia) -এর দাবি ছিল, নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যেই এনসিপিআইয়ের কয়েকজন সাংসদ শীঘ্রই বিজেপির দিকে যেতে পারেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনজনকে বাদ দিলে দলের বাকি ১৭ জন সাংসদের বিজেপিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দুর্গাপুজোর আগেই সেই যোগদান হতে পারে বলেও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়। সেই জল্পনার মধ্যেই বিজেপির অবস্থান নিয়ে মুখ খুললেন শমীক। বসুনিয়ার বক্তব্যে যাঁদের নাম ঘিরে রাজনৈতিক চর্চা শুরু হয়েছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার (Kakoli Ghosh Dastidar), সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় (Sudip Bandyopadhyay) এবং রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় (Rachana Banerjee) -এর মতো তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদরা।
বসুনিয়ার দাবি ছিল, এনসিপিআইয়ের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে ও একাধিক সাংসদ বিজেপির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার পথ বেছে নিতে পারেন। কিন্তু এই দাবির সঙ্গে বিজেপির বর্তমান সিদ্ধান্তের কোনও মিল নেই বলেই জানিয়ে দিলেন শমীক ভট্টাচার্য। রাজ্য বিজেপির সভাপতির বক্তব্য, এখনই তৃণমূল কংগ্রেস থেকে কোনও সাংসদের বিজেপিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত দলের নেই। শুধু বর্তমান পরিস্থিতিই নয়, নিকট ভবিষ্যতেও তৃণমূলের কোনও সাংসদকে দলে নেওয়ার বিষয়ে বিজেপির তরফে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি বলে তাঁর বক্তব্য। ফলে রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদার কিংবা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে যে রাজনৈতিক জল্পনা তৈরি হয়েছে, তার ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিল গেরুয়া শিবির।
শমীক ভট্টাচার্য বলেন, ‘এই মুহূর্তে কেউ তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন না। অদূর ভবিষ্যতেও করবেন না। মানুষ তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। তৃণমূলের অত্যাচার মানুষ ভুলে যায়নি। এখন কয়েকজন সাংসদ মিলে একটি নতুন দল তৈরি করেছেন। তাঁরা এনডিএ-কে সমর্থন করেছেন। আমরা তাকে স্বাগত জানাই। কিন্তু কেউ বিজেপিতে আসছেন না।’ এই বক্তব্যের মাধ্যমে বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব একদিকে যেমন এনসিপিআইয়ের এনডিএ-সমর্থনকে স্বাগত জানিয়েছে, অন্যদিকে সেই রাজনৈতিক সমর্থনকে বিজেপিতে সরাসরি যোগদানের সঙ্গে এক করে দেখতে নারাজ বলেও বুঝিয়ে দিয়েছেন শমীক। অর্থাৎ, কোনও সাংসদ বিজেপির সঙ্গে রাজনৈতিক ভাবে অবস্থান নিলেই তাঁকে গেরুয়া দলে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, এমন নীতি এখনই কার্যকর হচ্ছে না।
এখানেই থামেননি শমীক। জগদীশ চন্দ্র বসুনিয়ার নিজের বিজেপিতে যোগ দেওয়ার ইচ্ছার প্রসঙ্গ উঠতেই তিনি আরও কড়া মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্য, কারও বিজেপিতে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা থাকতেই পারে। কিন্তু সেই ইচ্ছা পূরণ হবে কি না, তার সিদ্ধান্ত নেবে বিজেপিই। শুধু নিজের রাজনৈতিক অবস্থান বদল করলেই অতীতের রাজনৈতিক ভূমিকা থেকে দায়মুক্তি পাওয়া যাবে না বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। শমীকের কথায়, ‘উনি ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। বিজেপি তাঁকে নেবে কি না, সেটা বিজেপির ব্যাপার।’ এরপরই তিনি ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বাংলায় রাজনৈতিক হিংসার বিভিন্ন অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, সেই সময় বিজেপির কর্মী-সমর্থকদের উপর যে ধরনের হামলা ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল, সেগুলি দল ভুলে যায়নি।
বিজেপির রাজ্য সভাপতির অভিযোগ, ২০২১ সালের ২ মে-র পরবর্তী সময়ে দলের বহু কর্মী আক্রান্ত হয়েছিলেন। রাজনৈতিক সংঘর্ষ, বাড়িঘর ভাঙচুর, কর্মীদের উপর হামলা এবং মহিলাদের উপর অত্যাচারের মতো একাধিক অভিযোগের কথাও তিনি তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে বাড়ি ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ থেকে শুরু করে সামাজিক ভাবে হেনস্থার নানা অভিযোগ। এসব ঘটনার রাজনৈতিক দায় নিয়ে বিজেপির অবস্থান যে এখনও কঠোর, তাঁর মন্তব্যে সেই বার্তাই উঠে এসেছে। শমীক ভট্টাচার্য বলেন, ‘যাঁরা ২০২১ সালের ২ মে-র পর ২৭ দিনে ৫৬ জন বিজেপি কর্মীকে খুন করেছে, ২০০ জন বিজেপি মহিলা কর্মীকে গণধর্ষণ করেছে, জেসিবি দিয়ে বাড়ি ভাঙা, থুতু ফেলে চাটানো, মাথা কামিয়ে দেওয়া, জরিমানা নিয়ে বাড়ি ফেরানো, অটো-টোটো স্ট্যান্ড থেকে ছেলেদের বার করে দেওয়া, এগুলো বিজেপি ভুলে যায়নি। সুতরাং, বিজেপির পতাকা হাতে নিলেই যে সমস্ত পাপ মুছে যাবে, সেটা মনে করার কোনও কারণ নেই।’
এই মন্তব্যের পর এনসিপিআইকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া দলবদলের জল্পনা আরও রাজনৈতিক তাৎপর্য পেয়েছে। কারণ, একদিকে নতুন দল গঠন করে এনডিএ-কে সমর্থনের সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে সেই দলের সাংসদদের বিজেপিতে যোগদানের সম্ভাবনা, দু’টি বিষয়কে একই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। কিন্তু শমীকের বক্তব্য সেই সমীকরণে আপাতত একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করল। উল্লেখ্য, রাজনৈতিক মহলে এই ঘটনাকে তৃণমূল-বিজেপি সম্পর্কের বৃহত্তর সমীকরণের সঙ্গেও দেখা হচ্ছে। বাংলায় দীর্ঘদিন ধরেই দলবদল রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিধানসভা নির্বাচন থেকে লোকসভা নির্বাচন, প্রতিটি পর্বেই এক দল থেকে অন্য দলে নেতানেত্রীদের যাতায়াত নিয়ে চর্চা হয়েছে। ফলে কয়েকজন সাংসদের সম্ভাব্য দলবদলের খবর সামনে এলেই তা দ্রুত রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিশেষ করে রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো জনপ্রিয় মুখের নাম সম্ভাব্য দলবদলের তালিকায় উঠে আসায় বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ আরও বেড়েছে। তবে তাঁর বিজেপিতে যাওয়ার বিষয়ে শমীক ভট্টাচার্য কোনও ইতিবাচক ইঙ্গিত দেননি। একই ভাবে কাকলি ঘোষ দস্তিদার এবং সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম নিয়েও বিজেপির তরফে কোনও যোগদানের সিদ্ধান্ত নেই বলেই তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে।
এনসিপিআইয়ের রাজনৈতিক অবস্থানও এই ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কয়েকজন সাংসদ মিলে নতুন রাজনৈতিক দল তৈরি করে এনডিএকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফলে সংসদীয় রাজনীতিতে তাঁদের অবস্থান নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। কিন্তু বিজেপি নেতৃত্ব সেই সমর্থনকে নিজেদের দলে যোগদানের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছে না। পৃথক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তাঁদের অবস্থানকে স্বাগত জানানোর কথাই বলেছেন শমীক। এদিকে জগদীশ চন্দ্র বসুনিয়ার মন্তব্যকে ঘিরে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, শমীকের বক্তব্যের পরে তা আপাতত ধাক্কা খেল। বিশেষ করে দুর্গাপুজোর আগে ১৭ জন সাংসদের বিজেপিতে যোগদানের সম্ভাবনা নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছিল, রাজ্য বিজেপির সভাপতির বক্তব্যে তার কোনও সমর্থন পাওয়া গেল না। অতীতের রাজনৈতিক ভূমিকা এবং বিজেপি কর্মীদের উপর হামলার অভিযোগকে সামনে এনে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, শুধুমাত্র দল পরিবর্তনের ইচ্ছা প্রকাশ করলেই বিজেপির দরজা খুলে যাচ্ছে না। ফলে এখন সবার লক্ষ্য, এনসিপিআইয়ের সাংসদদের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। বসুনিয়ার দাবির পর যাঁদের নাম নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে, তাঁদের কেউ নিজের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলেন কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে এনডিএর সঙ্গে এনসিপিআইয়ের সম্পর্ক কোন পথে এগোয়, তার উপরও নজর থাকবে। আপাতত অবশ্য শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্যেই বিজেপির অবস্থান পরিষ্কার, এনডিএকে সমর্থন করা আর বিজেপির সদস্য হওয়া এক বিষয় নয়, আর অতীতের রাজনৈতিক ভূমিকার হিসাবও দল সহজে ভুলছে না।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Ayushman Bharat Name Mismatch, Ayushman Bharat Card West Bengal | ‘মুখার্জি-মুখোপাধ্যায় হলেও আয়ুষ্মান ভারত থেকে নাম কাটবে না!’ SIR -এর অভিজ্ঞতার পর নবান্নের বড় নির্দেশ




