সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে এবার বড়সড় স্বীকৃতি দিলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি (Mark Carney)। ভারতের অবস্থানকে সাধারণ কোনও ‘মধ্যম শক্তি’ বা মিডল পাওয়ারের (Middle Power) পর্যায়ে রাখতে তিনি নারাজ। তাঁর মতে, ভারতের লক্ষ্য, উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভূমিকা অন্য অনেক দেশের তুলনায় আলাদা। শুধু আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার নয়, বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো অবস্থান তৈরি করার ক্ষমতাও আছে ভারতের। কার্নির এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন কাটিয়ে ভারত ও কানাডার মধ্যে যখন নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ চলছে, তখন কানাডার প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য দুই দেশের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মত আন্তর্জাতিক কুটনৈতিক মহলের।
ভারত সফরে এসে নতুন দিল্লি ও মুম্বাইয়ে সরকারী প্রতিনিধি, প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তি ও ব্যবসায়িক মহলের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন কার্নি। সেই সফরেই ভারতের আন্তর্জাতিক অবস্থান সম্পর্কে নিজের মূল্যায়ন তিনি তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সারমর্ম ছিল, কানাডাকে মধ্যম শক্তির দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে, কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে সেই পরিচয় যথাযথ না। কার্নির কথায়, ‘আমি ভারতকে মধ্যম শক্তি বলব না। কানাডা সেই পরিচয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারে। কিন্তু ভারতের গতিপথ এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা সম্পূর্ণ আলাদা।’ এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে ভারতের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী। উলখ্য যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় ‘মধ্যম শক্তি’ বলতে সাধারণত এমন দেশকে বোঝানো হয়, যাদের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে, কিন্তু বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলির মতো সর্বক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা নেই। কানাডা দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের এই শ্রেণির রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরে এসেছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা, বহুপাক্ষিক কূটনীতি ও বিভিন্ন দেশের মধ্যে সহযোগিতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কানাডার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভারতের অবস্থানকে সেই একই মাপকাঠিতে বিচার করতে রাজি নন কার্নি। তাঁর মূল্যায়নে, ভারতের শক্তি এবং বিশ্বরাজনীতিতে তার সম্ভাব্য ভূমিকা অনেক বেশি বিস্তৃত। ভারতের এই অবস্থানের পিছনে একাধিক কারণও বর্তমান। বিশ্বের বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ হিসেবে ভারতের গুরুত্ব আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ক্রমশ বাড়ছে। পাশাপাশি দ্রুত সম্প্রসারিত অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন আর কূটনৈতিক যোগাযোগের বিস্তার দেশটিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন সংকট, যুদ্ধ, বাণিজ্যিক বিরোধ কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়ে ভারতের অবস্থান এখন আর উপেক্ষা করার মতো নয়। আন্তর্জাতিক মঞ্চে নয়াদিল্লির বক্তব্য ও সিদ্ধান্তের দিকে নজর রাখে বিশ্বের একাধিক শক্তিধর দেশ। কার্নির বক্তব্যে সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভারতের অগ্রগতি আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে। বিপুল অভ্যন্তরীণ বাজার, তরুণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, ডিজিটাল পরিষেবার প্রসার ও উৎপাদন শিল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনা ভারতকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য করে তুলেছে। তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ উৎপাদন, মহাকাশ গবেষণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল পরিকাঠামোর মতো ক্ষেত্রেও ভারতের উপস্থিতি বাড়ছে। ফলে বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় ভারতকে বাদ দিয়ে এগোনো কঠিন হয়ে পড়ছে। কার্নির মন্তব্যে ভারতের এই বহুমুখী সক্ষমতার প্রতি স্বীকৃতি রয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন : Aadhaar Card Update Rules: আধারে ঠিকানা-মোবাইল কতবার বদলানো যায়? UIDAI-র নিয়ম জানলে এড়াবেন ঝামেলা
অর্থনৈতিক ক্ষমতার পাশাপাশি কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও ভারতের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। আমেরিকা, রাশিয়া, ইউরোপীয় দেশ এবং এশিয়ার বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজস্ব কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করে নয়াদিল্লি। আন্তর্জাতিক সংঘাতের ক্ষেত্রেও ভারত অনেক সময় আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পক্ষে অবস্থান নেয়। জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মতো বিষয়গুলিতে ভারতের মতামত ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলির স্বার্থ তুলে ধরার ক্ষেত্রে ভারতের কূটনৈতিক ভূমিকা আন্তর্জাতিক পরিসরে আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী কার্নির এই বক্তব্যকে শুধুমাত্র ভারতের প্রশংসা হিসেবে দেখছে না কূটনৈতিক মহলের একাংশ। এর পিছনে কানাডার নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থও নিহত আছে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সমীকরণে নানা পরিবর্তন এসেছে। আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চাপ ও অনিশ্চয়তার পরিস্থিতিতে কানাডা বিকল্প বাজার এবং নতুন অংশীদার খুঁজতে আগ্রহী। সেই জায়গায় ভারতের মতো বৃহৎ অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করা অটোয়ার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভারতের বাজারে কানাডার বাণিজ্যিক সম্ভাবনা যথেষ্ট বড়। অন্য দিকে, কানাডার জ্বালানি, খনিজ সম্পদ, প্রযুক্তি আর উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও ভারতের আগ্রহ। দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়লে উভয় পক্ষই লাভবান হতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ, পরিচ্ছন্ন শক্তি, প্রযুক্তি, কৃষি, শিক্ষা ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগের সুযোগ রয়েছে। ফলে কার্নির ভারত সফরকে কেবল সৌজন্য সফর হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। বরং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতার ভিত তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবেও এই সফরকে দেখা হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি নিয়েও আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বাণিজ্যিক যোগাযোগকে নতুন করে সচল করার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে দুই পক্ষ। পারস্পরিক বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ানো এবং আগামী দিনে তা দ্বিগুণ করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও আলোচনা চলছে বলে সূত্রের খবর। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ভারতীয় রফতানিকারকদের কাছে কানাডার বাজারে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে কানাডার সংস্থাগুলিও ভারতের দ্রুত সম্প্রসারিত বাজারে বিনিয়োগের সুযোগ পাবে। ভারত ও কানাডার সম্পর্কের ক্ষেত্রে জ্বালানি সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কানাডার প্রাকৃতিক সম্পদ ও ভারতের ক্রমবর্ধমান জ্বালানির চাহিদার মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। বিশেষ করে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, পারমাণবিক শক্তি, খনিজ সম্পদ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হলে দীর্ঘমেয়াদি লাভের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে বলে উল্লেখ। বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে সরবরাহ ব্যবস্থা মজবুত করা ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা দুই দেশের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু ভারত-কানাডা সম্পর্কের অতীত পুরোপুরি সংঘাতমুক্ত না। দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে কূটনৈতিক মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত একাধিক বিষয়কে কেন্দ্র করে সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়েছিল। তার প্রভাব পড়েছিল বাণিজ্য, কূটনৈতিক যোগাযোগ ও দ্বিপাক্ষিক আলোচনাতেও। ফলে নতুন করে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখছে আন্তর্জাতিক মহল। কার্নির সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টায় ইতিবাচক ভূমিকা নিতে পারে। এক্ষেত্রে কানাডায় বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। কানাডার সমাজ, অর্থনীতি, শিক্ষা, ব্যবসা এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রবাসী ভারতীয়দের অবদান রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে মানুষের যাতায়াত, শিক্ষাগত যোগাযোগ এবং পারিবারিক সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। ভারতীয় পড়ুয়াদের কাছে কানাডা অন্যতম পরিচিত উচ্চশিক্ষার গন্তব্য। আবার কানাডার বিভিন্ন শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্রে ভারতীয় পেশাদারদের অংশগ্রহণ রয়েছে। তাই কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি হলে তার ইতিবাচক প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনেও পড়তে পারে।
কার্নির বক্তব্য ভারতের আন্তর্জাতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। এত দিন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিভিন্ন আলোচনায় ভারতকে কখনও উন্নয়নশীল অর্থনীতি, কখনও আঞ্চলিক শক্তি, আবার কখনও উদীয়মান বিশ্বশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু কানাডার প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে ভারতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার উপর আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা কেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ না। আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় আরও বড় ভূমিকা নেওয়ার সক্ষমতাও রয়েছে দেশের। উল্লেখ্য, বিশ্বের ক্ষমতার ভারসাম্য দ্রুত বদলাচ্ছে। একদিকে পুরনো শক্তিধর দেশগুলির প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা, অন্য দিকে নতুন অর্থনীতির উত্থান, এই দু’য়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। সেই পরিস্থিতিতে ভারতের অবস্থান ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রযুক্তি, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, পরিবেশ আর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার মতো বিষয়ে ভারত কী ভূমিকা নেয়, তার উপর আগামী দিনের অনেক সিদ্ধান্ত নির্ভর করতে পারে।
কার্নির এই স্বীকৃতি তাই শুধু একটি কূটনৈতিক মন্তব্যেও আটকে থাকছে না। ভারতকে বিশ্ব নেতৃত্বের সম্ভাবনাময় শক্তি হিসেবে দেখার যে প্রবণতা আন্তর্জাতিক মহলে তৈরি হয়েছে, তাঁর বক্তব্যে তারই প্রতিফলনও আছে। তবে এই স্বীকৃতিকে বাস্তব সাফল্যে পরিণত করতে অর্থনৈতিক অগ্রগতি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, কূটনৈতিক ভারসাম্য আর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ভারতকে ধারাবাহিকভাবে এগোতে হবে। অন্য দিকে, কানাডার সঙ্গে সম্পর্কের পুরনো জট কাটিয়ে নতুন বাণিজ্যিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব কতটা কার্যকর হয়, সেটিও আগামী দিনে নজর কাড়বে। ভারতের গুরুত্ব সম্পর্কে কার্নির এই মূল্যায়ন দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ পথচলায় নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Narendra Modi Bengal speech | বেঙ্গালুরু থেকে বাংলার জয়ের গল্প শোনালেন নরেন্দ্র মোদী : ‘৩ থেকে ২০০+ বিধায়ক’, বিজেপির উত্থান ঘিরে রাজনৈতিক বার্তা



