সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: সুন্দরবনের (Sundarbans) যোগাযোগ ব্যবস্থা, কৃষি, মৎস্যচাষ ও পর্যটন পরিকাঠামোর উন্নয়নে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দের কথা ঘোষণা করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। তাঁর ঘোষণায় সুন্দরবন অঞ্চলের জন্য ১২০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দের কথা উঠে এসেছে। পাশাপাশি, এই অঞ্চলে মোট ৩২০২টি উন্নয়নমূলক কাজের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন। প্রশাসনিক স্তরে ঘোষিত এই উদ্যোগগুলি বাস্তবায়িত হলে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত দ্বীপগুলিতে যাতায়াত, কৃষিকাজ এবং জীবিকার ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে প্রকল্পগুলির বাস্তব অগ্রগতি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা ও বরাদ্দ অর্থের যথাযথ ব্যবহারই শেষ পর্যন্ত এই পরিকল্পনার সাফল্য নির্ধারণ করবে। শনিবার সুন্দরবনে আয়োজিত একটি প্রশাসনিক বৈঠকের পর অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী উন্নয়ন পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবন অঞ্চলের পরিকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি। পূর্বতন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে উদাসীনতার অভিযোগ তুলে তিনি জানান, বর্তমান বিজেপি সরকার এই অঞ্চলের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সেই লক্ষ্যেই বাজেটে বিশেষ আর্থিক বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে তাঁর বক্তব্য। যদিও পূর্বতন সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের স্বাধীন যাচাই করা তথ্য এখানে পাওয়া যায়নি। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, সুন্দরবনে উন্নয়নমূলক কাজের প্রথম পর্যায়ে ৫৫৩টি প্রকল্পের জন্য দরপত্র প্রকাশ করা হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে আরও ২৬৪৯টি প্রকল্প হাতে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ, দুই পর্যায় মিলিয়ে মোট ৩২০২টি কাজের মাধ্যমে এই অঞ্চলের বিভিন্ন পরিকাঠামোগত সমস্যা মোকাবিলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের পরিকল্পনায় রাস্তা নির্মাণ থেকে শুরু করে নিকাশি ব্যবস্থার উন্নতি, কালভার্ট তৈরি, নদীপথে যাতায়াতের সুবিধা বৃদ্ধি ও পরিবেশবান্ধব পরিবহণ চালুর মতো বিষয়গুলি গুরুত্ব পেয়েছে।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সুন্দরবনের উন্নয়ন বরাবরই প্রশাসনের কাছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নদী, খাঁড়ি ও বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বিস্তৃত এই অঞ্চলের বহু জায়গায় যাতায়াতের জন্য জলপথের উপর নির্ভর করতে হয়। বর্ষার সময়ে জল জমা, রাস্তার বেহাল দশা ও পর্যাপ্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে। চিকিৎসা, শিক্ষা, বাজার ও সরকারি পরিষেবা পেতে অনেক ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে সড়ক ও জলপথের পরিকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ জোর দেওয়ার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। ঘোষিত পরিকল্পনায় ১১৬৯টি রাস্তা নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। এই খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ১৪০৬.৩৪ কোটি টাকা বলে তিনি ম জানিয়েছেন। পাশাপাশি জলনিকাশি ব্যবস্থার উন্নয়ন ও ১১০টি কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। সুন্দরবনের মতো নিচু ও নদীবেষ্টিত এলাকায় বর্ষাকালে জল জমে থাকা একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। নিকাশি ব্যবস্থার উন্নতি ও প্রয়োজনীয় কালভার্ট তৈরি করা গেলে জল চলাচলের পথ সুগম হতে পারে। এর ফলে গ্রামীণ রাস্তা দিয়ে যাতায়াত, কৃষিজ পণ্য পরিবহণ ও স্থানীয় বাজারের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কিন্তু, ঘোষিত বরাদ্দের অঙ্ক ও প্রকল্পের বাস্তব ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাস্তা তৈরি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, বৃষ্টির জল দ্রুত বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় উপযুক্ত নির্মাণপদ্ধতি গ্রহণের উপরও পরিকাঠামোর স্থায়িত্ব নির্ভর করবে। সুন্দরবনের পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় রেখে প্রকল্পের নকশা তৈরি করা এবং কাজের গুণমান বজায় রাখাও প্রয়োজনীয়। দ্বীপাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ করতে পাঁচটি কংক্রিটের জেটি নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। যানবাহন ও পণ্য পরিবহণের সুবিধা বাড়ানোর জন্য আরও একটি জেটি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সুন্দরবনের বহু এলাকার বাসিন্দাদের কাছে নদীপথ শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, জীবিকা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উন্নত জেটি তৈরি হলে যাত্রী ওঠানামা, কৃষিজ পণ্য পরিবহণ এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহের ক্ষেত্রে সুবিধা বাড়তে পারে। তবে জেটিগুলি কোথায় তৈরি হবে, কবে কাজ শুরু হবে ও কত দিনের মধ্যে সেগুলি ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠবে, সেই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সামনে আসা প্রয়োজন।
সুন্দরবনের পর্যটন ক্ষেত্রেও পরিবেশবান্ধব পরিবহণ চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, বিদ্যুৎচালিত নৌকা চালুর জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ, ম্যানগ্রোভ অরণ্য এবং বন্যপ্রাণীকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। কিন্তু পর্যটনের প্রসারের সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করাও জরুরি। বিদ্যুৎচালিত নৌকা চালু হলে প্রচলিত জ্বালানিনির্ভর নৌকার ব্যবহারজনিত দূষণ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে নৌকার সংখ্যা, চলাচলের নির্দিষ্ট এলাকা, চার্জ দেওয়ার পরিকাঠামো ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, তার উপর এই উদ্যোগের ফল নির্ভর করবে। শুধু যোগাযোগ ও পর্যটন নয়, সুন্দরবনের মানুষের আয়ের পথ সম্প্রসারণেও একাধিক কর্মসূচির কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। মৎস্যচাষের উন্নয়নের জন্য ১৭ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। সুন্দরবনের বহু পরিবার মাছ ও কাঁকড়া চাষের উপর নির্ভরশীল। নদী ও জলাভূমিনির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত এই মানুষদের আয় বাড়াতে উৎপাদন, সংরক্ষণ এবং বাজারজাতকরণের সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন। আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও বাজারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করা গেলে স্থানীয় উৎপাদকদের লাভের পরিমাণ বাড়তে পারে।
কাঁকড়া চাষের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের জন্যও নির্দিষ্ট কর্মসূচী নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৩১ জনকে কাঁকড়া মোটাতাজাকরণ বা ক্র্যাব ফ্যাটেনিংয়ের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে উপযুক্ত পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাজারজাত করার আগে কাঁকড়ার বাণিজ্যিক মূল্য বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। সুন্দরবনের অর্থনীতিতে কাঁকড়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা উৎপাদনের মান উন্নত করার সুযোগ পেতে পারেন। তবে প্রশিক্ষণের পর তাঁদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, আর্থিক সহায়তা, সংরক্ষণের ব্যবস্থা এবং বাজারে বিক্রির সুযোগ কতটা নিশ্চিত করা যাবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উল্লেখ্য, কৃষিক্ষেত্রে সহায়তার জন্য ১৩ হাজার ৮৭৭ জন কৃষকের হাতে ব্যাটারিচালিত স্প্রেয়ার তুলে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। কৃষিকাজে কীটনাশক বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় তরল প্রয়োগের কাজে এই যন্ত্র ব্যবহার করা যায়। ব্যাটারিচালিত যন্ত্র ব্যবহারের ফলে হাতে বহন করে স্প্রে করার শ্রম কমতে পারে ও কাজের গতি বাড়তে পারে। তবে যন্ত্রের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যাটারি চার্জ করার সুযোগ ও কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকা দরকার। শুধু যন্ত্র বিতরণ নয়, দীর্ঘমেয়াদে তার ব্যবহার নিশ্চিত করাও এই কর্মসূচির সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হবে।
এ দিনের অনুষ্ঠানে মুড়িগঙ্গা নদীর উপর প্রস্তাবিত সেতু নির্মাণ নিয়েও বক্তব্য রাখেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, পূর্বতন তৃণমূল কংগ্রেস সরকার এই সেতু নিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। সেতু নির্মাণের বিষয়ে আশ্বাস দিয়ে তিনি জানান, ২০২৯ সালে তিনি নিজেই প্রকল্পটির উদ্বোধন করবেন। মুড়িগঙ্গার উপর সেতু নির্মিত হলে নদীপথের উপর নির্ভরশীল এলাকার যাতায়াত ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে সাগরদ্বীপের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ আরও সহজ করার ক্ষেত্রে এই প্রকল্পের গুরুত্ব রয়েছে। তবে সেতুর নির্মাণকাজের বর্তমান পর্যায়, অনুমোদন, অর্থের সংস্থান ও নির্দিষ্ট সময়সীমা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা জরুরি। ২০২৯ সালের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পূর্ণ করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে নির্মাণের অগ্রগতি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির উপর। এ প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী আরও দাবি করেন, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে সুন্দরবনের উন্নয়নের জন্য ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হলেও বাস্তবে প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাজ হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, বরাদ্দ অর্থের প্রায় ৮০ শতাংশ আত্মসাৎ করা হয়েছিল। তবে এই অভিযোগের সমর্থনে স্বাধীনভাবে যাচাই করা নথি বা নিরীক্ষার তথ্য প্রকাশিত হয়নি। ফলে অভিযোগটিকে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য হিসেবেই দেখা প্রয়োজন। সরকারি অর্থের ব্যবহার নিয়ে কোনও প্রশ্ন উঠলে তার নিষ্পত্তির জন্য নিরীক্ষা, প্রকল্পভিত্তিক ব্যয়ের হিসাব ও সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ।
সুন্দরবনের উন্নয়ন পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব কাজের কতটা সামঞ্জস্য থাকছে তার উপর। ১২০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ, ৩২০২টি প্রকল্প, রাস্তা নির্মাণ, জেটি তৈরি, কৃষি সহায়তা ও মৎস্যচাষের কর্মসূচী, প্রতিটি উদ্যোগই স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু প্রকল্পের কাজ সময়মতো শেষ করা, অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়গুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উল্লেখ্য, সুন্দরবনের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগের সমস্যা, নদীভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জীবিকার অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হন। তাই উন্নয়নের মূল্যায়ন শুধু বরাদ্দের অঙ্ক দিয়ে করা সম্ভব নয়। কতগুলি রাস্তা বাস্তবে তৈরি হল, কতগুলি দ্বীপে যাতায়াতের সুবিধা বাড়ল, কৃষক ও মৎস্যজীবীদের আয় কতটা বৃদ্ধি পেল ও পর্যটনের প্রসারের পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশ কতটা সুরক্ষিত থাকল—এই প্রশ্নগুলির উত্তরই প্রকল্পগুলির কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সুন্দরবনের পরিকাঠামো ও অর্থনীতিতে পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এখন নজর থাকবে, ঘোষিত প্রকল্পগুলি কবে কাজের পর্যায়ে পৌঁছয় ও স্থানীয় মানুষ তার সুফল কত দ্রুত পান।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Amit Mishra on Virat Kohli | ফিট হলেই দলে ফেরানোর আশ্বাস কোহলির, তারপর আর ফোনও ধরেননি! প্রাক্তন ভারতীয় স্পিনার অমিত মিশ্রের বিস্ফোরক অভিযোগ



