সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা ২৬ অক্টোবর ২০২৬: বঙ্গোপসাগরে দ্রুত শক্তি বাড়াচ্ছে গভীর নিম্নচাপ। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, সোমবার ভোরে সেটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে। পরবর্তী সময়ে শক্তি বাড়িয়ে মঙ্গলবার রাতে অতি তীব্র ঘূর্ণিঝড়ের চেহারা নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বুধবার দুপুরে অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলে আছড়ে পড়তে পারে এই ঘূর্ণিঝড়। সেই সময়ে ঝড়ের সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করা হলে তার নাম হবে ‘অর্ণব’ (Arnab)। এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের উপকূলবর্তী এলাকায় সতর্কতা জারি করার পাশাপাশি মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। সপ্তাহের মাঝামাঝি থেকে দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলাতেও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া দফতর।
আলিপুর আবহাওয়া দফতরের (Alipore Meteorological Department) রবিবার বিকেল ৪টের বুলেটিন অনুযায়ী, রবিবার সকালেই বঙ্গোপসাগরের উপর গভীর নিম্নচাপ তৈরি হয়েছে। সকাল সাড়ে ১১টার পর্যবেক্ষণে সেটির অবস্থান ছিল শ্রীবিজয়পুরম থেকে প্রায় ৪২০ কিলোমিটার উত্তর-উত্তর পশ্চিমে। অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনম থেকে এর দূরত্ব ছিল প্রায় ৮৭০ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণ পূর্বে। কাকিনাড়া থেকে প্রায় ৯৬০ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণ পূর্বে, মছলিপত্তনম থেকে ১০৬০ কিলোমিটার পূর্বে এবং বাপাতলা থেকে প্রায় ১১৩০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থান করছিল গভীর নিম্নচাপটি। গত ছয় ঘণ্টায় সেটি ঘণ্টায় প্রায় ৫ কিলোমিটার গতিতে এগিয়েছে বলে বুলেটিনে জানানো হয়েছে। হাওয়া অফিস সূত্রে খবর, সোমবার ভোরে পূর্ব-মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরের উপর গভীর নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে। তার পর উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া পরিস্থিতি বজায় থাকলে মঙ্গলবার রাতের মধ্যে ঝড়টি অতি তীব্র ঘূর্ণিঝড়ের পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। বুধবার সকালে সেটি অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলের কাছাকাছি চলে আসবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
স্থলভাগে আছড়ে পড়ার সম্ভাব্য সময় বুধবার দুপুর। অন্ধ্রপ্রদেশের বাপাতলা ও বিশাখাপত্তনমের মধ্যবর্তী উপকূলবর্তী এলাকায় ঝড়টির আঘাত হানার আশঙ্কা রয়েছে। ইয়ানাম উপকূলেও এর প্রভাব পড়তে পারে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, স্থলভাগে প্রবেশের সময় ঘূর্ণিঝড়ের স্থায়ী গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৫ থেকে ১২৫ কিলোমিটার থাকতে পারে। দমকা হাওয়ার সর্বোচ্চ গতিবেগ পৌঁছতে পারে ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটারে। ফলে অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে ঘূর্ণিঝড়ের প্রকৃত গতিপথ ও শক্তির পরিবর্তন সম্পর্কে পরবর্তী আবহাওয়া বুলেটিনের দিকে নজর রাখা প্রয়োজন। সমুদ্রে ঝড়ের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মৎস্যজীবীদের নিরাপত্তা নিয়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। রবিবার থেকেই পূর্ব-মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন অংশে হাওয়ার বেগ বাড়তে শুরু করেছে। সোমবার ঘূর্ণিঝড় তৈরি হওয়ার সম্ভাব্য দিনে সমুদ্রে ঘণ্টায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। মঙ্গলবার ঝড়ের শক্তি আরও বাড়লে হাওয়ার গতিবেগ ঘণ্টায় ৯০ থেকে ১১০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। উত্তাল সমুদ্রে ছোট ও মাঝারি মাছ ধরার নৌকার পক্ষে যাতায়াত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের উপকূলেও মঙ্গলবার থেকে আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটতে পারে। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ওই দিন থেকে উপকূলবর্তী এলাকায় ঘণ্টায় ৩৫ থেকে ৫৫ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। সমুদ্র উত্তাল থাকার আশঙ্কায় মৎস্যজীবীদের মঙ্গলবার থেকে সমুদ্রে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। যাঁরা ইতিমধ্যেই মাছ ধরতে সমুদ্রে গিয়েছেন, তাঁদের মঙ্গলবারের মধ্যে ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ অন্ধ্রপ্রদেশের দিকে হলেও বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া এই আবহাওয়া পরিস্থিতির প্রভাব পশ্চিমবঙ্গের উপকূলেও পড়তে পারে। তাই সতর্কতা মেনে চলা ও প্রশাসনের নির্দেশ অনুসরণ করা জরুরি। দক্ষিণবঙ্গে অবশ্য মঙ্গলবার পর্যন্ত বড় ধরনের ঝড়বৃষ্টির পূর্বাভাস নেই। কিন্তু বুধবার থেকে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে। বুধবার থেকে শুক্রবারের মধ্যে দক্ষিণবঙ্গের কয়েকটি জেলায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়া দফতরের পরিভাষায়, ২৪ ঘণ্টায় ৭ থেকে ১১ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাত হলে তাকে ভারী বৃষ্টি হিসেবে গণ্য করা হয়। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে জলীয় বাষ্পের জোগান ও বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের কারণে দক্ষিণবঙ্গের কিছু এলাকায় বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তে পারে।
বুধবার ও বৃহস্পতিবার দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। উপকূলবর্তী দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও পূর্ব মেদিনীপুরে ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টি হলে নিচু এলাকায় জল জমার সমস্যা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামেও ভারী বৃষ্টির কারণে গ্রামীণ রাস্তা এবং কৃষিজমিতে সাময়িক সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও বাসিন্দাদের আবহাওয়ার সর্বশেষ পূর্বাভাসের দিকে নজর রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় বৃহস্পতিবার ভারী বৃষ্টি হতে পারে। এই দুই জেলায় বুধবার তুলনায় কম বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও পরের দিন পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে পারে। অন্যদিকে কলকাতা, হাওড়া ও হুগলিতে বুধবার ও বৃহস্পতিবার বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। বৃষ্টির সময় বজ্রপাতের আশঙ্কা থাকায় খোলা জায়গায় থাকা, গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া কিংবা জলাশয়ের কাছে অবস্থান করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ।
উত্তর ২৪ পরগনা, পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ এবং নদিয়া জেলায় বুধবার থেকে শনিবার পর্যন্ত বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি হতে পারে। ফলে দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় টানা কয়েক দিন আবহাওয়ার ওঠানামা চলার সম্ভাবনা রয়েছে। কোথাও ভারী বৃষ্টি, কোথাও বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ছিটেফোঁটা বৃষ্টি, জেলাভেদে পরিস্থিতির তারতম্য হতে পারে। কৃষিকাজ, যাতায়াত ও দৈনন্দিন কাজকর্মের পরিকল্পনা করার সময় এই পূর্বাভাস মাথায় রাখা প্রয়োজন। উত্তরবঙ্গেও সপ্তাহের মাঝামাঝি থেকে বৃষ্টির দাপট বাড়তে পারে। বৃহস্পতিবার দার্জিলিং ও জলপাইগুড়িতে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এই দুই জেলা-সহ উত্তরবঙ্গের আটটি জেলায় হলুদ সতর্কতা জারি করা হয়েছে বলে হাওয়া অফিস সূত্রে খবর। শুক্রবার দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং ও আলিপুরদুয়ারে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। শনিবার পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের কয়েকটি এলাকায় ভারী বৃষ্টির পরিস্থিতি বজায় থাকার আশঙ্কা প্রকাশ হাওয়া অফিস সূত্রে।
পাহাড়ি এলাকায় ভারী বৃষ্টি হলে পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে যাতায়াতের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। কোথাও কোথাও ধস, পাথর গড়িয়ে পড়া কিংবা রাস্তার উপর জল জমার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে নির্দিষ্ট এলাকায় কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা স্থানীয় বৃষ্টিপাত ও ভূপ্রকৃতির উপর নির্ভর করবে। উত্তরবঙ্গের বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটকদেরও আবহাওয়ার সতর্কতা এবং প্রশাসনিক নির্দেশ মেনে চলা প্রয়োজন। ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ -এর সম্ভাব্য গতিপথ, শক্তি এবং স্থলভাগে আছড়ে পড়ার সময় নিয়ে আগামী কয়েক দিনের আবহাওয়া বুলেটিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চলেছে। বঙ্গোপসাগরে গভীর নিম্নচাপের অবস্থান ও গতিবেগের পরিবর্তনের উপর নির্ভর করেই ঝড়ের চূড়ান্ত গতিপথ নির্ধারিত হবে। তাই এখনই ঝড়ের প্রভাব সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর পরিবর্তে নিয়মিত সরকারি পূর্বাভাস অনুসরণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে উপকূলবর্তী এলাকার বাসিন্দা, মৎস্যজীবী, কৃষক ও পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের সতর্ক থাকতে হবে। মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা মানা, প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিরাপদ স্থানে রাখা এবং দুর্যোগের সময়ে প্রশাসনের নির্দেশ অনুসরণ করা ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকা জেলাগুলিতে নিকাশি ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও যাতায়াতের পরিস্থিতির উপর লক্ষ্য রাখা জরুরি।
বর্তমান হাওয়া অফিস সূত্রের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সোমবার থেকে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে এবং বুধবার অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলে আছড়ে পড়ার আশঙ্কা। পশ্চিমবঙ্গে এর প্রভাব মূলত মঙ্গলবার থেকে সমুদ্রের উত্তাল পরিস্থিতি ও বুধবার থেকে বৃষ্টির মাধ্যমে অনুভূত হতে পারে। তবে ঝড়ের গতিপথ ও শক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে পূর্বাভাসও বদলাতে পারে। তাই পশ্চিমবঙ্গের কোন জেলায় কখন কতটা বৃষ্টি হবে, তা জানতে আলিপুর আবহাওয়া দফতরের পরবর্তী বুলেটিনের দিকে নজর রাখাই সবচেয়ে জরুরি।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Sociology : ভারতবর্ষে সমাজতত্ত্বের ভাবনা



