সম্পাদকীয়
আমাদের লোকসাহিত্যে দুই লক্ষ্মী। এক, চঞ্চলা লক্ষ্মী। তিনি চঞ্চল, অস্থির, আজ এখানে কাল ওখানে। তিনি জুয়া, ফাটকা, অসৎ উপায়ে আসা ধনের প্রতীক। আরেক, অচলা লক্ষ্মী। তিনি স্থির, ধীর, গৃহস্থের ঘরে ধানের গোলায়, গোয়ালের গরুতে, শিশুর হাসিতে বাস করেন। শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে আমরা এই অচলা লক্ষ্মীকেই দেখি। ‘পল্লীসমাজ’ বা ‘পথের দাবী’ নয়, তাঁর ছোটগল্পগুলোতে, ‘মহেশ’ গল্পে যে গৃহস্থ বধূ তার শেষ সম্বলটুকু দিয়ে সংসার আগলে রাখে, সে-ই তো অচলা লক্ষ্মী।
আলোর ঘরে, অন্ধকারের খাতা: কোজাগরী লক্ষ্মীর সাহিত্য-পাঠ

কার্তিকের পূর্ণিমা। বাতাসে হিমের প্রথম স্পর্শ। ধানের ক্ষেত তখন সোনার মতো ভারী। গ্রাম বাংলার প্রতিটি উঠোনে, শহরের প্রতিটি ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে একটি অন্তহীন অপেক্ষা। তিনি আসবেন। তিনি আসছেন। কোজাগরী : কে জেগে আছ? এই একটি প্রশ্নের উপর ভর করে আবহমান বাংলার সবচেয়ে কোমলতম, সবচেয়ে গার্হস্থ্য উৎসবটি দাঁড়িয়ে আছে। লক্ষ্মীপুজো।
কিন্তু লক্ষ্মী কে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই বাঙালির সাহিত্য, তার পুরাণ, তার লোককথা ও তার গভীরতম মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের সামনে আমাদের দাঁড়াতে হয়।
আমাদের ছোটবেলার লক্ষ্মী ছিলেন মাটির প্রতিমা। লাল শাড়ি, সোনার গয়না, পায়ের কাছে সাদা পেঁচা, হাতে ধানের ছড়া। মা আলপনা দিতেন। চাল গুঁড়ো আর সিঁদুরের সেই সাদা-লাল নকশা যেন এক অলৌকিক মানচিত্র, যে মানচিত্র ধরে দেবী ঘরে ঢুকবেন। সেই আলপনার ভেতরেই ছিল আমাদের প্রথম সাহিত্য। কোনও শব্দ ছাড়াই একটি গল্প বলা, একটি আগমনের গল্প, একটি প্রাচুর্যের আকাঙ্ক্ষার গল্প। বাংলা সাহিত্যে লক্ষ্মী কখনওই শুধু ধনের দেবী নন। তিনি শ্রী। শ্রী মানে সৌন্দর্য, শ্রী মানে সুস্থিতি, শ্রী মানে গৃহের শান্তি। রবীন্দ্রনাথ যখন লেখেন, ‘লক্ষ্মী যখন আসবে তখন কোথায় তারে দিবি রে ঠাঁই?’ তখন তিনি টাকার কথা বলছেন না। তিনি বলছেন মনের প্রস্তুতির কথা। ঘর কী পরিষ্কার আছে? মন কী পরিষ্কার আছে? কোজাগরী পূর্ণিমার রাত জাগা আসলে তো আত্ম-জাগরণ। কে জেগে আছো? এই প্রশ্নটি ঈশ্বর মানুষকে করছেন না, মানুষ নিজেই নিজেকে করছে। আমি কী জেগে আছি? আমার লোভ, আমার হিংসা, আমার অলসতার কী ঘুম ভেঙেছে?
এইখানেই লক্ষ্মীর দ্বৈত সত্তা। আমাদের লোকসাহিত্যে দুই লক্ষ্মী। এক, চঞ্চলা লক্ষ্মী। তিনি চঞ্চল, অস্থির, আজ এখানে কাল ওখানে। তিনি জুয়া, ফাটকা, অসৎ উপায়ে আসা ধনের প্রতীক। আরেক, অচলা লক্ষ্মী। তিনি স্থির, ধীর, গৃহস্থের ঘরে ধানের গোলায়, গোয়ালের গরুতে, শিশুর হাসিতে বাস করেন। শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে আমরা এই অচলা লক্ষ্মীকেই দেখি। ‘পল্লীসমাজ’ বা ‘পথের দাবী’ নয়, তাঁর ছোটগল্পগুলোতে, ‘মহেশ’ গল্পে যে গৃহস্থ বধূ তার শেষ সম্বলটুকু দিয়ে সংসার আগলে রাখে, সে-ই তো অচলা লক্ষ্মী। বঙ্কিমচন্দ্র ‘কমলাকান্তের দপ্তরে’ একটি অসাধারণ প্রবন্ধ লিখেছিলেন, ‘আমার দুর্গোৎসব’। সেখানে তিনি বলছেন, বাঙালির দুর্গা হল, শক্তির আরাধনা, কিন্তু বাঙালির লক্ষ্মী হল, ভোগের আরাধনা। বঙ্কিমের এই পর্যবেক্ষণ নির্মমভাবে সত্য। দুর্গাপুজোয় আমরা বাইরে যাই, প্যান্ডেলে যাই, আলো দেখি। লক্ষ্মীপুজোয় আমরা ঘরে ফিরি। দরজা বন্ধ করি। নিজের সঞ্চয় গুনি। এই ঘরে ফেরাটাই সাহিত্যের সবচেয়ে বড় উপাদান।
জীবনানন্দ দাশের কবিতায় লক্ষ্মী আছেন, কিন্তু অন্য রূপে। ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে’ এই যে অনন্ত পথ চলা, এর শেষে কোথাও একটা ঘর আছে, যেখানে ধানসিঁড়ি নদীর তীরে একটি লক্ষ্মী-পেঁচা বসে আছে। জীবনানন্দের লক্ষ্মী নিঃশব্দ, তিনি কথা বলেন না। তিনি শুধু দেখেন। বাংলার প্রকৃতির মধ্যে যে প্রাচুর্য, যে শান্ত শ্রী, সেটাই তাঁর কবিতায় লক্ষ্মী। এবার আসি ব্রতকথায়। লক্ষ্মীর পাঁচালী, এটি বাংলার সবচেয়ে বেশি পঠিত সাহিত্য, যদিও একে আমরা সাহিত্য বলি না। কিন্তু ভাবুন তো, এই পাঁচালী কী? এটি একটি নিম্নবর্গের নারীর উত্থানের গল্প। পুরাণের গল্পে বলা হয়, লক্ষ্মীর ব্রত প্রথম প্রচার করেন এক দরিদ্র বণিক-বধূ। উচ্চবর্ণের পুরোহিতরা নয়, দেবীর আরাধনা শেখায় গ্রামের সাধারণ মেয়েরা। লক্ষ্মীর পাঁচালী তাই বাংলার প্রথম নারীবাদী সাহিত্য। সেখানে বলা হয়, অহংকার করো না, হিংসা করো না, পরনিন্দা করো না – তাহলেই লক্ষ্মী আসবেন। এটি একটি নৈতিক অর্থনীতির পাঠ। আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে এই পাঠটি আরও প্রাসঙ্গিক। আজ আমাদের চারপাশে চঞ্চলা লক্ষ্মীর উন্মত্ত নৃত্য। শেয়ার মার্কেট, ক্রিপ্টোকারেন্সি, রাতারাতি বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন। আমরা সবাই কোজাগরী রাতে জেগে আছি, কিন্তু ল্যাপটপের স্ক্রিনের সামনে। কে জেগে আছ? প্রশ্নটি এখন করেছে স্টক এক্সচেঞ্জ। আর আমরা উত্তর দিচ্ছি, আমি জেগে আছি, আমাকে আরও দাও।
এই লোভের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে সাহিত্যের লক্ষ্মী। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুঁই মাচা’ গল্পটি মনে করুন। ক্ষেন্তি নামের এক দরিদ্র মেয়ের পুঁইশাক খাওয়ার সামান্য ইচ্ছা। তার মৃত্যুর পর তার লাগানো পুঁই গাছটি বেড়ে ওঠে। ওই পুঁই গাছটিই তো লক্ষ্মী। যে প্রাচুর্য ভোগে নয়, ত্যাগে, স্মৃতিতে, মাটির কাছাকাছি থাকায়। তাই এবারের কোজাগরী পূর্ণিমায় যখন আপনি প্রদীপ জ্বালাবেন, শুধু টাকার জন্য প্রার্থনা করবেন না। প্রার্থনা করুন শ্রী-এর জন্য। আপনার লেখার টেবিলটি যেন পরিষ্কার থাকে, আপনার বইয়ের তাকে যেন ধুলো না জমে, আপনার মনের ভেতরের হিংসার অন্ধকার যেন দূর হয়। লক্ষ্মীপুজোর সাহিত্য আসলে ঘর গোছানোর সাহিত্য। বাইরের পৃথিবী যতই অশান্ত হোক, ভেতরের ঘরটি যেন শান্ত থাকে। সেই ঘরটিই তো কবিতা। সেই ঘরটিই তো গল্প। আলপনা আঁকুন। প্রদীপ জ্বালান। আর জেগে থাকুন। কারণ তিনি এখনও জিজ্ঞেস করছেন, কো জাগর্তি? কে জেগে আছ?🍁
🍂মহামিলনের কথা
“রাম” নাম মাত্র উচ্চারণের দ্বারাই শুক ও বেশ্যার অতি সুদারুণ সব পাপ বিনষ্ট হয়ে গেল।
কেউ কেউ বলেন, শাস্ত্রের নামের যে এত মহিমা দেখা যায় সে কেবল লোককে সৎ পথে আনবার জন্য; পাপীকে সৎ পথে এনে তাকে অন্যান্য সাধন-ভজন শেখালে তবে সে শান্তি লাভ করে।

শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ
এ যুগে মানুষ মরণকে জয় করতে পারে?
পারে— পারে—পারে।
সে উপায় কি অতি কঠিন?
না না—কঠিন নয়—অতি সহজ, সরল, সুগম।
আমায় সে পথ বলে দাও।
তুমি অবিরাম নাম কর— তাহলে মরণ-জয়ে সমর্থ হবেই।
কেবল নাম করলেই? শ্রদ্ধাভক্তিহীন, কামক্রোধের কিঙ্কর, শত দোষের একমাত্র আলয়, মহাপাপী আমি—
কেবল নাম করলেই উদ্ধার পাবো?
পাবে। নাম করতে করতে কাম যাবে, ক্রোধ যাবে,পাপ-তাপ সব দূর হয়ে যাবে— প্রেমের মহাপ্লাবনে ভাসতে ভাসতে তুমি সেই আনন্দের দেশে উপস্থিত হবে।
তাহলে শ্রদ্ধাভক্তিহীনেরও উপায় আছে?
হাঁ হাঁ। এক বেশ্যার একটি শুকপাখী ছিল। সেই বেশ্যা পাখীটিকে সর্বদা “রাম” নাম পড়াত। তারপর—
রামনাম পরং ব্রহ্ম সর্ব্ববেদাধিকং ফলম্।
সমস্তপাতকধ্বংসি শুকস্তু তত্তদাপঠৎ॥
—ক্রিয়াযোগসার।
সমস্ত বেদপাঠের অপেক্ষা অধিক ফলদায়ক; অখিল পাতকনাহক পরব্রহ্ম “রাম” নাম শুক পাঠ করত। বেশ্যার মুখে শুনে শুনে সেও বলত রাম রাম রাম। বেশ্যার রাম-নামে প্রীতি ছিল না, সে পাখী পুষেছে— তাকে পড়ানোর দরকার— এই মনে করে “রাম” নাম পড়াত, আর পাখীর মুখে শুনত। পাখীর মুখে শুনত পাখী বেশ পড়ছে বলে— রাম নাম শুনতে ভাল লাগতো বলে নয়। তাহলে কি হয়— রাম নাম তো সহজ বস্তু নয়।
রামোচ্চারণমাত্রেণ তয়োশ্চ শুকবেশ্যয়োঃ।
বিনষ্টমভবৎ পাপং সর্ব্বমেব সুদারুণম্॥
—“রাম” নাম মাত্র উচ্চারণের দ্বারাই শুক ও বেশ্যার অতি সুদারুণ সব পাপ বিনষ্ট হয়ে গেল।
কেউ কেউ বলেন, শাস্ত্রের নামের যে এত মহিমা দেখা যায় সে কেবল লোককে সৎ পথে আনবার জন্য; পাপীকে সৎ পথে এনে তাকে অন্যান্য সাধন-ভজন শেখালে তবে সে শান্তি লাভ করে।
যাঁরা এ কথা বলেন তাঁরা নামের পথে হাঁটেন নি,অন্য রাস্তা দিয়ে চলছেন। মাত্র যদি “রাম” এই দুইটি অক্ষর ধরে থাকা যায় তাহলে সাধন-ভজন, ভক্তি-মুক্তি— সব এসে তাকে বুকে করে একেবারে ঠাকুরের কাছে নিয়ে যায়।
শ্রীশ্রীনামামৃত লহরী | শ্রীওঙ্কারনাথ-রচনাবলী
🍂ফিরেপড়া | কবিতা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর -এর একটি কবিতা

শনির দশা
আধবুড়ো ঐ মানুষটি মোর নয় চেনা–
একলা বসে ভাবছে কিংবা ভাবছে না,
মুখ দেখে ওর সেই কথাটাই ভাবছি,
মনে মনে আমি যে ওর মনের মধ্যে নাবছি।
বুঝিবা ওর মেঝোমেয়ে পাতা ছয়েক ব’কে
মাথার দিব্যি দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিল ওকে।
উমারানীর বিষম স্নেহের শাসন,
জানিয়েছিল, চতুর্থীতে খোকার অন্নপ্রাসন–
জিদ ধরেছে, হোক-না যেমন ক’রেই
আসতে হবে শুক্রবার কি শনিবারের ভোরেই।
আবেদনের পত্র একটি লিখে
পাঠিয়েছিল বুড়ো তাদের কর্তাবাবুটিকে।
বাবু বললে, “হয় কখনো তা কি,
মাসকাবারের ঝুড়িঝুড়ি হিসাব লেখা বাকি,
সাহেব শুনলে আগুন হবে চটে,
ছুটি নেবার সময় এ নয় মোটে।’
মেয়ের দুঃখ ভেবে
বুড়ো বারেক ভেবেছিল কাজে জবাব দেবে।
সুবুদ্ধি তার কইল কানে রাগ গেল যেই থামি,
আসন্ন পেন্সনের আশা ছাড়াটা পাগলামি।
নিজেকে সে বললে, “ওরে, এবার না হয় কিনিস
ছোটোছেলের মনের মতো একটা-কোনো জিনিস।’
যেটার কথাই ভেবে দেখে দামের কথায় শেষে
বাধায় ঠেকে এসে।
কেইবা জানবে দামটা যে তার কত,
বাইরে থেকে ঠিক দেখাবে খাঁটি রুপোর মতো।
এমনি করে সংশয়ে তার কেবলই মন ঠেলে,
হাঁ-না নিয়ে ভাব্নাস্রোতে জোয়ার-ভাঁটা খেলে।
রোজ সে দেখে টাইম্টেবিলখানা,
ক’দিন থেকে ইস্টিশনে প্রত্যহ দেয় হানা।
সামনে দিয়ে যায় আসে রোজ মেল,
গাড়িটা তার প্রত্যহ হয় ফেল।
চিন্তিত ওর মুখের ভাবটা দেখে
এমনি একটা ছবি মনে নিয়েছিলেম এঁকে।
কৌতূহলে শেষে
একটুখানি উসখুসিয়ে একটুখানি কেশে,
শুধাই তারে ব’সে তাহার কাছে,
“কী ভাবতেছেন, বাড়িতে কি মন্দ খবর আছে।”
বললে বুড়ে, “কিচ্ছুই নয়, মশায়,
আসল কথা, আছি শনির দশায়।
তাই ভাবছি কী করা যায় এবার
ঘৌড়দৌড়ে দশটি টাকা বাজি ফেলে দেবার।
আপনি বলুন, কিনব টিকিট আজ কি।”
আমি বললেম, “কাজ কী।”
রাগে বুড়োর গরম হল মাথা;
বললে, “থামো, ঢের দেখেছি পরামর্শদাতা!
কেনার সময় রইবে না আর আজিকার এই দিন বই!
কিনব আমি, কিনব আমি, যে ক’রে হোক কিনবই।”
শঙ্খ ঘোষ –এর একটি কবিতা

দশমী
তবে যাই
যাই মণ্ডপের পাশে ফুলতোলা ভোরবেলা যাই
খাল ছেড়ে পায়ে পায়ে উঠে – আসা আলো
যাই উদাসীন দেহে গুরুগুরু বোধনের ধ্বনি
যাই সনাতন বলিদান
কপালে দীঘল ভালো পূজার প্রণাম
যাই মুখঢাকা জবা চত্বর অঙ্গন বনময়
যাই ছায়াময় ভিড়ে মহানিশি আরতির ধোঁয়া
দোলে স্মৃতি দোলে দেশ দোলে ধুনুচির অন্ধকার
মঠের কিনার ঘিরে কেঁপেওঠা বনবাসী হাওয়া
যাই পিতৃপুরুষের প্রদীপ -বসানো দুঃখ ,আর
ঠাকুমা যেমন ঠিক দশমীর চোখে দেখে জল
যাই পাকা সুপুরির রঙে-ধরা গোধূলির দেশ
আমি যাই
🍂প্রবন্ধ
স্থাপত্যের আকার ও নির্মাণে প্রয়োজনীয় শ্রমের পরিমাণ থেকে বোঝা যায়, কাজটি কয়েকজন মানুষের বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে সম্পন্ন হওয়া সম্ভব ছিল না। এর পিছনে ছিল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বহু মানুষের সম্মিলিত শ্রম। খাদ্য সংগ্রহের পাশাপাশি এত বড় নির্মাণ প্রকল্পে নিয়মিত শ্রম দেওয়ার সুযোগ কীভাবে তৈরি হয়েছিল, সেই প্রশ্নই প্রাগৈতিহাসিক সমাজের অর্থনীতি ও সংগঠন সম্পর্কে নতুন অনুসন্ধানের পথ খুলে দিয়েছে।
কৃষির আগেই ছিল মন্দির, আর সভ্যতার আগেই বিশ্বাস! গোবেকলি তেপে বদলে দিচ্ছে মানব ইতিহাসের চেনা ধারণা

শতদ্রু চক্রবর্তী
মানুষ কবে থেকে দেবতা, অদৃশ্য শক্তি কিংবা কোনও পবিত্র সত্তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল? কবে তার মনে জন্ম নিয়েছিল এমন এক জায়গা তৈরির ভাবনা, যেখানে একত্রিত হয়ে কোনও অজানা শক্তির উদ্দেশ্যে নিবেদন করা যায় নিজের ভয়, আশা কিংবা কৃতজ্ঞতা? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিকেরা একটি পরিচিত ধারণার উপর নির্ভর করেছেন। তাঁদের মতে, কৃষিকাজের প্রসার, স্থায়ী বসতি গঠন ও উদ্বৃত্ত খাদ্য উৎপাদনের পরেই জটিল সামাজিক কাঠামো তৈরি হয়। তারই পরিণতিতে গড়ে ওঠে মন্দির কিংবা উপাসনাস্থল। কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কের গোবেকলি তেপে সেই পরিচিত ব্যাখ্যার সামনে হাজির করেছে একটি বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। প্রায় ১১ হাজার বছরেরও বেশি পুরনো এই প্রত্নস্থলের পাথুরে স্থাপত্য জানাচ্ছে, কৃষিনির্ভর সভ্যতার পূর্ণ বিকাশের আগেই মানুষ এমন নির্মাণকাজে হাত দিয়েছিল, যার জন্য প্রয়োজন ছিল পরিকল্পনা, শ্রমের সমন্বয়, কারিগরি দক্ষতা ও কোনও না কোনও ধরনের সম্মিলিত বিশ্বাস।
এই স্থাপত্য কেবল উপাসনার কাজে ব্যবহৃত হত কি না, কিংবা এখানে সামাজিক সমাবেশ ও অন্য কোনও কর্মকাণ্ডও চলত কি না, এখনও তার সব উত্তর মেলেনি। ইতিহাস আসলে স্থির কোনও বিবরণ নয়। নতুন প্রত্নবস্তু, উন্নত বয়স নির্ণয় পদ্ধতি ও আগের আবিষ্কারের পুনর্বিশ্লেষণ আমাদের পরিচিত ব্যাখ্যাকে বদলে দিতে পারে। গোবেকলি তেপে দেখিয়েছে, কৃষি, ধর্ম, প্রযুক্তি ও সামাজিক সংগঠনের বিকাশকে একটি নির্দিষ্ট সরল ক্রমে সাজিয়ে দেখা কঠিন।
তুরস্কের বর্তমান সানলিউরফা শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে একটি পাহাড়ের উপর অবস্থিত এই প্রত্নস্থল। বিশ শতকের শেষ দশকে জার্মান প্রত্নতত্ত্ববিদ ক্লাউস শ্মিড্টের অনুসন্ধান গোবেকলি তেপেকে আন্তর্জাতিক প্রত্নতাত্ত্বিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। ১৯৯৪ সালে সানলিউরফা অঞ্চল নিয়ে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক দলের একটি প্রতিবেদনে এই স্থানের উল্লেখ তাঁর নজরে পড়ে। প্রতিবেদনটি পড়েই ক্লাউস সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আর অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে যান ওই অঞ্চলে। পরবর্তী খননকার্যে যে স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও অন্যান্য প্রত্নবস্তু সামনে আসে, তা প্রাগৈতিহাসিক মানুষের জীবন, সামাজিক সংগঠন এবং ধর্মীয় চেতনার ইতিহাসকে নতুন করে বিচার করার প্রয়োজন তৈরি করে। গোবেকলি তেপের গুরুত্ব প্রাচীনত্বে আটকে নেই। এর আসল তাৎপর্য লুকিয়ে রয়েছে মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে এর সম্পর্কের মধ্যে। যে সময়ের স্থাপত্য এখানে পাওয়া গিয়েছে, সেই সময়ের মানুষ প্রধানত শিকার ও খাদ্যসংগ্রহের উপর নির্ভরশীল ছিল। তারা বন্য প্রাণী শিকার করত, মাছ ধরত, ফলমূল সংগ্রহ করত, প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্য জোগাড় করত। তুরস্ক ও লেভান্ত অঞ্চলে প্রায় ১১ হাজার বছর আগে কৃষিকাজের বিকাশের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল বলে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় ধারণা করা হয়। তারও আগে ওই অঞ্চলের মানুষ বুনো গম ও বার্লি সংগ্রহ করত। কিন্তু গোবেকলি তেপের প্রাচীন স্থাপত্যের বয়স নির্ধারণ করে দেখা যায়, কৃষির উপর নির্ভরশীল স্থায়ী সমাজ প্রতিষ্ঠার আগেই সেখানে বিশাল পাথরের কাঠামো নির্মিত হয়েছিল।
এই তথ্য মানবসভ্যতার বিকাশ সম্পর্কে দীর্ঘদিনের একটি ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। এত দিন মনে করা হত, কৃষিকাজ মানুষকে খাদ্যের তুলনামূলক নিশ্চয়তা দিয়েছিল, আর সেই নিশ্চয়তা থেকেই জন্ম নিয়েছিল স্থায়ী বসতি, পেশার বিভাজন, সামাজিক স্তরবিন্যাস ও বৃহৎ নির্মাণ প্রকল্প। কিন্তু গোবেকলি তেপে দেখাচ্ছে, সম্পর্কটি হয়ত এত সরল ছিল না। মানুষের ধর্মীয় বা আচারসংক্রান্ত প্রয়োজনও বৃহত্তর সামাজিক সংগঠনের জন্ম দিতে পারে। অর্থাৎ, কৃষি ও স্থায়ী বসতি গড়ে ওঠার পরেই যে মানুষ সম্মিলিতভাবে বড় নির্মাণকাজে যুক্ত হতে পেরেছিল, এমন সিদ্ধান্ত আর বিনা প্রশ্নে মেনে নেওয়া যায় না। শিকারি-সংগ্রাহক সমাজে খাদ্যের উদ্বৃত্ত কীভাবে তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। এখানে উদ্বৃত্ত বলতে আধুনিক অর্থে শিল্পজাত পণ্য কিংবা বাজারের জন্য উৎপাদিত সামগ্রী বোঝানো হচ্ছে না। তা কোনও গোষ্ঠী তার প্রয়োজন মেটানোর পরও যদি অতিরিক্ত খাদ্য সংগ্রহ করতে পারত, তা হলে সেই বাড়তি খাদ্য অন্য কাজে যুক্ত মানুষদের বাঁচিয়ে রাখার সুযোগ তৈরি করত। শিকার, মাছ ধরা, বুনো উদ্ভিদ সংগ্রহ, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে আদানপ্রদানের মাধ্যমে পাওয়া সম্পদ বৃহত্তর সামাজিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা নিতে পারত। সেই পরিস্থিতিতে প্রত্যেককে সারাক্ষণ খাদ্য সংগ্রহে ব্যস্ত থাকতে হত না। কেউ পাথর কাটার কাজে দক্ষতা অর্জন করতে পারত, কেউ ভাস্কর্য নির্মাণ করতে পারত, আবার কেউ সামগ্রিক নির্মাণকাজের পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের দায়িত্ব নিতে পারত।
গোবেকলি তেপে নির্মাণের জন্য ঠিক কী ধরনের সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তা নিয়ে এখনও বহু প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু এর স্থাপত্যের আকার ও নির্মাণে প্রয়োজনীয় শ্রমের পরিমাণ থেকে বোঝা যায়, কাজটি কয়েকজন মানুষের বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে সম্পন্ন হওয়া সম্ভব ছিল না। এর পিছনে ছিল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বহু মানুষের সম্মিলিত শ্রম। খাদ্য সংগ্রহের পাশাপাশি এত বড় নির্মাণ প্রকল্পে নিয়মিত শ্রম দেওয়ার সুযোগ কীভাবে তৈরি হয়েছিল, সেই প্রশ্নই প্রাগৈতিহাসিক সমাজের অর্থনীতি ও সংগঠন সম্পর্কে নতুন অনুসন্ধানের পথ খুলে দিয়েছে।
আসলে, গোবেকলি তেপে আমাদের সামনে এমন এক সমাজের ছবি তুলে ধরে, যে সমাজের মানুষ কৃষিনির্ভর জীবনযাত্রার পূর্ণ বিকাশের আগেই বড় আকারের নির্মাণকাজে অংশ নিয়েছিল, পাথরে শিল্প সৃষ্টি করেছিল ও মৃতদের নিয়ে নির্দিষ্ট আচরণ পালন করে থাকতে পারে। তাদের বিশ্বাসের প্রকৃতি কেমন ছিল, এই স্থাপত্য কেবল উপাসনার কাজে ব্যবহৃত হত কি না, কিংবা এখানে সামাজিক সমাবেশ ও অন্য কোনও কর্মকাণ্ডও চলত কি না, এখনও তার সব উত্তর মেলেনি। ইতিহাস আসলে স্থির কোনও বিবরণ নয়। নতুন প্রত্নবস্তু, উন্নত বয়স নির্ণয় পদ্ধতি ও আগের আবিষ্কারের পুনর্বিশ্লেষণ আমাদের পরিচিত ব্যাখ্যাকে বদলে দিতে পারে। গোবেকলি তেপে দেখিয়েছে, কৃষি, ধর্ম, প্রযুক্তি ও সামাজিক সংগঠনের বিকাশকে একটি নির্দিষ্ট সরল ক্রমে সাজিয়ে দেখা কঠিন। মানুষের ইতিহাসে বিশ্বাস হয়তো কেবল উন্নত অর্থনীতি কিংবা স্থায়ী বসতির ফল ছিল না; বরং মানুষের সম্মিলিত কর্মকাণ্ড, সামাজিক সম্পর্ক ও খাদ্য উৎপাদনের পরিবর্তনের সঙ্গে তার পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল।
এই সময় দাঁড়িয়ে যে প্রশ্নগুলির উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না, আগামী দিনের গবেষণা হয়ত তার কিছু সমাধান দেবে। আবার নতুন আবিষ্কার জন্ম দিতে পারে আরও অনেক প্রশ্নের। তাই বর্তমানের জ্ঞানকে চূড়ান্ত সত্য বলে ধরে নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনই নতুন তথ্যের আলোয় পুরনো ধারণা সংশোধিত হলেই অতীতের সমস্ত ব্যাখ্যাকে অস্বীকার করার প্রয়োজনও নেই। গোবেকলি তেপের পাথরের স্তম্ভগুলি হাজার হাজার বছর ধরে দাঁড়িয়ে থেকে যেন সেই কথাই মনে করিয়ে দেয় যে, মানবসভ্যতার কাহিনি এখনও লেখা হচ্ছে, আর তার বহু গুরুত্বপূর্ণ দিক আজও হয়ত মাটির গভীরেই অপেক্ষা করছে!🍁
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হয়েছে সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।
হারিয়ে যাওয়া নারীর
ইতিকথা
মমতা রায় চৌধুরী
৩৪.
জীবনের হিসেবগুলো বোধহয় কেউ সেভাবে মেলাতে পারে না। ছোটবেলায় রংমিলান্তি খেলতে খেলতে ধাঁধায় পড়ে যেতাম। তাইএসব যদি অংক কষে হতো সমাধান করা যেত তাহলে অনেক কিছুই বদলে যেত। সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠে তিথি ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল পেছনে পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো পুচু। শহরের আবছা ভোর আস্তে আস্তে মানুষের সমাগম হচ্ছে। ভ্যানে করে সবজি যাচ্ছে ।জমাদার রাস্তা ঝাট দিচ্ছে। দত্তদের বাড়ি থেকে হঠাৎ করে একটি জানলা খুলে কী দেখল, কে জানে! আবার জানলা বন্ধ হয়ে গেল। নিচের কুকুরগুলো ডেকে উঠল। পুচু ও হঠাৎ করে ডেকে উঠলো। পুচুর গায়ে হাত বুলিয়ে দিল তিথি ও লেজ নাড়তে লাগল। আপন মনে লতাদির কথা ভাবতে লাগল। তারপর কী মনে হল, বলল চল তো পুচু কাগজি মাসির কাছে যাই।
পুচু আগে আগে যেতে লাগল।
রুক্ষ বাস্তবের মাটিতে এই শহরের বুকে নতুন পথের আশায় বারবার পথিক সেজে দাঁড়িয়েছিল। হেমন্তের গোধূলি বেলায় বারবার হারিয়ে যেতে চেয়েছিল কোনও এক ভালবাসার মানুষের সঙ্গে। কিন্তু ভাগ্য তার সঙ্গে বিট্রে করেছে। কখনও কখনও অন্ধকারের মধ্যে এক চিলতে আলোর আশায় দিন গুনেছে ভেবেছে হয়ত, দেখা হবে কখনও সেই সুন্দরের সঙ্গে! তিথি দেখল মাসি যখন কথাগুলো বলছে তখন চোখ দুটো ছল ছল করছে। এতগুলো বছর কাগজি মাসেও লড়াই করেছে জীবনের সঙ্গে। হয়ত লড়াই করতে করতে চোখের জল ফেলতে ফেলতে একসময় সেই জল হারিয়ে গিয়েছে। কিন্তু আজ যখন লতা দি’র কথা বলছিল, তখন আবার নতুন করে যেন জলপ্রপাত এর মত উপচে পড়ছিল।
ও বাবা দিব্যি মাসির দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে পেছন দিকে তাকাল।
—দেখছ, আমি আসি কিনা! তারপর নিজেই ঢুকে গেল।
কাগজি মাসি বলল,
—তুই এসে গেছিস বস বস। নাকি শোবে এখানে?
—ও বাবা কি করছ, মাসি।
এই যে আমার পাশে শুয়ে পড়ল।
—তাই তো দেখছি।
—আবার তুমি এখানে নেমে আসলে!
—ঘুম ভেঙে গেল মাসি, দেখলাম তোমার কাছে যাই।
বুঝেছি লতার কথা জানতে এসেছ, না?
—ঠিকই ধরেছ। তারপরের ইতিহাসটুকু সম্পূর্ণ না করলে হয়।
মাসি উঠে বসল, পা দু’টোকে খুব কষ্টে টেনে বসার চেষ্টা করল, আসলে বয়স হয়েছে তো বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ব্যথাগুলো যেন আরও বেশি আষ্টেপৃষ্ঠে ধরছে চেপে।
—মাসি ব্যথার ওই স্প্রে দিচ্ছ না?
—দি মাঝে মাঝে আবার ভুলেও যাই।
—না না… ভুললে হবে না। দিতে হবে মাসি, এখন তো কত কষ্ট হচ্ছে বলো।
—হ্যাঁ, তারপর বলো কী হল?
—ছেলেটাকে সকাল হলে বিদায় করে দিল। তারপর বলল কোনওদিন যেন দেখি না এই গলিতে।
—ছেলেটা অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল কেন?
তিথি বলল,
—কেন? অবাক হয়েছে কেন?
—আসলে ওতো নিজেই জানে না, লাল জলের নেশায় কী কী কথা বলেছে!
—হ্যাঁ, তা অবশ্য ঠিক।
—লতা বলল, যদি আবার এই গলিতে দেখতে পাই তাহলে কিন্তু খবর আছে। ছেলেটি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, কিন্তু আমি তো তোমাকে ভালবাসি। লতা সেদিন খিস্তি দিয়ে বলেছিল, ভালবাসি! আরে ভাগ ভাগ ভালবাসা নিজের বউকে গিয়ে ভালবাস গে, তাহলে আর এখানে আসতে হবে না। জীবনটা একেবারে তেজপাতা করে দিচ্ছে।
ছেলেটি না লতার এই রুদ্র মূর্তি দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিল আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ বেরিয়ে গিয়েছিল।
—এরপর থেকে লতা জীবন শুরু করল নতুন করে?
কাগজি মাসি বলল,
—ছেলেটিকে তাড়িয়ে দেবার পর লতা ভীষণ কেঁদেছিল। আসলে লতাও ভালবেসে ফেলেছিল। আর যদি এইভাবে কঠিন কথা না বলত, ছেলেটি আবার আসত। লতা চাইছিল না ওর বউকে কষ্ট দিতে। একজন নারী হয়ে ও-এটা কিছুতেই করতে পারবে না।
এজন্য ওকে খুব কঠিন হতে হয়েছিল। তবে কি জানো বৌমা লতা কিন্তু এবার গলির জীবনটাকেই নতুন ভাবে শুরু করল।
—কী বলছ মাসি?
—শুরু মানে লতাদি তো গলিতেই জীবন যাপন করছিল।
—হ্যাঁ সেটা তো করছিলে, তার মধ্যেও নিজেকে বাঁচিয়ে ছিল এবার আর নিজের জীবনটাকে সে গুরুত্বই দিল না, সে ভেবে নিয়েছে এর জীবনের কোনও আর মূল্য নেই। বরং যতদিন তার রূপ যৌবন আছে সেটাকে খাটিয়ে তাকে অনেক অনেক টাকা রোজগার করতে হবে।
—কী বলছ মাসি?
তিথি অবাক হয়ে যায়।
—হ্যাঁ। গলির মেয়েদের তো এটাই নিয়ম কারণ কী রূপ যৌবন থাকতে তাঁরা যদি টাকা-পয়সা বাড়িয়ে এসব কিছু না করে নিতে পারে ভবিষ্যতের সঞ্চয় না করে নিতে পারে। তাহলে পরবর্তীতে তাদের আর কী মূল্য থাকবে কে দেখবে এদেরকে?
তিথি মাথাটা নেড়ে বলল,
—কথাটা ঠিকই বলেছ।
—লতা নিজেও অনেক বেশি মদ খেতে লাগল, আর মাসিকে জানিয়ে দিল ওর জন্য যত কাস্টমার আসবে সব কাস্টমার কেউ অ্যাটেন করবে। অন্য কাউকে যেন সেই কাস্টমার না দেওয়া হয়। মাসি তো এই কথা শুনে খুশি যেমন হয়েছিল তেমনি অবাকও হয়েছিল একি কথা শুনছে? ভূতের মুখে রাম নাম! তবে লতার ভাবমূর্তি দেখে মাসি ও কিন্তু বেশ শিহরিত। লতার মুখের উপর কিছু বলতে পারেনি, আর বলবেই বা কী? মাসি তো এটাই চাইছিল ইনকাম।
—মাসি!
—হ্যাঁ গো, এক সময় লতা এত এত টাকা ইনকাম করতে লাগল তোমাকে কি বলি! আমাকে কত টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করেছে।
—তাহলে এখন তোমাকে সাহায্য করে না?
—এখন ওরও তো বয়স হয়ে গেছে বলো, ওরও তো নিজেকে ভাল রাখার জন্য পুঁজি রাখতে হবে। তারপর আবার নিজের বাচ্চা আছে।
তিথি অবাক হয়ে বলল,
—বাচ্চা!
—কী যে বলো না বৌমা। কিচ্ছু বোঝ না যেন বাচ্চা হবে না।
—তা তোমাদের কোনও প্রোটেকশন থাকে না?
—হ্যাঁ সে থাকবে না কেন! তবে কখনো কখনো তো বাইচান্স হয়ে যায়।
—তাহলে সেগুলোকে তোমরা কী করো? আবরশন করো না।
—হ্যাঁ। তার মধ্যেও কেউ কেউ বাচ্চা রেখেও দেয়। লতার ক্ষেত্রেও এরকম হয়েছিল ও-বাচ্চাটিকে নষ্ট করতে চায়নি।
—তাহলে লতা দি’ও মা হয়েছিল?
—হ্যাঁ হয়েছিল?
—ওর ছেলে হয়েছিল। সেই ছেলে একদিন বড় হল ওর চোখের সামনে সে ছেলে ও- মারাও গেল। সেই
শোকটা নিতে ও পার ছিল না।
—কত বছর বয়সে মারা গেল।
বড় হয়েই মারা গেছে। ছেলের বিয়েও দিয়েছিল।
—বিয়ে!
—হ্যাঁ।
—কে বিয়ে করবে?
লতা তো অন্য জায়গায় বাড়ি কিনেছিল। সেখানেই তার ছেলেকে রেখেছিল পড়াশোনা শিখিয়েছে। ছেলের বিয়ে দিয়েছে যখন তার নাতি হল, ওর ছেলেটি মারা গেল।
—কী বলছ মাসি? এসব কথা কি শুনছি? এ তো পুরো জীবনের গল্প আমরা যদি আমাদের বাস্তব জীবনের পাতা উল্টাই তাহলে এই ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি দেখব?
রুক্ষ বাস্তবের মাটিতে এই শহরের বুকে নতুন পথের আশায় বারবার পথিক সেজে দাঁড়িয়েছিল। হেমন্তের গোধূলি বেলায় বারবার হারিয়ে যেতে চেয়েছিল কোনও এক ভালবাসার মানুষের সঙ্গে। কিন্তু ভাগ্য তার সঙ্গে বিট্রে করেছে। কখনও কখনও অন্ধকারের মধ্যে এক চিলতে আলোর আশায় দিন গুনেছে ভেবেছে হয়ত, দেখা হবে কখনও সেই সুন্দরের সঙ্গে! তিথি দেখল মাসি যখন কথাগুলো বলছে তখন চোখ দুটো ছল ছল করছে। এতগুলো বছর কাগজি মাসেও লড়াই করেছে জীবনের সঙ্গে। হয়ত লড়াই করতে করতে চোখের জল ফেলতে ফেলতে একসময় সেই জল হারিয়ে গিয়েছে। কিন্তু আজ যখন লতা দি’র কথা বলছিল, তখন আবার নতুন করে যেন জলপ্রপাত এর মত উপচে পড়ছিল।
—জানো বৌমা, আর যেদিন সেই ছেলেটাকে বিদায় করল তারপরেই লতা বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল, আমার দিকে। আমাকে এসে জড়িয়ে ধরে প্রচুর কেঁদেছিল।
তিথি মনে মনে ভাবল, হ্যাঁ সেটাই স্বাভাবিক। হয়ত সুপ্ত আগ্নেয়গিরি হঠাৎ করে জেগে উঠেছিল আবার নতুন উদ্যমে জীবনকে শুরু করবে বলে। 🍁(ক্রমশঃ)
🍂কবিতা
হিমালয় ঘোষ -এর একটি কবিতা

বুকের ভেতর অন্যরকম
তুমি এখনও বোঝোনি এই শহরে কত মানুষ
রোজ মরে যায়- প্রেম না-পেয়ে
এখন আমার আর কিছু নেই
একটা পুরোনো জামা আছে একটা নদীর নাম মনে আছে।
বাড়ির উঠোন হয়ে যাই
যেখানে শুধু রোদ পড়ে থাকে।
তোমার সবুজ ঠোঁটে আসলে একটা মাঠ
আমি সারাদিন ওখানে শুয়ে থাকতে পারি
শুধু তোমার চুলের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে
একটা বিকেল পার করে দেওয়া যায়।
কারা চুমু খোঁজে, শরীর খোঁজে…
আমরা খুঁজি একটা দীর্ঘ সময়-
সেখানে শুধু তোমার বুকের ওঠানামা
চলো, কোথাও যাই
এই ঘরটাই ব্রহ্মলোক হয়ে যাক,
এই লেপটাই পাহাড়…
শ্রিয়া বিশ্বাস -এর দু’টি কবিতা

গন্ধ
তোমার গায়ের গন্ধ মানে বিকেল
মানে ফেরার পথে
তোমার চোখে লেগে থাকা
রোদের দাগ
কাছে এলে মনে হয়
ভিতরের কে যেন কাছে এল
জড়িয়ে ধরলে মনে হয়
আমি বাড়ি ফিরলাম
কেন, বল

সবুজ
সবুজ। তোমার
পাতলা ঠোঁটে
সেদিন
আমাদের সব গাছ আমাদের ঘরে
চলে এসেছিল
যেন্ এটাই আমাদের স্টেশন
আমরা কোথাও
যাই না, আমরা থেমে থাকি
তোমার লোমহীন বুকে
মুখ রাখলে
টের পাই ভেতরে তবলা বাজছে
সুমন চট্টোপাধ্যায় -এর পাঁচটি কবিতা

ইস্টিশন
ট্রেনটা এখনও দেরি করে
চায়ের ভাঁড়ে ধোঁয়া ওঠে কুয়াশার মতো।
একটা কুকুর, ভিখারি, আর আমি
তিনজনেই কোথাও যাব বলে বসে!
ট্রেন এলে আমরা আলাদা হয়ে যাব
এই একসাথে বসে থাকাটাই ছিল যাত্রা
আর ইস্টিশনটাই ছিল আসল গন্তব্য।

কোজাগরী
মা যখন আলপনা দেয়, চাল গুঁড়ো গলে যায় আঙুলে,
সাদা দাগে দাগে একটা পথ তৈরি হয়।
আমি জিজ্ঞেস করি, এই পথ কোথায় যায়?
মা বলে, লক্ষ্মী আসবে।
আমি বড় হয়ে বুঝেছি, লক্ষ্মী আসে না
আসে শীত। আসে ধান কাটার গন্ধ।
কিন্তু মায়ের আঙুলে এখনও সেই পথ আঁকা হয়
কারণ অপেক্ষা করাটাই উৎসব, পথটাই আসলে ঘর।
ফ্ল্যাট নম্বর ৪০২
রোজ সন্ধ্যা সাতটায় পাশের ফ্ল্যাটে কেউ পিয়ানো বাজায়,
আমি তার নাম জানি না, মুখও দেখিনি।
আমার ভাত পুড়ে যায়, তার সুর কেটে যায়!
দু’জনেই একসাথে থেমে যাই।
একদিন লিফটে দেখা, হাসলাম দু’জনেই,
কথা হল না।
পরের দিন পিয়ানো আর বাজেনি,
আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি অনেকক্ষণ।
মানুষ এভাবেই পরিচিত হয়,
শব্দে, গন্ধে, না-বাজা সুরে,
তারপর একদিন সবাই চলে যায়, এবং
রেখে যায় ফাঁকা এক-একটা সন্ধ্যা।
পুরনো শার্ট
বাবার আলমারিতে নীল শার্ট ঝুলে আছে
দশ বছর ধরে কেউ পরে না।
মা ফেলে দিতে বলে, আমি বলি থাক।
ওই শার্টের পকেটে এখনও পুরনো বাসের টিকিট,
কৃষ্ণনগর থেকে বহরমপুর, ২০১৩।
আর কলমের দাগ।
বাবা এখন আর বাসে ওঠে না, লেখেও না।
কিন্তু শার্টটা ঝুলন্ত…
যেন একটা মানুষ তার নিজের চিহ্ন রেখে গিয়েছে,
আমি মাঝে মাঝে ওটা গায়ে দিই,
হাতা দু’টো অনেক বড়…
মনে হয়, বাবা পুরনো কাপড়ের মত নরমভাবে
আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে

ভাগীরথীর কাছে
প্রতিদিন ভাগীরথীর পাড়ে যাই
কিছু ফেলতে বা কিছু নিতে নয়।
শুধু দেখি জল কীভাবে যায়…
আমাদের ছোটবেলায় নদীটা আরও চওড়া ছিল,
নাকি আমরা ছোট ছিলাম বলে তাই মনে হতো?
এখন নদীর ওপর ব্রীজ, আলো…
সেলফি তোলার ভিড়
কিন্তু জল একই রকমভাবে যায়, বয়ে যায়
কোনো তাড়া নেই, উল্টো স্রোতও নেই
আমি আমার বাবার হাত ধরে এই ঘাটে এসেছি,
আমার ছেলেকে নিয়ে আসি এখন।
বাবা বলতেন, নদীতে কিছু ফেলতে নেই, পাপ হয়।
আমি আমার ছেলেকে বলি, নদীতে কিছু ফেল না, নদীটা বাঁচুক।
একই কথা, শুধু পাপ শব্দটা উঠে গিয়েছে, পরিবেশ এসেছে।
নদীটা শোনে, কিছু বলে না।
সে জানে, শব্দ বদলায়, মানুষ বদলায়,
সে শুধু বয়ে যায়, আমাদের সব কথা নিয়ে…
সমুদ্রের দিকে, সেখানে সব কথা নোনা জলে এক হয়ে যায়।
ভৈরব সিংহ -এর তিনটি কবিতা

অপেক্ষা
বলেছিলে আসবে
আমি ঘড়ি দেখিনি
তিনবার চা ঠান্ডা হয়েছে
আমি গরম করেছি একইভাবে।
তুমি আসোনি
চা এখনও গরম আছে
আমার অপেক্ষাটার মত।

দশমীর পর
গতকাল রাত থেকে ঢাক থেমে গেছে
উঠোনে শুধু কাঠির দাগ পড়ে আছে।
ঠাকুরের জায়গাটা ফাঁকা
ওখানে এখন একটা কাক বসে আছে।
আমাদের মা সকাল থেকে বাসন মাজছে
যেন কিছুই হয়নি
আমার জামাটা এখনও নতুন
কিন্তু পরতে ইচ্ছে করছে না
উৎসব শেষ হয় না
উৎসব সরে যায় অন্যদিকে
যেভাবে সূর্য, যেভাবে চাঁদ
একইভাবে আসা যাওয়া করে

পুরনো বইয়ের দোকান
কলেজ স্ট্রিটে বৃষ্টি পড়ছে
আমি একটা পুরনো বই হাতে দাঁড়িয়ে
দাম পঞ্চাশ টাকা, ভেতরে কারও নাম লেখা,
‘সুমনা, ১৯৯৮’…
কে এই সুমনা? ওকি এখনও বই পড়ে?
নাকি তার বিয়ে হয়ে গিয়েছে, বই পড়ার সময় নেই!
বইটা কিনে নিলাম,
সুমনার জন্য নয়, আমার জন্য।
কারণ প্রত্যেক পুরনো বই আসলে দুটো গল্প, একটা ভেতরে ছাপা
আরেকটা মার্জিনে লেখা,
যেটা হারিয়ে গিয়েছে।
🍂গল্প
এই আছি শব্দটার মধ্যে যে কি শক্তি আছে, তা শুধু সানি জানে। সাংবাদিক সানি রায়, যে বড় বড় মন্ত্রীদের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করে, কিন্তু সে এই একটি শব্দে কেঁপে যায়। নরম হয়ে যায় বুকের ভেতরটা। ও-চেয়ার থেকে উঠে জোনাকিকে কোলে তুলে নিল। বিছানায় নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিল। তারপর দু’জনে জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইল। কোনও কথা বলল না কেউ-ই। শুধু বুকের মধ্যে বুক। জোনাকির শরীরটা উষ্ণ। সানি তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আস্তে আস্তে। যেন কোনও বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে।
আলিঙ্গন

সানি সরকার
কলকাতার এই বাড়িটা পুরনো। গড়িয়াহাটের মোড় থেকে একটু ভেতরে গোলপার্কের দিকে, একটা গলির ভেতর। দোতলার বাড়ি। বারান্দায় একটা মাধবীলতা গাছ। সানি যখন সন্ধ্যেবেলা অফিস থেকে ফেরে, গাছটার দিকে তাকায়। ফুলগুলো তখন কেমন যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। সানি রায়। বয়স চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। একটি প্রথম সারির বাংলা দৈনিকের সিনিয়র এডিটর। কিন্তু বাড়ি ফিরে সে আর সাংবাদিক থাকে না। সে তখন শুধু সানি। জোনাকির সানি। আর জোনাকি মিত্র। স্কটিশ চার্চ কলেজে বাংলা পড়ায়। ছাত্র-ছাত্রীরা বলে, জোনাকি ম্যাডাম ক্লাসে রবীন্দ্রনাথ পড়াতে পড়াতে কেঁদে ফেলেন। তার চোখে একটা কী একটি আছে, যেটা সানি ছাড়া কেউ পড়তে পারে না, বা বোঝে না।
দু’জনের প্রেমটা কোনও সিনেমার মতো নয়। কোনও নাটকীয়তা নেই। আছে শুধু অপেক্ষা আর আলিঙ্গন। সকাল সাতটায় জোনাকি উঠে যায়। চা বানায়। সানির ঘুম ভাঙে চায়ের গন্ধে। উঠে বসে, চোখ কচলায়। জোনাকি চায়ের কাপটা বাড়িয়ে দেয়। তারপর কোনও কথা না বলে, সানি জোনাকিকে টেনে নেয় বুকের কাছে। একটা দীর্ঘ আলিঙ্গন। সারাদিনের জন্য শক্তি সঞ্চয়। এই আলিঙ্গনে কোনও তাড়া নেই, কোনও দাবি নেই। শুধু আছে, আমরা আছি। দু’জনের।
‘আজকে তোমার কলেজ কখন?’ সানি জিজ্ঞেস করে, জোনাকির চুলে মুখ গুঁজেই সানি জিজ্ঞেস করে।
‘এগারোটায়। তোমার?’
‘আজকে মিটিং আছে। এডিটোরিয়াল। কিন্তু তাড়াতাড়ি ফিরব।’
এই তাদের সংসার। ছোট্ট, কিন্তু গভীর।
ঘাটশিলা থেকে নিয়ে আসা নীল শাড়িটা জোনাকি একদিন সন্ধ্যেবেলা পরল। কোনও কারণ ছাড়াই পরল। সানি সেদিন খুব ক্লান্ত। কিছু একটি বিষয় নিয়ে বসের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে। বারান্দায় বসে সিগারেট খাচ্ছে। যদিও জোনাকি সিগারেট পছন্দ করে না। জোনাকি এসে তার পাশে বসল না। সে সামনে বসল, সামনে। তারপর সানির হাঁটুতে হাত রাখল। বলল, ‘তাকাও আমার দিকে।’
সানি তাকাল। জোনাকি, নীল শাড়ি, খোলা চুল। চোখে কাজল।
প্রথমবার যখন ওরা বাংরিপোশি গিয়েছিল, তখন বর্ষাকাল। সানি বলেছিল, ‘চলো, কোথাও পালাই। কলকাতা দম বন্ধ করে দিচ্ছে।’
জোনাকি বলেছিল, ‘কোথায়?’
‘বাংরিপোশি। বুদ্ধদেব গুহ যেখানে যেতেন। সেই উপন্যাস…’
তারপর আর অপেক্ষা নয়। খড়গপুর পেরিয়ে, বোম্বে রোড ধরে গিয়েছিল। দু’পাশে শালবন। বৃষ্টি হচ্ছিল ঝিরঝির করে। বাংরিপোশির রিসর্টে যখন পৌঁছল, তখন বিকেল। বুড়িবালাম নদী ফুলে ফেঁপে উঠেছে। কটেজের বারান্দায় বসে ছিল ওরা। সামনে পাহাড়। পাহাড়ের মাথায় মেঘ আটকে আছে। জোনাকি হঠাৎ বলল, ‘সানি, এই জায়গাটা এত স্তব্ধ কেন?
সানি কোনো উত্তর দিল না। সে জোনাকির পাশে গিয়ে বসল। তারপর তাকে আলিঙ্গন করল। পেছন থেকে। জোনাকির কাঁধে থুতনি রাখল।
‘নীরবকে শুনতে হয়,’ সানি ফিসফিস করে বলল। আরও বলল থেমে থেমে, ‘শব্দ দিয়ে না, বুক দিয়ে।’
জোনাকি চোখ বন্ধ করল। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে শালপাতার ওপর। টুপটাপ শব্দ। আর ভেতরে, সানির বুকের ধুকপুকানি। সেই শব্দটা জোনাকির কাছে বুড়িবালাম নদীর চেয়েও গভীর। সেই রাতে তারা অনেকক্ষণ আলিঙ্গন বদ্ধ হয়ে শুয়ে ছিল। কোনও কথা ছিল না। বাইরে ঝিঁঝিঁ ডাকছিল। মাঝে মাঝে দূরে রাতপাখির ডাক। সানি জোনাকির কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। জোনাকি বলল, ‘আমার ভয় করছে।’
‘কিসের ভয়?’
‘যদি এই সময়টা ফুরিয়ে যায়?’
সানি তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। বলল, ‘সময় ফুরোয় না, জোনাকি। সময়কে ধরে রাখতে হয়। এই যে দ্যাখো, এভাবে।’
এই মুহূর্তগুলিই তো সময়কে ধরে রাখার একমাত্র উপায়। শরীর দিয়ে, মন দিয়ে।…
এরপর সেখান থেকেই ঘাটশিলা প্ল্যান। শীতকালে। ডিসেম্বরের শেষ। কলকাতায় তখনও শীত পড়েনি ভাল করে। কিন্তু ঘাটশিলায় কনকনে ঠাণ্ডা। সুবর্ণরেখা নদীর ধারে, রাতমোহনা ব্রীজের কাছে একটা বাংলোতে উঠেছিল তারা। সকালে তারা নদীর ধারে হাঁটতে গেল। কুয়াশা। নদীর জল কাচের মতো পরিষ্কার, কিন্তু ঠাণ্ডা। জোনাকি একটা শাল জড়িয়ে ছিল। সবুজ শাল। সানি জোনাকির এই লুকটা খুব পছন্দ করে।
‘বিভূতিভূষণ এখানে হাঁটতেন,’ জোনাকি বলল। ‘আমার ছাত্রছাত্রীদের পড়াই। আর ভেসে যাই জানো।
‘আর বুদ্ধদেব গুহ’? সানি হাসল।
‘তিনিও’
ওরা একটা পাথরের ওপর বসল। সামনে নদী বয়ে চলেছে। সানি বলল, ‘জানো জোনাকি, আমি যখন খবর লিখি, যখন রাজনীতির কাটাছেঁড়া করি, তখন আমার মনে হয়, পৃথিবীটা খুব কঠিন। কিন্তু তোমাকে যখন জড়িয়ে ধরি, তখন মনে হয়, পৃথিবীটা সম্পূর্ণ তুলোর থেকেও নরম।’’
জোনাকি কোনও উত্তর দিল না। সে সানির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজেই এগিয়ে এসে সানির বুকে মুখ গুঁজল। সামনে নদী। গাছপালা, পাখি, সমস্ত কিছুকে উপেক্ষা করল ওরা। শীতের হাওয়ায় জোনাকিরর শাল উড়ছিল। সানি তাকে বুকের ভেতরটায় জড়িয়ে ধরল। সেই মুহূর্তটা দীর্ঘ হল। খুব দীর্ঘ। যেন নদীর বয়ে যাওয়ার মতো। যেন তারা সময়কে আটকে দিতে চাইছে। একজন আদিবাসী নারী মাথায় কিছু নিয়ে যাচ্ছিলেন। সে তাদের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। জোনাকি লজ্জা পেয়ে মুখ লুকাল সানির বুকেই।
‘লজ্জা কি? প্রেম তো লজ্জার নয়। প্রেম তো আলোর মতো। তাই না ম্যাডাম?’
কলকাতায় ফিরে আবার সেই জীবন। সানির অফিস, জোনাকির কলেজ। খবরের কাগজের ডেডলাইন, ছাত্রদের খাতা দেখা। কিন্তু রাত হলেই আবার ওরা নিজেদের কাছে ফিরে আসে। একদিন রাতে সানির মন খারাপ। একটি বড় স্টোরি নিয়ে চাপ। একটি রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি। ফোন আসছে হুমকির। জোনাকি কিছু জিজ্ঞেস করল না। রান্নাঘর থেকে এসে, সানির চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে, তাকে জড়িয়ে ধরল। তার গালে গাল রাখল। সানি চোখ বন্ধ করল।
‘তুমি আছো তো?’ সানি বলল।
‘আছি। সবসময় আছি।’
এই আছি শব্দটার মধ্যে যে কি শক্তি আছে, তা শুধু সানি জানে। সাংবাদিক সানি রায়, যে বড় বড় মন্ত্রীদের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করে, কিন্তু সে এই একটি শব্দে কেঁপে যায়। নরম হয়ে যায় বুকের ভেতরটা। ও-চেয়ার থেকে উঠে জোনাকিকে কোলে তুলে নিল। বিছানায় নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিল। তারপর দু’জনে জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইল। কোনও কথা বলল না কেউ-ই। শুধু বুকের মধ্যে বুক। জোনাকির শরীরটা উষ্ণ। সানি তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আস্তে আস্তে। যেন কোনও বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে।
‘তুমি যখন এভাবে জড়িয়ে ধরো, তখন মনে হয় আমি সম্পূর্ণ নিরাপদ,’ জোনাকি বলল।
‘তুমি নিরাপদই তো। আমার কাছে।’
বাইরে আস্ত কলকাতা জেগে আছে। গাড়ির হর্ন, রাত পাখির ডাক অনবরত। কিন্তু এই ঘরের ভেতর, এই বন্ধনের ভেতরে একটি আলাদা পমহাবিশ্ব আছে। ওখানে কোনও খবর নেই, কোনও রাজনীতি নেই, কোনও পরীক্ষা নেই। আছে দুটো মানুষ, যারা একে অপরকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়।
এরই ভেতর ওরা আবার বাংরিপোশি এল এক গ্রীষ্মকালে। প্রচণ্ড গরম। কিন্তু শালবনের ভেতরের ছায়া। ওরা সিমলিপালের দিকে গিয়েছিল। জঙ্গলের ভেতর একটা ঝর্ণা আছে। নাম বড়হিপানি নয়, ছোট একটা ঝর্ণা। কেউ যায় না। জোনাকি জলে পা ডুবিয়ে বসেছিল সানি তার পাশে।
‘আমাদের যদি একটা বাড়ি থাকত এখানে?’ জোনাকি বলল।
‘থাকবে একদিন।’
‘সত্যি?’
‘হ্যাঁ। যখন আমরা বুড়ো হয়ে যাব। তখন আর খবরের কাগজ থাকবে না, কলেজ থাকবে না। শুধু এই জঙ্গল তুমি আর আমি।’
জোনাকি হাসল। তারপর সানির কাঁধে মাথা রাখল।
সানি তাকে নিজের বুকের খুব মাঝটিতে নিল। ঘামে ভেজা শরীর। কিন্তু তাতে কি? আদর ও প্রেম তো শরীরের নয়, মনের। ঝর্ণার শব্দের মধ্যে, পাখির ডাকের মধ্যে, তারা অনেকক্ষণ বসে রইল। জোনাকি বলল, ‘ওই সানি, তুমি আমাকে এত ভালবাস কেন?’
সানি বলল, ‘ভালবাসার কোনওকারণ হয় না, জোনাকি। কারণ খুঁজতে গেলেই ভালবাসা মরে যায়। আমি শুধু জানি, তোমাকে না জড়িয়ে ধরলে আমার ঘুম আসে না। আমি নিঃশব্দে নিঃশেষ হতে থাকি।’
এই হল ওর প্রেমের সংজ্ঞা। কোনও কবিতার মতো না। কিংবা বাড়তি কোন বড় কথাও না। শুধু একটা অভ্যাস। গভীরতম অভ্যাস। যে অভ্যাস ছাড়া জীবন অসম্পূর্ণ।
সেদিন কলকাতায় বৃষ্টি হচ্ছে। শ্রাবণ মাস। সানি অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরেছে। জোনাকি কলেজ থেকে ফিরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছে। সানি পেছন থেকে এসে তাকে আঁকড়ে ধরল। জোনাকি চমকাল না। সে জানত, সানি আসবে।
‘ভিজবে তো,’ জোনাকি বলল।
‘’আজ অন্যভাবে ভিজি না?’
বৃষ্টির ছাঁট এসে তাদের ভিজিয়ে দিচ্ছে। মাধবীলতা গাছটা ভিজছে। গলিটা ভিজছে। কলকাতা ভিজছে। সানি জোনাকিকে নিজের দিকে ঘোরাল। তারপর তার কপালে, তার চোখে, তার গালে হাত রাখল। তারপর তাকে খুব শক্ত করে বুকের মধ্যে নিয়ে নিল।
দীর্ঘ ও গভীরভাবে একেঅপরের মাঝে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ। বৃষ্টির মধ্যে।
জোনাকি বলল, ‘এই দিনগুলি কখনও শেষ হবে না তো?’
সানি বলল, ‘না। এ-তো চিরন্তন। আমরা সাজিয়ে নিই। এমনি চলবে। বাংরিপোশি থেকে ঘাটশিলা, ঘাটশিলা থেকে কলকাতা, কলকাতা থেকে আবার কোথাও। যতদিন আমরা আছি, ততদিন বইবে আমাদের মনে দেহে…! প্রকৃতির আমরা প্রকৃতিতে মিশে থাকব।’
বৃষ্টি পড়ছে। তাদের শরীর ভিজে যাচ্ছে। কিন্তু তারা নিজেদের বক্ষ-বেষ্ঠনী থেকে আলাদা হচ্ছে না। কারণ তারা জানে, প্রেম মানে আর কিছুই নয়, শুধু এইভাবে, এই ভেজা বারান্দায়, একে অপরকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকা। প্রেম। শুধু প্রেম। আর কিছু না।
কলকাতায় তখন শ্রাবণ শেষ হয়ে ভাদ্র পড়েছে। আকাশে মেঘের আনাগোনা, কিন্তু বৃষ্টি নেই। একটা ভ্যাপসা গরম। গড়িয়াহাটের এই ফ্ল্যাটের বারান্দায় মাধবীলতা গাছটা এবার ফুলে ভরে গিয়েছে। সানি আর জোনাকি ফিরেছে। একবার প্রিয় বাংরিপোশি, একবার প্রিয় ঘাটশিলা ঘুরে। ওদের গায়ে এখনও জঙ্গলের গন্ধ লেগে আছে। জোনাকি কলেজ থেকে ফিরে সবুজ সালোয়ারটা ছাড়েনি। সারাদিন ক্লাস নিয়েছে ওই সালোয়ার পরেই। সানি অফিস থেকে ফিরে দেখল, জোনাকি বিছানায় বসে আছে, জানলার দিকে তাকিয়ে। বাইরে আকাশ গুমোট। সানি ল্যাপটপ ব্যাগটা পিঠ নামিয়ে রেখে, জুতো না খুলেই জোনাকির সামনে এসে বসল। তারপর আস্তে করে তার মুখটা নিজের মুখের কাছে নিয়ে এল। এত কাছে যে দু’জনের নিঃশ্বাস মিশে যাচ্ছে।
‘কি ভাবছো?’ সানি বলল।
জোনাকি বলল, ‘ভাবছি, বাংরিপোশির সেই বৃষ্টিটা যদি এখানেও হতো।’
সানি কোনও উত্তর দিল না। শুধু কপালে কপাল ঠেকিয়ে বসে রইল। নাকে নাক ছুঁয়ে থাকল। এইটুকু ছোঁয়াই তো সব। বাইরে হর্ন বাজছে, রিক্সা যাচ্ছে, কিন্তু এই ঘরে শুধু দুটো নিঃশ্বাসের শব্দ। জোনাকি চোখ বন্ধ করল। বলল, ‘এভাবে থাকলে মনে হয়, আমরা আর কলকাতায় নেই। মনে হয় বুড়িবালামের ধারে বসে আছি।’
সেবার সরস্বতী পুজো। জোনাকি সকাল সকাল কলেজে গিয়েছিল। লাল সালোয়ার পরেছিল। সানি দুপুরে অফিস থেকে বেরিয়ে কলেজের গেটে দাঁড়িয়েছিল। ছাত্র-ছাত্রীদের ভিড়। ঢাকের শব্দ। জোনাকি বেরিয়ে এসে সানিকে দেখে চমকে গেল। ‘তুমি এখানে?’
‘তোমাকে নিতে এলাম।’
রিক্সায় ফিরছিল ওরা। জোনাকির খোঁপায় গাঁদা ফুল। সানি বারবার তার ফুলগুলি ঠিক করে দিচ্ছিল। বাড়ি ফিরে জোনাকি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ফুল খুলছে। সানি পেছন থেকে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। বিছানায় বসিয়ে তুলে নিল কোলে। লাল সালোয়ারের রঙটা বিকেলের আলোয় আরও লাল লাগছিল। সানি তার কপালে ঠোঁট ছঁয়ে গভীর চুমু ফিল। কপালে কপাল ঠেকাল। বলল, ‘আজ তোমাকে দেখে মনে হচ্ছিল, আমার জীবনের সব মিথ্যে। শুধু এই মুহূর্তটা সত্যি।’
জোনাকি হাসল। তারপর নিজেই সানির বুকে মুখ গুঁজল। অনেকক্ষণ। পুজোর মন্ত্র তখনও ভেসে আসছে দূর থেকে। কিন্তু তাদের মন্ত্র ছিল অন্য। স্তব্ধতার মন্ত্র। ভালবাসা থেকে উত্তীর্ণ হওয়া প্রেমের মন্ত্র।
ঘাটশিলা থেকে নিয়ে আসা নীল শাড়িটা জোনাকি একদিন সন্ধ্যেবেলা পরল। কোনও কারণ ছাড়াই পরল। সানি সেদিন খুব ক্লান্ত। কিছু একটি বিষয় নিয়ে বসের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে। বারান্দায় বসে সিগারেট খাচ্ছে। যদিও জোনাকি সিগারেট পছন্দ করে না। জোনাকি এসে তার পাশে বসল না। সে সামনে বসল, সামনে। তারপর সানির হাঁটুতে হাত রাখল। বলল, ‘তাকাও আমার দিকে।’
সানি তাকাল। জোনাকি, নীল শাড়ি, খোলা চুল। চোখে কাজল।
‘ঘাটশিলার কথা মনে আছে? রাতমোহনা ব্রীজ?’ জোনাকি বলল।
‘আছে।’
‘সেদিন তুমি বলেছিলে, পৃথিবীটা নরম। মনে আছে?’
সানি সিগারেটটা নিভিয়ে দিল। তারপর নিচে নেমে এসে জোনাকিকে জড়িয়ে ধরল। নীল শাড়ির আঁচল ছড়িয়ে পড়ল। জোনাকি বলল, ‘মন খারাপ করো না। তোমার কলম তো সত্যি লেখে। সত্যির দাম দিতে হয়। আর আমি তো আছি তোমার হয়ে, সবসময়।’
সানি ওকে শক্ত করে ধরে রইল। মনে হচ্ছিল, এই নীল শাড়ির ভাঁজে, এই মুহূর্তে সে আবার সুবর্ণরেখার জল ছুঁতে পারছে। ঠাণ্ডা, শান্ত জল। এরপরের দিনগুলো রোজকার দিনগুলির মতই স্বাভাবিক। কিন্তু রোজকার দিনই তো প্রেমের আসল পটভূমি। একটি রবিবার দুপুরে খেয়ে, দু’জনেই বিছানায়। জোনাকি হলুদ সালোয়ার পরেছিল। বাইরে কাক ডাকছে। ফ্যান ঘুরছে আস্তে। সানি জোনাকির দিকে পাশ ফিরল। জোনাকিও। তারপর গালে গাল ঠেকিয়ে শুয়ে রইল। কোনও কথা নেই। ঘুম আর জাগরণের মাঝামাঝি একটা সময়। জোনাকি বলল, ‘ওই, এই সেই দুপুর? থামো… শেষ হয়ে যেও না…
সানি বলল, ‘’কেন হবে? শেষ হবে না। আমরা এভাবেই থেকে যাব। বুড়ো হয়ে যাব এভাবেই।’
আরেক রাতে, শীত পড়েছে সবে। জোনাকি গোলাপি সালোয়ার পরে কাঁপছে। বলছে, ‘ঠাণ্ডা লাগছে।’
সানি রুম হিটার চালাল না। বিছানায় এসে পেছন থেকে জোনাকিকে জড়িয়ে ধরল। পুরো শরীর দিয়ে। জোনাকির পিঠ সানির বুকে। সানির হাত জোনাকির বুকের ওপর। জোনাকি বলল, ‘এবার গরম লাগছে।’
সানি বলল, ‘গরমই তো লাগার কথা। আমার বুকটা তো তোমার জন্য সবসময় গরম হয়ে থাকে।’
জোনাকি হেসে ফেলল। তারপর সানির হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল। এভাবেই তাদের শীত কাটে। আর সব শেষে, যেটা রোজ হয়, সেটা হাল্কা সবুজ সালোয়ারে। রাতে শুতে যাওয়ার আগে। সানি আর জোনাকি মুখোমুখি বসে। নাকে নাক প্রায় ছুঁয়ে। কপালে কপাল লেগে যায়।
জোনাকি বলে, ‘আজকে কী হল সারাদিন?’
‘কিছু না। শুধু তোমার কথা ভেবেছি।’
‘মিথ্যেবাদী। তুমি তো খবর নিয়ে ভেবেছ।’
‘খবরের মধ্যেও তোমাকে ভেবেছি।’
তারপর ওরা হাসে। তারপর গভীরে নেমে যায়। বাইরে কলকাতা মহানগর, ওরা মিশে যায় এই ছোট্ট বিছানায়। এই এক প্রিয় জায়গায়। জোনাকি একদিন বলেছিল, ‘বুদ্ধদেব গুহর লেখায় জঙ্গল থাকে, নদী থাকে, প্রেম থাকে।’
সানি বলেছিল, ‘আমাদের গল্পে জঙ্গল নেই, নদী নেই। আমাদের গল্পে শুধু এই ঘরটা আছে আর এই আমরা।’
জোনাকি বলল, ‘এই ঘরটাই তো আমাদের জঙ্গল। এই বিছানাটাই তো আমাদের নদী। আর এই আমরাই তো আমাদের ঘাটশিলা, আমাদের বাংরিপোশি।’
সানি আর কিছু বলেনি। সে শুধু জোনাকিকে আরও কাছে টেনে নিয়েছিল। এত কাছে যে, দুটো শরীরের মাঝে কোনও দূরত্ব ছিল না।
সেবার ঘাটশিলা থেকে ফেরার পর অনেকদিন কেটে গিয়েছে। কলকাতায় এখন শেষ দিকের বৃষ্টি। সারাদিন বৃষ্টি, থামার নাম নেই। সানি তাড়াতাড়ি ফিরেছে। জোনাকির কলেজ ছুটি। ঘর অন্ধকার। জানলা দিয়ে বৃষ্টির ছাঁট আসছে। জোনাকি একটা পাতলা সবুজ সালোয়ার পরেছে। ওটা ভিজে গেলে গায়ে লেগে থাকে। সানি দরজা খুলতেই দেখল, জোনাকি বারান্দায় দাঁড়িয়ে, বৃষ্টি দেখছে। চুল খোলা। পিঠ ভিজে গিয়েছে।
সানি ব্যাগটা রাখল না। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। কোনও কথা বলল না। পেছন থেকে জোনাকিকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। যেন অনেকদিন পর দেখা হল দু’জনের! জোনাকি এদিনও চমকাল না। ও-জানত, এই বৃষ্টিতে সানি এভাবেই আসবে। সে সানির হাতের ওপর নিজের হাত রাখল।
‘ভিজে যাচ্ছ,’ জোনাকির কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে সানি ফিসফিস করে বলল।
‘ভিজতে দাও। ভিজব বলেই তো দাঁড়িয়ে আছি।’
তখন বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। সানির বুক জোনাকির পিঠে লেগে আছে। জোনাকি সানির বুকের ওঠানামা স্পষ্টতই টের পাচ্ছে। সানি জোনাকিকে নিজের দিকে ঘোরাল। দু’জনের মুখোমুখি। জোনাকির চোখে জল, না বৃষ্টির ফোঁটা? বোঝা যাচ্ছে না।
‘কি হয়েছে?’ সানি জিজ্ঞেস করল।
জোনাকি বলল, ‘কিছু না। শুধু মনে হচ্ছে, যদি আজ তুমি না আসতে, আমি এই বৃষ্টির মতোই ঝরে যেতাম।’
সানি আর কিছু শুনল না। সে জোনাকির কপালে কপাল ঠেকাল। নাক ঘষল নাকে। তারপর তাকে কোলে তুলে নিল। ঘর অন্ধকার। বাইরে মেঘ ডাকছে। জানলার পর্দা উড়ছে। সানি জোনাকির পাশে শুল। তারপর তাকে নিজের বুকের ভেতর টেনে নিল। এমনভাবে, মমধ্যিখানে কোনও ফাঁক নেই। জোনাকির ভেজা চুল সানির মুখে লাগছে। সানি তার চুল সরিয়ে দিল। তারপর তার গালে, তার কপালে অনবরত চুমু খেল।
‘তোমাকে আজ অন্যরকম লাগছে,’ জোনাকি বলল।
‘কী রকম?’
‘যেন তুমি আমাকে প্রথমবার ছুঁচ্ছো।’
সানি হাসল। বলল, ‘রোজই তো প্রথমবার। রোজই তো নতুন করে ছোঁয়া।’
জোনাকি সানির টি-শার্টটা খামচে ধরল। বলল, ‘আজ ছেড়ো না।’
‘ছাড়ব না। কোনওদিনই ছাড়িনি।’’
‘প্লিজ…’
সানি জোনাকির ঠোঁটের ওপর আঙ্গুল রাখল। তারপর আর কথা থাকে না। শুধু নিঃশ্বাস। গভীর, ভারী নিঃশ্বাস। বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। সানি জোনাকিকে আরও কাছে টানছে, জোনাকি সানিকে। দু’’জন শরীর একে অপরের উষ্ণতা খুঁজছে। জোনাকি বলল, ‘সানি, আমাকে আরও জড়িয়ে ধরো। যাতে আমি আর আমি না থাকি। তুমি হয়ে যাই।’
সানি বলল, ‘আমিও তো তাই চাই। তোমার মধ্যে মিশে যেতে চাই।’
‘যাও…’
এই মিশে যাওয়া কোনও শরীরের ব্যাপার নয়। এটা আত্মার মিলন। অনেকক্ষণ পর বৃষ্টি থামল। ঘরে একটা ভেজা গন্ধ। জোনাকি সানির বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে। সানির হাত জোনাকির পিঠে। আস্তে আস্তে পিঠে কিছু লিখছে তর্জনী। যেন কোনো সুর? কে জানে! সানি জানলার দিকে তাকাল। বৃষ্টি থেমে গিয়ে আকাশ পরিষ্কার হচ্ছে। একটা পাখি ডাকল।
বলল, “গল্প শেষ হয় না, জোনাকি। গল্প চলতে থাকে।
জোনাকি চোখ বন্ধ করল। সানির বুকের ধুকপুকানি শুনতে শুনতে বলল, “তাহলে এই সময়টাও চলে যাবে না বল?’
“না। এই থাকবে। যতদিন আমরা থাকব। যতদিন কলকাতায় বৃষ্টি হবে, যতদিন শালবন থাকবে, যতদিন সুবর্ণরেখা বইবে। হুগলি নদীটে ঢেউ উঠবে!’
বাইরে সন্ধ্যা নামছে। ঘরে আলো জ্বলেনি। অন্ধকারে দুটো মানুষ একে অপরের ভেতর মিশে গিয়েছে। গন্তব্য কোথায়? শূন্যে! মহাশূন্যে…
কারণ তারা জানে, চূড়ান্ত প্রেম মানে , পথের মধ্যেই একে অপরের ভেতর থাকা। আত্মায় শুধু মিশে থেকে প্রবাহিত হওয়া।🍁
🍂বইপত্র| ১
পরিবারে জ্যেষ্ঠ সন্তানের উপর দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা কোনও নতুন সামাজিক সমস্যা নয়। কিন্তু দেশভাগ-পরবর্তী আর্থিক অনিশ্চয়তা সেই বোঝাকে আরও ভারী করে তোলে। বড় ছেলে যেন পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য একটি বিনিয়োগ। তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা, স্বপ্ন কিংবা ব্যর্থতার অধিকারও পরিবারের প্রয়োজনের কাছে গৌণ হয়ে যায়। বাবা-মায়ের সিদ্ধান্ত, ভাইবোনের ভবিষ্যৎ ও সংসারের অর্থনৈতিক ভার সামলাতে গিয়ে তার নিজের জীবন কোথায় হারিয়ে যায়! সেই বিস্ময় ও প্রশ্ন গল্পগুলির অন্তর্গত বেদনাকে গভীর করে। এখানে সত্যপ্রিয় ঘোষের সমাজদৃষ্টির মূল্যও আছে।
সত্যপ্রিয়র ঘোষ-এর গল্প ও ক্ষতবিক্ষত মানুষ

ঋতব্রত মৈত্র
বাংলা ছোটগল্পের জগতে এমন কিছু লেখক আছেন, যাঁদের রচনা পাঠককে স্বস্তি দেওয়ার পরিবর্তে অস্বস্তির মুখোমুখি দাঁড় করায়। ওঁদের গল্পে জীবনের চেনা হিসাব মেলে না। মানবিকতার প্রচলিত সংজ্ঞা বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ে। আর সমাজের স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া আচরণের আড়ালে বেরিয়ে আসে নিষ্ঠুর নানান চেহারা। সত্যপ্রিয় ঘোষ তেমনই একজন কথাসাহিত্যিক। ওঁর গল্প পড়তে গিয়ে কাহিনির পরিণতি কোন দিকে যাচ্ছে, তা-ই শুধু জানার কৌতুহল কাজ করে না। একইভাবে মানুষের বেঁচে থাকার পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক অনটন, সামাজিক ভণ্ডামি, ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে অস্বস্তিকর কিছু প্রশ্নও সামনে এসে দাঁড়ায়। ‘গল্প সংগ্রহ’ প্রথম খণ্ড সেই অস্বস্তিরই গুরুত্বপূর্ণ পাঠ। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এই বইয়ে ধরা রয়েছে এমন একজন কথাসাহিত্যিকের জগৎ, সেখানে মানুষের ক্ষুধা, অপমান, সম্পর্কের টানাপোড়েন ও কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা সাহিত্যের বড় উপাদান হয়ে উঠেছে। কিন্তু, সাহিত্যিক সত্যপ্রিয় ঘোষকে বুঝতে গেলে ওঁর লেখার সঙ্গে শঙ্খ ঘোষের পরিচিত সাহিত্যিক পরিচয়ের তুলনা টেনে লাভ নেই। দু’ ভাইয়ের সাহিত্যিক স্বভাব ও প্রকাশভঙ্গির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে।
‘লোকো শেডের নায়িকা’ এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। গল্পটির সঙ্গে সুবোধ ঘোষের ‘অযান্ত্রিক’ ও ঋত্বিক ঘটকের ১৯৫৮ সালের চলচ্চিত্রের অনুরণন অনুভব করা যায়। যন্ত্রের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে বহুবার তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু সেই সম্পর্ক কেবল ব্যবহারিক প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। দীর্ঘদিনের সঙ্গ, পরিচিত শব্দ, কাজের অভ্যাস, দৈনন্দিন নির্ভরতা কোনও যন্ত্রকে মানুষের কাছে আবেগের অংশ করে তুলতে পারে।
কবি শঙ্খ ঘোষের কবিতায় যে সংযত সৌন্দর্য, ছন্দের আশ্রয় কিংবা ভাষার মিতব্যয়ী আবেগ পাঠককে আকর্ষণ করে, সত্যপ্রিয়র গল্পে তার বদলে অনেক সময় অনুভূত হয় এক ধরনের দহন। ওঁর লেখা পাঠকের গায়ে জলবিছুটির মতো জ্বালা ধরাতে পারে। সেই জ্বালার উৎস কিন্তু গল্পের দুঃখজনক পরিণতি না। আসলে তা মানুষের জীবনকে যেসব সামাজিক ও অর্থনৈতিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের নির্মম উপস্থিতি। গল্প শেষ হওয়ার পরেও প্রশ্ন থেকে যায়, মানুষ সত্যিই নিজের জীবনকে নিজের মতো করে গড়ে তুলতে পারেন? নাকি সমাজের অদৃশ্য নিয়ম তাকে ক্রমাগত কোনও নির্দিষ্ট পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়? এখানেই ‘গল্প সংগ্রহ’ প্রথম খণ্ডের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল এর বিষয়বৈচিত্র্য। দেশভাগের আগে ও পরের সামাজিক বিপর্যয়, কর্মক্ষেত্রের বিচিত্র চরিত্র ও রেলওয়ের লোকোশেডের অভিজ্ঞতা! এই তিনটি পরিসর ধরে লেখকের গল্পের জগৎকে বোঝার সুযোগ তৈরি হয়।
এই বিভাজনকে একেবারে কঠোর কাঠামো হিসেবে দেখলে সত্যপ্রিয় ঘোষের সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি ধরা পড়বে না। কারণ, তাঁর গল্পের বিভিন্ন পরিসরের মধ্যে একটি অন্তর্লীন যোগ বর্তমান। কোথাও ক্ষুধা মানুষের মর্যাদাকে গ্রাস করছে, কোথাও সামাজিক ক্ষমতা দুর্বল মানুষকে বিদ্রূপের পাত্র করে তুলছে, আবার কোথাও কর্মজীবনের যন্ত্রপাতি ও মানুষের সম্পর্কের মধ্যে তৈরি হচ্ছে অদ্ভুত আবেগময় টান। বিষয় আলাদা হলেও মানুষের অসহায়তা ও আত্মমর্যাদার সঙ্কট বারবার ফিরে আসে। একইভাবে ‘পেট’ গল্পের শিরোনাম থেকেই সত্যপ্রিয় ঘোষের দৃষ্টিভঙ্গির একটি পরিচয় পাওয়া যায়। শরীরের অত্যন্ত সাধারণ একটি অঙ্গকে কেন্দ্র করে লেখক যেন গোটা সমাজব্যবস্থার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দেন। ক্ষুধা মানুষের মৌলিক প্রয়োজন, অথচ সেই প্রয়োজনই বহু সময় তার স্বাধীনতা, নৈতিকতা ও সম্পর্কের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। পেটের দায়ে মানুষ যে সিদ্ধান্ত নেয়, একে কেবল ব্যক্তিগত চরিত্রের দুর্বলতা বলে বিচার করা যায় না। তার পিছনে কাজ করে জীবিকার সঙ্কট, পারিবারিক দায়িত্ব ও সামাজিক অবস্থানের চাপ। গল্পটির তাৎপর্য এখানেই যে, ক্ষুধাকে নিছক শারীরিক অনুভূতি হিসেবে না দেখে লেখক তাকে বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেন। তবে এমন বিষয়কে সাহিত্যে কার্যকর করে তুলতে সংযমের প্রয়োজনও কম নয়। ক্ষুধার প্রতীক যখন অত্যন্ত ব্যাপক অর্থ বহন করতে শুরু করে, তখন চরিত্রের স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতা কখনও বৃহত্তর বক্তব্যের আড়ালে ঢাকা পড়তে পারে। সত্যপ্রিয়র গল্প পাঠের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটি বিবেচনায় রাখা জরুরি। তেমনি, দেশভাগের অভিঘাত তাঁর গল্পের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। দেশভাগকে সাধারণত ভূখণ্ডের বিভাজন, উদ্বাস্তু মানুষের দুর্ভোগ কিংবা পরিচিত পরিবেশ হারানোর ইতিহাস হিসেবে দেখা হয়।
কিন্তু সত্যপ্রিয় ঘোষ -এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পরিবারের ভিতরকার সম্পর্ক, আর্থিক নিরাপত্তা কিংবা সামাজিক মর্যাদার উপরেও পড়ে। ‘মায়াপথ’ কিংবা ‘বিয়ে’ -এর মতো গল্পের আলোচনায় এই পরিবর্তিত বাস্তবতার নানা দিক উঠে আসে। পরিবারে জ্যেষ্ঠ সন্তানের উপর দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা কোনও নতুন সামাজিক সমস্যা নয়। কিন্তু দেশভাগ-পরবর্তী আর্থিক অনিশ্চয়তা সেই বোঝাকে আরও ভারী করে তোলে। বড় ছেলে যেন পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য একটি বিনিয়োগ। তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা, স্বপ্ন কিংবা ব্যর্থতার অধিকারও পরিবারের প্রয়োজনের কাছে গৌণ হয়ে যায়। বাবা-মায়ের সিদ্ধান্ত, ভাইবোনের ভবিষ্যৎ ও সংসারের অর্থনৈতিক ভার সামলাতে গিয়ে তার নিজের জীবন কোথায় হারিয়ে যায়! সেই বিস্ময় ও প্রশ্ন গল্পগুলির অন্তর্গত বেদনাকে গভীর করে। এখানে সত্যপ্রিয় ঘোষের সমাজদৃষ্টির মূল্যও আছে। তিনি পারিবারিক দায়িত্বকে কেবল মহৎ আত্মত্যাগ হিসেবে দেখেন না। দায়িত্বের নামে কীভাবে একজন মানুষের উপর অসামঞ্জস্যপূর্ণ চাপ তৈরি করা হয়, সেটিও তাঁর পর্যবেক্ষণের বিষয়। কিন্তু এই ধরনের গল্পের মূল্যায়নে আর একটি দিক খেয়াল করা প্রয়োজন। পরিবারের ভিতরে দায়িত্ব বণ্টনের অসাম্যকে তুলে ধরার পাশাপাশি চরিত্রগুলির ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ও পরস্পরের সঙ্গে সংঘাত কতটা বিকশিত হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সামাজিক সমস্যার যথার্থ উপস্থিতি থাকলেই গল্প সম্পূর্ণ হয়ে যায় না। সেই সমস্যার ভিতরে থাকা মানুষগুলির স্বতন্ত্র কণ্ঠও পাঠকের কাছে পৌঁছনো দরকার। ‘বিয়ে’ গল্পে দেশভাগ-পরবর্তী সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়েদের অবস্থান নিয়ে যে সঙ্কটের কথা উঠে আসে, তা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সামাজিক মর্যাদা ও পারিবারিক সম্মানের আবরণ থাকলেও নারীর জীবন যে অর্থনৈতিক লেনদেনের যুক্তি থেকে মুক্ত ছিল না, গল্পটি সেই বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি ফেরায়। বিবাহের মতো সামাজিক প্রতিষ্ঠান এখানে ব্যক্তিগত সম্পর্কের পরিণতিই না, এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে পরিবারের আর্থিক হিসাব, সামাজিক অবস্থান আর অবশ্যই মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্যদের সিদ্ধান্ত। নারীকে মানুষ হিসেবে দেখার পরিবর্তে পারিবারিক মর্যাদা রক্ষার উপকরণ কিংবা দর-কষাকষির বস্তু হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা এখানে সামাজিক তাৎপর্য বাড়ায়। এই বিষয়টি বিচার করতে গিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, নারীর নিজের বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কতটা জায়গা পেয়েছে? পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর পণ্যায়ন তুলে ধরার পাশাপাশি নারীর নিজস্ব অভিজ্ঞতার বহুমাত্রিকতা তুলে ধরা যে কোনও কথাসাহিত্যিকের জন্য কঠিন পরীক্ষা। অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মানসিক পরিণতি নিয়েও সত্যপ্রিয় ঘোষের আগ্রহ লক্ষণীয়। ‘কুবের সাম্রাজ্যের শেষ অধ্যায়’ ও ‘কালো জল’-এর মতো গল্পে জীবনের চাপ কীভাবে মানুষের মানসিক ভারসাম্যকে বিপন্ন করে, সেই প্রশ্ন সামনে আসে।
অর্থনৈতিক অনটনকে আমরা প্রায়ই হিসাবের খাতায় আয় ও ব্যয়ের পার্থক্য হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবে তার প্রভাব মানুষের আত্মসম্মান, সামাজিক সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণার উপরেও পড়ে। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে, যেখানে স্বাভাবিক বলে বিবেচিত সামাজিক আচরণগুলির সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন হতে থাকে। বাইরে থেকে তাকে অস্বাভাবিক মনে হলেও তার অভিজ্ঞতার পিছনে থাকতে পারে দীর্ঘদিনের অপমান ও অসহায়তা। এই ধরনের চরিত্র নির্মাণে লেখকের দায়িত্বও কম নয়। মানসিক বিপর্যস্ততাকে কেবল বিচিত্র আচরণ কিংবা নাটকীয়তার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করলে চরিত্রের মানবিক জটিলতা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ‘কালো জল’-এর পরাবাস্তব আবহকে তাই শুধু অস্বাভাবিকতার প্রকাশ হিসেবে না দেখে মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা ভেঙে পড়ার একটি সাহিত্যিক রূপ হিসেবেও বিচার করা যায়। তথাপি পরাবাস্তবতা যখন সামাজিক বাস্তবতার জায়গা দখল করে নেয়, তখন পাঠকের কাছে চরিত্রের যন্ত্রণার কারণ ও পরিণতি কিছুটা অস্পষ্ট থেকে যেতে পারে। গল্পের কাব্যিক আবহ তার সামাজিক বক্তব্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা এই ধরনের লেখার অন্যতম কঠিন দিক হিসেবে চিহ্নিত। সত্যপ্রিয় ঘোষের কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা গল্পগুলিতে অন্য নির্মমতা দেখা যায়। ‘আমোদ’ তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। নামটির মধ্যে যে আনন্দ বা বিনোদনের ইঙ্গিত রয়েছে, গল্পের অভিজ্ঞতা তার বিপরীত দিকে নিয়ে যায় পাঠককে। সহকর্মীকে নিয়ে মস্করা, দলবদ্ধ বিদ্রূপ ও অন্যের অসহায়তাকে উপভোগ করার প্রবণতা কীভাবে নিপীড়নের রূপ নিতে পারে, সেই প্রশ্ন এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
কর্মক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার সব সময় পদমর্যাদার মাধ্যমে ঘটে না। কখনও একটি দল, একটি প্রতিষ্ঠিত গোষ্ঠী কিংবা কয়েকজনের সম্মিলিত আচরণ একজন মানুষকে বিচ্ছিন্ন ও অসহায় করে তুলতে পারে। হাসিঠাট্টার নামে যে আচরণকে তুচ্ছ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়, তার প্রভাব আক্রান্ত ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্যের উপর গভীর হতে পারে। এই গল্পের সমকালীন প্রাসঙ্গিকতাও অস্বীকার করা যায় না। স্কুল, কলেজ, হোস্টেল কিংবা অফিসে সহপাঠী ও সহকর্মীকে হেয় করার সংস্কৃতি এখনও বিভিন্ন রূপে দেখা যায়। কিন্তু গল্পটির তাৎপর্য কেবল এই যে এমন ঘটনা ঘটে, সেখানেই সীমাবদ্ধ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হল, নিষ্ঠুর আচরণকে কীভাবে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়। নির্যাতনকারী নিজেকে অপরাধী মনে না করে কিন্তু পরিস্থিতিটিকে নিছক মজা বলে ব্যাখ্যা করতে পারে। দর্শকেরা প্রতিবাদ না করে হাসিতে যোগ দিলে নিপীড়নের পরিবেশ আরও শক্তিশালী হয়। সত্যপ্রিয় ঘোষ এই সামাজিক মনস্তত্ত্বের দিকে দৃষ্টি ফেরান। এই ধরনের গল্পের সাফল্য নির্ভর করে আক্রান্ত চরিত্রের অন্তর্জগৎ কতখানি ফুটে উঠেছে তার উপরেও। নিপীড়নের ঘটনা যত তীব্রই হোক, তার মানবিক অভিঘাতের গভীর বিশ্লেষণ ছাড়া তা কেবল একটি মর্মান্তিক ঘটনার বিবরণ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ‘স্বামী’ গল্পেও কর্মক্ষেত্রের সহকর্মীদের আচরণ ও ব্যক্তিগত জীবনের উপর তার প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তমোনাশকে ঘিরে সহকর্মীদের আচরণ তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাপনের পথকে বাধাগ্রস্ত করে।
হাঁচি কিংবা ডায়রির মতো দৈনন্দিন বিষয়কে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি ক্রমে সামাজিক বিদ্রূপের রূপ নেয়। তমোনাশের অসুস্থতা কাটিয়ে ওঠার পরে পুলকেশ মাইতির সেই বিদ্রূপের লক্ষ্য হয়ে ওঠা ঘটনাটিকে আরও জটিল করে তোলে। এখানে অপমানের শিকার হওয়া মানুষ এবং অন্যকে অপমান করার সুযোগ খোঁজা মানুষের অবস্থান বদলে যায়। নিপীড়নের সংস্কৃতি যে কেবল একজন অপরাধীর উপস্থিতির উপর নির্ভর করে না। পরিস্থিতি অনুযায়ী নতুন লক্ষ্য বেছে নিতে পারে, সেই বাস্তবতা গল্পটির অন্তর্গত তাৎপর্য। এই ধারার লেখার একটি সীমাও রয়েছে। কর্মক্ষেত্রের নিষ্ঠুরতা তুলে ধরতে গিয়ে যদি চরিত্রগুলি প্রধানত নিপীড়ক ও নিপীড়িত এই দুই ভাগে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তা হলে মানুষের আচরণের জটিলতা কিছুটা সংকুচিত হতে পারে। সত্যপ্রিয় ঘোষের গল্পগুলিকে তাই কেবল সামাজিক অন্যায়ের দলিল হিসেবে পড়লে চলবে না। ওঁর চরিত্র নির্মাণে ব্যক্তিগত দুর্বলতা, পরিস্থিতির চাপ এবং নৈতিক সিদ্ধান্তের পারস্পরিক সম্পর্কও খুঁজে দেখা দরকার। কারণ, বাস্তব জীবনে মানুষ সব সময় একটিমাত্র পরিচয়ে আবদ্ধ থাকে না। ‘গল্প সংগ্রহ’ প্রথম খণ্ডের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশগুলির একটি হল লোকোশেডের কর্মজীবনকে ঘিরে লেখা গল্পগুলি। রেলওয়ের লোকোশেড একটি নির্দিষ্ট পেশাগত পরিসর, সেখানে যন্ত্র, শ্রম, সময়, মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা একে-অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। এই জগৎ সাধারণ পাঠকের কাছে পরিচিত না-ও হতে পারে। সত্যপ্রিয় ঘোষ সেই কর্মপরিবেশের ভিতর থেকে চরিত্র ও সম্পর্কের উপাদান সংগ্রহ করেছেন। ফলে তাঁর গল্পে কর্মজীবন নিছক মানুষের আবেগ, অভ্যাস ও আত্মপরিচয় গঠনের একটি সক্রিয় ক্ষেত্র।
‘লোকো শেডের নায়িকা’ এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। গল্পটির সঙ্গে সুবোধ ঘোষের ‘অযান্ত্রিক’ ও ঋত্বিক ঘটকের ১৯৫৮ সালের চলচ্চিত্রের অনুরণন অনুভব করা যায়। যন্ত্রের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে বহুবার তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু সেই সম্পর্ক কেবল ব্যবহারিক প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। দীর্ঘদিনের সঙ্গ, পরিচিত শব্দ, কাজের অভ্যাস, দৈনন্দিন নির্ভরতা কোনও যন্ত্রকে মানুষের কাছে আবেগের অংশ করে তুলতে পারে। লোকোশেডের পরিবেশে এই সম্পর্কের নিজস্ব তাৎপর্য রয়েছে। নরেন ও তার ‘বাঘিনী’কে ঘিরে গল্পের আবেগ পাঠককে সেই জগতে প্রবেশের সুযোগ দেয়। এই গল্পে নরেন্দ্রকে আপাতদৃষ্টিতে পরাজিত মনে হলেও তার অভিজ্ঞতার ভিতরে অন্য ধরনের জয়ের ইঙ্গিত আছে। তার ‘বাঘিনী’ যেন নিছক যন্ত্র নয়, সম্পর্কের বিশ্বস্ত সঙ্গী। এখানে ‘অযান্ত্রিক’-এর স্মৃতি জেগে ওঠা স্বাভাবিক, কিন্তু সেই তুলনা করতে গিয়ে সত্যপ্রিয় ঘোষের গল্পকে কেবল পূর্ববর্তী সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের ছায়া হিসেবে বিচার করা অন্যায় হবে। অনুরণন থাকলেই অনুকরণ প্রমাণিত হয় না। এখানে দেখতে হবে, লেখক পরিচিত বিষয়কে নিজের অভিজ্ঞতা ও চরিত্রের মাধ্যমে কতটা স্বতন্ত্র রূপ দিতে পেরেছেন। এই গল্পের মূল্যায়নে সেই প্রশ্নই গুরুত্বপূর্ণ। তবে যন্ত্রের প্রতি মানুষের আবেগকে অতিরিক্ত মানবিক রূপ দিতে গেলে তার বাস্তব কর্মপরিবেশ ও সামাজিক প্রেক্ষাপট আড়ালে চলে যেতে পারে। আবেগ ও বাস্তবতার এই টানাপোড়েন গল্পটির পাঠে বিবেচ্য।
বইটির প্রচ্ছদেও রয়েছে সংযত নান্দনিকতা। সেঁজুতি বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিকল্পনায় সবুজ ও সাদা রঙের ব্যবহার ও পাতার বিন্যাস গ্রন্থটিকে একটি সজীব দৃশ্যরূপ দিয়েছে। প্রচ্ছদটি গল্পগুলির বেদনাময় বিষয়বস্তুকে সরাসরি অনুকরণ করার চেষ্টা করেনি। সংযত রঙের ব্যবহারে আলাদা একটি পরিবেশ তৈরি করেছে। বইয়ের প্রচ্ছদ নিয়ে প্রশংসা করলেই সম্পাদনার সামগ্রিক গুণমান সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। একটি গল্পসংগ্রহের ক্ষেত্রে পাঠযোগ্যতা, গল্প নির্বাচনের যুক্তি, পাঠভেদ বা টীকার প্রয়োজন, লেখকের সাহিত্যিক বিবর্তন বোঝার সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ। সংকলক ও সম্পাদক রুশতী সেনের ভূমিকা তাই গল্পগুলি একত্র করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পাঠককে সত্যপ্রিয় ঘোষের সাহিত্যিক জগতে প্রবেশের উপযুক্ত পথ করে দেওয়াও এমন সংকলনের দায়িত্ব। ‘গল্প সংগ্রহ’ প্রথম খণ্ডের গুরুত্ব এখানেই যে, এটি এমন একজন কথাসাহিত্যিকের কাজের দিকে পাঠকের দৃষ্টি ফেরায়, যাঁর গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে সমাজের চাপে ক্ষতবিক্ষত মানুষ। ওঁর রচনায় ক্ষুধা, দেশভাগ, পারিবারিক দায়িত্ব, কর্মক্ষেত্রের নিষ্ঠুরতা ও যন্ত্রের সঙ্গে মানুষের আবেগময় সম্পর্ক আলাদা আলাদা বিষয় হলেও তাদের ভিতরে রয়েছে একটি সাধারণ প্রশ্ন। মানুষের মর্যাদা রক্ষা করার সুযোগ সমাজ তাকে কতখানি দেয়? এই প্রশ্নের উত্তর লেখক সহজে দেন না। গল্পগুলি পাঠককে এমন পরিস্থিতির সামনে দাঁড় করায়, সেখানে নৈতিক বিচার করা কঠিন হয়ে পড়ে। তথাপি, সংকলনটির মূল্যায়নে অতিরিক্ত প্রশংসার বদলে কিছু সংযত প্রশ্নও রাখা দরকার। বিষয়বস্তুর তীব্রতা, সামাজিক বক্তব্যের গুরুত্ব কিংবা কর্মজীবনের অভিজ্ঞতার অভিনবত্ব কোনও গল্পকে আপনা থেকেই শিল্পসার্থক করে তোলে না। চরিত্রের স্বাতন্ত্র্য, ভাষার সংযম, আখ্যানের গতি ও প্রতিটি ঘটনার অন্তর্গত প্রয়োজনীয়তা দিয়েও তাকে বিচার করতে হয়। সত্যপ্রিয় ঘোষের গল্পের জগতে কোথাও কোথাও সামাজিক বক্তব্যের ভার চরিত্রের ব্যক্তিগত বিকাশকে ছাপিয়ে যায় কি না, কোথাও প্রতীকী আবহ কাহিনির গতিকে ধীর করে কি না এসব প্রশ্ন পাঠকের বিবেচনায় থাকা উচিত। একজন লেখককে গুরুত্ব দেওয়া মানে তাঁর সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা বন্ধ করে দেওয়া কিন্তু না। সেই সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েই তাঁর সাহিত্যিক অর্জনের প্রকৃতি বোঝা সম্ভব।
এখানে বলা যায়, ‘গল্প সংগ্রহ’ প্রথম খণ্ড এমন এক পাঠ, যা বাংলা ছোটগল্পের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ধারাকে নতুন করে বিচার করার সুযোগ দেয়। সত্যপ্রিয় ঘোষের গল্প পাঠককে আরামদায়ক সমাপ্তির আশ্বাস দেয় না। তাঁর চরিত্রেরা অনেক সময় পরিস্থিতির কাছে পরাজিত হয়, সম্পর্কের ভিতরে অপমানিত হয় কিংবা জীবনের অর্থ খুঁজতে গিয়ে আরও গভীর সংকটে পড়ে। কিন্তু তাঁদের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যে প্রশ্নগুলি উঠে আসে, তা কেবল তাঁদের সময়ের নয়। আজও অর্থনৈতিক চাপ, পারিবারিক প্রত্যাশা, কর্মক্ষেত্রের বিদ্রূপ এবং সামাজিক ক্ষমতার অপব্যবহার মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে। সেই কারণে এই সংকলন অতীতের গল্পের ভাণ্ডার না। মানুষের মর্যাদা ও বেঁচে থাকার অধিকার নিয়ে চলমান আলোচনারও অংশ। পাঠক বইটি হাতে নিলে শুধু গল্পের কাহিনি জানবেন না, নিজের পরিচিত সমাজের কিছু অস্বস্তিকর মুখও চিনে ফেলতে পারেন।
বই : গল্প সংগ্রহ, (প্রথম খণ্ড)
লেখক: সত্যপ্রিয় ঘোষ
সংকলক ও সম্পাদক: রুশতী সেন
প্রচ্ছদ: সেঁজুতি বন্দ্যোপাধ্যায়
🍂বইপত্র| ২
সেথের চরিত্রকে সহজে নায়িকা কিংবা অপরাধী কোনও একটি পরিচয়ে আটকে রাখা যায় না। তিনি একই সঙ্গে অত্যাচারের শিকার, সন্তানহারা মা ও এমন একটা সিদ্ধান্তের বাহক, যার পরিণাম থেকে তাঁর মুক্তি নেই। তাঁর অপরাধবোধ কোনও বিচ্ছিন্ন মানসিক দুর্বলতাও না। ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটা ক্ষত। তিনি অতীতকে ভুলতে চান, অথচ অতীত তাঁকে ভুলতে দেয় না। উপন্যাসে স্মৃতিতে পুরনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখবেন না। বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণকারী তা সক্রিয় শক্তি।
টনি মরিসনের Beloved মাতৃত্ব, অপরাধবোধ ও ইতিহাসের নির্মম বিচার

সুজয়নীল দাশগুপ্ত
‘Freeing yourself was one thing, claiming ownership of that freed self was another.’ নিজের শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে আসা এক ব্যাপার, আর মুক্তির পর নিজের অস্তিত্বের উপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্পূর্ণ অন্য ব্যাপার। টনি মরিসনের ‘Beloved’ উপন্যাসের কেন্দ্রে থাকা এই উপলব্ধিই বইটির শক্তি, আবার এর পাঠের সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক দিকও। দাসপ্রথার অবসান ঘটলেই কি দাসত্বের অবসান ঘটে? আইন কোনও মানুষকে স্বাধীন ঘোষণা করলেই কি তার শরীর, স্মৃতি, মাতৃত্ব এবং আত্মপরিচয়ের উপর তার অধিকার ফিরে আসে? নাকি অত্যাচারীর হাত থেকে পালানোর পরেও অত্যাচারের ভাষা, ভয় ও অপরাধবোধ মানুষের ভিতরে বসবাস করতে থাকে? নোবেলজয়ী মার্কিন লেখক টনি মরিসন এই প্রশ্নগুলিকে এমন এক আখ্যানের মধ্যে এনেছেন, যেখানে মাতৃত্ব কোনও পবিত্র, নির্ভেজাল আবেগের নিরাপদ আশ্রয় না। ইতিহাসের নিষ্ঠুরতার সঙ্গে সংঘর্ষে ক্ষতবিক্ষত মানবিক অভিজ্ঞতা। ‘Beloved’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সেথে। কেনটাকির ‘সুইট হোম’ নামের বাগানবাড়িতে দাসত্বের জীবন থেকে পালিয়ে তিনি ওহাইয়োর সিনসিনাটিতে আশ্রয় নেন। কিন্তু তাঁর মুক্তির কাহিনি কোনও সরল বিজয়গাথা নয়। পালানোর আগে নিজের দুই বছরের শিশুকন্যাকে হত্যা করেন সেথে, কারণ তাঁর আশঙ্কা, মেয়েটি দাসপ্রথার অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হবে। মেয়ের কবরের ফলকে নাম লেখানোর সামর্থ্য তাঁর ছিল না। খোদাই করা হয়েছিল শুধু ‘Beloved’ শব্দটি। এই একটি শব্দের মধ্যে মিশে থাকে মৃত সন্তানের প্রতি মায়ের ভালবাসা, নিজের সিদ্ধান্তের ভয়াবহ ভার, হারানোর অসহ্য যন্ত্রণা, এমন এক সমাজের বিরুদ্ধে চুপচাপ অভিযোগ, যে সমাজে একটি মায়ের কাছে সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার চেয়েও তাকে দাসত্ব থেকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠেছিল।
এই উপন্যাস একাই দাসপ্রথার সামগ্রিক ইতিহাস বোঝার জন্য যথেষ্ট নয়। ‘Beloved’-এর মূল্য তাই তার বিষয়বস্তুর গুরুত্বে যতটা, তার চেয়েও বেশি নিহিত রয়েছে নৈতিক স্বস্তি প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতায়। এখানে কোনও চরিত্রকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ঘোষণা করে পাঠককে নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় না। আবার ইতিহাসের নির্মমতার দায় কোনও নির্যাতিত মানুষের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার পথও খোলা রাখা হয় না। সেথের সিদ্ধান্ত, ডেনভারের বেড়ে ওঠা, বেলাভেডের রহস্যময় উপস্থিতি মিলিয়ে উপন্যাসটি এমন একটা জগৎ তৈরি করে, সেখানেই ভালবাসা মুক্তির সম্ভাবনা বহন করে, কিন্তু ভালবাসার নামে সংঘটিত কাজও বিচার ও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে উঠে যায় না।
ঘটনার প্রায় আঠারো বছর পরে সেথে ও তাঁর ছোট মেয়ে ডেনভারের জীবনে এক অপরিচিত তরুণীর আবির্ভাব ঘটে। তার নাম বেলাভেড। সে কে, কোথা থেকে এসেছে, তার উপস্থিতির প্রকৃত অর্থ কী—উপন্যাসের কাহিনি ক্রমশ এই প্রশ্নগুলিকে ঘিরে এগোয়। সেথের অতীত, নিহত শিশুকন্যার স্মৃতি, বর্তমান জীবনের অস্বস্তিকর ঘটনাগুলি পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। এখানে ভূতের উপস্থিতি ভৌতিক কাহিনির উপাদান নয়। যে ইতিহাসকে চাপা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, তারই প্রত্যাবর্তনের সাহিত্যিক রূপ।
টনি মরিসনের সবচেয়ে বড় সাফল্য, তিনি দাসপ্রথাকে কেবল ইতিহাসের একটি নিষ্ঠুর প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখাননি। তিনি দেখিয়েছেন, মানুষকে সম্পত্তিতে পরিণত করার ব্যবস্থা কীভাবে তার আত্মপরিচয়, পারিবারিক সম্পর্ক ও নিজের শরীর সম্পর্কে ধারণাকেও ধ্বংস করে। দাসত্বে বন্দী মানুষের শ্রম কেড়ে নেওয়া হয়, তার চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তার শরীরের উপর অন্যের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতাও তখন নিছকই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থাকে না, হয়ে ওঠে মালিকের স্বার্থ, সম্পত্তি ও ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। এই পরিস্থিতিতে মাতৃত্বকে স্বাভাবিক আবেগের পরিসরে বিচার করা প্রায় নিষ্ঠুরতারই নামান্তর। কারণ, যে সমাজ একজন মাকে নিজের সন্তানকে নিরাপদ রাখার নিশ্চয়তা দিতে পারে না, সেই সমাজে মাতৃত্বের নৈতিকতা বিচার করার অধিকার কার?৷ কিন্তু এখানেই উপন্যাসটির সঙ্গে পাঠকের সবচেয়ে কঠিন সংঘাত তৈরি হয়। সেথের শিশুহত্যাকে কী কেবল মাতৃস্নেহের চরম প্রকাশ বলে গ্রহণ করা যায়? দাসত্বের হাত থেকে সন্তানকে রক্ষা করার উদ্দেশ্য কী হত্যার নৈতিক জটিলতা মুছে দেয়? মরিসন কোনও সহজ উত্তর দেন না। তাঁর উপন্যাস সেথের সিদ্ধান্তকে এমন ভয়াবহ ঐতিহাসিক পরিস্থিতির মধ্যে স্থাপন করে, যেখানে প্রচলিত নৈতিকতার মাপকাঠি ভেঙে পড়ে। তবু পাঠকের অস্বস্তি থেকেই যায়, থাকা উচিতও। কারণ, কোনও কাজের পেছনে ভয়াবহ সামাজিক বাস্তবতা থাকলেই সেই কাজের সমস্ত নৈতিক প্রশ্নের অবসান ঘটে না। সেথের সিদ্ধান্তকে বুঝতে চেষ্টা করা ও সেই সিদ্ধান্তের ভয়াবহতা উপলব্ধি করা! দু’টি কাজই একসঙ্গে করতে হয়। উপন্যাসের শক্তি এই দ্বন্দ্বে দুর্বলতা দেখা দেয় তখনই, যখন পাঠক চরিত্রের যন্ত্রণা অনুভব করতে গিয়ে তার কাজের জটিল বিচার থেকে সরে যেতে চান।
সেথের চরিত্রকে সহজে নায়িকা কিংবা অপরাধী কোনও একটি পরিচয়ে আটকে রাখা যায় না। তিনি একই সঙ্গে অত্যাচারের শিকার, সন্তানহারা মা ও এমন একটা সিদ্ধান্তের বাহক, যার পরিণাম থেকে তাঁর মুক্তি নেই। তাঁর অপরাধবোধ কোনও বিচ্ছিন্ন মানসিক দুর্বলতাও না। ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটা ক্ষত। তিনি অতীতকে ভুলতে চান, অথচ অতীত তাঁকে ভুলতে দেয় না। উপন্যাসে স্মৃতিতে পুরনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখবেন না। বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণকারী তা সক্রিয় শক্তি। যে ঘটনা একবার ঘটে গিয়েছে, তা সময়ের সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না। তার ছবি, ভয় এবং অপরাধবোধ মানুষের চেতনায় এমনভাবে গেঁথে থাকে যে, মানুষ বর্তমানের মধ্যেও অতীতের শাস্তি ভোগ করতে থাকে। এই জায়গায় মরিসনের গদ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সামনে আসে। তিনি অতীতকে সব সময় সরল কালানুক্রমে বর্ণনা করেন না। স্মৃতি, বর্তমান, স্বগতোক্তি ও চরিত্রের অভ্যন্তরীণ অনুভূতি পরস্পরের মধ্যে প্রবেশ করে। ফলে পাঠককে কেবল ঘটনা অনুসরণ করলেই চলে না; বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতার সূত্র জুড়ে চরিত্রের মানসিক অবস্থার কাছে পৌঁছতে হয়। এই নির্মাণরীতি উপন্যাসটির বিষয়বস্তুর সঙ্গে মানানসই। ট্রমা তো কোনও সুশৃঙ্খল বিবরণ মেনে মানুষের মনে ফিরে আসে না। কখনও একটি শব্দ, কখনও কোনও মুখ, কখনও পরিচিত পরিবেশের সামান্য পরিবর্তন অতীতের ভয়কে বর্তমানের মধ্যে ফিরিয়ে আনে।
এই কৌশলের প্রশংসা করলেই তার সমস্ত সীমাবদ্ধতা অস্বীকার করা চলে না। উপন্যাসের অরৈখিকতা, বারবার ফিরে আসা স্মৃতি ও প্রতীকনির্ভর নির্মাণ পাঠকে গভীরতা দিলেও কিছু পাঠকের কাছে তা দুরূহ ও ক্লান্তিকর হয়ে উঠতে পারে। কোথাও কোথাও আবেগের পুনরাবৃত্তি চরিত্রের যন্ত্রণাকে আরও তীব্র করার বদলে পাঠের গতি কমিয়ে দেয়। কাহিনির সূত্রগুলি যখন দীর্ঘ সময় ধরে ইঙ্গিতের আড়ালে থাকে, তখন পাঠককে সক্রিয়ভাবে অর্থ নির্মাণ করতে হয় ঠিকই, কিন্তু সেই দাবি সব ক্ষেত্রে সমান ফলপ্রসূ নয়। সাহিত্যিক অস্পষ্টতা আর অকারণ দুর্বোধ্যতার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মরিসন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রথমটির শক্তি ব্যবহার করলেও, তাঁর আখ্যানের কিছু অংশে দ্বিতীয়টির অভিযোগ তোলার অবকাশও থেকে যায়। ‘Beloved’-এর আর একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ডেনভার। মায়ের অতীতের ভার, বিচ্ছিন্ন পারিবারিক জীবনের মধ্যে বেড়ে ওঠা ডেনভারের কাছে বেলাভেডের আগমন প্রথমে সঙ্গ ও সম্পর্কের সম্ভাবনা তৈরি করে। কিন্তু ক্রমে সেই সম্পর্কের প্রকৃতি বদলে যায়। সেথের অতীতের সঙ্গে বেলাভেডের যোগ যত গভীর হয়, বর্তমানের পারিবারিক জীবন তত বেশি বিপর্যস্ত হতে থাকে। ডেনভারের অভিজ্ঞতা দেখায়, এক প্রজন্মের অমীমাংসিত ক্ষত পরবর্তী প্রজন্মের জীবনকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। যে ইতিহাসের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ডেনভার নয়, সেই ইতিহাসের ফল তাকেও বহন করতে হয়।
এই দিক থেকে উপন্যাসটি ব্যক্তিগত ট্রমার গণ্ডি পেরিয়ে সামাজিক স্মৃতির প্রশ্নে পৌঁছয়। দাসপ্রথার ইতিহাস কোনও একটি পরিবারের মধ্যে শেষ হয়ে যায় না। তার প্রভাব ছড়িয়ে থাকে মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস, আত্মপরিচয়, সামাজিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের ক্ষমতার মধ্যে। অতীতের অপরাধকে ভুলে যাওয়ার দাবি অনেক সময় বর্তমানের সুবিধাভোগীদের স্বার্থ রক্ষা করে। আবার অতীতকে ব্যক্তিগত অপরাধবোধের মধ্যে আটকে রাখলেও তার সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য হারিয়ে যায়। মরিসন এই দুই বিপদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে স্মৃতির দায়কে সামনে আনেন। উপন্যাসের একটি স্মরণীয় উপলব্ধি হল, কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের শরীরকে ঘিরে দাসপ্রথার সমাজে যে ঘৃণা ও অবমাননা কাজ করত, তার বিরুদ্ধে নিজের অস্তিত্বকে ভালোবাসার প্রয়োজন। সেথের জীবনের অভিজ্ঞতায় শরীর নিজেরই তা না। তা অন্যের ক্ষমতা, সহিংসতা, নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য। এই বাস্তবতায় নিজের শরীর, চোখ, অনুভূতি এবং মানবিক মর্যাদাকে গ্রহণ করা রাজনৈতিক তাৎপর্য অর্জন করে। যে সমাজ কোনও মানুষকে তার গায়ের রং, বংশপরিচয় কিংবা শ্রমের উপযোগিতা দিয়ে বিচার করে, সেখানে আত্মপ্রেমও হয়ে ওঠে প্রতিরোধের একটি পদ্ধতি। কিন্তু আত্মপ্রেমের এই ধারণাকে সস্তা প্রেরণামূলক বক্তব্যে নামিয়ে আনা উচিত নয়। কারণ, দীর্ঘস্থায়ী অত্যাচারের ক্ষত কেবল নিজেকে ভালবাসার সিদ্ধান্তে সেরে যায় না তার জন্য প্রয়োজন নিরাপত্তা, সম্পর্ক, সামাজিক স্বীকৃতি আর ন্যায়বিচারের পরিবেশ।
এখানেই ‘Beloved’-এর মানবিক বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ, আবার তার পাঠে সতর্কতার প্রয়োজনও রয়েছে। উপন্যাসটি যন্ত্রণার মধ্যে সম্পর্ক ও নিরাময়ের সম্ভাবনা খুঁজলেও, সেই সম্ভাবনাকে সহজ সমাধান হিসেবে হাজির করে না। বেলাভেডের উপস্থিতি সেথেকে অতীতের মুখোমুখি দাঁড় করায়, কিন্তু মুখোমুখি হওয়া আর মুক্তি পাওয়া এক বিষয় নয়। অতীতকে স্বীকার করার প্রয়োজন, কিন্তু স্মৃতির কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করাও বিপজ্জনক। সেথের অভিজ্ঞতা দেখায়, অপরাধবোধ মানুষকে নিজের ভিতরেই বন্দি করে রাখতে পারে। একই সঙ্গে এটাও মনে রাখা প্রয়োজন, তাঁর যন্ত্রণাকে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ফল হিসেবে দেখলে ঠিক হবে না। যে সামাজিক ব্যবস্থায় তাঁর সিদ্ধান্তের জন্ম, তার দায় কোনওভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। উল্লেখ্য যে, মরিসনের লেখার আর একটি শক্তি হল, তিনি দাসপ্রথার শিকার মানুষদের কেবল অসহায় ভুক্তভোগী হিসেবে নির্মাণ করেন না। তাঁদের ভয়, ক্রোধ, আকাঙ্ক্ষা, ভালোবাসা, ঈর্ষা, দ্বন্দ্ব রয়েছে। তাঁরা কখনও ভুল করেন, কখনও অন্যকে আঘাত করেন, আবার কখনও বেঁচে থাকার জন্য নিজেদের ভিতরে নতুন শক্তি খুঁজে নেন। তাঁদের মানবিকতা প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁদের নিখুঁত করে তোলার প্রয়োজন পড়ে না। তাঁদের অসম্পূর্ণতা এবং নৈতিক দ্বন্দ্বই তাঁদের জীবন্ত করে তোলে। এই জায়গায় ‘Beloved’ দাসপ্রথার ইতিহাসকে পরিসংখ্যান কিংবা রাজনৈতিক স্লোগানের বাইরে এনে মানুষের অভিজ্ঞতার গভীরে প্রবেশ করে।
উপন্যাসটির অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। বেলাভেডকে ঘিরে রহস্য ও অতিপ্রাকৃত আবহকে বহুস্তরীয় করেছে, কিন্তু তার ফলে বাস্তব ইতিহাসের কিছু নির্দিষ্ট প্রশ্ন কখনও কখনও প্রতীকের আড়ালে চলে যায়। দাসপ্রথার অর্থনৈতিক কাঠামো, আইনগত নিষ্ঠুরতা ও ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়ে পাঠকের আরও বিশদ অনুসন্ধানের প্রয়োজন হতে পারে। সাহিত্য যে ইতিহাসের পাঠ্যবই নয়, তা ঠিক; কিন্তু ইতিহাসকে অনুভব করানোর পাশাপাশি তার বস্তুগত ভিত্তি সম্পর্কে পাঠকের কৌতূহলও জাগিয়ে তোলা জরুরি। মরিসন মানুষের মানসিক ও আবেগগত অভিজ্ঞতায় অসাধারণ গভীরতা অর্জন করলেও, এই উপন্যাস একাই দাসপ্রথার সামগ্রিক ইতিহাস বোঝার জন্য যথেষ্ট নয়। ‘Beloved’-এর মূল্য তাই তার বিষয়বস্তুর গুরুত্বে যতটা, তার চেয়েও বেশি নিহিত রয়েছে নৈতিক স্বস্তি প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতায়। এখানে কোনও চরিত্রকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ঘোষণা করে পাঠককে নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় না। আবার ইতিহাসের নির্মমতার দায় কোনও নির্যাতিত মানুষের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার পথও খোলা রাখা হয় না। সেথের সিদ্ধান্ত, ডেনভারের বেড়ে ওঠা, বেলাভেডের রহস্যময় উপস্থিতি মিলিয়ে উপন্যাসটি এমন একটা জগৎ তৈরি করে, সেখানেই ভালবাসা মুক্তির সম্ভাবনা বহন করে, কিন্তু ভালবাসার নামে সংঘটিত কাজও বিচার ও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে উঠে যায় না। টনি মরিসনের ‘Beloved’ তাই সহজপাঠ্য, স্বস্তিদায়ক কিংবা আবেগঘন সমাপ্তির আশ্বাস দেওয়া উপন্যাস না। এর কিছু অংশের পুনরাবৃত্তি, অরৈখিকতা ও প্রতীকনির্ভরতা পাঠের পথে বাধা তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বইটির প্রধান অর্জন অস্বীকার করা যায় না। দাসপ্রথার ইতিহাসকে ব্যক্তিগত স্মৃতি, মাতৃত্বের সঙ্কট এবং আত্মপরিচয়ের লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত করে মরিসন দেখিয়েছেন, আইনি স্বাধীনতা আর মানসিক মুক্তি এক নয়। মানুষ শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারে, কিন্তু নিজের জীবনকে নিজের বলে দাবি করার লড়াই আরও দীর্ঘ।
‘Beloved’ পাঠককে সেথের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে কোনও সহজ রায় দিতে বলছে না। এমন এক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়, যার উত্তর এড়িয়ে যাওয়া যায় না। যে সমাজ একজন মাকে সন্তানের জীবন ও দাসত্বের মধ্যে ভয়াবহ একটি নির্বাচন করতে বাধ্য করে, তার নৈতিক দায় কোথায় শেষ হয়? এই প্রশ্নের কোনও আরামদায়ক উত্তর নেই। আর সেই অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাতেই টনি মরিসনের উপন্যাস তার সাহিত্যিক শক্তি অর্জন করেছে।
গ্রন্থ: Beloved
লেখক: টনি মরিসন
🍂বইপত্র| ৩
বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণকে যাঁরা প্রকাশনার অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে দেখেন, তাঁদের কাছে সুবোধ দাশগুপ্তের কাজ নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। তাঁর শিল্পের রহস্যময়তা, রুক্ষ রেখার দৃঢ়তা ও কৌতুকের সূক্ষ্ম উপস্থিতি বাংলা গ্রন্থশিল্পের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ের পরিচয় বহন করে।
বাংলা গ্রন্থশিল্পের বিস্মৃত জাদুকর সুবোধ দাশগুপ্ত-এর
রেখা ও রহস্যের জগৎ

মধুজা গুহ
বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণের ইতিহাসে এমন অনেক শিল্পী রয়েছেন, যাঁদের সৃষ্টিশীলতার ছাপ ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য বইয়ের পাতায়, অথচ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিস্মৃতির আড়ালে চলে গিয়েছে তাঁদের নাম। লেখক ও প্রকাশকের পরিচিতি যতটা গুরুত্ব পায়, বইয়ের দৃশ্যভাষা নির্মাণকারী শিল্পীদের অবদান ততটা আলোচনায় আসে না। বাংলা গ্রন্থশিল্পের তেমনই এক গুরুত্বপূর্ণ অথচ আজকের প্রজন্মের কাছে প্রায় অপরিচিত নাম সুবোধ দাশগুপ্ত। তাঁর নির্বাচিত শিল্পকর্ম, অসম্পূর্ণ আত্মকথন, স্বরচিত রচনা ও তাঁকে ঘিরে বিভিন্ন মানুষের স্মৃতিচারণ ও মূল্যায়ন নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে একটি বিশেষ সংকলন। দেখা যায়, গত শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে দীর্ঘ সময় ধরে যাঁরা বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদ নির্মাণ ও অলঙ্করণের জগতে নিজেদের দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন, সুবোধ দাশগুপ্ত তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
শিল্পকর্মের দৃশ্যমান রূপের পাশাপাশি তার নির্মাণের সময়কাল ও শিল্পীকে ঘিরে থাকা অভিজ্ঞতাও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু, এই সময়ের ডিজিটাল প্রজন্মের কাছে পুরনো বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদ অনেক সময় কেবল অতীতের কোনও সংস্করণের পরিচায়ক। অথচ সেই প্রচ্ছদের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে নির্দিষ্ট সময়ের নান্দনিকতা, মুদ্রণসংস্কৃতির বিবর্তন ও শিল্পীর ব্যক্তিগত পরীক্ষানিরীক্ষা। সুবোধ দাশগুপ্তের মতো শিল্পীদের কাজ নতুন করে সামনে এলে বাংলা গ্রন্থসজ্জার ইতিহাসকে অন্য দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ তৈরি হয়।
সুবোধ দাশগুপ্ত -এর শিল্পকর্মের বিশেষত্ব ছিল রেখার ব্যবহার, টেক্সচারের বৈচিত্র্য ও ছবির মধ্যে রহস্যময় আবহ তৈরি করার অসাধারণ ক্ষমতা। প্রচলিত সৌন্দর্যবোধের ছকে নিজেকে আটকে না রেখে তিনি ছবির মধ্যে নিয়ে এসেছিলেন এক ধরনের রুক্ষতা, ভাঙাচোরা গঠনই শক্তিশালী রেখার স্বতন্ত্র ভাষা। সেই ভাষাই শিল্পীর কাজকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল। সুবোধ দাশগুপ্তের আঁকার দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে রেখার নিজস্ব চরিত্র। কোথাও তা অসমান, কোথাও খসখসে, আবার কোথাও তীব্র ও দৃঢ়। ছবির উপরিভাগে টেক্সচারের প্রয়োগ তাঁর কাজকে আরও বহুমাত্রিক করে তুলত। এই রুক্ষ দৃশ্যভাষার মধ্যেই তৈরি হতো এক অদ্ভুত রহস্যের আবহ। তবে তাঁর শিল্পকর্মের বৈশিষ্ট্য কেবল গাম্ভীর্য কিংবা রহস্যময়তায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তার সঙ্গে মিশে থাকত সূক্ষ্ম কৌতুকবোধ। কখনও সেই কৌতুক স্পষ্ট, কখনও তা ছবির আড়ালে লুকিয়ে থাকে। রহস্য ও হাস্যরসের এই মিশ্রণ তাঁর শিল্পে তৈরি করেছিল বিশেষ স্বাদ। যাকে বলা যায় সিরিওকমিক অর্থাৎ গাম্ভীর্য ও কৌতুকের একটি আশ্চর্য সহাবস্থান।
গ্রন্থসজ্জার জগতে এই ধরনের নিজস্ব দৃশ্যভাষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একটি বইয়ের প্রচ্ছদকে বইটির বাইরের সাজসজ্জা হিসেবে দেখা উচিৎ না। প্রচ্ছদ পাঠকের সঙ্গে বইটির প্রথম পরিচয়ের মাধ্যমও বটে। একইভাবে, অলঙ্করণ গল্প, উপন্যাস কিংবা অন্য কোনও রচনার বক্তব্যকে আরও গভীরভাবে অনুভব করতে সাহায্য করে। শব্দের পাশাপাশি ছবি যখন পাঠকের কল্পনাকে উসকে দেয়, তখন বই হয়ে ওঠে এক সমন্বিত শিল্পমাধ্যম। সুবোধ দাশগুপ্তের কাজের গুরুত্ব বুঝতে গেলে এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটটি মনে রাখা প্রয়োজন। অন্যদিকে, বাংলা প্রকাশনা শিল্পের ইতিহাসে প্রচ্ছদশিল্পী, অলঙ্করণশিল্পী, লিখনশিল্পী ও সচিত্রকরণে যুক্ত শিল্পীদের অবদান দীর্ঘদিনের। বটতলার বইয়ের যুগ থেকেই পাঠকের কাছে সাহিত্যকে পৌঁছে দেওয়ার কাজে ছবির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের সঙ্গে মুদ্রণপ্রযুক্তি বদলেছে, প্রকাশনার ধরন পাল্টেছে, বইয়ের বাজারেও এসেছে নানা পরিবর্তন। কিন্তু বইয়ের বিষয়বস্তুকে দৃশ্যের মাধ্যমে পাঠকের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার প্রয়োজন কখনও শেষ হয়নি। তা সত্ত্বেও এই শিল্পীদের অনেকের জীবন, কাজ ও সৃজনপ্রক্রিয়া নিয়ে বহুলাংশেই পর্যাপ্ত আলোচনা হয়নি বললেই চলে!
এই বিস্মৃতির পিছনে কিন্তু আছে শিল্পকর্ম সংরক্ষণের সীমাবদ্ধতাও। কোনও লেখকের পাণ্ডুলিপি কিংবা প্রকাশিত বইয়ের কপি সংরক্ষিত থাকলেও তার প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত শিল্পীর মূল কাজ, স্কেচ কিংবা সৃজনপ্রক্রিয়ার নথি সব সময় যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয় না। ফলে এক সময়ের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীদের কাজ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছনোর পথ ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠে। পশ্চিমবঙ্গে গ্রন্থশিল্পীদের কাজকে এক জায়গায় সংগ্রহ ও প্রদর্শনের মতো স্থায়ী উদ্যোগের অভাবও এই সমস্যাকে আরও প্রকট করে। তরুণ পাঠক ও শিল্পীদের সামনে অতীতের গ্রন্থশিল্পের ধারাবাহিক পরিচয় তুলে ধরার জন্য এমন সংগ্রহশালার প্রয়োজনীয়তা তাই বিশেষভাবে অনুভূত হয়। সুবোধ দাশগুপ্তকে ঘিরে প্রকাশিত এই সংকলন সেই অভাবের কথা নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। একই সঙ্গে এটি শিল্পীর শিল্পীসত্তাকে পুনরাবিষ্কারের সুযোগ তৈরি করে। বইটিতে স্থান পেয়েছে শিল্পীর নির্বাচিত কাজ। তাঁর রেখা, টেক্সচার এবং দৃশ্যভাবনার বৈশিষ্ট্য বুঝতে সাহায্য করবে। শিল্পীর অসম্পূর্ণ আত্মকথন ও কিছু স্বরচিত রচনা সংকলনটিকে আরও ব্যক্তিগত মাত্রা দিয়েছে। একজন শিল্পী কীভাবে নিজের কাজ ও সময়কে দেখতেন, তাঁর ভাবনার জগৎ কোন পথে এগোত, কিংবা সৃষ্টির পিছনে কী ধরনের অনুভব কাজ করত? এই ধরনের লেখার মাধ্যমে সেই সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সুযোগও তৈরি হয়।
শুধু শিল্পকর্মের পুনর্মুদ্রণেই সংকলনটির পরিসর শেষ হয়নি। সুবোধ দাশগুপ্তের কাজ নিয়ে বিভিন্ন মূল্যায়ন ও তাঁকে ঘিরে স্মৃতিচারণও এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ফলে বইটি একদিকে যেমন শিল্পীর শিল্পের পরিচয় বহন করছে, অন্যদিকে তেমনই তুলে ধরছে তাঁকে ঘিরে থাকা সময়, মানুষ ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের কিছু স্মৃতি। ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে শিল্পসমালোচনার সংযোগ অতীতের কোনও সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বকে বুঝতে বিশেষভাবে সাহায্য করে। কারণ, শিল্পকর্মের দৃশ্যমান রূপের পাশাপাশি তার নির্মাণের সময়কাল ও শিল্পীকে ঘিরে থাকা অভিজ্ঞতাও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু, এই সময়ের ডিজিটাল প্রজন্মের কাছে পুরনো বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদ অনেক সময় কেবল অতীতের কোনও সংস্করণের পরিচায়ক। অথচ সেই প্রচ্ছদের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে নির্দিষ্ট সময়ের নান্দনিকতা, মুদ্রণসংস্কৃতির বিবর্তন ও শিল্পীর ব্যক্তিগত পরীক্ষানিরীক্ষা। সুবোধ দাশগুপ্তের মতো শিল্পীদের কাজ নতুন করে সামনে এলে বাংলা গ্রন্থসজ্জার ইতিহাসকে অন্য দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের প্রচ্ছদশিল্পী, চিত্রকর ও শিল্পচর্চায় আগ্রহীদের কাছেও এই কাজগুলি হয়ে উঠতে পারে মূল্যবান অনুপ্রেরণা।
বইটির আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল, এটি একজন শিল্পীর কাজের সংকলন হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। বইটি বিস্মৃত হয়ে যাওয়া একটি শিল্পপরিসরের দরজা খুলে দেওয়ার চেষ্টা। এখানে শিল্পীর সৃষ্টির পাশাপাশি রয়েছে তাঁর সময়কে ফিরে দেখার উপাদান। স্মৃতিচারণ ও মূল্যায়নের সূত্র ধরে পাঠক পৌঁছে যেতে পারেন এমন এক অতীতে, যা বর্তমানের কাছে অনেকটাই ঝাপসা। সেই অর্থে সংকলনটি যেন এক সাহিত্য-শিল্পের টাইমমেশিন, যার মাধ্যমে বাংলা প্রকাশনা ও গ্রন্থশিল্পের হারিয়ে যেতে বসা অধ্যায়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়া সম্ভব। আবার, বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণকে যাঁরা প্রকাশনার অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে দেখেন, তাঁদের কাছে সুবোধ দাশগুপ্তের কাজ নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। তাঁর শিল্পের রহস্যময়তা, রুক্ষ রেখার দৃঢ়তা ও কৌতুকের সূক্ষ্ম উপস্থিতি বাংলা গ্রন্থশিল্পের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ের পরিচয় বহন করে। সেই দিককে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার জন্য এই সংকলন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এই বইটি সংগ্রহে রাখার আগ্রহ তৈরি করতে পারে বাংলা বইয়ের ইতিহাস, প্রচ্ছদশিল্প ও অলঙ্করণের বিবর্তন নিয়ে কৌতূহলী পাঠকদের মধ্যে। তথাপি উল্লেখ্য, যে শিল্পীরা নেপথ্যে থেকে বইকে দৃশ্যগত পরিচয় দেন, তাঁদের কাজের স্বীকৃতি ছাড়া প্রকাশনা শিল্পের ইতিহাস পূর্ণ হয় না। সুবোধ দাশগুপ্তকে ঘিরে এই সংকলন সেই সত্যের দিকেই দৃষ্টি ফেরায়। তাঁর কাজের পুনর্পাঠের মধ্য দিয়ে শুধু একজন বিস্মৃত শিল্পীকে ফিরে পাওয়াই নয়, বাংলা গ্রন্থসজ্জার সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকেও নতুন করে চিনে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। 🍁

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক
এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আইডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।






