সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ ঢাকা: উন্নত জীবনের আশা, পরিবারের আর্থিক অনটন দূর করার স্বপ্ন ও দেশে কর্মসংস্থানের অভাব এই তাগিদেই প্রতি বছর বাংলাদেশ (Bangladesh) থেকে বহু নারী গৃহকর্মী হিসেবে পাড়ি দেন সৌদি আরব-সহ পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। কিন্তু বিদেশে পৌঁছে তাঁদের একাংশের অভিজ্ঞতা হয়ে উঠছে ভয়াবহ। অতিরিক্ত কাজের চাপ, বেতন না পাওয়া, চলাফেরায় বাধা, শারীরিক নির্যাতন এবং যৌন নিপীড়নের মতো গুরুতর অভিযোগ নিয়ে দেশে ফিরতে হচ্ছে বহু নারীকে। ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসা নারী শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৯৭৯ উল্লেখ। তাঁদের মধ্যে নির্যাতনের শিকার নারী রয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। কিছু নারী গর্ভবতী অবস্থায় দেশে ফিরেছেন এবং যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছেন। এই পরিস্থিতি বিদেশে নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা আর দেশে ফেরার পর তাঁদের পুনর্বাসন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের বহু পরিবারের কাছে বিদেশে কাজ করতে যাওয়া অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। বিশেষত গ্রামীণ এলাকার নারীদের একাংশ গৃহকর্মীর কাজের জন্য বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন পরিবারের ঋণ শোধ, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালানো কিংবা সংসারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটানোর আশায়। নিয়োগকারী সংস্থা ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তাঁদের বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে তুলনামূলক বেশি বেতন ও নিয়মিত আয়ের আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু কাজের পরিবেশ, নিয়োগকর্তার আচরণ, চুক্তির শর্ত আর আইনি সুরক্ষা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকলে বিদেশে পৌঁছনোর পর সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। ভাষাগত বাধা এবং স্থানীয় আইন সম্পর্কে অজ্ঞতাও তাঁদের বিপদের মুখে ফেলতে পারে। সূত্রের খবর, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশ থেকে দেশে ফেরা নারী শ্রমিকদের মধ্যে সৌদি আরব থেকেই সবচেয়ে বেশি নারী ফিরে এসেছেন। বিমানবন্দরের কল্যাণ ডেস্কে নথিভুক্ত হিসাবের ভিত্তিতে এই সংখ্যা প্রায় ৯৭৯। তবে এই পরিসংখ্যানকে শুধু দেশে ফিরে আসা শ্রমিকদের সংখ্যা হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। তাঁদের মধ্যে কত জন নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন, কত জনের অভিযোগের তদন্ত হয়েছে ও কত জনের জন্য আইনি সহায়তা বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্য জানা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সব নারী কেন দেশে ফিরেছেন, তাঁদের প্রত্যাবর্তনের পরিস্থিতি কী ছিল ও অভিযোগগুলির পরিণতি কী হয়েছে, তা আলাদা করে যাচাই করাও জরুরি।
দেশে ফিরে আসা বহু নারী নিয়োগকর্তার বাড়িতে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়ার কথা জানিয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ। সূত্রের অভিযোগ অনুযায়ী, কারও কারও পাসপোর্ট নিয়ে নেওয়া হয়, আবার কাউকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় না। নির্ধারিত কাজের সময়ের বাইরে দীর্ঘক্ষণ কাজ করতে বাধ্য করা, বেতন আটকে রাখা কিংবা প্রতিশ্রুতির তুলনায় কম পারিশ্রমিক দেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। কিছু ক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে সূত্রে উল্লেখ। এমন পরিস্থিতিতে কোনও নারী সাহায্য চাইতে চাইলেও তাঁর পক্ষে নিরাপদে বাড়ির বাইরে যাওয়া, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা কিংবা নিজের অবস্থান সম্পর্কে অন্যকে জানানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সৌদি আরব-সহ উপসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক দেশে গৃহকর্মীদের কর্মসংস্থানের সঙ্গে কাফালা (Kafala) ব্যবস্থার সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। এই ব্যবস্থার বিভিন্ন রূপে বিদেশি শ্রমিকের বসবাস ও কাজের অবস্থান নিয়োগকর্তা বা স্পনসরের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। ফলে কর্মস্থল বদলানো, চাকরি ছাড়া কিংবা অন্যত্র যাওয়ার ক্ষেত্রে শ্রমিকদের নানা বাধার মুখে পড়তে হয় বলে অধিকারকর্মীদের একাংশের অভিযোগ। গৃহকর্মীরা যদি নিয়োগকর্তার বাড়িতেই থাকেন, তবে তাঁদের কাজের পরিবেশের উপর স্বাধীন নজরদারি চালানোও কঠিন হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে পাসপোর্ট আটকে রাখা, যোগাযোগের সুযোগ সীমিত করা কিংবা চুক্তির বাইরে কাজ করানোর অভিযোগ খতিয়ে দেখা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসন নিয়ে কাজ করা ব্র্যাকের (BRAC) মাইগ্রেশন কর্মসূচি-সহ বিভিন্ন সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে বিদেশফেরত নারী শ্রমিকদের সমস্যা নিয়ে কাজ করছে। তাদের পর্যবেক্ষণ ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে নির্যাতন, আর্থিক ক্ষতি আর দেশে ফিরে সামাজিক সমস্যার মুখে পড়ার বিষয় উঠে এসেছে। কিছু নারী গর্ভবতী অবস্থায় দেশে ফিরেছেন বলে প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ যৌন নিপীড়নের অভিযোগও করেছেন। তবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অভিযোগের বিষয়ে যথাযথ তদন্ত, ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা রক্ষা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। নির্যাতনের শিকার নারীদের পরিচয় বা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ পেলে তাঁদের নিরাপত্তা ও সামাজিক জীবনে আরও সমস্যা তৈরি হতে পারে।
বিদেশে নির্যাতনের অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফেরার পরেও অনেক নারীর সংকট শেষ হয় না। শারীরিক আঘাতের চিকিৎসা, মানসিক ধাক্কা সামলানো, পরিবারের কাছে ফিরে নতুন করে জীবন শুরু করা এবং উপার্জনের ব্যবস্থা করা তাঁদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। যৌন নিপীড়নের অভিযোগের ক্ষেত্রে সামাজিক কলঙ্কের আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। কোনও কোনও নারী পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী কিংবা সমাজের অন্য মানুষের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার ভয়ে মুখ খুলতে চান না বলে অভিবাসন নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। ফলে নির্যাতনের প্রকৃত চিত্র সরকারি নথিতে সম্পূর্ণভাবে ধরা পড়ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন থাকে।
এই পরিস্থিতিতে বিদেশফেরত নারী শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা, আইনি সহায়তা এবং আর্থিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা জরুরি। শুধু দেশে ফেরার ব্যবস্থা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাঁদের অভিযোগ নথিভুক্ত করা, প্রয়োজন অনুযায়ী তদন্তে সহায়তা দেওয়া এবং ভবিষ্যতে জীবিকা অর্জনের সুযোগ তৈরির দিকেও নজর দিতে হবে। যাঁরা বিদেশে কাজ করতে গিয়ে ঋণ নিয়েছেন বা পরিবারের কাছ থেকে টাকা ধার করেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে উপার্জন ছাড়াই দেশে ফিরে আসা আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং পুনর্বাসনমূলক সহায়তা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হওয়া প্রয়োজন। নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিদেশে যাওয়ার আগের প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়োগের আগে কাজের ধরন, বেতন, কর্মঘণ্টা, ছুটি, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা আর চুক্তির শর্ত সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। শ্রমিকদের পাসপোর্ট ও অন্যান্য পরিচয়পত্র নিজের কাছে রাখার গুরুত্ব, জরুরি পরিস্থিতিতে কোথায় যোগাযোগ করতে হবে, আর স্থানীয় আইন অনুযায়ী কী কী অধিকার রয়েছে, সে সম্পর্কেও প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। পাশাপাশি নিয়োগকারী সংস্থার লাইসেন্স, মধ্যস্থতাকারীদের কার্যকলাপ এবং বিদেশে পাঠানোর আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি নিয়মিত যাচাই করা প্রয়োজন। চুক্তির শর্ত ভঙ্গ হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যকর পদ্ধতিও থাকা জরুরি।
বাংলাদেশ সরকার ও সৌদি কর্তৃপক্ষের মধ্যে নারী শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ ও সুরক্ষা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা ও চুক্তি হয়েছে। তবু বাস্তবে অভিযোগ জানানোর সুযোগ, তদন্তের গতি আর নির্যাতনের শিকার শ্রমিকদের সহায়তা নিয়ে আরও কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে বলে অধিকারকর্মীদের একাংশ মনে করেন। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ শাখা, আশ্রয়কেন্দ্র আর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে বিপদে পড়া নারীদের দ্রুত সাহায্য করা সম্ভব হতে পারে। নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। উল্লেখ্য, বিদেশে নারী শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে শুধু কর্মসংস্থানের সংখ্যা বাড়ানো নয়, তাঁদের অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষা করাও সমান জরুরি। যে পরিবারগুলির আর্থিক ভবিষ্যৎ বিদেশে কাজ করতে যাওয়া নারীদের উপার্জনের উপর নির্ভর করে, তাঁদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সৌদি আরব থেকে ফিরে আসা প্রায় ৯৭৯ নারীকে ঘিরে প্রকাশিত তথ্য তাই শ্রম অভিবাসন ব্যবস্থার নানা দুর্বলতা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন সামনে এনেছে। অভিযোগগুলির যথাযথ তদন্ত, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় নজরদারি, দূতাবাসের সক্রিয় সহায়তা ও দেশে ফেরার পর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা কার্যকর করা গেলে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট কমানোর পথ তৈরি হতে পারে। বিদেশে কাজ করতে যাওয়া কোনও নারী যেন নিরাপত্তা ও মর্যাদা হারানোর ভয়ে দিন কাটাতে বাধ্য না হন, সেটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Abhishek Sharma world record | India vs New Zealand T20 : অভিষেক শর্মার বিশ্বরেকর্ড, প্রথম বলেই ছক্কা! নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভারতের ঐতিহাসিক জয়



