সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: পাহাড়ের আঁকাবাঁকা রাস্তা, মেঘে ঢাকা চা-বাগান আর কাঞ্চনজঙ্ঘার মনোরম দৃশ্যের টানে প্রতি বছরই দার্জিলিংয়ে ভিড় জমান দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা। কিন্তু পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘদিনের সমস্যা হয়ে উঠেছে যানজট, যাতায়াতের অসুবিধা ও পর্যটন পরিকাঠামোর উপরে বাড়তি চাপ। এ বার সেই ছবিতে বদল আনতে পাহাড়ি পর্যটনকে নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। দার্জিলিং (Darjeeling), কালিম্পং (Kalimpong), মিরিক (Mirik), দুধিয়া (Dudhia), মংপু (Mongpu) এবং কার্সিয়ং (Kurseong)-সহ পাহাড়ের একাধিক পর্যটনকেন্দ্রকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার লক্ষ্যে একাধিক পদক্ষেপের কথা ভাবা হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হল পাঁচটি রোপওয়ে নির্মাণের প্রস্তাব। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পাহাড়ে যাতায়াতের ক্ষেত্রে নতুন বিকল্প তৈরি হওয়ার পাশাপাশি পর্যটন মানচিত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে। দার্জিলিংয়ের অন্যতম বড় সমস্যা হল যানজট। পর্যটনের মরসুমে কিংবা ছুটির দিনে শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলিতে গাড়ির চাপ বেড়ে যায়। পাহাড়ি পথের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে যানবাহনের গতি কমে গেলে পর্যটকদের দীর্ঘ সময় রাস্তায় কাটাতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছতে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সময় লেগে যায়। এই পরিস্থিতিতে পাঁচটি রোপওয়ে তৈরির প্রস্তাবকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, রোপওয়ে চালু করা সম্ভব হলে পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকার মধ্যে যাতায়াতের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। তাতে সড়কপথের উপরে নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে এবং পর্যটকদের ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও আরও স্বচ্ছন্দ হতে পারে। তবে কোন কোন এলাকায় রোপওয়ে তৈরি হবে, তার নির্দিষ্ট রুট, নির্মাণব্যয় এবং কাজ শুরুর সময়সূচি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। শুধু যাতায়াতের সমস্যা মেটানো না, পাহাড়ের পর্যটনকে আরও বহুমুখী করে তোলাও এই পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য। বর্তমানে দার্জিলিংয়ের পরিচিত আকর্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে চা-বাগান, পাহাড়ি রেলপথ, ঔপনিবেশিক আমলের স্থাপত্য, স্থানীয় সংস্কৃতি আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। তবে পর্যটকদের দীর্ঘ সময় ধরে পাহাড়ে রাখা ও নতুন নতুন গন্তব্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ানোর জন্য আরও নানা ধরনের আয়োজনের প্রয়োজন রয়েছে। সেই কথা মাথায় রেখেই চা উৎসব, ভিনটেজ কার র্যালি, রিভার রাফটিং ও প্যারাগ্লাইডিংয়ের মতো উদ্যোগের কথা পরিকল্পনায় রাখা হয়েছে। এই আয়োজনগুলি বাস্তবায়িত হলে পর্যটকেরা একই সফরে প্রকৃতি, ঐতিহ্য ও অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
চা উৎসবকে কেন্দ্র করে পাহাড়ের চা-শিল্পের সঙ্গে পর্যটনের সম্পর্ক আরও মজবুত করার সুযোগ রয়েছে। দার্জিলিংয়ের চায়ের আন্তর্জাতিক পরিচিতি বহু দিনের। চা-বাগান ঘুরে দেখা, চা তৈরির পদ্ধতি সম্পর্কে জানা এবং স্থানীয় চায়ের স্বাদ নেওয়ার মতো অভিজ্ঞতাকে উৎসবের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে পর্যটকদের কাছে নতুন আকর্ষণ তৈরি হতে পারে। অন্য দিকে, ভিনটেজ কার র্যালি পাহাড়ের ঐতিহ্য ও পুরনো গাড়ির প্রতি আগ্রহী পর্যটকদের টানতে পারে। নদীকেন্দ্রিক রিভার রাফটিং এবং প্যারাগ্লাইডিংয়ের মতো কার্যকলাপের মাধ্যমে অ্যাডভেঞ্চার পর্যটনের পরিসরও বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। অবশ্য এই ধরনের কর্মকাণ্ড চালু করার ক্ষেত্রে পর্যটকদের নিরাপত্তা, প্রশিক্ষিত কর্মী, উপযুক্ত অনুমতি ও পরিবেশগত বিধি মেনে চলার বিষয়গুলিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। পর্যটনকেন্দ্রগুলির সৌন্দর্য বজায় রাখতে ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলির সংরক্ষণ আর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উপরেও জোর দেওয়া হচ্ছে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে প্লাস্টিক, খাবারের প্যাকেট এবং অন্যান্য বর্জ্য জমে পরিবেশের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পাহাড়ি এলাকায় বর্জ্য সংগ্রহ ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা দুর্বল হলে তার প্রভাব পড়তে পারে নদী, বনভূমি আর স্থানীয় জনজীবনের উপরেও। তাই পর্যটন পরিকাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা ও ঐতিহাসিক স্থানগুলির রক্ষণাবেক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পর্যটনের প্রসার যাতে পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ আর সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ক্ষতি না করে, সে দিকেও নজর রাখা প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে।
এই উদ্যোগের পাশাপাশি পর্যটকদের হাতে প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে পৌঁছে দিতে ডিজিটাল ব্যবস্থার উপরেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মাত্র তিন দিনে তৈরি করা হয়েছে ‘ডিসকভার দার্জিলিং’ (Discover Darjeeling) নামে একটি মোবাইল অ্যাপ। পর্যটনমন্ত্রী শংকর ঘোষ (Shankar Ghosh) অ্যাপটির উদ্বোধন করেছেন। অ্যাপের মাধ্যমে দার্জিলিংয়ের ঐতিহ্যবাহী স্থান, তুলনায় কম পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র আর ভ্রমণ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য এক জায়গায় পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। হোটেল, হোমস্টে, যাতায়াতের ব্যবস্থা, স্থানীয় দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে তথ্য পেতে পর্যটকদের সুবিধা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, নতুন জায়গায় বেড়াতে গেলে কোথায় থাকা যাবে, কীভাবে যাতায়াত করতে হবে ও আশপাশে কী কী দেখার আছে, সেই তথ্য খুঁজতে অনেক পর্যটককেই বিভিন্ন ওয়েবসাইট কিংবা স্থানীয় সূত্রের উপর নির্ভর করতে হয়। একটি নির্দিষ্ট অ্যাপে এই তথ্যগুলি সহজে পাওয়া গেলে পরিকল্পনা তৈরি করা আরও সুবিধাজনক হতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা প্রথম বার দার্জিলিংয়ে যাচ্ছেন কিংবা পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রের বাইরে নতুন জায়গা ঘুরে দেখতে চান, তাঁদের কাছে এই ডিজিটাল পরিষেবা কার্যকর হতে পারে। পর্যটন দফতরের তরফে জানানো হয়েছে, ভবিষ্যতে অন্য জেলাতেও একই ধরনের অ্যাপ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু অ্যাপের তথ্য কত নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে? পর্যটকেরা কী পরিমাণ পরিষেবা পাবেন? তার উপরেই এর কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।
পাহাড়ের পর্যটন ব্যবস্থায় হোমস্টের গুরুত্বও ক্রমশ বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের বাড়িতে থাকার সুযোগ পর্যটকদের কাছে যেমন আলাদা অভিজ্ঞতা তৈরি করে, তেমনই এলাকার মানুষের আয়ের পথও খুলে দেয়। কিন্তু হোমস্টের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিবন্ধন, নিরাপত্তা এবং পরিষেবার মান বজায় রাখার বিষয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নতুন ব্যবস্থায় হোমস্টের নিবন্ধন, নবায়ন এবং নতুন আবেদনের প্রক্রিয়া অনলাইনে করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে আবেদনকারীদের দফতরে গিয়ে একাধিক ধাপ পার করার প্রয়োজন কমতে পারে। একই সঙ্গে পুলিশ নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত হোমস্টেগুলির তালিকা তৈরি করবে বলে জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আর অনিয়ম চিহ্নিত করার কাজে সুবিধা হতে পারে। পাহাড়ে পর্যটনকে কেন্দ্র করে বহু মানুষের জীবিকা গড়ে উঠেছে। হোমস্টে পরিচালনা, গাড়ি ভাড়া, পর্যটক গাইডের কাজ, স্থানীয় খাবারের দোকান, হস্তশিল্প বিক্রি ও অন্যান্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বহু বাসিন্দা। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে এই ক্ষেত্রগুলিতে কাজের সুযোগও বাড়তে পারে। তবে সেই লাভ স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হলে প্রশিক্ষণ, পরিষেবার মানোন্নয়ন, ছোট ব্যবসাগুলিকে সহায়তা করার বিষয়গুলিও গুরুত্ব পাবে। পর্যটনের প্রসারের ফলে যাতে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা ব্যাহত না হয় এবং প্রাকৃতিক সম্পদের উপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সেই ভারসাম্য বজায় রাখাও জরুরি।
আরও পড়ুন : Siraj ud daulah : এক বছরের নবাব
সরকারের নতুন পর্যটন নীতিমালা ইতিমধ্যেই মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেয়েছে বলে সূত্রের খবর। এই উন্নয়ন পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়ে যেতে কেন্দ্রীয় সরকারের ৫৭ কোটি টাকার বরাদ্দ এবং পর্যটন দফতরের জমি ও সম্পদ ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আগামী ছয় থেকে সাত মাসের মধ্যে পাহাড়ের পর্যটন পরিকাঠামোয় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আনার লক্ষ্য রয়েছে বলে উল্লেখ। দার্জিলিংকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরার পরিকল্পনায় তাই এক দিকে যেমন যাতায়াতের উন্নতি, ডিজিটাল পরিষেবা ও নতুন বিনোদনের সুযোগ তৈরির বিষয় রয়েছে, অন্য দিকে রয়েছে পরিবেশ রক্ষা, ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্য। পাঁচটি রোপওয়ে নির্মাণের প্রস্তাব বাস্তবে রূপ পেলে পাহাড়ে যাতায়াতের অভিজ্ঞতায় পরিবর্তন আসতে পারে। পাশাপাশি চা উৎসব, অ্যাডভেঞ্চার পর্যটন আর উন্নত হোমস্টে ব্যবস্থার মাধ্যমে দার্জিলিং ও সংলগ্ন এলাকাগুলিতে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এখন নজর থাকবে, ঘোষিত পরিকল্পনাগুলি কত দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগোয় এবং তার সুফল কতটা পৌঁছয় পর্যটক ও পাহাড়ের স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Darjeeling snowfall, Sandakphu snow February | দার্জিলিংয়ে বসন্তের বুকে শীতের কামড়: দুপুরেই বরফে ঢাকল সান্দাকফু-মানেভঞ্জন, নাথু-লা ভ্রমণ বন্ধ



