সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: ইলন মাস্কের (Elon Musk) স্টারলিংক (Starlink) -সহ বিদেশি স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সংস্থাগুলির পরিষেবার উপর নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করতে নতুন প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা করছে কেন্দ্রীয় সরকার। ভারতের মাটিতে পরিচালিত বিদেশি স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যাতায়াত করা ইন্টারনেট ডেটার উপর নজরদারি নিশ্চিত করতে বিশেষ হার্ডওয়্যার ব্যবস্থার কথা ভাবা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইকনমিক টাইমস’ (The Economic Times) -এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে আলোচনা চলছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য, দেশের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বিদেশি স্যাটেলাইট অপারেটরদের নেটওয়ার্কের উপর ভারতীয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে ভারতে পরিষেবা দেওয়া বিদেশি স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সংস্থাগুলিকে নির্দিষ্ট হার্ডওয়্যার ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে নিজেদের ডেটা ট্রাফিক পরিচালনা করতে হতে পারে। অর্থাৎ, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে পৌঁছনো ইন্টারনেট সংযোগের তথ্যপ্রবাহ একটি নির্ধারিত প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো অতিক্রম করবে। গ্রাহকের বাড়িতে কিংবা স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশনে এই যন্ত্র বসানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে যন্ত্রটির চূড়ান্ত নকশা, স্থাপনের নির্দিষ্ট স্থান এবং কার্যপ্রণালী সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি।
সরকারের পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে ‘হার্ডওয়্যার-এনফোর্সড সভরেন সিকিউরিটি লেয়ার’ (Hardware-Enforced Sovereign Security Layer) নামে একটি নিরাপত্তা কাঠামো। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদেশি সংস্থার পরিচালিত নেটওয়ার্কের উপর নির্ভর না করে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে একটি প্রযুক্তিগত স্তর তৈরি করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, নির্ধারিত হার্ডওয়্যারের মধ্য দিয়ে ডেটা প্রবাহিত হলে আইন মেনে তা পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে ঠিক কোন ধরনের তথ্যের উপর নজরদারি চালানো হবে এবং কী শর্তে তা করা যাবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত নিয়ম এখনও প্রকাশিত হয়নি। কেন্দ্রীয় সরকারের এই উদ্যোগের পিছনে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিই প্রধান বিবেচনা বলে মনে করা হচ্ছে। প্রচলিত স্থলভিত্তিক ব্রডব্যান্ড পরিষেবার তুলনায় স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের প্রযুক্তিগত কাঠামো আলাদা। এই পরিষেবায় মহাকাশে থাকা স্যাটেলাইট, গ্রাউন্ড স্টেশন ও গ্রাহকের টার্মিনালের মধ্যে সংযোগ স্থাপিত হয়। ফলে নেটওয়ার্কের বিভিন্ন স্তরে তথ্যের প্রবাহ এবং তার উপর নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নিরাপত্তা সংস্থাগুলির কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষত, বিদেশি সংস্থার প্রযুক্তি ও পরিকাঠামোর উপর নির্ভরশীল পরিষেবার ক্ষেত্রে ভারতীয় আইন কার্যকর করা এবং প্রয়োজনীয় নজরদারি নিশ্চিত করার প্রশ্নটি সামনে এসেছে।
স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের অন্যতম বড় সুবিধা হল, যেখানে প্রচলিত ফাইবার সংযোগ বা মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌঁছনো কঠিন, সেখানেও তুলনামূলক দ্রুত ইন্টারনেট পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। পাহাড়ি অঞ্চল, প্রত্যন্ত গ্রাম, দ্বীপাঞ্চল ও দুর্গম সীমান্ত এলাকায় এই প্রযুক্তি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় প্রচলিত যোগাযোগ পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও স্যাটেলাইটভিত্তিক পরিষেবা বিকল্প সংযোগ হিসেবে কাজে আসতে পারে। কিন্তু এই প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি ডেটার নিরাপত্তা, আইনানুগ নজরদারি এবং দেশের নিয়ন্ত্রণাধীন যোগাযোগ পরিকাঠামো বজায় রাখাও সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রস্তাবিত হার্ডওয়্যার ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদেশি অপারেটরদের নেটওয়ার্ককে সরাসরি বিশ্বাসযোগ্য ধরে না নিয়ে নির্দিষ্ট নিরাপত্তাবিধির আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, কোনও বিদেশি সংস্থা ভারতে পরিষেবা দিতে চাইলে তাকে দেশের আইন ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত শর্ত মেনে চলতে হবে। শুধু গ্রাহকের কাছে ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকলেই পরিষেবা চালুর অনুমতি মিলবে না। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা, তথ্য সংরক্ষণের নিয়ম এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতার শর্ত পূরণ করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এই পরিকাঠামো তৈরির দায়িত্ব সরকারি গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থাগুলির হাতে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যোগাযোগ প্রযুক্তি, নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট হার্ডওয়্যার তৈরিতে অভিজ্ঞ সরকারি সংস্থাগুলির দক্ষতা কাজে লাগানোর কথা ভাবা হচ্ছে। প্রয়োজনে বেসরকারি প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকেও এই কাজে যুক্ত করা হতে পারে। তবে প্রকল্পের দায়িত্ব বণ্টন, অর্থ বরাদ্দ, প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও বাস্তবায়নের সময়সীমা নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি। ফলে পরিকল্পনাটি কোন পর্যায়ে এবং কী সময়ের মধ্যে কার্যকর হতে পারে, তা নির্ভর করছে পরবর্তী সরকারি সিদ্ধান্তের উপর। এই আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে স্টারলিংক। ইলন মাস্কের মহাকাশ প্রযুক্তি সংস্থা স্পেসএক্সের (SpaceX) অধীনস্থ এই পরিষেবা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে নিম্ন কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ভারতে পরিষেবা চালুর জন্যও সংস্থাটি দীর্ঘ দিন ধরে উদ্যোগী। ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করতে হলে স্টারলিংককে দেশের টেলিযোগাযোগ নীতি, লাইসেন্সিং ব্যবস্থা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত শর্ত পূরণ করতে হবে। পরিষেবা চালুর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন এবং স্পেকট্রাম ব্যবহারের বিধিও গুরুত্বপূর্ণ।
বিদেশি স্যাটেলাইট সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে গ্রাহকের তথ্য কোথায় সংরক্ষিত হবে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আইনানুগ প্রয়োজনে কীভাবে প্রয়োজনীয় তথ্য পাবে ও নেটওয়ার্কের উপর নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর থাকবে, সেই প্রশ্নগুলিও আলোচনার অংশ। কোনও সংস্থা দেশের ভিতরে গেটওয়ে তৈরি করলেই যে তার সমস্ত নেটওয়ার্ক ট্রাফিকের উপর ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে, এমন নয়। তাই প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোর মাধ্যমে নিরাপত্তা সংক্রান্ত শর্ত কার্যকর করার প্রস্তাবকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু, এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হলে বিদেশি সংস্থাগুলির পরিচালন ব্যয় বাড়তে পারে কি না, পরিষেবা চালুর প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হবে কি না এবং গ্রাহকের গোপনীয়তা কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। নজরদারির পরিধি, তথ্য ব্যবহারের সীমা এবং আইনানুগ অনুমোদনের প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট না হলে নতুন ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এখনও পর্যন্ত প্রস্তাবিত হার্ডওয়্যার স্তর নিয়ে আলোচনা চলছে বলেই জানা যাচ্ছে। ফলে স্টারলিংক-সহ বিদেশি স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সংস্থাগুলির জন্য নতুন নিয়ম কবে কার্যকর হবে, কী ধরনের যন্ত্র বাধ্যতামূলক করা হবে এবং পরিষেবা চালুর অনুমোদনের সঙ্গে এই ব্যবস্থার সম্পর্ক কী হবে, তা নিয়ে অপেক্ষা রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলে ভারতের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে দেশের ডিজিটাল যোগাযোগ পরিকাঠামোয় বিদেশি প্রযুক্তির ব্যবহার, জাতীয় নিরাপত্তা ও নাগরিকের তথ্যের গোপনীয়তার মধ্যে ভারসাম্য রাখার বিষয়টিও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Putin praises Modi, Modi Ukraine peace efforts | ‘যত দ্রুত সম্ভব সংঘাত শেষ হোক’! মোদীর উদ্যোগে পুতিনের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, কী বললেন রুশ প্রেসিডেন্ট?



