সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মস্কো: রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের অবসান নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) -এর, ধারাবাহিক উদ্যোগের প্রশংসা করলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (Vladimir Putin)। মস্কোর কাছে অনুষ্ঠিত ভালদাই ডিসকাশন ক্লাবের (Valdai Discussion Club) বার্ষিক বৈঠকে পুতিন জানান, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও নরেন্দ্র মোদী প্রতিটি আলোচনায় ইউক্রেন সংঘাত কীভাবে বন্ধ করা যায়, সেই প্রসঙ্গ তোলেন। শুধু যুদ্ধ বন্ধের কথা বলাই নয়, দুই পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে পাওয়ার জন্য মোদীর কিছু ‘খুব ভাল ধারণা’ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন রুশ প্রেসিডেন্ট। পুতিনের এই মন্তব্য সামনে আসার পর ভারত-রাশিয়া কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি ইউক্রেন সংঘাত নিয়ে নতুন দিল্লির অবস্থানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ভালদাইয়ে পুতিন বলেন, মোদী এমন কয়েক জন বিশ্বনেতার মধ্যে রয়েছেন, যাঁরা রাশিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেও ইউক্রেন সংঘাতের অবসানের প্রয়োজনীয়তা বারবার তুলে ধরেন। রুশ প্রেসিডেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, সংঘাত বন্ধের বিষয়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা দুই নেতার বৈঠকের সময়ও বিষয়টি আলোচনায় আসে।, পুতিন জানান, মোদীর কাছে এমন কিছু প্রস্তাব রয়েছে, যার মাধ্যমে সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত দুই পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য কোনও সমাধানের দিকে এগোনো সম্ভব হতে পারে। রুশ প্রেসিডেন্টের কথায়, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগ ও যত দ্রুত সম্ভব শান্তিপূর্ণভাবে সংঘাতের অবসানের ইচ্ছার জন্য মস্কো কৃতজ্ঞ। পুতিনের বক্তব্যে ‘mutually acceptable solutions’ বা উভয় পক্ষের গ্রহণযোগ্য সমাধানের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
ইউক্রেন সংঘাত নিয়ে ভারতের অবস্থান গত কয়েক বছর ধরে সংলাপ ও কূটনীতির ওপর জোর দেওয়ার মধ্যেই রয়েছে। নতুন দিল্লি রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘ দিনের সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ইউক্রেনের সঙ্গেও যোগাযোগ রেখে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একাধিক আন্তর্জাতিক মঞ্চে সংঘাতের সমাধানের জন্য আলোচনা ও কূটনৈতিক পথের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। সেই ধারাবাহিকতারই প্রতিফলন পুতিনের সাম্প্রতিক বক্তব্যে উঠে এসেছে বলে উল্লেখ। দুই রাষ্ট্র নেতার সাম্প্রতিক সাক্ষাতের দিকেও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক কূটনৈতিক মহলের দৃষ্টি রয়েছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে নতুন দিল্লিতে ব্রিকস (BRICS) সম্মেলনের ফাঁকে মোদী ও পুতিনের বৈঠক হয়। সেখানে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও ইউক্রেন সংঘাত নিয়েও আলোচনা হয়। রুশ প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীকে ইউক্রেনের পরিস্থিতি সম্পর্কে নিজের মূল্যায়ন জানান। অন্য দিকে, নরেন্দ্র মোদী আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতের সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন বলে সূত্রের খবর। শুধু তা-ই নয়, এর আগে আগস্টের শেষেও দুই নেতার বৈঠক হয়েছিল। সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (SCO) সম্মেলনের ফাঁকে তাঁদের সাক্ষাৎ হয়। সেখানেও ইউক্রেন পরিস্থিতি আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। অর্থাৎ, সাম্প্রতিক সময়ে মোদী-পুতিন বৈঠকগুলিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতও নিয়মিত আলোচনায় এসেছে। পুতিনের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই ধারাবাহিকতারই আর একটি বিশেষ প্রকাশ।
ভারতের অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও দীর্ঘ দিন ধরে আলোচনা রয়েছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন দুই দেশের সঙ্গেই ভারতের কূটনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে। সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে নতুন দিল্লি এক দিকে মস্কোর সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সম্পর্ক বজায় রেখেছে, অন্য দিকে ইউক্রেনের সঙ্গে যোগাযোগও অব্যাহত রেখেছে। ভারতীয় নেতৃত্ব বারবার সংঘাতের অবসানের জন্য আলোচনা ও কূটনীতির পথ অনুসরণের কথা বলেছে। অন্যদিকে, পুতিনের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, তিনি মোদীর অবস্থানকে ‘নিরপেক্ষ’ হিসেবে উল্লেখ করলেও একই সঙ্গে সংঘাতের অবসানের বিষয়ে তাঁর আগ্রহের কথা বলেছেন। অর্থাৎ, রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের বর্ণনায় ভারতের অবস্থান কোনও একটি পক্ষের হয়ে সরাসরি অবস্থান নেওয়ার বদলে সংঘাত শেষ করার দিকে কেন্দ্রীভূত। পুতিনের মতে, সেই কারণেই মোদী রাশিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ইউক্রেন নিয়ে আলোচনায় বারবার শান্তির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের প্রভাব অবশ্য দুই দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই সংঘাত আন্তর্জাতিক রাজনীতি, জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার উপর প্রভাব ফেলেছে। ফলে সংঘাতের অবসান নিয়ে বিভিন্ন দেশ নিজেদের কূটনৈতিক অবস্থান জানিয়ে চলেছে। ভারতের ক্ষেত্রেও রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলির সঙ্গে একযোগে সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পুতিনের মন্তব্যের সময়ে ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের অন্য দিকগুলিও সক্রিয় রয়েছে। প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, বাণিজ্য, মহাকাশ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা চলছে। সেপ্টেম্বরের বৈঠকেও দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন ক্ষেত্র পর্যালোচনা করা হয়েছিল। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েও দুই পক্ষ কাজ করছে বলে উল্লেখ।
আগামী দিনে ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হতে চলেছে। পুতিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ২৪তম ভারত-রাশিয়া বার্ষিক শীর্ষ বৈঠকের জন্য রাশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। মোদী সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন ও সফরের দিনক্ষণ কূটনৈতিক স্তরে ঠিক হওয়ার কথা বলে সূত্রের খবর। ফলে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের পরবর্তী বৈঠকেও ইউক্রেন পরিস্থিতি আলোচনায় জায়গা পেতে পারে বলে আন্তর্জাতিক মহলের লক্ষ্য রয়েছে। এদিকে ইউক্রেন সংঘাতের অবসান নিয়ে ভারতের অবস্থানের ক্ষেত্রে ‘আলোচনা’ ও ‘কূটনীতি’ দু’টি শব্দই বারবার উঠে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী এর আগে রাশিয়া ও ইউক্রেনের নেতৃত্বের সঙ্গে পৃথক যোগাযোগের কথাও জানিয়েছেন। ভারতের বক্তব্য অনুযায়ী, দুই পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে সহযোগিতা করার সুযোগ রয়েছে। তবে সংঘাতের চূড়ান্ত সমাধান কীভাবে হবে, তা নির্ভর করছে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে আলোচনার অগ্রগতি আর সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক পক্ষগুলির অবস্থানের ওপর ভিত্তি করেই।
পুতিনের সাম্প্রতিক মন্তব্য তাই দুই বন্ধু রাষ্ট্র নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রসঙ্গেই সীমাবদ্ধ নয়। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নিজেই জানিয়েছেন, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও মোদী নিয়মিত ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের প্রসঙ্গ তোলেন। একই সঙ্গে তিনি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবগুলিকে দুই পক্ষের গ্রহণযোগ্য সমাধান খোঁজার ক্ষেত্রে কার্যকর ধারণা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু মোদীর ঠিক কোন কোন প্রস্তাবকে পুতিন ‘খুব ভাল ধারণা’ বলেছেন, তার বিস্তারিত প্রকাশ করেননি রুশ প্রেসিডেন্ট। ফলে এই মন্তব্য থেকে নির্দিষ্ট কোনও শান্তি-চুক্তির রূপরেখা বা ভারতের কোনও মধ্যস্থতা প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়েছে বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। আপাতত পুতিনের বক্তব্য থেকে যে বিষয়টি জানা যাচ্ছে, তা হল, ইউক্রেন সংঘাতের অবসান নিয়ে মোদীর ধারাবাহিক আলোচনা ও গ্রহণযোগ্য সমাধান খোঁজার উদ্যোগকে মস্কো গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। ভালদাই ডিসকাশন ক্লাবের মঞ্চে পুতিনের এই মন্তব্যের পর ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক ও ইউক্রেন সংঘাত নিয়ে নতুন দিল্লির কূটনৈতিক অবস্থান ফের আন্তর্জাতিক আলোচনায় এসেছে। যুদ্ধের অবসানের পথ এখনও অনিশ্চিত হলেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নিয়মিত ভাবে শান্তিপূর্ণ সমাধানের কথা তুলে ধরছেন, রুশ প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে সেই বিষয়টিরই স্বীকৃতি মিলেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : BRICS | Programme for Economic Cooperation 2030, Modi Putin meeting Delhi : বিষকেকে বৈঠকের দু’সপ্তাহের মধ্যেই দিল্লিতে মোদী-পুতিন সাক্ষাৎ, বাণিজ্য থেকে প্রতিরক্ষা, আলোচনায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়




