সম্পাদকীয়
জনপ্রিয়তার হিসাব সাহিত্যকে প্রভাবিত করতেই পারে, কিন্তু পাঠকের পছন্দকে একমাত্র মানদণ্ড করলে লেখার স্বাধীনতা মুষড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। অন্যদিকে, পাঠকের কাছে পৌঁছনোর বিষয়টিও উপেক্ষা করা যায় না। অত্যন্ত দুরূহ ভাষা কিংবা অকারণ জটিল নির্মাণ অনেক সময় পাঠকের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে। গভীর চিন্তা আর সহজ যোগাযোগ এই দু’য়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই সমকালীন লেখকদের বিশেষ কাজগুলির একটি। ভাষা সহজ হলেই ভাব সরল হবে, এমন নয়। আবার কঠিন ভাষাই যে গভীরতার প্রমাণ, তা-ও নয়। সাহিত্যের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দায় রয়েছে মানুষের অনুচ্চারিত অভিজ্ঞতাকে সামনে তুলে নিয়ে আসা।
প্রশ্নের মুখে
এই সময়ের লেখালেখি
সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবনযাপন, যোগাযোগের ধরন, ভাষা ব্যবহারের পদ্ধতি। একসময় যে কথোপকথন চিঠিতে সীমাবদ্ধ থাকত তা এখন কয়েকটি শব্দ, ছবি কিংবা কয়েক সেকেন্ডের ভিডিওতে প্রকাশ পাচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমের দ্রুত বিস্তার মানুষের সামনে তথ্য ও মতামতের বিপুল ভাণ্ডার খুলে দিয়েছে। কিন্তু সেই প্রবাহের মধ্যে পাঠের অভ্যাস কতটা টিকে থাকছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেই সাহিত্যের ভূমিকা নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সাহিত্য তো শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়। মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতি থেকে সামাজিক টানাপোড়েন, রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে নৈতিক সঙ্কট, জীবনের বহুস্তরকে ভাষা দেওয়ার কাজও সাহিত্য করে। ফলে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সাহিত্যের মাধ্যম বদলালেও তার মৌলিক প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না। যত দ্রুত চারপাশের পরিবর্তন ঘটে, তাকে বুঝে নেওয়ার জন্য গভীর পাঠের প্রয়োজন ততই বাড়ে।
বর্তমান প্রজন্মের পাঠাভ্যাসে ডিজিটাল মাধ্যমের প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। মোবাইলের পর্দায় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একের পর এক বিষয় সামনে চলে আসে। একটি লেখা শেষ করার আগেই অন্য খবর, ছবি বা ভিডিও মনোযোগ টেনে নেয়। এই অভ্যাস দীর্ঘ রচনার ক্ষেত্রে একটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। উপন্যাস, দীর্ঘ গল্প বা মননশীল প্রবন্ধ পাঠের জন্য যে সময় ও একাগ্রতা প্রয়োজন, তা অনেক পাঠকের দৈনন্দিন জীবনে ক্রমশ সঙ্কুচিত হচ্ছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বই বা সাহিত্য অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। পাঠের মাধ্যমের সঙ্গে পাঠের ধরন বদলাচ্ছে। অনলাইন পত্রিকা, ই-বুক, ডিজিটাল আর্কাইভ ও সামাজিক মাধ্যমের সাহিত্যচর্চা নতুন পাঠক তৈরি করছে। বহু তরুণ লেখকও প্রচলিত প্রকাশব্যবস্থার বাইরে নিজেদের লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পারছেন। ফলে প্রযুক্তি একদিকে লম্বা পাঠের অভ্যাসে চাপ তৈরি করলেও অন্যদিকে সাহিত্যপ্রকাশের নতুন দরজাও খুলেছে। এই পরিবর্তনের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের অবস্থান আলাদা করে ভাবার দাবি রাখে। বাংলা ভাষার সাহিত্য ইতিহাসে লোকজ সংস্কৃতি, সামাজিক পরিবর্তন, প্রেম, প্রতিবাদ, বেদনা, রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও ব্যক্তিমানুষের সঙ্কটকে ধারণ করেছে। লোককথা থেকে আধুনিক কবিতা, উপন্যাস থেকে নাটক, প্রতিটি ধারাই সময়ের সঙ্গে নিজের ভাষা ও বিষয় পরিবর্তন করেছে। ফলে বর্তমান সময়ের নতুন বাস্তবতাও সাহিত্যের বিষয় হয়ে উঠবে, এটাই স্বাভাবিক। সেই বাস্তবতার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ডিজিটাল জীবন। সামাজিক মাধ্যম এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যমে আটকে নেই। মানুষের আত্মপরিচয়, সম্পর্ক, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, একাকিত্ব ও সামাজিক স্বীকৃতির ধারণাকেও বদলে দিচ্ছে। নতুন সাহিত্য যদি এই পরিবর্তনকে গ্রহণ করে, তাহলে আগামী দিনের বাংলা লেখায় নতুন জীবনচিত্র তৈরি হতে পারে। ভার্চুয়াল সম্পর্ক, পর্দানির্ভর জীবন, তথ্যের অতিরিক্ততা ও ক্রমশ বদলে যাওয়া ব্যক্তিসত্তা এসবই সাহিত্যের নতুন উপাদান হতে পারে।
সাহিত্যের ভবিষ্যৎ তাই বই বনাম প্রযুক্তির সরল দ্বন্দ্বে নির্ধারিত হবে না। প্রশ্ন হল, নতুন প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে কীভাবে গভীর পাঠের পরিবেশ তৈরি করা যায়। ডিজিটাল প্রকাশনা, অডিয়োবুক, ই-বুক কিংবা অনলাইন সাহিত্যপত্র নতুন পাঠক তৈরি করতে পারে। কিন্তু মাধ্যম যতই বদলাক, একটি সাহিত্যকর্মের মূল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে ভাষা, ভাবনা, নির্মাণ ও মানবজীবনের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর। সময়ের পরিবর্তন সাহিত্যের জন্য নতুন বিষয় নিয়ে আসবে, নতুন পাঠক তৈরি করবে আবার নতুন ভাষারও জন্ম দেবে। সেই পরিবর্তনকে গ্রহণ করেও লেখাকে মানুষের গভীর অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত রাখতে হবে।

কিন্তু, নতুন বিষয় গ্রহণ করলেই সাহিত্য সমকালীন হয়ে ওঠে না। লেখার ভিতরে জীবনকে দেখার নিজস্ব দৃষ্টিও প্রয়োজন। পাঠকের তাৎক্ষণিক মনোযোগ পাওয়ার জন্য ভাষাকে কেবল চটকদার করে তোলা হলে লেখার স্থায়িত্ব কমতে পারে। জনপ্রিয়তার হিসাব সাহিত্যকে প্রভাবিত করতেই পারে, কিন্তু পাঠকের পছন্দকে একমাত্র মানদণ্ড করলে লেখার স্বাধীনতা মুষড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। অন্যদিকে, পাঠকের কাছে পৌঁছনোর বিষয়টিও উপেক্ষা করা যায় না। অত্যন্ত দুরূহ ভাষা কিংবা অকারণ জটিল নির্মাণ অনেক সময় পাঠকের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে। গভীর চিন্তা আর সহজ যোগাযোগ এই দু’য়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই সমকালীন লেখকদের বিশেষ কাজগুলির একটি। ভাষা সহজ হলেই ভাব সরল হবে, এমন নয়। আবার কঠিন ভাষাই যে গভীরতার প্রমাণ, তা-ও নয়। সাহিত্যের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দায় রয়েছে মানুষের অনুচ্চারিত অভিজ্ঞতাকে সামনে তুলে নিয়ে আসা। সমাজের আলোচনায় সমস্ত মানুষের জীবন সমান গুরুত্ব পায় না। প্রান্তিক মানুষ, শ্রমজীবী, একাকী বৃদ্ধ, নিঃসঙ্গ শিশু, পারিবারিক সহিংসতার শিকার মানুষ কিংবা সামাজিক বৈষম্যের ভিতরে থাকা মানুষের অভিজ্ঞতা অনেক সময় মূল স্রোতের আলোচনার বাইরে থেকে যায়। সাহিত্য সেই জীবনকে দৃশ্যমান করার সুযোগ তৈরি করতে পারে!
এখানেই সাহিত্যের সঙ্গে নাগরিক জীবনের সম্পর্ক তৈরি হয়। কোনও রচনা সরাসরি সামাজিক বক্তব্য না দিয়েও পাঠকের চিন্তায় পরিবর্তন আনতে পারে। একটি চরিত্রের জীবন পাঠককে অন্য একটি শ্রেণির মানুষের বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে। একটি কবিতা ব্যক্তিগত বেদনার ভিতর দিয়ে বৃহত্তর সামাজিক ক্ষতকে অনুভব করাতে পারে। একটি স্মৃতিকথা বিস্মৃত ইতিহাসের দিকে নতুন করে তাকানোর সুযোগ দিতে পারে। এই কারণে সাহিত্যের স্বাধীনতাও গুরুত্বপূর্ণ। লেখকের কাজ কোনও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত পাঠকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কিন্তু নয়। প্রশ্ন তোলা, দ্বন্দ্ব সামনে তুলে ধরা ও ভাবনার জায়গা তৈরি করাই সাহিত্যের বিশাল শক্তি। পাঠক নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবেন। একই রচনার অর্থ তাই ভিন্ন পাঠকের কাছে ভিন্ন হতে পারে এটাই স্বাভাবিক।
নবীন লেখকদের জন্য বর্তমান সময় একদিকে সম্ভাবনাময়, অন্যদিকে কঠিন। প্রকাশের সুযোগ বেড়েছে, কিন্তু লেখার ভিড়ও বেড়েছে। লেখার মানও কিছু ক্ষেত্রে ক্ষীণ হয়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য লেখা প্রকাশিত হচ্ছে। ফলে আলাদা হয়ে ওঠার তাগিদে অনেক সময় বিষয় বা ভাষায় অতিরিক্ত চমক দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। অথচ সাহিত্যিক স্থায়িত্বের জন্য প্রয়োজন নিজস্ব স্বর। অন্যের সাফল্যের সূত্র অনুসরণ করে সাময়িক পরিচিতি পাওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘস্থায়ী সাহিত্যিক অবস্থান তৈরি হয় লেখকের লেখার নিজস্ব শক্তিতেই। এ ক্ষেত্রে পাঠাভ্যাসের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। একজন লেখক শুধু নিজের সময়কে পড়লে তাঁর সাহিত্যিক পরিসর ভীষণই সীমিত হতে পারে। সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যের পূর্বসূরি পূর্বসূরী লেখকদের পাশাপাশি অন্য ভাষার সাহিত্য, অনুবাদ, ইতিহাস, দর্শন, সমাজবিষয়ক লেখার সঙ্গে পরিচয় লেখকের ভাবনার ক্ষেত্র প্রসারিত করে। পাঠ যত বিস্তৃত হয়, লেখার ভিতরেও তত বেশি জীবন ও ভাবনার বৈচিত্র্য আসতে পারে। প্রবীণ ও নবীন লেখকের সম্পর্কও প্রতিদ্বন্দ্বিতার নয়। উভয়ের ভেতর সম্পর্ক ও আলোচনা হওয়া দরকার। নতুন প্রজন্ম নতুন বাস্তবতা ও ভাষা নিয়ে আসবে, প্রবীণরা তাঁদের সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা দিয়ে আলোচনাকে সমৃদ্ধ করবেন। দুই প্রজন্মের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলে সাহিত্যচর্চার ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার নবীন লেখার ওপর অতীতের ছায়া অতিরিক্ত হলে নতুন কণ্ঠের স্বাধীন বিকাশও বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে।
এখানে পাঠকও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। মনে রাখতে হবে, সাহিত্য শুধু লেখকের একক প্রকাশ নয়। পাঠের মধ্য দিয়ে এক-একটি রচনার নতুন অর্থ তৈরি হয়। পাঠক কোনও চরিত্রে নিজের জীবনের ছায়া দেখতে পারেন, কোনও কবিতায় হারানো সময়ের স্মৃতি খুঁজে পেতে পারেন, আবার কোনও প্রবন্ধের যুক্তি নিয়ে দ্বিমতও পোষণ করতে পারেন। এই স্বাধীন পাঠই সাহিত্যের প্রাণশক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখনকার সময়ে সেই স্বাধীন সাহিত্য পাঠের জন্য সময় বের করাই হয়ত বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সাহিত্য পাঠের মূল্য তো শুধু সাহিত্য বোঝার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মনোযোগ দিয়ে পড়া মানুষকে যুক্তির ধারাবাহিকতা অনুসরণ করতে শেখায়, অন্যের অভিজ্ঞতার ভিতরে প্রবেশের সুযোগ দেয়, তেমনি নিজের ধারণাকে প্রশ্ন করার অভ্যাস তৈরি করে। দ্রুত তথ্য গ্রহণের বিপরীতে পাঠ চিন্তার একটি ভিন্ন ছন্দ তৈরি করে।
সাহিত্যের ভবিষ্যৎ তাই বই বনাম প্রযুক্তির সরল দ্বন্দ্বে নির্ধারিত হবে না। প্রশ্ন হল, নতুন প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে কীভাবে গভীর পাঠের পরিবেশ তৈরি করা যায়। ডিজিটাল প্রকাশনা, অডিয়োবুক, ই-বুক কিংবা অনলাইন সাহিত্যপত্র নতুন পাঠক তৈরি করতে পারে। কিন্তু মাধ্যম যতই বদলাক, একটি সাহিত্যকর্মের মূল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে ভাষা, ভাবনা, নির্মাণ ও মানবজীবনের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর। সময়ের পরিবর্তন সাহিত্যের জন্য নতুন বিষয় নিয়ে আসবে, নতুন পাঠক তৈরি করবে আবার নতুন ভাষারও জন্ম দেবে। সেই পরিবর্তনকে গ্রহণ করেও লেখাকে মানুষের গভীর অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত রাখতে হবে। কারণ সাহিত্য যে শুধু সময়ের প্রতিচ্ছবি নয়। অনেক সময় সাহিত্য সময়কে প্রশ্নও করে, একথা ভুললে চলবে কী করে? মানুষকে শুধু ভোক্তা হিসেবে দেখার যে প্রবণতা বর্তমান সমাজে ক্রমশ-ই বাড়ছে, সাহিত্য তার বিপরীতে মানুষের সৃষ্টিশীল সত্তাকে সামনে নিয়ে আসে। একজন পাঠক কোনও বই পড়ার সময় শুধু তথ্য গ্রহণ করেন না তিনি কল্পনা করেন, অনুভব করেন, বিচার করেন আবার নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন একটি জগতের সম্পর্ক তৈরি করেন। এই জায়গাটিই সাহিত্যের সবচেয়ে বড় শক্তি। দ্রুত সময়ের যুগে সাহিত্যের প্রয়োজন মানুষের স্থিরতার জন্য। কেবল তা-ই নয়, সাহিত্য প্রয়োজন গভীরে যাওয়ার জন্যও। প্রয়োজন এমন কিছু প্রশ্নের সামনে দাঁড়ানোর জন্য, যার উত্তর কোনও কয়েক সেকেন্ডের স্মার্ট ফোনের স্ক্রিনে পাওয়া সম্ভব নয়। সময় বদলাবে, ভাষার রূপ পাল্টাবে, পাঠের মাধ্যমও নতুন হবে। কিন্তু মানুষের নিজের সঙ্গে ও অন্য মানুষের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক স্থাপনের প্রয়োজন যতদিন থাকবে, সাহিত্যও ততদিন তার জায়গা ধরে রাখবে।🍁
🍂মহামিলনের কথা
মান্ত্র, পার্থিব, আগ্নেয়, বায়ব্য, দিব্য, বারুণ, মানস এই সপ্তবিধ স্নানের কথা শাস্ত্রে আছে। ওঁ শন্ন আপঃ মন্ত্রপাঠ মান্ত্র, মৃত্তিকা লেপন পার্থিব, বিভূতি লেপন আগ্নেয়, গোরজঃ কৃত স্নান বায়ব্য, রৌদ্রে যে বৃষ্টি হয় তাহাতে স্নান দিব্য, নদ্যাদিতে স্নান বারুণ, মনের দ্বারা বিষ্ণুর ধ্যান তাহা মানস স্নান বলিয়া কীর্ত্তিত হয়। শরীর অসুস্থ থাকলে মান্ত্র স্নানাদি করিয়া নিত্যকর্ম্ম করা যাইতে পারে।
শ্রীশ্রীতুলসীমহিমামৃত
শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ
গুরু৷ শ্রীমতী তুলসীর সুগন্ধ, বিমল, অখণ্ডপত্র দ্বারা যে মানব একবার আমার পূজা করে, যমরাজ বিশেষ প্রণিধানপূর্ব্বক দেখিয়া লিখিত পাপবিবরণী হইতে তাহার নাম মুছিয়া ফেলেন। যাহারা একাদশী দিনে আমার পূজার জন্য তুলসী আনয়ন না করে, তাহাদের যৌবন, জীবন, অর্থ ও সম্পত্তি সকলেই ধিক্ এবং কি ইহ কি পর কোন কালেই সুখলাভ হয় না।
গয়াশ্রাদ্ধ করিলে শ্রাদ্ধকর্ত্তার পিতৃগণ পরিতুষ্ট হন, মহাদেবকে তুলসীপত্র দান করিলে তাহার শতগুণ ফল হয়। স্নান না করিয়া তুলসী-চয়ন করত পূজা করিলে পূজক অপরাধী হয়, তাহার সমস্ত নিষ্ফল হয়।

শিষ্য। শরীর অসুস্থ থাকিলে যদি অবগাহন স্নান না করিতে পারে তাহা হইলে কি করিবে।
গুরু। মান্ত্র, পার্থিব, আগ্নেয়, বায়ব্য, দিব্য, বারুণ, মানস এই সপ্তবিধ স্নানের কথা শাস্ত্রে আছে। ওঁ শন্ন আপঃ মন্ত্রপাঠ মান্ত্র, মৃত্তিকা লেপন পার্থিব, বিভূতি লেপন আগ্নেয়, গোরজঃ কৃত স্নান বায়ব্য, রৌদ্রে যে বৃষ্টি হয় তাহাতে স্নান দিব্য, নদ্যাদিতে স্নান বারুণ, মনের দ্বারা বিষ্ণুর ধ্যান তাহা মানস স্নান বলিয়া কীর্ত্তিত হয়। শরীর অসুস্থ থাকলে মান্ত্র স্নানাদি করিয়া নিত্যকর্ম্ম করা যাইতে পারে।
শিষ্য। তুলসীর ভজন কয় প্রকার?
গুরু। নয় প্রকার। দর্শন, স্পর্শন, ধ্যান, কীর্ত্তন, রোপণ, প্রণাম, তুলসী নাম বা মাহাত্ম্য শ্রবণ, সেবন, পুষ্পাদির দ্বারা পূজা, এই নবধা তুলসীর ভজন যিনি করেন, কোটি যুগ সহস্র হরির পরমপদে অবস্থান করিয়া থাকেন।
🍁শ্রীশ্রীতুলসীমহিমামৃত | শ্রীওঙ্কারনাথ রচনাবলী
🍂ফিরেপড়া | কবিতা
উৎপলকুমার বসু -এর একটি কবিতা

ক্ষয়
বকুল, তোমাকে শুধু ঈর্ষা করি, কতো না সহজে
তুমি তার মত্ত কেশে ডুবে যাও অনির্বাণ,
তোমার অতীতে নেই প্রবচন, ছায়া, শান্তি, গ্রন্থের বীজাণু,
আমার অনন্ত রক্ত ঝরে যায় অগ্নির সমাজে।
কেননা ফসল কাটা শেষ হলে এত বেশি অবিচ্ছিন্ন খড়
মানুষ টানেনি যেন, আমিও দেখেনি যেন
কোনো কেশে এ-হেন সম্পদ।
🍂সাময়িকী
শঙ্খ ঘোষের কাছে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক সাহিত্যিক কেন্দ্র। কিন্তু সেই সম্পর্ক নিছকই ভক্তির ছিল না। তিনি রবীন্দ্রনাথকে পড়েছেন, বিশ্লেষণ করেছেন, প্রশ্ন করেছেন আর তাঁর সাহিত্যিক নির্মাণের ভেতরকার রহস্য অনুসন্ধান করেছেন। ফলে রবীন্দ্রচর্চায় তাঁর অবস্থান ছিল একই সঙ্গে শ্রদ্ধাশীল ও অনুসন্ধিৎসু।
পবিত্র সরকার -এর চোখে শঙ্খ ঘোষ

তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায়
শঙ্খ ঘোষকে নিয়ে বাংলা ভাষায় যত আলোচনা হয়েছে, তার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তাঁর কবিতা, রবীন্দ্রচর্চা, অধ্যাপনা কিংবা তাঁর সামাজিক অবস্থান। কিন্তু ‘কালি ও কলম’ -এ পবিত্র সরকার -এর লেখা ‘শঙ্খ ঘোষ, স্রষ্টা ও সামাজিক’ পাঠ করলে শঙ্খ ঘোষের আরও একটি পরিচয় সামনে আসে। সেখানে শঙ্খ ঘোষ শুধু একজন খ্যাতিমান কবিই নন, দীর্ঘ সহাবস্থান, সহকর্মিতা, বন্ধুত্ব, সাহিত্যচর্চা ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের ভিতর দিয়ে ধরা দেওয়া একজন নিপাট মানুষ। পবিত্র সরকারের চোখে শঙ্খ ঘোষকে তাই শুধু তাঁর প্রকাশিত বই দিয়ে বোঝা যায় না। তাঁকে বুঝতে হয় ওঁর নীরবতা, সংযম, প্রশ্ন করার ধরন, তরুণদের পাশে দাঁড়ানোর অভ্যাস, ভাষার প্রতি যত্ন ও সামাজিক সঙ্কটে মানুষের পাশে থাকার মধ্য দিয়ে। এই দৃষ্টিতে শঙ্খ ঘোষের জীবন যেন কবিতার বাইরে লেখা একটি গদ্য।
শঙ্খ ঘোষ অনেক সময় সরাসরি সিদ্ধান্ত ঘোষণা না করে প্রশ্নের আকারে নিজের বক্তব্য সাজাতেন। পাঠকের সামনে একটি প্রশ্ন রেখে কবি যেন তাকে নিজেই সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ দিতেন। রবীন্দ্রনাথের ছন্দচিন্তা নিয়ে তাঁর প্রশ্নমুখর মন্তব্যের ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতি দেখা যায়। পবিত্র সরকার ব্যক্তিগত স্মৃতিতে জানিয়েছেন, তাঁরা কখনও কখনও শঙ্খ ঘোষকে বলতেন, সরাসরি কথা না বলে পাঠকের ওপর সিদ্ধান্তের দায়িত্ব কেন ছেড়ে দেন? শঙ্খ ঘোষের মৃদু হাসিই যেন তার উত্তর হয়ে থাকত! এই ‘মৃদু হাসি’ আসলে পবিত্র সরকারের স্মৃতিতে শঙ্খ ঘোষের ব্যক্তিত্বের একটি বড় চিহ্ন।
পবিত্র সরকারের লেখার শুরুতেই যে ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তা হল ‘পাবলিক ইন্টেলেক্চুয়াল’। অর্থাৎ এমন এক বুদ্ধিজীবী, যিনি নিজের লেখার জগতে আবদ্ধ থাকেন না, সমাজের নানা প্রশ্নে নিজের বিবেক অনুযায়ী অবস্থান নেন। শঙ্খ ঘোষকে পবিত্র সরকার এই পরিসরেই দেখতে চেয়েছেন। তাঁর মতে, শঙ্খ ঘোষের পরিচয় শুধু কবি বললে তাঁর ব্যাপ্তি কমিয়ে দেখা হয়। কারণ তাঁর প্রতিবাদ শুধু কবিতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। গদ্যে, স্বাক্ষরে, সভায়, মিছিলে বিভিন্নভাবে তিনি নিজের সামাজিক অবস্থান প্রকাশ করেছেন। এখানেই পবিত্র সরকারের চোখে শঙ্খ ঘোষের বিশেষত্ব তৈরি হয়। তিনি দেখেছেন, শঙ্খ ঘোষ সংগঠিত রাজনীতির নিয়মিত কর্মী ছিলেন না, কিন্তু রাজনীতি ও সমাজের প্রশ্ন থেকে নিজেকে সরিয়েও রাখেননি। মানুষের ওপর অন্যায়, হিংসা, বঞ্চনা কিংবা সামাজিক সঙ্কট তাঁকে নাড়া দিয়েছে। ফলে তাঁর কবিতার ভিতর দিয়ে যে মানুষ কথা বলেছেন, তিনি চারপাশের পৃথিবী সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন না। ব্যক্তিগত অনুভূতির সঙ্গে সামাজিক বাস্তবতার যোগ তৈরি করাই শঙ্খ ঘোষ-এর কবিতার অন্যতম শক্তি হয়ে উঠেছিল।
পবিত্র সরকার দীর্ঘ সময় শঙ্খ ঘোষকে কাছ থেকে দেখেছেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রায় পঁচিশ বছর একই পরিসরে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল। ফলে তাঁর লেখা দূর থেকে কোনও সাহিত্যিক মূল্যায়ন করা না। সেখানে রয়েছে একজন সহকর্মীর পর্যবেক্ষণ। শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক শঙ্খ ঘোষ, আড্ডার শঙ্খ ঘোষ, তরুণ কবিদের আশ্রয় দেওয়া শঙ্খ ঘোষ, ভাষা নিয়ে চিন্তিত শঙ্খ ঘোষ, মিছিলের শঙ্খ ঘোষ ও নিজের লেখার বানান পর্যন্ত নিখুঁত রাখার ব্যাপারে সতর্ক শঙ্খ ঘোষ! এসমস্ত নিয়ে পবিত্র সরকারের স্মৃতিতে মানুষটি বহুস্তরীয়। এই কারণেই পবিত্র সরকারের লেখায় শঙ্খ ঘোষের কবি-পরিচয় একেবারে প্রথমে থাকলেও সেটিই শেষ কথা হয়ে ওঠে না। বাংলা কবিতায় তাঁর অবস্থান যে অসাধারণ, সে বিষয়ে লেখকের বক্তব্য দৃঢ়। তাঁর কবিতার সংখ্যা, দীর্ঘ সাহিত্যজীবন ও পাঠকের মধ্যে বিস্তৃত গ্রহণযোগ্যতা এই সবই সেই মূল্যায়নের ভিত্তি। কিন্তু পবিত্র সরকারের দৃষ্টিতে শঙ্খ ঘোষের আসল স্বাতন্ত্র্য তাঁর কবিতার ভাষা ও নির্মাণে। তিনি এমন এক সময় কবিতায় প্রবেশ করেছিলেন, যখন বাংলা কবিতা একদিকে ব্যক্তিগত অনুভূতির দিকে এগোচ্ছে, অন্যদিকে সমাজ ও রাজনীতির অভিঘাতও গ্রহণ করছে। শঙ্খ ঘোষ সেই দুই ক্ষেত্রের মধ্যে নিজের একটি পৃথক পথ তৈরি করেছিলেন। আসলে পবিত্র সরকার যে শঙ্খ ঘোষকে দেখেছেন, তিনি ভাষার কারিগরও। ছন্দের নানা রীতি, গদ্যছন্দ, অন্ত্যমিল, অন্তর্মিল, স্তবক বিন্যাস সহ কবিতার নির্মাণের নানা উপাদান শঙ্খ ঘোষ-এর হাতে আলাদা মাত্রা পেয়েছে। কিন্তু সেই কারিগরি কখনও কবিতার প্রাণকে ঢেকে দেয়নি। ব্যক্তিগত অনুভব ও সামাজিক চেতনার সঙ্গে মিশে ভাষার সৌন্দর্য তৈরি করেছে। পবিত্র সরকারের আলোচনায় শঙ্খ ঘোষের এই দিকটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁর মতে কবির স্বাতন্ত্র্যের অন্যতম ভিত্তি ছিল এই শিল্পনির্মাণের ক্ষমতা।
পবিত্র সরকারের দৃষ্টিতে শঙ্খ ঘোষকে বুঝতে গেলে শুধু তাঁর কবিতার সৌন্দর্যের দিকে তাকালে চলবে না। কারণ শঙ্খ ঘোষের কবিতার ভিতরেই সমাজের অস্থিরতা ঢুকে পড়েছিল। ব্যক্তিমানুষের প্রেম বা একাকিত্বের পাশাপাশি সেখানে এসেছে বঞ্চিত মানুষ, রাজনৈতিক হিংসা, মৃত্যুর অভিঘাত, স্বাধীনতার পরও মানুষের অপূর্ণ প্রাপ্তির প্রশ্ন। তাঁর প্রতিবাদ উচ্চকণ্ঠ ছিল না। অনেক সময় একটি ব্যঙ্গাত্মক বাক্য, একটি সংযত প্রশ্ন কিংবা কয়েকটি বেদনাময় শব্দের মধ্য দিয়েই তিনি সময়কে প্রশ্ন করেছেন। পবিত্র সরকার বিশেষভাবে মনে করিয়ে দেন, শঙ্খ ঘোষের প্রতিবাদকে তাঁর কবিতা থেকে আলাদা করা যায় না। জরুরি অবস্থার সময় তাঁর লেখায় যে তীব্র রাজনৈতিক ব্যঙ্গ দেখা গিয়েছিল, তা তাঁর সামাজিক অবস্থানেরই অংশ। কলকাতার রাজপথে কবির উপস্থিতিও সেই অবস্থানের সাক্ষ্য বহন করে। অর্থাৎ তিনি যে কথাগুলি লিখেছেন, প্রয়োজনের সময়ে সেই কথার পাশে দাঁড়িয়েছেনও। এখানেই কবি ও সামাজিক মানুষের মধ্যে অবশ্যই একটি সেতু তৈরি হয়েছে। শঙ্খ ঘোষের কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ছিল মানুষের ঐক্য। পবিত্র সরকারের আলোচনায় এই দিকটি বিশেষভাবে উঠে আসে। নানা ভাষা, দেশ ও সংস্কৃতির মধ্যে বিভাজন থাকলেও মানুষের মৌলিক অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি সংযোগ রয়েছে, শঙ্খ ঘোষের সাহিত্যিক অনুসন্ধান যেন সেই জায়গাটিকেই বারবার খুঁজেছে। তাঁর পাঠের বিস্তৃতি তাই কেবল বাংলা বা ভারতীয় সাহিত্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ভারতীয় ঐতিহ্য থেকে আন্তর্জাতিক ইতিহাস ও সংস্কৃতির নানা পরিসরে তাঁর আগ্রহ বিস্তৃত হয়েছিল।
পবিত্র সরকার তাঁর লেখায় দেখান, এই অনুসন্ধিৎসু মানুষটির আর একটি পরিচয় ছিল গবেষক। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য নিয়ে তাঁর দীর্ঘ কাজ, বাংলা ছন্দ নিয়ে ভাবনা, কাব্যতত্ত্ব নিয়ে অনুসন্ধান, এসবের মধ্যে তাঁর পাঠের গভীরতা ধরা পড়ে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, গবেষণার ভাষাও তাঁর হাতে একেবারে শুষ্ক হয়ে যায়নি। পবিত্র সরকার দেখিয়েছেন, শঙ্খ ঘোষের গদ্যে গবেষণার বিষয়ও পাঠকের কাছে জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে। তথ্য, স্মৃতি, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও প্রশ্ন তাঁর গদ্য একটি নিজস্ব স্বর তৈরি করেছে। শঙ্খ ঘোষের গদ্যের প্রতি পবিত্র সরকারের আকর্ষণের জায়গাটি আরও সূক্ষ্ম। তিনি লক্ষ্য করেছেন, শঙ্খ ঘোষ অনেক সময় সরাসরি সিদ্ধান্ত ঘোষণা না করে প্রশ্নের আকারে নিজের বক্তব্য সাজাতেন। পাঠকের সামনে একটি প্রশ্ন রেখে কবি যেন তাকে নিজেই সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ দিতেন। রবীন্দ্রনাথের ছন্দচিন্তা নিয়ে তাঁর প্রশ্নমুখর মন্তব্যের ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতি দেখা যায়। পবিত্র সরকার ব্যক্তিগত স্মৃতিতে জানিয়েছেন, তাঁরা কখনও কখনও শঙ্খ ঘোষকে বলতেন, সরাসরি কথা না বলে পাঠকের ওপর সিদ্ধান্তের দায়িত্ব কেন ছেড়ে দেন? শঙ্খ ঘোষের মৃদু হাসিই যেন তার উত্তর হয়ে থাকত! এই ‘মৃদু হাসি’ আসলে পবিত্র সরকারের স্মৃতিতে শঙ্খ ঘোষের ব্যক্তিত্বের একটি বড় চিহ্ন। তিনি ছিলেন স্বল্পভাষী, সংযত ও আত্মপ্রচারে অনাগ্রহী। কিন্তু নীরবতা তাঁর দুরত্ব তৈরি করেনি। বহু মানুষ তাঁর কাছে নিজেদের কথা বলতে পারতেন। ছাত্রছাত্রী, সহকর্মী, তরুণ কবি, পরিচিত-অপরিচিত অনেকের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন নির্ভর করার মতো একজন মানুষ। পবিত্র সরকারের লেখায় এই শঙ্খ ঘোষের ব্যক্তিগত ছবি অত্যন্ত মানবিক। এখানে পুরস্কারপ্রাপ্ত কবির চেয়ে বড় হয়ে ওঠে এমন একজন মানুষ, যার দরজায় এসে কেউ নিজের কথা অনায়াসে বলতে পারেন।
তরুণ কবিদের সঙ্গে কবি শঙ্খ ঘোষ-এর সম্পর্ক এই মানবিকতার আরও একটি দৃষ্টান্ত। তাঁর বাড়িতে নিয়মিত কবিদের আড্ডা বসত। সেখানে নতুন প্রজন্মের কবিরা আসতেন, কথা বলতেন, নিজেদের লেখা নিয়ে আলোচনা করতেন। শুধু তা-ই নয়, অপ্রস্তুত সময়েও কেউ দরজায় এসে ‘একটু কফি খেতে এলাম, শঙ্খদা’ বললে তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়ার অভ্যাস তাঁর ছিল না। পবিত্র সরকারের লেখায় এই ঘটনাগুলি শঙ্খ ঘোষকে একজন বড় কবির পাশাপাশি একজন সহজলভ্য অগ্রজ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত। শঙ্খ ঘোষের এই আশ্রয়দাতা চরিত্রের সঙ্গে তাঁর খ্যাতির একটি বৈপরীত্য ছিল। তিনি যত বড় হয়েছেন, ততই নিজেকে সামনে আনার প্রবণতা কমেছে। ক্যামেরা এড়িয়ে চলেছেন, নিজের জীবন নিয়ে প্রচার পছন্দ করেননি, তথ্যচিত্রে নিজের উপস্থিতি নিয়েও ছিলেন অনাগ্রহী। অথচ একই মানুষকে দেখা গিয়েছে জনতার মিছিলে হাঁটতে। এই বৈপরীত্য পবিত্র সরকারের দৃষ্টিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ব্যক্তিগত প্রচারে অনাগ্রহী মানুষটি সামাজিক অন্যায়ের প্রশ্নে নীরব থাকেননি।
পবিত্র সরকার তাঁর স্মৃতিতে লেখেন, শঙ্খ ঘোষের শিক্ষকসত্তাও আলাদা জায়গা দখল করে আছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ সহকর্মীর অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দেখেছেন, কীভাবে শঙ্খ ঘোষ শ্রেণিকক্ষে জটিল সাহিত্যিক বিষয়কে সহজভাবে ব্যাখ্যা করতেন। তাঁর বক্তৃতায় উচ্চকণ্ঠতা ছিল না, কিন্তু বক্তব্যের ভিতরে ছিল দৃঢ়তা। কবিতা আবৃত্তির ক্ষেত্রেও তাঁর কণ্ঠের নিজস্ব আকর্ষণ ছিল। ফলে শিক্ষকতা, বক্তৃতা ও আবৃত্তি, তিন ক্ষেত্রেই তাঁর ভাষাবোধ কাজ করত। বাংলা ভাষা নিয়ে শঙ্খ ঘোষের আগ্রহও পবিত্র সরকারের লেখায় বিশেষভাবে জায়গা পেয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির সঙ্গে তাঁর যুক্ত থাকা, পরিভাষা, বানান, লিপি ও অভিধান নির্মাণের কাজে অংশ নেওয়া ও রবীন্দ্র রচনাবলি সম্পাদনার ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন এসব তাঁর ভাষাচেতনার ব্যাপ্তি দেখায়। নিজের লেখার মুদ্রণ নিয়েও তাঁর যত্ন ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম। কোথায় হাইফেন থাকবে, কোন বানান কীভাবে ছাপা হবে এই ছোটখাটো বিষয়ও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
পবিত্র সরকার তাঁর লেখায় শঙ্খ ঘোষের যে ছবি স্পষ্ট করে তুলেছেন, তা নিছকই একটি বিশেষ ছবি না। তিনি একই সঙ্গে শিল্পী ও ভাষা নিয়ে কাজ করা একজন মননশীল মানুষ। তাঁর কাছে শব্দ কবিতার শ্যধু উপকরণ না, শব্দের গঠন, বানান, ছন্দ, উচ্চারণ ও ব্যবহারও সংস্কৃতিরই অংশ। এই কারণে ভাষা নিয়ে তাঁর যত্নকে তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গেও পবিত্র সরকারের পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। শঙ্খ ঘোষের কাছে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক সাহিত্যিক কেন্দ্র। কিন্তু সেই সম্পর্ক নিছকই ভক্তির ছিল না। তিনি রবীন্দ্রনাথকে পড়েছেন, বিশ্লেষণ করেছেন, প্রশ্ন করেছেন আর তাঁর সাহিত্যিক নির্মাণের ভেতরকার রহস্য অনুসন্ধান করেছেন। ফলে রবীন্দ্রচর্চায় তাঁর অবস্থান ছিল একই সঙ্গে শ্রদ্ধাশীল ও অনুসন্ধিৎসু। জীবনের শেষ পর্বেও পবিত্র সরকারের চোখে শঙ্খ ঘোষের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তাঁর কাজের সঙ্গে সম্পর্ক। শরীর দুর্বল হয়ে গেলেও সাহিত্যিক কৌতূহল থামেনি। পুরোনো লেখা, গবেষণার উপকরণ, স্মৃতি কোনও কিছু নিয়েই তাঁর আগ্রহ শেষ হয়ে যায়নি। এমনকী বিদায়ের সময়ও অতিথিকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেওয়ার অভ্যাস বজায় ছিল। পবিত্র সরকারের স্মৃতিতে এই দৃশ্যটি নিছক ব্যক্তিগত স্মৃতি না। এটি শঙ্খ ঘোষের স্বভাবের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে। শরীর যতই দুর্বল হোক, মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের দায়িত্ব থেকে তিনি সরে যাননি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, পবিত্র সরকার শঙ্খ ঘোষকে দূর থেকে তৈরি কোনও স্মারকচিত্রে বর্ণিত করেননি। তাঁর লেখায় কবির সঙ্গে মানুষের দূরত্ব বারবার ভেঙে যায়। সেখানে বড় কবির পাশে দেখা যায় এমন একজন মানুষকে, যিনি সহকর্মীদের সঙ্গে আড্ডা দিয়েছেন, ছাত্রদের পড়িয়েছেন, তরুণ কবিদের বাড়িতে ডেকেছেন, বন্ধুর কথা শুনেছেন, ভাষার বানান নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন ও প্রয়োজনের সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ফলে ‘শঙ্খ ঘোষ’ নামটি সেখানে একটি সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি একটি ব্যক্তিগত সম্পর্কেরও নাম।
এই দৃষ্টিতে পবিত্র সরকারের লেখা আসলে শঙ্খ ঘোষের মৃত্যুর পর একটি স্মরণলেখা হলেও তার পরিসর স্মৃতিচারণের চেয়ে অনেক বড়। এটি একজন স্রষ্টাকে তাঁর কাজের ভিতর দিয়ে ও একজন মানুষকে তাঁর সম্পর্কের ভিতর দিয়ে দেখার চেষ্টা। পবিত্র সরকার দেখা শঙ্খ ঘোষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ত এখানেই। তিনি যত বড় কবি হয়েছেন, তত বড় দূরত্ব তৈরি করেননি। তাঁর চারপাশে থাকা মানুষদের জন্য একটি জায়গাও তৈরি করেছেন। শঙ্খ ঘোষের কবিতার পঙ্ক্তি ভবিষ্যৎ পাঠকের কাছে পৌঁছবে, তাঁর গবেষণামূলক গদ্য নতুন পাঠের জন্ম দেবে, তাঁর রবীন্দ্রচর্চা আলোচনায় থাকবে, তাঁর ভাষাবিষয়ক কাজ বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে জায়গা করে থাকবে। কিন্তু পবিত্র সরকারের লেখায় যে শঙ্খ ঘোষকে পাওয়া যায়, তাঁর উত্তরাধিকার আরও ব্যক্তিগত একজন বড় মানুষ কীভাবে বড় হয়েও অন্য মানুষের জন্য দরজা খোলা রাখতে পারেন, কীভাবে নিজের খ্যাতিকে আড়ালে রেখে সাহিত্য ও সমাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন, তার একটি জীবন্ত চিত্র। তাই বলাই যায় যে, একজন কবির দৃষ্টিতে ‘শঙ্খ ঘোষ’ বলতে শুধু একজন কবির সাহিত্যিক মূল্যায়ন বোঝায় না। এটি একজন কবিকে তাঁর সবচেয়ে মানবিক জায়গায় ফিরে দেখা। সেখানে শঙ্খ ঘোষ কখনও অগ্রগণ্য কবি, কখনও গবেষক, কখনো অধ্যাপক, কখনও ভাষাকর্মী, কখনও প্রতিবাদী নাগরিক, আবার কখনও এক কাপ চায়ের পাশে বসে থাকা আপনজন। পবিত্র সরকারের সহকর্মী ও ব্যক্তিগত স্মৃতির মধ্য দিয়ে এই বহুস্তরীয় শঙ্খ ঘোষই পাঠকের সামনে এসে দাঁড়ান। আর সেই কারণেই তাঁর লেখা শঙ্খ ঘোষকে শুধু বাংলা কবিতার ইতিহাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ নাম হিসেবে না, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা বিরল স্রষ্টা হিসেবেও পড়ার সুযোগ করে দেয়। 🍁
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হয়েছে সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।
হারিয়ে যাওয়া নারীর
ইতিকথা
মমতা রায়চৌধুরী
৩১.
জীবন পথে চলতে চলতে কত অভিজ্ঞতাই না হয় হারিয়ে যাওয়া ক্ষতগুলো আবার যেন নতুন করে মনের ভেতরে এমন ক্ষত তৈরি করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার মতো তার থেকে কখনওই বেরিয়ে আসা যায় না। অক্টোপাসের মত জড়িয়ে ধরে। তিথি ইদানিং একটা লেখায় হাত পাকাচ্ছে। কী আশ্চর্য সেখানে যে বিষয়টা নিয়ে লিখতে যাচ্ছে সেখানেও জড়িয়ে রয়েছে হাজারও ক্ষত চিহ্ন। উদ্বাস্তু নারীদের জীবন কথা এখানে উদ্বাস্তু বলতে যে নারীদের জীবনে ফুল ফল সমৃদ্ধ হয়ে ওঠার সময় সেই ফুল অকালে ঝরে যায় কোন গলির অন্ধকার কোণায়। যদিও রাত্রি নেমে আসলে আলোর ঝলকানি রংচং মেখে নেচে গেয়ে কাস্টমারদের মাতিয়ে রাখা সেখানে কখনও-ই তার সেই দুঃখটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে না। ভবিতব্যের চোরাবালিতে দুঃখ বাক্সবন্দী থাকে, সকালে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে আবার নাড়াচাড়া দিয়ে ওঠে। সেই সঙ্গে তিথির মনের ভেতরেও তাদের কথা লিখতে গিয়ে কোথায় যেন তার পেশাগত জীবনে একরাশ অসত্যতা, অন্যায়, অবিচার মানবিকতার ক্ষয় হতে দেখে, এই ক্ষয় যেন বোধের ভিতরে গিয়ে আঘাত করে। কখনও দেখে যারা এই সমাজ গড়ার কারিগর শিক্ষকদেরকেই ভূলুণ্ঠিত হতে আবার কখনও দেখা যায় দেখা যায় শিক্ষার আলো জ্বালতে আসা এই মহান পেশায় আগত শিক্ষকদের অমানবিকতার এক চূড়ান্ত দিক। এই মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় প্রকাশ পেল তিথির বিদ্যালয় -এর পাশের বিদ্যালয়ে। শিক্ষার্থীদের স্কুলের শতবর্ষ উপলক্ষ্যে তাঁদের সামর্থের উর্ধ্বে গিয়ে চাঁদা নেওয়া এবং সেটা যদি হয় সেই শিক্ষার্থীদের মার্কশিটের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে চাঁদা দেওয়ার সম্পর্ক। চাঁদা দাও মার্কশিট নাও। কী চরম অমানবিক ভাবতেও অবাক লাগে।
–কী জিনিস থেকে সাড়া দিল ঠিক আছে দিচ্ছি।
—তারপর কি হল মাসি?
চা করতে করতে বলল।
এক কাস্টমার ওকে দেখে পাগল কিন্তু ও তো ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়! ছেলেটি প্রায়ই আসে আর লতাকেই ও-চায়।
—তা তোমার মাসি জানে না।
—না না প্রথম প্রথম বুঝতে পারেনি মাসি।
—দিয়ে তারপর?

এরকম ঘটনা নাকি ঘটেছে যদি ঘটনাটি সত্যিই হয় তাহলে বিবেকবোধের কাছে মাথা নত হয়। বিকেলের ম্লান আলোয় নিজেকে যেন কখনো মনে হচ্ছে এই মানবিক বোধটুকু যেন এভাবে হারিয়ে না যায়, এদের মত করে অমানবিক যেন কখনও না হতে হয়। এই ভাবনার মাঝেই আঘাত করে কোন এক উচ্চ স্বর। ‘মামা, মাম, মাম’ তীব্রভাবে আঘাত করে এভাবে চিৎকার কেন করছে বুবুন!
ছাদ থেকে তিথি দ্রুত নামতে থাকে সিঁড়ি দিয়ে। হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলে, কী হয়েছে বাবা?
—‘মাম’ মাম’…
বলতে বলতেই হাঁপাচ্ছে ছেলেটা। সঙ্গে পুচু ও যেন কেমন অস্থির হয়ে উঠেছে।
—হ্যাঁ বলো বাবা, চোখে জল কেন?
ও হাত দিয়ে রান্নাঘরের দিকে দেখায়।
তিথি দ্রুত ছুটতে থাকে রান্নাঘরের দিকে। গিয়ে দেখে কাগুজি মাসি পড়ে আছে।
—কী হয়েছে?
—ও বৌমা একি হয় কপালটা কেটে গেছে তো?
—কী করে পড়ে গেলে?
ও মাসি তোমার এখন বয়স হয়েছে একটু দেখে শুনে চলো।
বুঝেছি এইতো বাসন ছড়িয়ে পড়ে আছে তুমি বাসনগুলো একসাথে নিয়ে আসতে গিয়েছিলে?
তিথি মাসিকে ধরে তোলে আর বলে, সাবধানে আমাকে ধরো।
—হ্যাঁ গো বৌমা।
—কতদিন বলেছি মাসি একসাথে অত বাসনে এনো না তুমি তো আমার কথা শুনবে না, এই যে এখন লাগল কী হবে এখন?
—কিছু হবে না বৌমা।
—দাঁড়াও দেখি…
তিথি তুলো নিয়ে আসে। বেটাডাইন লাগিয়ে দেয়।
—আচ্ছা শোনো তোমাদের ছেলে বাজার থেকে আসছে তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে।
—না না আমাকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে না একটুখানি কেটেছে।
—না মাসি একবার ডাক্তারের কাছে যাও অন্তত টিটেনাস তো নিতে হবে।
ইতিমধ্যে বুবুন আর পুচু চলে এসেছে।
—মাম মাম, মাসি দিদা ঠিক হয়ে গেছে?
কাগজে মাসি বুবুনকে জড়িয়ে ধরে বলে,
—হ্যাঁ বাবা।
পুচু ও কাগুজে মাসিকে এসে আদর করতে লাগল।
—ও বৌমা, বৌমাআআআআ…
—দেখো তোমার শাশুড়ি মা ডাকছে।
—কী বলছেন?
নিচ থেকে সাড়া দিল তিথি।
—ও বৌমা, এক কাপ চা দেবে আমায়?
—আচ্ছা দিচ্ছি।
এই দেখো, তুমি বাসনটা নিলে—
—কেন আমি মাজব।
—তুমি আগে সুস্থ হও।
—তুমি ক্ষেপি আছো! এই দেখো আমি পুরো ফিট।
বেশ তুমি ফিট বসো আমি রান্না করতে করতে লতা মাসির আরও কিছু কাহিনি শুনে নিই লিখতে হবে তো আমাকে।
—আচ্ছা বেশ। তোমার ছেলেটা কী মায়াবী।
—আর বলো না মাসি, ডিজিটাল যুগে এসে সব সময় ভয় ও যেন মানুষের মতো মানুষ হতে পারে, চারিদিকে যা মানবিকতার অবক্ষয় দেখছি!
—কী অবক্ষয়?
—আরে মানুষের ভাবনা চিন্তাগুলো কেমন পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে! মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে না সেটাই বলছিলাম।
—না গো তোমার ছেলে দেখবে অন্যরকম হবে দেখো। আমি পড়ে যাবার পরও কেমন ভয় পেয়ে গেছে আবার চিৎকার করে ডাকল তোমায়।
—হ্যাঁ গো মাসি, ভগবানের কাছে প্রার্থণা করো যেন এরকম থাকে মানুষ হয়ে যেন মানুষের পাশে থাকতে পারে।
—সে তো অবশ্যই।
—হ্যাঁ কি বলছিলে যেন লতা মাসির কথা…
—তারপর আর কি লতার কাস্টমার! আসলে কাস্টমারকে লাল জলের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে কুপোকাত করে রেখে দিত।
—কী বলছ মাসি?
—হ্যাঁ গো, ওতো সবার পেটের কথা আমার কাছে বলেছে গো।
তারপর তারপর কি একদিন এমন এক কাস্টমার আসলো লতাকে দেখে প্রেমে পড়ে গেল।
—ওমা তাই নাকি?
—হ্যাঁ গো বৌমা।
—তাহলেও ওর দাদার কাছে আর যায়নি।
—না দাদার কাছে গেছিল। সে কাহিনি আছে বলছি শোনো না।
—মাসি তুমি একটু বসো আমি চট করে মাকে চা টা দিয়ে আসি।
—ওই দেখো ওইদিকে আবার কলিংবেল টিপছে, হরি হরায়ে নম কৃষ্ণ যাদবায় নমঃ যাদবায় কৃষ্ণবায় মাধবায় নমঃ।
—বোধহয় ছেলে আসলো।
—হ্যাঁ তাই হবে। মাকে আগে চাটা দিয়ে আসি তারপর গিয়ে দরজা খুলি।
—কিন্তু ছেলে তো রেগে যাবে।
তিথি ছুটতে শুরু করল, এত জোরে ছুটছে চা টা আবার না পড়ে যায়।
—মা এই নিন চা।
কল্যানী দেবী হাত বাড়িয়ে চাটা নেন। তিথি তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে,
—ও-বৌমা শোনো শোনো।
পরে এসে শুনছি কলিং বেল বাজছে। আপনার ছেলে এসেছে বোধ হয়।
—আরে একটা কথা শুনে যাও বলছি না, দাদুভাই চেঁচাচ্ছিল কেন?
তিথি আস্তে আস্তেই বলল,
—কাগুজি মাসে পড়ে গেছে সেই জন্য।
—সেকি! কীভাবে?
তিথি কোনও জবাব না দিয়ে চলে যায় দরজা খুলতে। পবিত্র একগুচ্ছ অভিযোগ তুলে বলল,
—কী করো বলো তো? কখন থেকে বেল টিপছি দু-দুটো ব্যাগ আছে হাতে ধরে রাখা যায়?
—আরে বাবা মাকে চা দিতে গেছিলাম, মা তো ছাড়ছেই না।
পবিত্র জুতোটা পাশে খুলে রেখে ব্যাগ দুটো নিয়ে রান্না ঘরের দিকে এগোয়।
—একি মাসি কপাল কাটল কী করে?
—আর বোলো না বাবা পড়ে গেছি।
—ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে তো।
—না না সেরকম কিছু হয়নি বৌমা ওষুধ লাগিয়ে দিয়েছে।
তিথি দরজা বন্ধ করে এসে বলে,
—হ্যাঁ, সে লাগিয়েছি তবে একটা টিটেনাস অন্তত দিতে হবে তো।
—আমি টিনুকে ফোন করে বলে দিচ্ছি ও-দিয়ে যাবে।
—ব্যথা করছে তো, ব্যথার ওষুধ খাবে?
—না।
তিথি বলে,
—ঠিক আছে মাসি যদি ব্যথার ওষুধ না খেতে চায় তাহলে রাত্রে আবার যদি জ্বর আসে দেখে একটা প্যারাসিটামল মাসিকে দিতে হবে।
—তুমি অফিস যাবে তো?
না আজকে অফিস যাব না।
—কেন গো?
—তুমি স্কুলে যাবে না?
—না মাসির এরকম অবস্থা! থাক, আজকে যাব না।
বুবুন বলল,
—মাম মাম আমিও যাব না।
—কোথায় যাবে না বাবা?
—স্কুলে?
—সেকি বাবা! তোমাকে বলেছি না, একটা গল্প শুনিয়েছিলাম না গোপাল ছেলেরা কী হয়?
মা বাবার কথা শোন।
—আর তুমি?
—মাম মাম আমিও শুনি।
—তাহলে আজকে কেন শুনছো না?
—মাম মাম আমি যেদিন স্কুলে যাই, তুমিও স্কুলে চলে যাও। আজকে তুমি বাড়িতে আছ আমি থাকি না মাম মাম।
কাগজি মাসি বলল, বৌমা ছেড়ে দাও না থাকতে চাইছে যখন আজকে থাক, স্কুলে যেতে হবে না।
—ঠিক আছে যাও।
—কি মজা… কি মজা… কি মজা…
—আমাকে এক কাপ চা দিও।
—কী জিনিস থেকে সাড়া দিল ঠিক আছে দিচ্ছি।
—তারপর কি হল মাসি?
চা করতে করতে বলল।
এক কাস্টমার ওকে দেখে পাগল কিন্তু ও তো ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়! ছেলেটি প্রায়ই আসে আর লতাকেই ও-চায়।
—তা তোমার মাসি জানে না।
—না না প্রথম প্রথম বুঝতে পারেনি মাসি।
—দিয়ে তারপর?
—কী গো, চা হল?
উপর থেকে হাঁক দিল পবিত্র।
—হ্যাঁ যাচ্ছি।
—বাপ রে চা না পেলে যেন বিশ্ব অন্ধকার হয়ে যায়। এই নাও চা।
—রাখো।
—শোনো, আজকে কিন্তু ইলিশ এনেছি, সঙ্গে কচুর শাক এনেছি।
—এ কচু শাকটা কে কাটবে বলো তো?
—কেন মাসি?
—মাসি কে আমি বলব আজকে?
—অন্যদিন করো।
তিথি গজগজ করতে করতে নিচে নামল।
—কিছুতেই গল্পটা আমার শোনাই হয়ে ওঠে না।
—দেখো না, মাসি কচুর শাক এনেছে।
—তা কি হয়েছে এনেছে? আমি কেটে দেব, তোমার অসুবিধে কী?
—আজকে তোমার এমনি লেগেছে, আমি বলতে পারি তোমাকে কাটার কথা বলো।
—আমি বলছি তো আমি পারব করতে, তুমি অত টেনশন করো না।
—ঠিক আছে…
তিথি ও একটু চা নিয়ে বসল।
—তারপর বলো মাসি…
—একদিন লতা আমাকে বলল, ছেলেটির কথা।
—তোমাকে?
—হ্যাঁ।
—তুমি কী বললে?
—আমি বললাম দেখ লতা, আমাদের জীবন তো এমনিই নরকের মত। বিশ্বাস হারালে তো হবে না আর একবার বিশ্বাস করেই দেখ, যদি তোর কপালে ঘর থাকে ঘর যদি করতে পারিস।
কথামতো লতা রাজি হয়ে যায়।🍁 (ক্রমশঃ)
🍂কবিতা
অশোক কুমার রায় -এর একটি কবিতা

ঘুম পাড়ানী
জেগে আছি জেগে সবাই
জেগে জেগে খেজুর গাছে ওঠা
সমুদ্র পার হতে হবে সারা জীবন সাঁতার শেখা।
মরীচিকার জাল ফেলেছে পথঘাট বাসা
জালকাটা এক দায়।
তবু নিদ্রাহীন চোখে জাল কাটতে হয়।
বিরামহীন বাতাস সেও তো নিঃশ্বাসে বিশ্বাসে।
কুটির থেকে অট্টালিকা স্বপ্ন দেখা
এভাবেই দেখতে দেখতে
কখন ঘুমিয়ে পড়ি? কারাই বা ঘুমিয়ে দেয়
জানে শুধু অন্তর্যামী।
মিতা নূর -এর একটি কবিতা

প্রথম প্রার্থনায় তুমি
তুমি পাশে নেই, তবু মনে হয় তুমি কাছেই আছ,
নীরবতায় নীরব কবি হয়ে।
শ্বাস নিতে আজ খুব কষ্ট হয়,
তবুও ভাবতে ভাল লাগে তোমাকে।
তোমাকে নিয়ে হাসলে…
লোকে ভাবে আমার মন ভাল, কিন্তু তারা কি জানে?
তোমাকে কখনও বলা হয়নি— ভালবাসি,
তবু তোমাকেই ভাবতে ভাল লাগে।
তোমার হাতটাও ছোঁয়া হয়নি কখনও,
তবুও কেন যেন…
সকালের প্রথম প্রার্থনায় তুমিই থাকো।
বরুণ সাহা -এর একটি কবিতা

কেউ জানে না
ঝড়ের মতন, মনের মতন,
দাপট তাদের কখন কেমন—
কেউ জানে না।
উড়িয়ে নিয়ে যাবে যখন,
কোথায় নিয়ে ফেলবে কখন—
কেউ জানে না।
ভালোবাসা, মায়া, মমতা,
কারোর হাতে নেই ক্ষমতা—
কেউ জানে না।
ধরে রাখা শাখা-প্রশাখা,
আজ আছে, কাল থাকা না-থাকা—
কেউ জানে না।
যখন যেমন, তখন তেমন,
সারমর্ম বুঝবে কখন—
কেউ জানে না।
বুঝতে বুঝতে সময় যখন
সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা তখন,
আর কখনো ভোর হবে না—
কেউ জানে না।
দীপঙ্কর মণ্ডল -এর একটি কবিতা

চোখ বুঁজে
চোখ বুঁজে থাকলে যেমন কোনও কিছু দেখার উপায় নেই তেমনি ঘুমিয়ে থাকলে স্বপ্ন ছাড়া আর কিছু আসার উপায় নেই… ছোট ছোট পিপীলিকার শুধু পিছন পিছন ছোটা… দাঁত থাকলে দাঁতের মর্ম না বোঝা… সাবধানে এক পা দু পা করে হেঁটে এসেছি বাস স্ট্যাণ্ড চার মাথার মোড়ে পানের দোকানে ভিড়…
কারো হাতে পানের বোটায় চুন…
চুন কালি তো অনেক আগেই মেখেছি… খেয়েছি লজ্জার মাথা… এবার শুধু পার্লারে যাওয়া বাকি…
বাকি শেষটা দেখার… আর বাসটা যখন আসবে… তখন ভিড়ের সাথে মিশে যাওয়া…
সৌমিত্র পালিত -এর একটি কবিতা

শেষ চিঠি
অভিনয় দক্ষ মানুষ শোনো
এখন শুয়েছি, এবার ঘুমব।
এইঘুম আর ভাঙবে না কখনও।
আমার দেহের একটি জন্মের সমাপ্তি হবে।
এবার বাগানে বাগান ফুটবে শিউলি ফুল…
পৃথিবীর সমস্ত নারী পাপের আগুনে জ্বলবে।
পৃথিবীর সমস্ত পুরুষ মোহের দাসত্বে ঝুলবে সিলিঙে?
🍂ফিচার
কর্নাটকের এই প্রাচীন জনপদ দেখিয়ে দেয়, মন্দির ভারতীয় সংস্কৃতিতে কেবল উপাসনার স্থান ছিল না! বহু ক্ষেত্রে তা হয়ে উঠেছিল শিল্প, স্থাপত্য, কারিগরি দক্ষতা, সামাজিক জীবনের মিলনক্ষেত্র। অয়হোলের মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন স্থাপনাগুলি এখনও সেই দীর্ঘ নির্মাণযাত্রার কথা বলে চলেছে।
মন্দির স্থাপত্যের আঁতুড়ঘর অয়হোল, কর্নাটকের মাটিতে লুকিয়ে ভারতের প্রাচীন নির্মাণকথা!

সুধীর দত্ত
ভারতের ইতিহাস যদি দেখা যায় তাহলে তা শুধু রাজা-রাজড়ার উত্থান-পতন কিংবা যুদ্ধের কাহিনি নির্ভর নয়। দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রাচীন স্থাপত্যও বহন করে চলেছে বহু শতাব্দীর পরিবর্তনের সাক্ষ্য। সেই ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক জড়িয়ে রয়েছে কর্নাটকের অয়হোলকে ঘিরে। বাগলকোট জেলার এই ঐতিহাসিক গ্রামকে ভারতীয় মন্দির স্থাপত্যের আঁতুড়ঘর হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাথরের গায়ে খোদাই করা নকশা, নানা ধরনের স্থাপত্যরীতি, ধর্মীয় নির্মাণের বৈচিত্র্য অয়হোল শুধু পুরনো জনপদ হিসেবে না, ভারতের স্থাপত্য-ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে পরিচিত করেছে। কর্নাটকের উত্তরাংশে অবস্থিত অয়হোলের ইতিহাসের সঙ্গে ভারতীয় মন্দির নির্মাণের বিবর্তনের একটি বড় অংশ জড়িয়ে আছে। ওই নির্দিষ্ট ধরনের মন্দির স্থাপত্য হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এর পিছনে ছিল লম্বা সময়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নির্মাণশৈলীর পরিবর্তন, পাথরকে কাজে লাগিয়ে নতুন রূপ দেওয়ার প্রয়াস। অয়হোলের বিভিন্ন স্থাপনা সেই পরিবর্তনের ধারাটিকে বুঝতে সাহায্য করে। ফলে এই জনপদের গুরুত্ব শুধু সময়ই না, ভারতীয় স্থাপত্যের বিকাশে এর ভূমিকার মধ্যেও নিহিত।
ভারতীয় মন্দির স্থাপত্যের ইতিহাসে অয়হোলের গুরুত্ব আরও একটি কারণে উল্লেখযোগ্য। এখানে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন স্থাপত্য-প্রভাবের মধ্যে একটি সংযোগের ছবি পাওয়া যায়। দাক্ষিণাত্যের ভৌগোলিক অবস্থান এমন ছিল যে নানা সাংস্কৃতিক প্রবাহের সঙ্গে এই অঞ্চল যুক্ত হতে পেরেছিল। তার প্রভাব স্থাপত্যেও পড়েছিল। মন্দিরের নকশা ও নির্মাণরীতিতে সেই আদান-প্রদানের নানা চিহ্ন দেখা যায়।
অয়হোলের প্রাচীন স্থাপত্যের দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে নির্মাণের বৈচিত্র্য। একই অঞ্চলের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মন্দির ও স্থাপত্যরীতি দেখা যায়। কোথাও কাঠামো তুলনামূলক সরল, কোথাও আবার পাথরের গায়ে সূক্ষ্ম নকশা ও অলঙ্করণের ব্যবহার দেখা যায়। মন্দিরের পরিকল্পনা, স্তম্ভের বিন্যাস, ছাদের ধরন আর প্রবেশপথের নির্মাণশৈলীতে নানা পরিবর্তনের চিহ্ন রয়েছে। এই বৈচিত্র্য থেকেই বোঝা যায়, প্রাচীন স্থপতিরা একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে নিজেদের আটকে রাখেননি। তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা নির্মাণের নতুন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করেছেন। আসলে, অয়হোলের সঙ্গে চালুক্য যুগের স্থাপত্য ঐতিহ্যের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীন চালুক্য শাসনকালে কর্নাটকের এই অঞ্চল শিল্প ও স্থাপত্যের বিকাশের অন্যতম ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। সেই সময় পাথর কেটে মন্দির নির্মাণের কাজ যেমন এগিয়েছিল, তেমনই বিভিন্ন স্থাপত্যরীতির সমন্বয় ঘটেছিল। পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ ও দাক্ষিণাত্যের মন্দির স্থাপত্যের যে বৈশিষ্ট্যগুলি আরও পরিণত রূপ লাভ করে, তার কিছু প্রাথমিক চিহ্ন অয়হোলের স্থাপনাগুলিতে খুঁজে পাওয়া যায়।
এই কারণেই অয়হোলকে অনেক সময় ভারতীয় মন্দির স্থাপত্যের পরীক্ষাগার হিসেবেও দেখা হয়। এখানে স্থপতিরা কীভাবে মন্দিরের পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন, কীভাবে পাথরের ভার বহন করার উপযোগী কাঠামো নির্মাণ করেছিলেন ও কীভাবে ধর্মীয় ভাবনাকে স্থাপত্যের ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন, তার নানা নিদর্শন রয়েছে। প্রাচীন নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও শিল্পবোধের যে সমন্বয় প্রয়োজন ছিল, অয়হোলের স্থাপত্যে তার পরিচয় পাওয়া যায়। অয়হোলের মন্দিরগুলির আর একটি আকর্ষণ হল, নির্মাণে পাথরের ব্যবহার। আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়া বহু শতাব্দী আগে বড় আকারের পাথর কেটে, বহন করে ও নির্দিষ্ট মাপে বসিয়ে স্থাপত্য নির্মাণ করা সহজ কাজ ছিল না। সেই সময়কার কারিগরদের দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায় স্থাপত্যের বিভিন্ন অংশে। পাথরের স্তম্ভ, দেওয়ালের অলংকরণ, ছাদের কাঠামো এবং মন্দিরের বিভিন্ন অংশের সংযোগে নির্মাণকৌশলের উন্নত ধারণা প্রকাশ পায়। অয়হোলের স্থাপত্যকে শুধু ধর্মীয় নির্মাণ হিসেবে দেখলে তার ইতিহাসের একটি বড় অংশ অদেখা থেকে যায়। কারণ একটি মন্দির তৈরি হওয়ার সঙ্গে সমাজের অর্থনৈতিক অবস্থা, কারিগরদের দক্ষতা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা ইত্যাদি কিছুরই সম্পর্ক ছিল। একটি বড় নির্মাণকাজের পিছনে প্রয়োজন হত বিপুল শ্রম, পাথর সংগ্রহ, পরিবহণ ও দীর্ঘ সময় ধরে কাজ চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা। ফলে অয়হোলের স্থাপত্যের ইতিহাস একই সঙ্গে প্রাচীন সমাজের সংগঠন ও সাংস্কৃতিক বিকাশের কথাও বলে।
ভারতীয় মন্দির স্থাপত্যের ইতিহাসে অয়হোলের গুরুত্ব আরও একটি কারণে উল্লেখযোগ্য। এখানে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন স্থাপত্য-প্রভাবের মধ্যে একটি সংযোগের ছবি পাওয়া যায়। দাক্ষিণাত্যের ভৌগোলিক অবস্থান এমন ছিল যে নানা সাংস্কৃতিক প্রবাহের সঙ্গে এই অঞ্চল যুক্ত হতে পেরেছিল। তার প্রভাব স্থাপত্যেও পড়েছিল। মন্দিরের নকশা ও নির্মাণরীতিতে সেই আদান-প্রদানের নানা চিহ্ন দেখা যায়। অয়হোলের স্থাপত্য একক কোনও শৈলী নয়। এটি পরিবর্তনের দিকও। কীভাবে প্রাথমিক নির্মাণরীতি ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে, কীভাবে ধর্মীয় স্থানের ধারণা স্থাপত্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ও কীভাবে স্থানীয় কারিগরি জ্ঞান বৃহত্তর ভারতীয় স্থাপত্য ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে, অয়হোল সেই দীর্ঘ যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। এই ঐতিহাসিক গ্রামকে ঘিরে আগ্রহ শুধু স্থাপত্যপ্রেমীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের ইতিহাস, শিল্প, প্রত্নতত্ত্ব এবং সংস্কৃতি নিয়ে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের কাছেও অয়হোলের গুরুত্ব রয়েছে। কারণ একটি প্রাচীন স্থাপত্যকে দেখলে শুধু তার সৌন্দর্য দেখা যায় না, তার ভিতরে লুকিয়ে থাকা সময়ের চিহ্নও পড়া যায়। কোন পাথর কীভাবে বসানো হয়েছে, কোন অংশে কী ধরনের অলঙ্করণ করা হয়েছে, মন্দিরের ভিতরের পরিসর কীভাবে পরিকল্পিত হয়েছে এইসব প্রতিটি বিষয়ই অতীতের মানুষের চিন্তাভাবনা সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।
এইসময় আধুনিক শহর, উঁচু বিল্ডিং ও দ্রুত বদলে যাওয়া নির্মাণশৈলীর মধ্যে দাঁড়িয়ে অয়হোলের প্রাচীন মন্দিরগুলি অন্য এক সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। সেই সময় নির্মাণের গতি ধীর ছিল ঠিকই, কিন্তু স্থাপত্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ভাবনা। পাথরের তৈরি একটি স্থাপনা কয়েক প্রজন্ম পেরিয়ে কীভাবে টিকে থাকতে পারে, তারই সাক্ষ্য বহন করে এই প্রাচীন জনপদ। এখানে আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অয়হোলের পরিচয় শুরু কর্নাটকের একটি ঐতিহাসিক গ্রাম হিসেবে আর সীমাবদ্ধ নয়। ভারতীয় মন্দির স্থাপত্যের যে বড় ইতিহাস এখন নানা গবেষণা, সংরক্ষণ ও পর্যটনের মাধ্যমে মানুষের সামনে আসে, তার গোড়ার দিকের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির সঙ্গে অয়হোলের নাম জড়িয়ে রয়েছে। এখানকার স্থাপত্যে যেমন ধর্মীয় বিশ্বাসের ছাপ রয়েছে, তেমনই রয়েছে শিল্পচর্চা, নির্মাণকৌশল, সামাজিক সংগঠনের পরিচয়ও। প্রাচীন ভারতের ইতিহাস বুঝতে গেলে তাই শুধু রাজবংশের তালিকা কিংবা যুদ্ধের বিবরণ যথেষ্ট না। পাথরের তৈরি মন্দির, স্তম্ভ, ভাস্কর্য, নির্মাণের পরিকল্পনাও সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। অয়হোল সেই দলিলগুলির একটি বড় ভাণ্ডার। কর্নাটকের এই প্রাচীন জনপদ দেখিয়ে দেয়, মন্দির ভারতীয় সংস্কৃতিতে কেবল উপাসনার স্থান ছিল না! বহু ক্ষেত্রে তা হয়ে উঠেছিল শিল্প, স্থাপত্য, কারিগরি দক্ষতা, সামাজিক জীবনের মিলনক্ষেত্র। অয়হোলের মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন স্থাপনাগুলি এখনও সেই দীর্ঘ নির্মাণযাত্রার কথা বলে চলেছে। সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, নির্মাণের পদ্ধতিও বদলেছে, কিন্তু পাথরের গায়ে ধরে রাখা সেই ইতিহাস এখনও টিকে আছে। আর সেই কারণেই ভারতীয় মন্দির স্থাপত্যের উৎস ও বিকাশের কথা উঠলে কর্নাটকের অয়হোল একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হয়ে সামনে আসে। বহু শতাব্দী আগে যে নির্মাণপরীক্ষা শুরু হয়েছিল, তার নানা চিহ্ন সেখানে দেখা যায়। সেই ইতিহাসই অয়হোলকে ভারতের প্রাচীন স্থাপত্য ঐতিহ্যের অনন্য কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। 🍁
🍂গ্রন্থপাঠ
অজিতেশের ভাবনায় অভিনয় কোনও সহজ অনুকরণ না। অভিনয় জীবনকে গ্রহণ করার শিল্প, তাকে নিজের ভিতরে ধারণ করার সাধনা ও উপযুক্ত মুহূর্তে তাকে মানুষের সামনে ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা। এই কারণেই ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ সংগ্রহ’ নাট্যপ্রেমীর পাঠ্য তা কিন্তু নয়। বইটি শিল্প ও মানুষের সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে চান এমন প্রত্যেক পাঠকের কাছেই নতুন করে পাঠের দাবি রাখে।
অভিনয়ের অন্তর্লোক : অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ সংগ্রহ’

দেবব্রত সরকার
অভিনয়কে আমরা সাধারণত মঞ্চের দৃশ্যমান শিল্প হিসেবেই দেখি। আলো জ্বলে, অভিনেতা মঞ্চে আসেন, সংলাপ উচ্চারিত হয়, শরীরী ভাষা চরিত্রকে দৃশ্যমান করে তোলে, দর্শক সেই অভিনয় প্রত্যক্ষ করেন। কিন্তু এই দৃশ্যমানতার পিছনে যে অদৃশ্য প্রস্তুতি, জীবনবোধ, যে স্মৃতি, অনুভব ও যে আত্মসংগ্রহ কাজ করে, তার খবর আমরা কতটা রাখি? অভিনেতার একটি সংলাপ উচ্চারণের পিছনে কতগুলি দেখা মুখ, কতগুলি শোনা কথা, কতগুলি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কিংবা অন্যের জীবন থেকে আহরিত অনুভূতি জমে থাকতে পারে? অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ সংগ্রহ’ এই প্রশ্নগুলির সামনে পাঠককে দাঁড় করায়। বইটি পড়তে পড়তে মনে হতে পারে, মঞ্চের অভিনয় হয়ত মঞ্চে শুরু হয় না। সেই অভিনয়ের শুরু মানুষের জীবন থেকে, মানুষের দিকে তাকানো থেকে, নিজের ভিতরে সেই জীবনকে ধারণ করার ক্ষমতা থেকে। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা নাট্যমঞ্চের এমন শিল্পী, যাঁর কাজের পরিসর অভিনয়ের প্রচলিত সংজ্ঞাকে বহু দূর অতিক্রম করেছে। অভিনেতা হিসেবে তাঁর পরিচিতি যেমন গভীর, তেমনই নাট্যকার, নির্দেশক, চিন্তাশীল শিল্পী হিসেবেও তাঁর অবদান বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর প্রবন্ধগুলির বিশেষত্ব হল, সেখানে নাটক বা অভিনয় সম্পর্কে কেবল বাহ্যিক আলোচনা নেই। রয়েছে শিল্পীর ভিতরের প্রস্তুতি নিয়ে ভাবনা, অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির সম্পর্ক, শিল্পকর্মের বহুস্তরীয় পাঠ আর রয়েছে শিল্পী ও দর্শকের পারস্পরিক সম্পর্কের প্রশ্ন। ফলে ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ সংগ্রহ’ নাট্যকর্মীদের জন্য লেখা শুধু কোনও ব্যবহারিক নির্দেশিকা নয় হিসেবে দেখলে ভুল হয়ে যাবে। বইটির লেখাগুলি শিল্পকে বোঝার চিন্তাশীল পাঠও বটে।
অজিতেশের কাছে ‘অভিনয়’ শব্দটির অর্থই আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। তাঁর ব্যাখ্যায় অভিনয়ের মধ্যে রয়েছে শিল্পীর ভাবনা ও অনুভূতিকে দর্শকের অভিমুখে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া। এই ধারণাটি আপাতদৃষ্টিতে সরল হলেও এর ভিতরে আছে অভিনয় সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি। অভিনেতার ভিতরে আবেগ তৈরি হলেই অভিনয় সম্পূর্ণ হয় না। সেই আবেগকে দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তাকে শিল্পের ভাষায় রূপান্তর করতে হয়। অর্থাৎ অভিনয় একই সঙ্গে অন্তর্মুখী এবং বহির্মুখী। অভিনেতাকে একদিকে নিজের গভীরে প্রবেশ করতে হয়, অন্যদিকে সেই গভীরতা থেকে উঠে এসে দর্শকের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে হয়। এই দ্বিমুখী যাত্রার প্রথম ধাপই অভিজ্ঞতা। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় -এর চিন্তায় অভিজ্ঞতার গুরুত্ব এতটাই বেশি যে অভিনয়কে বুঝতে গেলে প্রথমেই জীবনকে বোঝার প্রয়োজন হয়। অভিনেতার চারপাশে প্রতিদিন যে অসংখ্য ঘটনা ঘটে, সেগুলি তার অভিনয়ের সম্ভাব্য উপাদান। রাস্তায় হাঁটার সময় কোনও বৃদ্ধের চলন, বাসে বসে থাকা কোনও মানুষের মুখের অভিব্যক্তি, কারও কথা বলার ধরন, কোনও সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা কোনও অচেনা মানুষের আচরণ ইত্যাদি শিল্পীর স্মৃতিতে কোনও না কোনওভাবে জায়গা করে নিতে পারে।
শিল্পীর ব্যক্তিগত অনুভূতি যত গভীরই হোক, শিল্পের চূড়ান্ত গন্তব্য মানুষের কাছে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যখন শিল্পের ভাষা পায়, তখন তা ব্যক্তিগত সীমা অতিক্রম করে। দর্শক নিজের জীবন দিয়ে তাকে নতুন অর্থ দেন। ফলে শিল্পীর একান্ত ঘর ও সমাজের ‘উঠোন’ এই দু’য়ের মধ্যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক তৈরি হয়। ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ সংগ্রহ’-এর পাঠ তাই পাঠককে অভিনয়ের একটি অন্য রকম অভিঘাতের দিকে নিয়ে যায়। মঞ্চে কোনও অভিনেতাকে দেখার সময় তখন দর্শক শুধু তাঁরই সংলাপ শোনেন না, তাঁর শরীরের বিভঙ্গিও পড়তে ইচ্ছে করে। একটি বিরতি কেন এল? একটি দৃষ্টি কেন বদলে গেল? একটি সাধারণ শব্দ কেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল? এই প্রশ্নগুলি সামনে আসে।
কিন্তু অজিতেশের বক্তব্যের সূক্ষ্ম দিক এখানেই যে, শুধু ঘটনাগুলির মধ্যে দিয়ে গেলেই অভিজ্ঞতা তৈরি হয় না। অভিজ্ঞতা গ্রহণের ক্ষমতাও প্রয়োজন। একই ঘটনা দুই ব্যক্তি প্রত্যক্ষ করলেও তার প্রভাব দু’জনের মনে একইভাবে কাজ করবে না। একজন হয়ত ঘটনাটি দেখে পাশ কাটিয়ে চলে যাবেন, অন্যজন হয়ত তার মধ্যে মানুষের কোনও গভীর সত্য আবিষ্কার করবেন। ফলে শিল্পীর কাছে জীবন দেখা মানে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হওয়া কিন্তু নয়। তার ভিতরের অর্থকে অনুভব করাও শিল্পীর কাজ। অভিজ্ঞতার এই ধারণা আবার দুই পথে বিস্তৃত হয়। প্রত্যক্ষ এবং অপ্রত্যক্ষ। নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা যেমন শিল্পীর অভিজ্ঞতার অংশ, তেমনই বই, সিনেমা, নাটক, ছবি, ভাস্কর্য কিংবা অন্য মানুষের জীবনের কথাও তাঁর অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করতে পারে। একজন অভিনেতা হয়ত নিজে কখনও যুদ্ধ দেখেননি, কিন্তু যুদ্ধ নিয়ে লেখা সাহিত্য পড়েছেন, চলচ্চিত্র দেখেছেন, মানুষের স্মৃতিকথা পড়েছেন। সেখান থেকে তৈরি হতে পারে এমন কল্পনাজাত অভিজ্ঞতা, যা পরবর্তী সময়ে অভিনয়ের উপাদান হয়ে উঠতে পারে। এই জায়গায় বইটির পাঠ আরও বিস্তৃত হয়ে ওঠে। কারণ অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয়চিন্তা আসলে শিল্পীর জীবনচর্চার কথাও বলে। একজন অভিনেতার পাঠাভ্যাস, সিনেমা দেখা, নাটক দেখা, মানুষের সঙ্গে কথা বলা, চারপাশ পর্যবেক্ষণ করা এসবই তাঁর শিল্পশিক্ষার অংশ। অভিনয়ের প্রস্তুতি তাই রিহার্সালের ঘরে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার বাইরেও জীবন প্রতিদিন একজন অভিনেতাকে শিক্ষা দেয়।
এরপর আসে সাঙ্গীকরণ। অভিজ্ঞতাকে নিজের ভিতরে ধারণ করার প্রক্রিয়া। এই ধারণাটিই সম্ভবত অজিতেশের লেখার আলোচনার সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্তরগুলির একটি। আমরা প্রতিদিন অসংখ্য দৃশ্য দেখি, অসংখ্য কথা শুনি, নানা মানুষের সঙ্গে পরিচিত হই। সবকিছু সচেতন স্মৃতিতে ধরে রাখা সম্ভব নয়। অনেক কিছু ভুলে যাই। কিন্তু শিল্পীর ক্ষেত্রে ভুলে যাওয়া মানেই সম্পূর্ণ বিলুপ্তি নয়। অভিজ্ঞতার কোনও অংশ মনের গভীরে থেকে যেতে পারে, অপেক্ষা করতে পারে উপযুক্ত মুহূর্তের। সৃষ্টির সময় সেই সুপ্ত অভিজ্ঞতাই অন্য রূপে ফিরে আসতে পারে। শিল্পী কখনও নিজের কাজ দেখে নিজেই অবাক হন। তিনি হয়ত আগে থেকে ভাবেননি যে চরিত্রটি এভাবে হাঁটবে, এভাবে তাকাবে কিংবা কোনও নির্দিষ্ট সংলাপ এমনভাবে উচ্চারিত হবে। অথচ অভিনয়ের মুহূর্তে তা স্বাভাবিকভাবে বেরিয়ে আসে। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় -এর ভাবনায় এর ভিতরে রয়েছে দীর্ঘদিনের সঞ্চিত জীবন-অভিজ্ঞতা। শিল্পীর মন যেন একটি বিশাল সংগ্রহশালা, যেখানে অসংখ্য দৃশ্য ও অনুভূতি নীরবে জমতে থাকে। এই সঞ্চয় সচেতন ও অবচেতন দুই স্তরেই কাজ করতে পারে। কোনও স্মৃতি হয়ত সরাসরি মনে আছে, আবার কোনও অভিজ্ঞতার কথা শিল্পী ভুলেই গিয়েছেন। কিন্তু তার ছাপ থেকে গেছে তাঁর অনুভূতির ভিতরে। নতুন কোনও চরিত্রের সঙ্গে সেই পুরনো অনুভূতির সম্পর্ক তৈরি হলে তা অভিনয়ের মধ্যে নতুন রূপে প্রকাশ পেতে পারে। এই কারণেই অভিনয়কে কেবল শেখা কৌশলের ফল হিসেবে দেখলে অজিতেশ ও তাঁর চিন্তার একটি বড় অংশ অদেখা থেকে যায়।
অভিজ্ঞতা ও সঞ্চয় যতই সমৃদ্ধ হোক, প্রকাশের জায়গায় এসে শিল্পীর সামনে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা উপস্থিত হয়। মনের মধ্যে অনুভূতি থাকা আর সেই অনুভূতিকে শিল্পে প্রকাশ করা এক জিনিস নয়। অভিনেতার শরীর, কণ্ঠ, চোখ, মুখ, গতি, স্তব্ধতা, নীরব ও সংলাপ এসবকিছুকে একসঙ্গে ব্যবহার করে সেই অন্তর্গত অনুভূতিকে দৃশ্যমান করে তুলতে হয়। প্রকাশের মুহূর্তেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শিল্পের সম্পদে পরিণত হয়। এখানে অভিনেতার কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি তাঁর অনুভবের গভীরতাও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু কাঁদার অভিনয় করলেই দর্শকের মনে বিষাদের অনুভূতি তৈরি হবে না। কেন চরিত্রটি কাঁদছে, তার কান্নার ভিতরে কী স্মৃতি, কী ক্ষতি, কী আকাঙ্ক্ষা বা কী অসহায়তা রয়েছে, সেই জটিলতাকে অভিনেতাকে ধারণ করতে হয়। তখন চোখের জল শুধু চোখের জল থাকে না, তা চরিত্রের জীবনের একটি মুহূর্ত হয়ে ওঠে। অজিতেশের অভিনয়চিন্তায় দর্শকও তাই নিষ্ক্রিয় নন। শিল্পী মঞ্চে তাঁর অনুভূতিকে একটি নির্দিষ্ট রূপে প্রকাশ করেন, কিন্তু দর্শক নিজের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি দিয়ে সেই প্রকাশকে গ্রহণ করেন। একজন দর্শক যে অর্থ খুঁজে পান, অন্যজন হয়তো অন্য অর্থ আবিষ্কার করেন। একটি শিল্পকর্মের বহুস্তরীয়তা এখানেই। শিল্পী তাঁর কাজের দরজা খুলে দেন, দর্শক নিজের অনুভব নিয়ে সেই দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করেন। ঋত্বিক ঘটক -এর শিল্পভাবনার সঙ্গে অজিতেশের এই চিন্তার একটি গভীর সম্পর্ক পাওয়া যায়। একটি শিল্পকর্মের বাইরের স্তরে থাকতে পারে গল্প, হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখের জীবনচিত্র। একটু গভীরে গেলে দেখা যেতে পারে সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার উপস্থিতি। আরও গভীরে যেতে পারলে ধরা দিতে পারে দর্শন, শিল্পীর আত্মচেতনা, তাঁর জীবনবোধ। আবার তারও গভীরে এমন অনুভূতির স্তর থাকতে পারে, যাকে সম্পূর্ণ ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় এই বহুত্বের ধারণাকে অভিনয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলে দেখেছেন। ফলে একজন অভিনেতার কাজ কেবল দর্শককে হাসানো বা কাঁদানোর মধ্যে শেষ হয় না। একটি অভিনয়ের মধ্যে একই সঙ্গে গল্প, সমাজ, মানুষ, ইতিহাস, সম্পর্ক ও শিল্পীর নিজস্ব অনুভূতি কাজ করতে পারে। যে দর্শক যে স্তরে পৌঁছবেন, তাঁর অভিজ্ঞতাও তেমন হবে। কিন্তু বড় শিল্পের শক্তি হল, তা একাধিক স্তরে দর্শকের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। এই জায়গায় অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় -এর ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ সংগ্রহ’ একটি সাধারণ অভিনয়-আলোচনা থেকে শিল্পতত্ত্বের দিকে এগিয়ে যায়। অজিতেশ অভিনয়কে বৃহত্তর শিল্পচর্চার অংশ হিসেবে দেখেন। ফলে তাঁর বক্তব্য শুধু অভিনেতার জন্য তা কিন্তু না। লেখক, চিত্রকর, চলচ্চিত্রকার কিংবা অন্য যে কোনও সৃষ্টিশীল মানুষের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। কারণ সৃষ্টির পূর্বশর্ত হিসেবে অভিজ্ঞতা, সঞ্চয়ও প্রকাশ এই তিনটি ধাপ বহু শিল্পমাধ্যমেই কার্যকর। গ্রন্থটির আর একটি মর্মস্পর্শী ভাবনা শিল্পীর একান্ত ‘ঘর’-কে ঘিরে। অজিতেশের কবিতার পঙ্ক্তি : ‘আমাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা ঘর দরকার’ শিল্পীর ব্যক্তিগত পরিসরের প্রয়োজনীয়তার কথা মনে করিয়ে দেয়। সৃষ্টিশীল মানুষকে সব সময় ভিড়ের মধ্যে থাকলে চলে না। কখনও তাঁকে নিজের কাছে ফিরে যেতে হয়। নিজের কাজকে দেখতে হয়, নিজের সঙ্গে কথা বলতে হয়, নিজের আবেগকে বুঝতে হয়। এই একান্ত সময়ই তাঁকে আবার মানুষের বৃহত্তর সমাজে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করে। এই ‘ঘর’ তাই নিছক একটি স্থানের উদাহরণ নয়। তা শিল্পীর আত্মপরীক্ষার জায়গা। সেখানে তিনি নিজের সৃষ্টিকে যাচাই করেন। সেখানে হয়ত কোনও বাহ্যিক করতালি নেই, দর্শকের প্রতিক্রিয়াও নেই। আছে শুধু শিল্পী ও তাঁর কাজ। এই একাকিত্বের ভিতর দিয়েই তৈরি হয় পরবর্তী সমষ্টিগত মুহূর্ত। শিল্পী একা প্রস্তুত হন, কিন্তু তাঁর শিল্প শেষ পর্যন্ত একার জন্য থাকে না। তিনি ফিরে আসেন সবার কাছে।
এই ভাবনাটি অজিতেশের শিল্পদর্শনের সঙ্গে সুন্দরভাবে মিলে যায়। শিল্পীর ব্যক্তিগত অনুভূতি যত গভীরই হোক, শিল্পের চূড়ান্ত গন্তব্য মানুষের কাছে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যখন শিল্পের ভাষা পায়, তখন তা ব্যক্তিগত সীমা অতিক্রম করে। দর্শক নিজের জীবন দিয়ে তাকে নতুন অর্থ দেন। ফলে শিল্পীর একান্ত ঘর ও সমাজের ‘উঠোন’ এই দু’য়ের মধ্যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক তৈরি হয়। ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ সংগ্রহ’-এর পাঠ তাই পাঠককে অভিনয়ের একটি অন্য রকম অভিঘাতের দিকে নিয়ে যায়। মঞ্চে কোনও অভিনেতাকে দেখার সময় তখন দর্শক শুধু তাঁরই সংলাপ শোনেন না, তাঁর শরীরের বিভঙ্গিও পড়তে ইচ্ছে করে। একটি বিরতি কেন এল? একটি দৃষ্টি কেন বদলে গেল? একটি সাধারণ শব্দ কেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল? এই প্রশ্নগুলি সামনে আসে। কারণ অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় -এর অভিনয়ভাবনা আমাদের শেখায়, অভিনয়ের অর্থ যা দেখা যায় তা না, যা দেখা যায় না, তারও একটি দীর্ঘ ভূমিকা থাকে। এই গ্রন্থের সাহিত্যিক মূল্যও এখানেই। অজিতেশ তত্ত্বের ভাষাকে শুষ্ক আলোচনায় পরিণত করেননি। তাঁর চিন্তার সঙ্গে মিশে আছে মঞ্চের বাস্তব অভিজ্ঞতা। এর জন্যই তাঁর লেখা পড়লে মনে হয়, কোনও দূরবর্তী তাত্ত্বিক ধারণায় একজন কর্মরত শিল্পী নিজের কাজের ভিতরের কথাই বলছেন। এই স্বর গ্রন্থটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ৯৩তম জন্মদিনের প্রেক্ষিতে তাঁর লেখার দিকে ফিরে তাকালে আরও একবার বোঝা যায়, একজন শিল্পীর উত্তরাধিকার তাঁর অভিনীত চরিত্র বা নির্দেশিত নাটকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। শিল্পীর চিন্তা, প্রশ্ন, শিল্প সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মূল্যবান হয়ে থাকে। ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ সংগ্রহ’ সেই উত্তরাধিকারেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে বলা যায়, ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ সংগ্রহ’ অভিনয়ের ভিতর দিয়ে মানুষকে আবিষ্কার করার একটি বই। এখানে অভিনেতা চরিত্রের মুখোশ পরেন না। নিজের জীবন, স্মৃতি ও অনুভূতির মধ্য দিয়ে চরিত্রের কাছে পৌঁছন। আবার চরিত্রের মাধ্যমে দর্শকের কাছে পৌঁছন। এই যাত্রায় অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে উপাদান, সাঙ্গীকরণ হয়ে ওঠে অন্তর্গত প্রস্তুতি ও প্রকাশ হয়ে ওঠে শিল্পের দৃশ্যমান রূপ। দর্শক সেই প্রকাশকে নিজের অনুভব দিয়ে সম্পূর্ণ করেন। অজিতেশের ভাবনায় অভিনয় কোনও সহজ অনুকরণ না। অভিনয় জীবনকে গ্রহণ করার শিল্প, তাকে নিজের ভিতরে ধারণ করার সাধনা ও উপযুক্ত মুহূর্তে তাকে মানুষের সামনে ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা। এই কারণেই ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ সংগ্রহ’ নাট্যপ্রেমীর পাঠ্য তা কিন্তু নয়। বইটি শিল্প ও মানুষের সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে চান এমন প্রত্যেক পাঠকের কাছেই নতুন করে পাঠের দাবি রাখে। মঞ্চের আলো নিভে যাওয়ার পরও যে অভিনয় আমাদের মনে থেকে যায়, যে চরিত্র নিজের জীবনের কোনও অচেনা দরজায় গিয়ে কড়া নাড়ে, তার পিছনে যে শিল্পসাধনা থাকে, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই প্রবন্ধগুলি সেই অদৃশ্য পথটিরই সন্ধান দেয়।🍁

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক
এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আইডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ ও ‘ফিরেপড়া : কবিতা ‘ আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।





