সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া নিম্নচাপকে ঘিরে নতুন করে আবহাওয়ার উদ্বেগ বাড়ছে। ক্রমশ শক্তি সঞ্চয় করে এই নিম্নচাপ গভীর নিম্নচাপ এবং পরে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া দফতর। সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়ের অভিমুখ উত্তর অন্ধ্রপ্রদেশ ও দক্ষিণ ওড়িশা উপকূলের দিকে থাকলেও এর প্রভাবে পশ্চিমবঙ্গের আবহাওয়াতেও বড় পরিবর্তন ঘটতে পারে। কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় আগামী সপ্তাহে বৃষ্টি, বজ্রবিদ্যুৎ ও ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ২৭ অক্টোবর থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় আবহাওয়াজনিত সতর্কতা জারি করা হয়েছে। কোথাও ভারী বৃষ্টি, আবার কোথাও ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া বইতে পারে। ফলে পুজো-পরবর্তী সময়ে আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের দিকে নজর রাখছেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে উপকূলবর্তী এলাকার বাসিন্দারা।
শুক্রবার দুপুরে প্রকাশিত বিশেষ বুলেটিনে আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরের উপরে শুক্রবার সকালে একটি নিম্নচাপ অঞ্চল তৈরি হয়েছে। ওই এলাকার উপরে একটি ঘূর্ণাবর্তও অবস্থান করছে, যার বিস্তার সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫.৮ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত। আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, শনিবারের মধ্যে নিম্নচাপ অঞ্চলটি আরও সুসংহত হয়ে নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। তার পরে সেটি পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রবিবার নিম্নচাপটি গভীর নিম্নচাপের রূপ নিতে পারে। পরিস্থিতি অনুকূল থাকলে সোমবার, ২৬ অক্টোবর, পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরের উপরে সেটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে বলে উল্লেখ। সমুদ্রের উপরে অবস্থান করার সময়েই সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়টির শক্তি আরও বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাসে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। আগামী দু’দিনে সেটি ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে উত্তর অন্ধ্রপ্রদেশ এবং দক্ষিণ ওড়িশা উপকূলের দিকে যেতে পারে। তবে ঘূর্ণিঝড়ের চূড়ান্ত গতিপথ, শক্তি এবং স্থলভাগে আছড়ে পড়ার সম্ভাব্য স্থান সম্পর্কে পরবর্তী আবহাওয়ার বুলেটিনের দিকে নজর রাখা জরুরি। নিম্নচাপ থেকে ঘূর্ণিঝড়ে রূপান্তরের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে।
সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়টি তৈরি হলে তার নাম হতে পারে ‘অর্ণব’ (Arnab)। উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ঘূর্ণিঝড়গুলির জন্য নির্ধারিত নামের তালিকায় এই নামটি রয়েছে, যা দিয়েছে বাংলাদেশ। তবে নামকরণের বিষয়টি ঘূর্ণিঝড় তৈরি হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল তার গতিপথ, বৃষ্টির পরিমাণ এবং বাতাসের গতিবেগ সম্পর্কে সময়মতো তথ্য পাওয়া। কারণ, ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্র সরাসরি পশ্চিমবঙ্গের উপকূলে না এলেও সমুদ্রের পরিস্থিতি এবং বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তনের কারণে রাজ্যের একাধিক জেলায় বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তে পারে। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী সোমবার পর্যন্ত দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে উল্লেখযোগ্য ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। কিন্তু মঙ্গলবার থেকেই আবহাওয়ার পরিস্থিতি বদলাতে পারে। কলকাতা, হাওড়া, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রামে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর এবং পশ্চিম মেদিনীপুরে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির পাশাপাশি ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। এই তিন জেলার জন্য হলুদ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari, 64 MLAs | শুভেন্দুর ৬৪ বিধায়ক মন্তব্যে জল্পনা, ঋতব্রত শিবিরকে নিশানা তৃণমূলের
মঙ্গলবারের তুলনায় বুধবার দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়া আরও বেশি প্রতিকূল হয়ে উঠতে পারে। কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের সমস্ত জেলাতেই ঝড়বৃষ্টির সতর্কতা রয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রামে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়ার পরিভাষায় ৭ থেকে ১১ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাতকে ভারী বৃষ্টি হিসেবে ধরা হয়। ফলে ওই জেলাগুলিতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃষ্টি হলে নিচু এলাকা, গ্রামীণ রাস্তা এবং শহরের জলনিকাশির ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে। যদিও কোথায় কতটা বৃষ্টি হবে, তা নির্ভর করবে ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ ও স্থানীয় আবহাওয়ার পরিস্থিতির উপরে।
বুধবার দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং দুই মেদিনীপুরে বৃষ্টির পাশাপাশি ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার গতিবেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। এই ধরনের হাওয়ায় খোলা জায়গায় চলাচল, অস্থায়ী কাঠামো ও দুর্বল গাছপালার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। দক্ষিণবঙ্গের বাকি জেলাগুলিতেও বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি এবং দমকা হাওয়ার সম্ভাবনা থাকছে। কলকাতায় বৃষ্টি হলে যান চলাচল, অফিসযাত্রা ও দৈনন্দিন কাজকর্মে প্রভাব পড়তে পারে। তাই বুধবার বাইরে বেরোনোর আগে আবহাওয়ার সর্বশেষ পূর্বাভাস দেখে নেওয়া ভাল। বৃহস্পতিবারও দুর্যোগের আশঙ্কা কাটছে না। পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া এবং পুরুলিয়ায় ভারী বৃষ্টি হতে পারে বলে পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের অন্যান্য জেলাতেও ঝড়বৃষ্টির সতর্কতা রয়েছে। অর্থাৎ, সপ্তাহের মাঝামাঝি থেকে দক্ষিণবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চল ও উপকূলবর্তী এলাকায় বৃষ্টির প্রভাব বেশি অনুভূত হতে পারে। কৃষিকাজ, মাঠে শুকোতে দেওয়া ফসল, নির্মাণকাজ ও খোলা জায়গায় থাকা সামগ্রী নিয়ে সংশ্লিষ্টদের আগাম সতর্কতা নেওয়া প্রয়োজন। বজ্রপাতের আশঙ্কা থাকলে খোলা মাঠ, জলাশয় এবং বিচ্ছিন্ন গাছের নীচে আশ্রয় নেওয়া এড়ানো উচিত।
সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বঙ্গোপসাগর উত্তাল হয়ে ওঠার আশঙ্কাও রয়েছে। সে কারণে আগামী মঙ্গলবার থেকে পশ্চিমবঙ্গের উপকূলবর্তী সমুদ্রে মৎস্যজীবীদের যেতে নিষেধ করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশিকা জারি না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের সমুদ্রে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যাঁরা ইতিমধ্যে সমুদ্রে রয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ও সামুদ্রিক সতর্কতা অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ। উপকূলবর্তী এলাকার বাসিন্দাদেরও আবহাওয়া দফতরের নিয়মিত ঘোষণা ও প্রশাসনের নির্দেশের দিকে নজর রাখতে হবে। উল্লেখ্য যে, দক্ষিণবঙ্গের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গেও সপ্তাহের শেষ দিকে আবহাওয়ার পরিবর্তন হতে পারে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে ঝড়বৃষ্টির উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা নেই। বুধবার উত্তরবঙ্গের আটটি জেলায় হালকা বৃষ্টি হতে পারে। তবে বৃহস্পতিবার দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি এবং আলিপুরদুয়ারে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। অন্য দিকে মালদহ, উত্তর দিনাজপুর এবং দক্ষিণ দিনাজপুরে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়া হতে পারে। ওই দিন এই ছয় জেলার জন্য সতর্কতা জারি করা হয়েছে। উল্লেখ্য, আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি থেকে পশ্চিমবঙ্গের আবহাওয়ায় বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপ শেষ পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয় কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়ের অভিমুখ অন্ধ্রপ্রদেশ ও দক্ষিণ ওড়িশার দিকে থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের উপকূল এবং দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার প্রভাব পড়তে পারে। তাই শুধুমাত্র ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য স্থলভাগে আছড়ে পড়ার স্থান দেখে নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই। আবহাওয়া দফতরের পরবর্তী বুলেটিন, বৃষ্টির সতর্কতা এবং মৎস্যজীবীদের জন্য জারি করা নির্দেশ নিয়মিত অনুসরণ করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে সতর্কতার মাত্রা ও সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কেও নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Nandigram Bypoll 2026, Suvendu Adhikari | নন্দীগ্রামের শেষ মিছিলে শুভেন্দুর নিশানায় মমতা, ১০ মার্চকে ‘মিথ্যা দিবস’ করার ডাক!



